আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চলে গেলেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ

প্রকাশিত : ৭ মে ২০১৫, ০১:২৬ এ. এম.

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আশ্চর্য অভিমান! তীব্র বেদনাবোধ! কেন? ঠিক কোন্ কারণে? কোনদিন তা জানা যায়নি। নিজেকে এতটাই আড়ালে রেখেছিলেন কিংবদন্তি ভাস্কর নভেরা আহমেদ। বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের অগ্রদূত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম রূপকার স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন প্রবাস জীবন। প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী, আত্মবিশ্বাসী এবং একরোখা ধরনের ভাস্কর জীবনের সবচেয়ে বড় সময় প্যারিসে কাটিয়েছেন। নীরবে-নিভৃতে। আর তার পর সুদূর প্যারিস থেকে এলো বিয়োগ সংবাদ- নভেরা আহমেদ আর নেই! আন্তর্জাতিক মানের এই ভাস্কর মঙ্গলবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের বিস্ময়কর প্রতিভা নভেরা আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ফ্রান্স প্রবাসী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আনা ইসলাম অনেকদিন ধরে নভেরার খোঁজ রেখেছেন। শিল্পী জানান, প্যারিসের হাসপাতালে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ।

বাবা সৈয়দ আহমেদ সুন্দরবন অঞ্চলে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৩০ সালে জন্ম হয় নভেরা আহমেদের। পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ভাস্কর্য শিল্পের পথিকৃৎ। তিনি ভাস্কর হামিদুর রহমানের সঙ্গে জাতীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিক নক্সা প্রণয়নের কাজ করেন। অজানা অভিমান নিয়ে দীর্ঘকাল তিনি একলা কাটিয়েছেন। প্রবাসে থাকলেও কেউ তাঁর কোন খোঁজ পাননি। সর্বশেষ গত বছরের ১৭ জানুয়ারি প্যারিসে তাঁর রেট্রোসপেকটিভ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলে ভাস্করের সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়। তার আগে ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে প্যারিসে গ্যালারি রিভগেসে তাঁর একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এ পদক নিতে বিশেষ দূত পাঠানো হলেও তিনি দেশে আসতে রাজি হননি। নভেরা দেশে না থাকলেও, তাঁর অনেক অমূল্য শিল্পকর্ম বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রদর্শিত হচ্ছে।

ভাস্কর্য বিষয়ে পড়াশোনা করতে তিনি লন্ডন যান ১৯৫১ সালে। সেখানেই শিল্পী জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। ভাস্কর্যের ওপর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুও সেখানে। লন্ডনের ক্যাম্বারওয়েল আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে। সেখানেই শিল্পী হামিদুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব। হামিদুর রহমান বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তাঁকে। দু’জনের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়ার জন্য তাঁদের যৌথ কাজগুলোও অপূর্ব হয়ে ওঠে। হামিদুর রহমান ও নভেরা শহীদ মিনারের কাজ শুরু করেন ১৯৬৭ সালে। শহীদ মিনারের জন্য অনেক মডেল জমা পড়লেও হামিদ-নভেরার ডিজাইনটিই নির্বাচিত হয়। প্রায় একমাস খেটে দু’জনে ডিজাইনটি তৈরি করেছিলেন। ’৫৭-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। কাজ চলে ’৫৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই মার্শাল ল জারি হওয়ায় শহীদ মিনারের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছিলেন নভেরা। এরপর ’৫৮ সালের শেষ দিকে তিনি এয়ারপোর্ট রোডে এমআর খান নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে (এখন যেখানে পারটেক্স গ্যালারি) একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তান ইউনাইটেড এ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সহায়তায় একটি একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী করেছিলেন নভেরা আহমেদ। ১৯৫৯ কিংবা ষাটে নভেরা লাহোর চলে যান। একষট্টি সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল এক্সিবিশন অব পেইন্টিং স্কাল্পচার এ্যান্ড গ্রাফিক আর্টস নামে এটি প্রদর্শনীতে তার ছ’টি ভাস্কর্য স্থান পেয়েছিল। প্রদর্শনীতে ‘চাইল্ড ফিলোসফার’ নামে তাঁর একটি ভাস্কর্য ‘বেস্ট স্কাল্পচার’ পুরস্কার পায়। নভেরার সে পুরস্কার শুধু নারী ভাস্কর্যের হিসেবে নয়, শিল্পকর্ম হিসেবে ভাস্কর্যের প্রথম স্বীকৃতি ছিল। এর আগে পশ্চিম পাকিস্তানে ভাস্কর্য করার ওপর এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৯৮৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারান। সে সময় খুব অর্থকষ্টেও ছিলেন এই ভাস্কর।

লাহোরে কয়েক বছর থাকার পর নভেরা চলে যান বোম্বেতে। সেখানে ইসমত চুগতাইর বাড়িতে কিছুদিন ছিলেন। বোম্বে থেকে প্যারিসে তারপর আবার গিয়েছিলেন লাহোরে। বেশিদিন থাকেননি। বিভিন্ন দেশ ঘুরে শেষে প্যারিসেই স্থায়ী হন।

প্রকাশিত : ৭ মে ২০১৫, ০১:২৬ এ. এম.

০৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: