আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আজও রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • মারুফ রায়হান

শত বৎসরে শত ফুল হয়ে ফুটলো শত কবির শব্দসম্ভার; অজস্র নাট্যমুহূর্ত সৃজিত হলো বহু নাট্যকারের সৃষ্টিশীলতায়; কত না জীবনশিল্পী এসে জীবনজগতের ওপর ফেললেন বহুকৌণিক আলো, তবু ঘুচলো না আঁধার; ঝরনার মতো বয়ে গেল গীতসুধাধারা; আর চিন্তা ও দর্শনের নব নব সূত্র উন্মোচন করলেন সংখ্যাহীন প্রাজ্ঞ মননশীলেরা। তবু আজও রবীন্দ্রনাথ পরম বাতিঘর হয়ে, মৃত্যুহীন মহীরূহ হয়ে বিরাজ করছেন বাঙালী সমাজে। আজও রবীন্দ্রনাথ বাঙালী জীবনে সকালের রবিকিরণ, ম্লান-ম্রিয়মাণ বেলায় অশেষ প্রেরণা, আধুনিকতার ধ্বনি ও ধোঁয়াশায় আশ্চর্য রকমভাবে প্রাসঙ্গিক। সাহিত্য যে ভাষাতেই লীখিত হোক না কেন তাতে থাকে সামান্য ক’জন অসামান্য স্রষ্টা, যাঁরা হন চিরায়ত অবশ্যপাঠ্য। যেমন জার্মান সাহিত্যে গ্যেটে, ইংরেজিতে শেক্সপীয়র, রুশ সাহিত্যে টলস্টয়। বাংলায় তেমনি রবীন্দ্রনাথ বলেই যে তিনি তাঁর নশ্বরসম্মত প্রস্থানের এতটাকাল পেরিয়েও বাঙালীর সবচেয়ে বড় সাহিত্য-আইকন, বিষয়টি নিশ্চয়ই তেমন নয়। সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিকতা বহুরূপ-রসসন্ধানী বাঙালীকে আকর্ষণ করেছে বহুবিধ বিচারেই। বাঙালীর গৌরবের প্রতীক হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁকে পাশে সরিয়ে রেখে শিক্ষিত বাঙালীর একটি ঋতুও পার করার সুযোগ নেই। তাঁর গান ভারী ধাতবের শ্রুতি বধির করে দেয়া অসুরের দাপটের মাঝেও বাঙালীকে গাইতেই হচ্ছে যুগ যুগ ধরে। মাল্টিমিডিয়া তার জগতজোড়া রাজ্যপাট খুলে বসার পর নব নব রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কারের চেষ্টা চলে আসছে। টেলীভিশন হয়ে উঠেছে আধুনিক, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নিঃসঙ্গ ও দলবদ্ধ, যুক্ত বা বিচ্ছিন্ন মানুষের জন্য এক অনিবার্য বিষয়। নিত্য আয়ুর ভাগ দেয়াই হয়ে উঠেছে মানবনিয়তি। এখানেও বাঙালী হাত পেতেছে রবীন্দ্রনাথের কাছেই। তাঁর গল্প-কাহিনী নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র ক্রমে বাঙালীর দর্শনযোগ্য জীবনশিক্ষা হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রের বিশাল ক্যানভাস থেকে টেলীভিশনের সীমিত বলয়ে রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস তার অন্তর্নিহিত রস নিয়ে উপস্থিত হতে শুরু করার পর ক্রমান্বয়ে তা গ্রহণীয় হয়ে উঠেছে। এখানে অভিনবত্ব হলো রবীন্দ্রনাথের গানের দৃশ্যকল্প সমকালীন রুচিকে ধারণ করে উঠে আসছে টেলীভিশনের ছোটপর্দায়। তার আগে অবশ্য আমাদের মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশিত হয়ে চলেন বিচিত্র আঙ্গিকে। বিনোদনসন্ধানী, পাঠবিমুখ, অর্থপূর্ণ জীবনবোধ থেকে নির্বাসিত শুধুমাত্র নাগরিক বাঙালীর কাছেও রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠেছেন প্রাসঙ্গিক।

সাহিত্যের সত্যিকারের পাঠকের সংখ্যা কোনকালেই খুব বেশি নয়। অথচ লাখ লাখ, কোটি বললেও কি ভুল হবে, বাঙালীর হৃদয়ে আসন পেতে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। রাষ্ট্র একসময় বাধা দিয়েছে, সে এক দুর্গতকাল ছিল। ছিল স্বাধীনতাহীনতার, অপমানের ও অন্ধকারের সময়; সেই প্রতিবন্ধকতার বিপরীতে প্রবলশক্তির উদ্বোধন ঘটিয়েছে রবীন্দ্রচর্চা এবং রবীন্দ্রপ্রেম। এটিকে বরং আত্মপরিচয়ের প্রতি, স্বভাষা ও স্বজাতির প্রতি প্রেম বললেই অধিক যুক্তিযুক্ত শোনাবে। রবীন্দ্রচর্চা বিকশিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাঙালী যখন তার নিজস্ব স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হলো তখন জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে রবীন্দ্র-অনুভব। বাংলাকে রবীন্দ্রনাথ কী সহজ রূপেই না ভালবেসেছেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ বলে। আজও রবীন্দ্রনাথ এভাবেই প্রাসঙ্গিক, অনিবার্য। একইসঙ্গে তিনি চিরকালীন। মুক্তিযুদ্ধের পেছনে বাঙালীর যে চেতনা, মূল্যবোধ ও আদর্শ ছিল, তার বিরোধিতা বেড়ে চলছিল, তা বন্ধ করার উদ্যোগ চলছিল। বাঙালীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বড় এক আলোর মশাল হলেন। গত শতাব্দীর আশির দশকে রবীন্দ্রনাথকে আবারও আঁকড়ে ধরতে হয়েছিল সে সময়কার সঙ্কট কাটাতে। কোন সে সঙ্কট? মহান নেতাকে হত্যা করে দেশের চাকাকে উল্টোদিকে পরিচালনার অপচেষ্টা চলেছে। যে সামরিক শাসন, অপশাসনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আত্মমর্যাদার প্রাঙ্গণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পুনরায় সমধর্মী দুঃশাসন স্বৈরশাসনের নিচেই বাংলার প্রাণ হাঁসফাঁস করে উঠেছিল। পরবর্তীকালে যদিও পরিস্থিতি অনেক শুধরেছে, সংস্কৃতিকর্মীদের পথ অনেকটাই সুগম হয়েছে, তবু রবীন্দ্রনাথ থেকে গিয়েছেন, তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করা, তাঁর মুক্ত চেতনাকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার আকাক্সক্ষায়। আর আজও রবীন্দ্রনাথের দেশজ প্রয়োজন, সমসাময়িক প্রয়োজন জাগরুক রয়েছে। জরুরী হলো রবীন্দ্রনাথকে আরও ভাল করে জানা, রবীন্দ্রদর্শনে নিজেদের উজ্জীবিত করা।

২.

সকলেই কবিতার পাঠক হয়ে উঠতে পারেন না। কবিতার রস উপভোগের জন্য পাঠককে বিশেষভাবে শিক্ষিত হতে হয়। কবিতার তুলনায় অবশ্য উপন্যাসের পাঠকই বেশি আমাদের দেশে। আজও রবীন্দ্রনাথ বাঙালী উপন্যাস পাঠকদের কাছে পাঠ্য। যদি একখানা উপন্যাসও নির্বাচন করেন পাঠকরা তাহলে অবধারিতভাবে ‘শেষের কবিতা’-ই উঠে আসে। তাই রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ একটি বহুলপঠিত এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় উপন্যাস। কেন বাঙালী এত বেশিবার পড়েছে এ উপন্যাস, কেন আজও সমান প্রিয়? একটু পর্যালোচনা করে দেখা যাক। উপন্যাসটি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেয়েছে প্রেমিকমনের কাছে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রথম দেখায় প্রেমÑ এ রকম একটা আপ্তবাক্য আছে বাংলায়। বাঙালীর অনেক প্রেমই প্রথম দেখায় হয়ে যায়, হোক না তা একতরফা। উপন্যাসেও আমরা বার বার দেখি যে, প্রথম দেখায় প্রেমে পড়ে যাচ্ছেন নায়ক বা নায়িকা। আসলে এটাকে প্রেম না বলে আকর্ষণ বলাই সঙ্গত। এরপর সেই আকর্ষণ মোহর রূপ নেয়, তখন তাতে অলৌকিক মোহের-অর্জনের চাহিদা তৈরি হতে থাকে। এভাবেই তো ধীরে ধীরে ভালবাসা বাড়তে থাকে। আবেগ মেলতে থাকে ডালপালা, বলা ভাল, পালাক্রমে তাতে যোগ হয় ডানা; কী দশা তখন একজন প্রেমপিয়াসী ব্যক্তির, পা কখনও মাটিতে, কখনও বা ভারসাম্য-এলোমেলো করে-দেয়া শূন্যে, হাওয়ায়। করোটিতে ব্রহ্মা-ের বহুবর্ণিল স্পন্দন। বাংলা ক্ল্যাসিক উপন্যাসে এমন অনেক শাশ্বত জুটির সাক্ষাত পাওয়া যায় যাদের প্রভাব কোন না কোনভাবে পড়ে প্রেমিকÑপ্রেমিকাদের ওপর। উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাদের যে-যে পরিস্থিতির ভেতর ফেলে দেন ঔপন্যাসিক; বাস্তবজীবনে অনেক সময় সে রকম ক্রাইসিসের ভেতর পড়ে যান প্রেমিক-প্রেমিকারা। আসলে প্রেম এমন একটি অথৈ সাগরÑ যার গভীরে নিমজ্জনের অভিজ্ঞতা বিবিধ-বিচিত্র হলেও মূল অনুভূতিগুলো প্রায় একইরকম। প্রেমে পড়লে যেমন অনেকের মরে যেতে ইচ্ছে করে, তেমনি প্রেম না পেলেও গলায় দড়ি দেয়া অনিবার্য বলে মনে হয়। তবে প্রেমের জটিলতাগুলো, তার সুড়ঙ্গসমূহ, সমাধিগহ্বরের অন্ধকার আর আলোয় ভরা আকাশ ভ্রমণ করে মেলে এমন নুড়ি ও সোনার সম্ভার যার একটার ওজনের সঙ্গে অন্যটার তুলনা চলে না। একটির শীতলতার মাত্রার সঙ্গে অন্যটির তাপমাত্রা এক পাল্লায় মাপা চলে না। আমাদের কথাশিল্পীদের কেউ কেউ চিরকালের জন্যে আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন এমন কিছু যুগলকে যাদের ছবি আমাদের মনের গভীরে চিরভাস্বর। সেরকমই ‘শেষের কবিতা’-র অমিত-লাবণ্য। গ্রাম আর শহরের ভালবাসার ধরন-ধারণে নিশ্চয়ই পার্থক্য রয়েছে, যদিও সেই ব্যবধান আজ অনেকটাই কমে এসেছে। গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত নারীর হৃদয়ের উত্তাপের সঙ্গে উচ্চশিক্ষিত শহুরে নারীর হৃদয়াবেগের তুলনা হতে পারে নিশ্চয়ই। কি উপন্যাসে, কি জীবনে, ভালবাসা শ্রেণীবৈষম্য ঘুচিয়ে দিতে পারে। যদিও সেটা সীমাবদ্ধ থাকে দুটি প্রেমথরথর নর-নারীর একান্ত চত্বরেই।

কবিগুরুর এই নায়ক অমিত রায় একজন নাম-গোপনকারী কবি। প্রেমিকা লাবণ্যকে সে শোনায় জনৈক নিবারণ চক্রবর্তীর কবিতা, যদিও বুদ্ধিমতী লাবণ্য একেবারে গোড়া থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে এই নিবারণ আর কেউ নয়, স্বয়ং অমিত, মানে তার মিতা। মিতাটির সঙ্গে কবির কবিতার মিতালী রয়েছে, যদিও সে চায় রবীন্দ্রবলয়ের বাইরে গিয়ে কবিপরিচিতি পেতে। লাবণ্য নিজেও কি কবি নন! তার কবিতা দিয়েই যবনিকা ঘটেছে এই উপন্যাসের। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে উপন্যাসটির আরেক উপেক্ষিত নায়ক শোভনলাল প্রসঙ্গে সামান্য নিবেদন। শেষ পর্যন্ত শোভনলালের সঙ্গেই লাবণ্যের বিয়ে পাকাপাকি হয়। তবে একপর্যায়ে তার অবস্থান কেমন ছিল লাবণ্যের কাছে সেটা বোঝাতে দুটি বাক্য তুলে দিচ্ছি। প্রেমজীবনের একটি গভীর সত্য হিসেবেও কথাগুলো বিবেচিত হতে পারে। কথাগুলো হলো- ‘যাকে খুবই ভালবাসা যেতে পারত তাকে ভালবাসার অবসর যদি কোন একটা বাধায় ঠেকে ফসকে যায়, তখন সেটা না-ভালবাসায় দাঁড়ায়, না সেটা দাঁড়ায় একটা অন্ধ বিদ্বেষে, ভালবাসারই উল্টো পিঠে।’ লাবণ্য কেন প্রথমে অমিতকে বিয়ের বন্ধনে জড়াতে চায়নি সেটা একটা বিগ কোশ্চেন, যেখানে প্রায় সমস্ত প্রেমেরই লক্ষ্য থাকে বাসর-রাত রচনার। প্রেমে মহত্ত্ব একটি বিরল বিষয়। এই বিরল জিনিসটি সাহিত্যেও কম এসেছে। শেষের কবিতা যেসব কারণে বাংলা উপন্যাসে অমরত্ব পেয়ে গেছে তার একটি প্রধান উপাদান লাবণ্যের ওই মহত্ত্ব। এসময়ের উপন্যাস পাঠকের কাছে এভাবেই রবীন্দ্রনাথ আজও আত্মীয়।

৩.

কবির জন্মদিন ঘিরে আয়োজনের বিপুলতা প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে নতুন রং ও শোভা এসে যুক্ত হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এক অর্থে তারপরে জন্মগ্রহণকারী প্রত্যেক কবিরই জন্মদিনÑ জন্মের উৎসব করার দিনÑ এমনটাই ভাবতাম তরুণ বয়সে। এদিন বিশেষ পুলক নিয়ে ঘুরে বেড়তে ভাল লাগত। দেখতে দেখতে বাংলাদেশে বিষয়টি এমন দাঁড়াল যে শুধু এদিন নয়, দিনটির আগে পরেও কয়েকটি দিন রীতিমতো জন্মদিনের উৎসব চলছে। টেলীভিশনই শুরু করেছিল এক এলাহীকা-; সারাদিন ধরে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে অনুষ্ঠানের মালা গাঁথা। প্রাণবন্ত আলোচনা, নাটক, কবিতা, গান এবং প্রামাণ্যচিত্রÑ কোনটাই বাদ পড়ত না। সরকারপ্রধান এ উপলক্ষে বাণী দিচ্ছেন, সরকারী বা জাতীয় উদ্যোগে পালীত হচ্ছে কবিজয়ন্তী। সংবাদপত্রে কবির জন্মদিন উপলক্ষে সম্পাদকীয় রচনা! কবির জন্মদিনে কবির প্রতি ভালবাসার যে প্রকাশ ঘটে তা এক কথায় অনবদ্য, অতুলনীয় এবং বিশ্বসভায় অভূতপূর্ব। একদিকে এ থেকে বাঙালীর বাঁধভাঙা আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতার বিষয়টিই প্রকাশিত হয়ে থাকে।

স্মরণযোগ্য যে, ১৯২৫ সালের পঁচিশে বৈশাখ কবির জন্মোৎসব পালিত হয় শান্তিনিকেতনে। সে-জন্মোৎসবের অঙ্গ হিসেবে উত্তরায়ণের উত্তর-পশ্চিম সীমানায় পঞ্চবটী (অর্থাৎ অশ্বত্থ, বিল্ব, বট, আমলকী ও অশোক) প্রতিষ্ঠা করা হয়। শান্তিনিকেতনে আনুষ্ঠানিক এবং ধারাবাহিক বৃক্ষরোপণ শুরু হয় আরও তিন বছর পরে ১৯২৮ সাল থেকে। কেন এই বৃক্ষরোপণ উৎসব সে বিষয়ে কবি তাঁর মনোভাব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন ১৯৩৯ সালে। তিনি বলেন : ‘পৃথিবীর দান গ্রহণ করার সময় মানুষের লোভ বেড়ে উঠল। অরণ্যের হাত থেকে কৃষিক্ষেত্রকে সে জয় করে নিলে, অবশেষে কৃষিক্ষেত্রের একাধিপত্য অরণ্যকে হটিয়ে দিতে লাগল। নানা প্রয়োজনে গাছ কেটে কেটে পৃথিবীর ছায়া বস্ত্রহরণ করে তাকে নগ্ন করে দিতে লাগল। তার বাতাস হলো উত্তপ্ত, মাটির উর্বরতার ভা-ার নিঃস্ব হলো। এই কথা মনে রেখে কিছুদিন পূর্বে আমরা যে অনুষ্ঠান করেছিলুম সে হচ্ছে বৃক্ষরোপণ, অপব্যয়ী সন্তান কর্তৃক মাতৃভা-ার পূরণ করার কল্যাণ-উৎসব।’...

আজ রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকীতে গোটা বাংলায় যথারীতি আনন্দধারা বয়ে যাবে। তবে শহুরে শিক্ষিত মন রবীন্দ্রনাথের গানে মোহমুগ্ধ থেকে তাঁর সাহিত্যের অন্তর্নিহিত মানবকল্যাণ ভাবনার বিষয়ে যে উদাসীন রয়ে যান, সে কথাটিও আজ বলা চাই। উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিষয়কে অকার্যকর করতে এবং মানবতাবাদকে ঊর্র্ধ্বে তুলে ধরতে রবীন্দ্রসৃষ্টির গভীর থেকে অদম্য শক্তির সন্ধান করতে হবে। আনন্দ আহরণের সমান্তরালে কর্তব্য সাধনের দিকটি গুরুত্ব পেলেই বলা যাবে আমরা সার্থকভাবে রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করতে পেরেছি। এই যে সেদিন সিরাজগঞ্জে তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে প্রচারপত্র বিতরণ করা হলো, এর বিপরীতে অবস্থান নিতে হলে আলো জ্বালানোর কাজটি করতে হবে সবকিছুর আগে। তবেই না কূপম-ূকতা, মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা দূর করা সম্ভব হবে। সেই আলোর অনির্বাণ উৎস রবীন্দ্রনাথের গদ্য রচনা, প্রবন্ধসাহিত্য। ওখানেই তাৎপর্যপূর্ণভাবে সন্ধান মিলবে রবীন্দ্রনাথের সমাজ, রাজনীতি, কৃষি, সমবায়, শিক্ষা, সাহিত্য, চিত্রকলাবিষয়ক ভাবনাগুলো। হৃদয়ের তৃষ্ণা মেটাতে বাঙালী বার বার রবি-শরণ নিয়েছে। সামাজিক অন্ধকার নেভাতেও আমাদের যেতে হবে তাঁর মননের বিভায়। এবারের পঁচিশে বৈশাখ হোক এ অঙ্গীকারেই উজ্জ্বল।

marufraihan71@gmail.com

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: