আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভূ-মধ্যসাগরে কেন নৌকাডুবি

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫
  • কামরুল হাসান

আফ্রিকা ও এশিয়ার দারিদ্র্যপীড়িত রাষ্ট্রের বিশাল এক জনগোষ্ঠী জীবিকার সন্ধানে দেশান্তরিত হয়। বৈধ-অবৈধ যে কোন উপায়ে এ দুই মহাদেশের যুবকদ্বয় উন্নত জীবনের খোঁজে প্রবাস জীবন বেছে নেয়। দেশান্তরিত এমন যুবকদের স্বপ্নের ঠিকানা ইউরোপ কিংবা আমেরিকা। ইউরোপ আফ্রিকা ও এশিয়ার নিকটবর্তী হওয়ার দরুন এ মহাদেশে অবৈধ উপায়ে ঢোকার প্রবণতা বেশি থাকে। উত্তর আফ্রিকা ও ভূ-মধ্যসাগরের তীরবর্তী দেশসমূহ থেকে সাধারণত ইউরোপে প্রবেশ করা হয়।

উত্তর আফ্রিকা হতে ইতালী কিংবা স্পেন ও ভূ-মধ্যসাগর হতে গ্রীস হয়ে ইউরোপে ঢোকে অবৈধ প্রবেশকারীরা। এসব হতভাগ্য অনুপ্রবেশকারীর প্রধান বাহন-নৌকা। উত্তাল সমুদ্রে রাতের আঁধারে সীমান্ত প্রহরীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্বপ্নের ঠিকানায় যাত্রা শুরু করে তারা। কিন্তু এমন যাত্রা সব সময় নিরাপদে পাড়ি দেয়া সম্ভব হয় না। সাগরের উত্তাল তরঙ্গে নৌকা ডুবে লবণাক্ত পানিতে সলিল সমাধিতে পরিণত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। সম্প্রতি এমন বেশকিছু ঘটনায় অসংখ্য আফ্রিকান ও এশিয়ানের মৃত্যু হয়। হতভাগ্য এমন তরুণদের গল্প নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।

দাউদা বাউবাকার একজন আফ্রিকান যুবক। মালির রাজধানী বামাকোর শহরতলির একটি রেস্তোরাঁয় তিনি কাজ করেন। ২২ বছর বয়সী এ যুবক তার সঞ্চয়ে যখন একটি কয়েন যোগ করে, তখনই তার মনে হতো, সে যেন তার স্বপ্নের খুব নিকটে। ইউরোপ পাড়ি জমাতে এ পর্যন্ত দাউদা ১৫০০ মার্কিন ডলার সংগ্রহ করে এবং কোন এক রাতে বাসযোগে গোয়া রওনা হয়। সে স্থান হতে গোপনে ট্রাক লরীর মাধ্যমে সাহারা হয়ে আলজেরিয়া, এরপর লিবিয়া ঢুকে সে। লিবিয়ায় এমন হতভাগ্য আফ্রিকানদের ভিড় লেগেই থাকে। এমন যুবকদ্বয়ের প্রত্যেকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অবৈধ উপায়ে ইউরোপ পাড়ি। এরপর সীমান্ত রক্ষীদের চোখে ধুলা দিয়ে সাধারণ নৌকায় ভিড়ে ভর্তি অবৈধ অভিবাসীরা সাগর পাড়ি দেয়। পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য নাগরিকদের মতোই দাউদা বাউবাকার জানেন এমন যাত্রা খুব বেশি নিরাপদ নয়। ভূ-মধ্যসাগরের নৌকাডুবির ঘটনা অহরহ। সংবাদ মাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমে এমন ঘটনা বেশ ফলাও করেই প্রচার হয়। তা সত্ত্বেও নাইজিরিয়া, গাম্বিয়া কিংবা সেনেগালের যুবকরা মৃত্যুভয়ে ভীত নয়। দাউদা বাউবাকারের জবানীতেই তা ফুটে ওঠে।

‘আপনি যেখানেই যাত্রা করুন জীবন ভয়ঙ্কর। এমনকি আমি আমার দেশের নিরাপদ স্থানেও মৃত্যুবরণ করতে পারি। দুর্ঘটনার ভয়ে ভীত হলে জীবনের স্বপ্ন পূরণ কারও পক্ষেই সম্ভব হয় না’।

মিসরের আল-বাসাত্তাদও এমন স্বপ্নে বিভোর। সিরিয়ান এ সুন্নি যুবক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সেনাবাহিনীর অত্যাচারে নিজ দেশ ছেড়ে লেবানন পাড়ি দিয়েছিলেন। কিন্তু শিয়া বাহিনী হিজবুল্লাহ হত্যার উদ্দেশ্যে যখন তার খোঁজ করতে থাকে, তখন তার পরিবার মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে মিসর পাড়ি দেয়। ২০১৩ সালের জুলাই মাসে তারা সিরিয়ান শরণার্থী শিবিরে নাম লেখায়। তারা জাতিসংঘের হাই-কমিশনারের আশ্রয়ের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আলেকজান্দ্রিয়া হয়ে ইউরোপ ঢোকার চেষ্টা করে।

সম্প্রতি ফেসবুকের একটি সিরিয়ান শরণার্থী পেজে জানা, যায় আল-বাসাত্তাদ ও তার পরিবার ইতালী প্রবেশ করেছে। তাদের ভ্রমণের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে চাইলে আল-বাসাত্তাদ উত্তরে জানায়, ‘কিসের বিপদ? আমি সিরিয়ায় যে ধরনের ভয়ঙ্কর দিন পার করেছি সেই তুলনায় এ ঝুঁকি কিছুই না।’ ভূ-মধ্যসাগরে অবৈধ উপায়ে ইউরোপ পাড়ি দেয়া ও দুর্ঘটনার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ১৯৯৬ সালে মিসর হয়ে ইতালী পাড়ি দিতে ২৮৩ জন ভাগ্য অন্বেষণকারী নিহত হয়েছিলেন। কিন্তু বিগত দশকগুলোতে এ ব্যবসা বিশাল এক বাণিজ্যে রূপ নেয় এবং প্রতিনিয়ত হাজার হাজার মানুষ এ উপায়ে ইউরোপ পাড়ি দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থা জানায়, সাম্প্রতিক শরণার্থী অনুপ্রবেশের ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সিরিয়ার ৮০ লাখ মানুষ এখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের ভয়াবহ জীবন হতে মুক্তি পেতে ছুটে যাচ্ছে তুরস্ক হয়ে ইউরোপে। সিরিয়ার এমন হতভাগ্য শরণার্থীদের শিবিরে যোগ দিয়েছে আফগানিস্তান, লিবিয়া ও ইরাকের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জনগণ। তুরস্ক ছাড়াও এসব অবৈধ অভিবাসীরা লিবিয়া হয়ে ইতালী প্রবেশে সচেষ্ট থাকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের দুর্বিষহ স্মৃতির সামনে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি তখন তাদের কাছে নস্যি মনে হয়। আরব বসন্তের পর লিবিয়া অবৈধ অভিবাসীদের অন্যতম ঠিকানা। যুদ্ধবিধ্বস্ত আরব জনগণের পাশাপাশি দারিদ্র্যপীড়িত আফ্রিকার জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ এ মিছিলে যোগ দেয়। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৪ সালে আনুমানিক ২১৯০০০ মানুষ ইউরোপ পাড়ি দিয়েছে এবং নৌদুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে হাজারের বেশি।

প্রকাশিত : ৬ মে ২০১৫

০৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: