রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নাট্যকার ও অভিনেতা রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত : ৭ মে ২০১৫
  • গৌতম পাণ্ডে

বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যসৃজনে নাটকের ভূমিকা অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র সাহিত্যসম্ভার বিশ্ববাসীর দৃষ্টি নতুন করে আকর্ষণ করল তাঁর সার্ধশততম জন্মবার্ষিকীতে। সর্বকালের সেরা নাট্যকার শেক্সপিয়ারের নাটকের সংখ্যা ৩৭ এবং রবীন্দ্রনাথের নাট্য রচনার সংখ্যা ষাটের অধিক। গভীর অথবা তত্ত্ব নাটকের পাশাপাশি রয়েছে তাঁর গীতি ও নৃত্যনাট্য, হাস্যকৌতুক, ব্যঙ্গকৌতুকসহ বিভিন্ন কমেডি নাটক। তিনি একাধারে ছিলেন অভিনেতা ও নাট্যকার। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পারিবারিক নাট্যমঞ্চে মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। অগ্রজ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর মলিয়ের লা বুর্জোয়ার ‘জাঁতিরোম’ অবলম্বনে রচনা করেছিলেন নাটক ‘হঠাৎ নবাব’। নাটকের এক বিশেষ চরিত্রে রবীন্দ্রনাথ অভিনয় করে সাড়া জাগিয়ে ছিলেন। পরে তিনি জ্যোতিরিন্দ্রনাথেরই ‘অলীকবাবু’ নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৮৮১ সালে তাঁর প্রথম গীতিনাট্য ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’ মঞ্চস্থ হয়। এই নাটকে তিনি ঋষি বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৮৮২ সালে রবীন্দ্রনাথ রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে ‘কালমৃগয়া’ নামে আরও একটি গীতিনাট্য রচনা করেছিলেন। নাটকটিতে তিনি অন্ধমুনির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। গীতিনাট্য রচনার পর রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি কাব্যনাট্য রচনা করেন। শেক্সপিয়রীয় পঞ্চাঙ্ক রীতিতে রচিত তাঁর ‘রাজা ও রানী’ (১৮৮৯) ও ‘বিসর্জন’ (১৮৯০) বহুবার সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয় এবং তিনি নিজে এই নাটকগুলোতে অভিনয়ও করেন। তিনি ১৮৮৯ সালে ‘রাজা ও রানী’ নাটকে বিক্রমদেবের ভূমিকায় অভিনয় করেন। বিখ্যাত ‘বিসর্জন’ নাটকে তিনি দুটি মুখ্য চরিত্র রঘুপতি ও জয়সিংহের ভূমিকায় ভিন্ন প্রযোজনায় অভিনয় করেছিলেন। ১৮৯০ সালের মঞ্চায়নের সময় যুবক রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ রঘুপতির ভূমিকায় এবং ১৯২৩ সালের মঞ্চায়নের সময় বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ যুবক জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। কাব্যনাট্য পর্বে রবীন্দ্রনাথের আরও দুটি উল্লেখযোগ্য নাটক হলো ‘চিত্রাঙ্গদা’ (১৮৯২) ও মালিনী (১৮৯৬)। কাব্যনাট্যের পর রবীান্দ্রনাথ প্রহসন রচনায় মনোনিবেশ করেন। এই পর্বে প্রকাশিত হয় ‘গোড়ায় গলদ’ (১৮৯২), ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ (১৮৯৭), ‘হাস্যকৌতুক’ (১৯০৭) ও ‘ব্যঙ্গকৌতুক’ (১৯০৭)। ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ কেদারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি ‘প্রজাপতির নির্বন্ধ’ উপন্যাসটিকেও ‘চিরকুমার সভা’ নামে একটি প্রহসনমূলক নাটকের রূপ দেন। বিশ শতকের মধ্যভাগে শিশির কুমারের মতো প্রতিভাধর অভিনেতাকে কেন্দ্র করে কলকাতার সাধারণ রঙ্গালয়ে নবযুগের সূচনা হয়। তখনকার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথের কমেডি নাটকগুলোর, যথা : চিরকুমার সভা ও শেষরক্ষা, বহুল অভিনয়ের সংবাদ পাওয়া যায়। তাঁর ট্রাজেডি নাটক বিসর্জনও সেই সময় অভিনীত হয়েছিল কিন্তু তাঁর অণন্য সৃজন ডাকঘর, রক্তকরবী, রাজা, অচলায়তন ও মুক্তধারার মতো নাটকগুলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ির চত্বরের বাইরের সাধারণ রঙ্গালয়ে তেমন একটা অভিনীত হয়নি। কাব্যনাট্যের পর রবীান্দ্রনাথ প্রহসন রচনায় মনোনিবেশ করেন। এই পর্বে প্রকাশিত হয় ‘গোড়ায় গলদ’ (১৮৯২), ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ (১৮৯৭), হাস্যকৌতুক’ (১৯০৭) ও ‘ব্যঙ্গকৌতুক’ (১৯০৭)। ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ কেদারের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি ‘প্রজাপতির নির্বন্ধ’ উপন্যাসটিকেও ‘চিরকুমার সভা’ নামে একটি প্রহসনমূলক নাটকের রূপ দেন। ১৯০৮ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ রূপক-সাংকেতিক তত্ত্বধর্মী নাট্যরচনা শুরু করেন। ইতিপূর্বে ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ (১৮৮৪) নাটকে তিনি কিছুটা রূপক-সাংকেতিক আঙ্গিক ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ১৯০৮ সালের পর থেকে একের পর এক নাটক তিনি এই আঙ্গিকে লিখতে শুরু করেন। এই নাটকগুলো হলো : ‘শারদোৎসব’ (১৯০৮), ‘রাজা’ (১৯১০), ‘ডাকঘর’ (১৯১২), ‘অচলায়তন’ (১৯১২), ‘ফাল্গুনী’ (১৯১৬), ‘মুক্তধারা’ (১৯২২), ‘রক্তকরবী’ (১৯২৬), ‘তাসের দেশ’ (১৯৩৩), ‘কালের যাত্রা’ (১৯৩২) ইত্যাদি। এই সময় রবীন্দ্রনাথ প্রধানত শান্তিনিকেতনে মঞ্চ তৈরি করে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অভিনয়ের দল গড়ে মঞ্চস্থ করতেন। কখনও কখনও কলকাতায় গিয়েও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করতেন তিনি। এসব নাটকেও একাধিক চরিত্রে অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ১৯১১ সালে ‘শারদোৎসব’ নাটকে সন্ন্যাসী এবং ‘রাজা’ নাটকে রাজা ও ঠাকুরদাদার যুগ্ম ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৪ সালে ‘অচলায়তন’ নাটকে অদীনপুণ্যের ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৫ সালে ‘ফাল্গুনী’ নাটকে অন্ধ বাউলের ভূমিকায় অভিনয়; ১৯১৭ সালে ‘ডাকঘর’ নাটকে ঠাকুরদা, প্রহরী ও বাউলের ভূমিকায় অভিনয়। নাট্যরচনার পাশাপাশি এই পর্বে ছাত্রছাত্রীদের অভিনয়ের প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথ পুরোন নাটকগুলো সংক্ষিপ্ত সংস্করণ করে নতুন ভাবে প্রকাশ করেন। ‘শারদোৎসব’ নাটকটি হয় ‘ঋণশোধ’ (১৯২১), ‘রাজা’ হয় ‘অরূপরতন’ (১৯২০), ‘অচলায়তন’ হয় ‘গুরু’ (১৯১৮), ‘গোড়ায় গলদ’ হয় ‘শেষরক্ষা’ (১৯২৮), ‘রাজা ও রানী’ হয় ‘তপতী’ (১৯২৯) এবং ‘প্রায়শ্চিত্ত’ হয় ‘পরিত্রাণ’ (১৯২৯)।

১৯২৬ সালে ‘নটীর পূজা’ নাটকে প্রথম অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে নাচ ও গানের প্রয়োগ ঘটান রবীন্দ্রনাথ। এই ধারাটিই তাঁর জীবনের শেষ পর্বে ‘নৃত্যনাট্য’ নামে পূর্ণ বিকাশ লাভ করে। নটীর পূজা নৃত্যনাট্যের পর রবীন্দ্রনাথ একে একে রচনা করেন ‘শাপমোচন’ (১৯৩১), ‘তাসের দেশ’ (১৯৩৩), ‘নৃত্যনাট্য চিত্রাঙ্গদা’ (১৯৩৬), ‘নৃত্যনাট্য চ-ালিকা’ (১৯৩৮) ও ‘শ্যামা’ (১৯৩৯)। এগুলোও শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীরাই প্রথম মঞ্চস্থ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর ১৩ বছর পরে অনন্য অভিনেতা ও নির্দেশক শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় কলকাতার বহুরূপী নাট্যদলের রক্তকরবী মঞ্চায়ন আসমুদ্রহিমাচল কাঁপিয়ে দিয়েছিল। আজকের বাংলাদেশেও রক্তকরবী সর্বাধিক অভিনীত নাটক। পাকিস্তান আমলে ড্রামা সার্কেলের রক্তকরবীর সফল প্রযোজনার স্মৃতি এবং আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম দেশে বাংলাদেশ টেলিভিশনে মুস্তাফা মনোয়ারের অত্যন্ত সফল প্রযোজনা রক্তকরবীর স্মৃতিও অক্ষয় হয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক রচনার প্রাসঙ্গিকতা দেশ, কাল ও সমাজের মর্মমূলে গ্রোথিত, যা কখনও ম্লান হওয়ার নয়। তাঁর রচনা চির নতুন ও চিরকালের। তিনি সব সময়ই আজকের রবীন্দ্রনাথ।

প্রকাশিত : ৭ মে ২০১৫

০৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: