কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বদলে গেছে বাংলাদেশ...

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫
  • রোকসানা বেগম

ঘটনা পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের পঞ্চম দিনের। ওয়াহাব রিয়াজ আর সাকিব আল হাসানের মধ্যকার বাকবিত-া হলো। সেখানে দেখা গেল ওয়াহাবের চোখের সামনে আঙ্গুল উঁচিয়ে কথা বলছেন সাকিব। এ একটি বিষয়ই যেন ‘বদলে গেছে বাংলাদেশের’ চিত্র ফুটিয়ে তুলল। বাংলাদেশ এতটাই উন্নতি করছে যে, পাকিস্তানের ক্রিকেটারদেরও এখন শাসায় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা!

আহ! এ দিনটি দেখার জন্যই তো মনে হয় সাবেক ক্রিকেটাররা অধীর অপেক্ষায় ছিলেন, যারা বাংলাদেশের ক্রিকেটটাকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কত কষ্ট করে, অন্য দলগুলোর গ্রেট ক্রিকেটারদের কত কথা হজম করেছেন। অবশেষে তাঁদের ‘ছোট্ট’ ভাইরাই যখন সেই পুরনো চিত্র ফুটিয়ে তুলছেন নিজেদের মতো করে তখন তো আনন্দ হওয়া স্বাভাবিকই। আনন্দ হচ্ছেও বটে।

এ আনন্দ বাংলাদেশের বদলে যাওয়ার। এ আনন্দ পাকিস্তানকে প্রথমবারের মতো টেস্টে নাকানিচুবানি খাওয়ানোর। যদিও বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট ড্র করেছে। তবে এ ড্র’তে জয়ের আনন্দই মিলছে, যে আনন্দ ক্রিকেটারদের থেকে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বাংলাদেশে। ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানকে ‘বাংলাওয়াশ’ করা গেছে। এরপর টি২০ ম্যাচেও পাকিস্তানকে হারানো গেছে। প্রথমবারের মতো টেস্টেও পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের হার হয়নি। মহাআনন্দে বাংলাদেশ ক্রিকেটারদের দিন কাটছে। সেই নবেম্বরে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে সিরিজ থেকেই যে দাপট দেখিয়ে চলেছে বাংলাদেশ, ক্রিকেট বিশ্বও তাতে কাঁপছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশের সামনে এখন যে দলই খেলবে, সেই দলকেই আমলে নিয়ে খেলতে হবে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের বিপক্ষেই।

সেই বদল তো আসলে চোখে পড়েছে সবচেয়ে বেশি কয়েকটি সংখ্যায়। রান ৩১২। বল ৪৫৪। মিনিট ৩৫১। চার ৩১ ও ছক্কা ৭টি। এ সংখ্যাগুলো হচ্ছে প্রথম টেস্টে দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের দুই ওপেনার তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের খেলার সময়। যখন ইমরুল কায়েস ৩১২ রানে আউট হলেন, তার আগেই এ সংখ্যাগুলো তৈরি হয়ে যায়। যে সংখ্যাগুলো ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশকে অন্যভাবেই চেনাচ্ছে। এখন যে বাংলাদেশ কোন দলের বিপক্ষেই সহজ প্রতিপক্ষ নয় তা বুঝিয়ে দিয়েছে এ সংখ্যাগুলোই। বদলে যাওয়ার বাংলাদেশের চিত্রও এ সংখ্যাগুলোই। কঠিন পরিস্থিতিতেও যে এখন বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারে, পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে সেই প্রমাণই মিলেছে।

এরপর সাকিব ব্যাট করার সময় ওয়াহাবের সঙ্গে যে বিবাদে জড়ালেন, যে ভঙ্গিতে কথা বললেন; তাতে বোঝাই গেল, শুধু ব্যাটে-বলে নয়, এখন থেকে চোখ রাঙ্গানিতেও বাংলাদেশকে হারাতে পারবে না কোন দলই।

খুলনা টেস্টের শেষ দিনে বিবাদে জড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের সাকিব আল হাসান আর পাকিস্তানের ওয়াহাব রিয়াজ। ড্র টেস্টের ওই ঘটনায় দু’জনকেই জরিমানা করেছে আইসিসি। ঘটনাটি ঘটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসের ১১৮তম ওভারে। সাকিব আর রিয়াজ খেলা বন্ধ রেখে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। দু’জনই একে অপরের দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলেন। এরকমটি বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের কেউ কোনদিন করতে পারেননি। সাকিব তা করে দেখালেন। বুঝিয়েও যেন দিলেন, ‘আমরা এসে পড়েছি ক্রিকেট বিশ্ব কাঁপাতে।’

পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটাররাই তো বাংলাদেশের দুর্দান্ত নৈপুুণ্যে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। যে রমিজ রাজা বাংলাদেশের বিষদ্গার করেছেন বিশ্বকাপেও, সেই তিনিই কিনা পাকিস্তানের এমন খেলায় বাংলাদেশকে দুর্বার বলছেন। জানিয়েছেন, ‘দেখুন, বাংলাদেশ তাদের ক্রিকেটের উন্নতি ঘটিয়েছে এবং তাদের মানসিকতাও ভিন্ন। দ্বিতীয় ইনিংসে তারা (বাংলাদেশ) যেভাবে ব্যাট করেছে, এটা দেখে আমাদের চোখ খুলে যাওয়া উচিত।’ ২৯৬ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে বাংলাদেশকে টেস্ট হার থেকে বাঁচিয়েছে তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের অসাধারণ দুই ইনিংস। ২৭৮ বলে তামিম ২০৬ রান করেন। ইমরুল কায়েস করেন ১৫০ রান। দু’জন মিলে দ্বিতীয় ইনিংসে বিশ্বরেকর্ড গড়া ৩১২ রানের জুটি গড়েন। সেখানেই ম্যাচ ড্র’র পথে এগিয়ে যায়। তামিম-ইমরুল বন্দনা তাই অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম টুইটারে সৌরভ গাঙ্গুলীও করেছেন। লিখেছেন, ‘ভাল করেছ, তামিম ইকবাল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এত ভাল করতে দেখাটা দারুণ। তোমাদের সবাইকে নিয়ে গর্বিত।’ গাঙ্গুলী যেখানে বাহবা দিচ্ছেন বাংলাদেশকে, সেখানে রমিজ রাজা কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট নিয়ে আছেন দ্বিধায়, শঙ্কায়। তার মুখেই সেই শঙ্কা, ‘আমি ঠিক জানি না, আমাদের ক্রিকেট কোথায় যাচ্ছে। এগিয়ে থাকা একটি টেস্ট ম্যাচে আমরা যদি বাংলাদেশকে হারাতে না পারি; এই রীতি যদি চলতে থাকে তাহলে কে আমাদের খেলা দেখতে চাইবে অথবা আমাদের দলকে খেলতে ডাকবে!’

এমনভাবে কেন বদলে গেল বাংলাদেশ। সবাই প্রধান কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের কথাই বলছেন। যিনি আবার বলছেন, ‘সত্যিই আমি কখনই এমন ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনা দেখিনি। এই কন্ডিশনে পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণ অন্যতম সেরা। চাপের মধ্যে এমন ব্যাটিং (বাংলাদেশের জন্য) বিশাল অর্জন।’ সেই হাতুরাসিংহেই বাংলাদেশকে বদলে যাওয়ার ধ্বনি শোনাচ্ছেন। বলেছেন, ‘আমি মনে করি, এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য টার্নিং পয়েন্ট; ইতিহাস। সব মিলিয়ে আমি বলব, দারুণ কাজ হয়েছে।’

হাতুরাসিংহে যেমন বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে খুঁজে পেয়েছেন, তেমনি গাঙ্গুলীও বাংলাদেশের ধারাবাহিক উন্নতি দেখছেন। বলেছেন, ‘অনেক উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের খেলায়। একেবারে স্মার্ট ক্রিকেট খেলছে ওরা। সব বিভাগেই দক্ষ ক্রিকেটার রয়েছে দলে। বাংলাদেশ এখন অনেক কঠিন প্রতিপক্ষ। সবচেয়ে বড় কথা হলো- মাঠে ওরা কোন প্রতিপক্ষকে ভয় পায় না। দল হিসেবে দারুণ সাহস দেখাচ্ছে।’ গাঙ্গুলী তো এখন জুনে বাংলাদেশ-ভারত সিরিজ নিয়েও ধোনি-কোহলিদের সতর্ক করে দিচ্ছেন, ‘আসলে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। সিরিজটা বেশ উপভোগ্য হবে বলেই মনে হচ্ছে আমার।’

বাংলাদেশ সফরে এসে পাকিস্তানের এতই খারাপ অবস্থা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ খেলে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের হতশ্রী অবস্থা হয়েছে। সেই অবস্থায় পাকিস্তান মিডিয়ায় ব্যঙ্গচিত্রও দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানী সংবাদপত্র ‘ডেইলি টাইমস’-এ প্রকাশিত এক কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সফরে ওয়ানডে ও টি২০-তে ইতোমধ্যে সমাধিস্থ করা হয়েছে পাকিস্তান দলকে। এখন টেস্ট ম্যাচের জন্যও চলছে কবর খোঁড়াখুঁড়ির কাজ!

পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটাররা এখন এতটাই ত্যক্তবিরক্ত যে, ৯০০ বছরেও ঠিক হবে না পিসিবি, এমনটিও বলছেন। রমিজ রাজা বলেন, ‘আমরা ম্যাচ ড্র করিনি, বরং হেরেছি। এর জন্য পিসিবিই দায়ী। আমাদের কাছে এমন অবস্থা সত্যই হতাশার।’ আর মোহাম্মদ ইউসুফ বলেছেন, ‘বাংলাদেশের কাছে হোয়াইটওয়াশ হয়ে ওয়ানডেতে নয় নম্বর পজিশনে নেমে গেছে পাকিস্তান। কিন্তু নয় থেকে নয় শ’ পজিশনে গেলেও পিসিবির কোন পরিবর্তন হবে না।’ সঙ্গে বাংলাদেশের প্রশংসাও করেন ইউসুফ, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেট সঠিক পথে হাঁটছে। এমনকি তাদের হাবভাবই বলে দিচ্ছে তারা উন্নতি করছে।’

যে আমির সোহেল বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজে ধারাভাষ্য দিচ্ছেন, তিনিও পাকিস্তানের সমালোচনায় মজেছেন। বলেছেন, ‘পাকিস্তান ক্রিকেট দলের পারফর্মেন্স দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছে। এর মূল কারণ ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোর হতাশাজনক অবস্থা। এ কারণেই পাকিস্তান থেকে ভাল ক্রিকেটার উঠে আসছে না।’ সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ভাল উন্নতি করছে। বিশেষ করে ওয়ানডে সিরিজের পরও এতদিন পর টেস্ট খেলতে গিয়ে যেভাবে ঘুরে দাঁড়ালো তা সত্যিই অসাধারণ। এই ধারা বজায় থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভাল কিছু করবে তারা।’

দল এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। সেই বদলে যাওয়া যে কোচ হাতুরাসিংহের জন্যই, টানা তিন টেস্টে শতক করা ওপেনার তামিম ইকবালই তা বুঝিয়ে দিয়েছেন। হাতুরাসিংহের পলিসিই সব পাল্টে দিচ্ছে। তামিম বলেছেন, ‘আমাদের কোন বাড়তি চাপ দেয়া হয়নি। কোচ বলেছিলেন, মনে কর প্রথম ইনিংস ব্যাট করছ। যা ভাল মনে হয় তাই করবে। এটা আমার কাছে খুব ইতিবাচক মনে হয়। যার যেটা খেলা উনি (কোচ) সেটাকেই সমর্থন করেন। এমনকি আক্রমণাত্মক খেলতে গিয়ে কেউ যদি ১০ রান করেও একটা ছয় মারতে গিয়ে আউট হয়ে যায়, তাতেও তাঁর কোন সমস্যা থাকে না।’

তবে দল বদলাচ্ছে হাতুরার জাদুর ছোঁয়ায়। কিন্ত বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ দল বদলে গেছে যেন ওয়াহাব রিয়াজের সঙ্গে সাকিবের বাকবিত-ায়, যে বাকবিত-ায় পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটারদেরও নাক কেটেছে। তাই যদি না হবে তাহলে রমিজ রাজা কেন বলবেন, ‘পাকিস্তানের ক্রিকেটে এমন দিনও চলে এসেছে যে বাংলাদেশের কেউ এমন চোখ গরম করে শাসানোর সাহস পাচ্ছে!’ ইউসুফ কেন অসহায় কণ্ঠে বলবেন, ‘হ্যাঁ, এমন দিন যে এসেছে, এর পেছনে কারণও আছে। ওদের ক্রিকেট বোর্ড গত ৫-৬ বছর ধরে সঠিক পরিচর্যা করে এসব আত্মবিশ্বাসী ক্রিকেটারদের গড়ে তুলেছে। আমাদের দল যেখানে ক্রমাগত নিচের দিকে যাচ্ছে, ওদের দল উপরে উঠছে। এই ঘটনা আমি দেখেছি। এর আগে জীবনে কখনও এমন হয়নি যে, বাংলাদেশের কেউ আমাদের সঙ্গে এভাবে কথা বলেছে!’

বাংলাদেশ দল যে এখন পৃথিবীর কাউকেই ছেড়ে কথা বলতে রাজি নয় তা সাকিবের ওই আচরণেই পরিষ্কার। দিন যে আসলেই বদলাচ্ছে! সেই দিনবদলের গান এখন বাংলাদেশের প্রত্যেক ক্রিকেটারের কণ্ঠেই।

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫

০৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: