মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অধিকারবঞ্চিত তরুণ শ্রমিক

প্রকাশিত : ৫ মে ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

কদিন আগে পার হয়ে গেল মহান মে দিবস। বিশ্বের তাবৎ শ্রমিক তথা কর্মজীবী মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার, শ্রমঘণ্টা নির্ধারণসহ আরও কিছু মানবাধিকার আদায়ের লক্ষ্যে গড়ে ওঠা রক্তাক্ত আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে এদিনটি পালিত হয়। বিশ্বের কোথাও কোথাও শ্রমিক দিবস হিসেবেও হয় পালিত। শ্রমিকের অধিকার আদায় করতে গিয়ে আত্মহুতি দেয়া সেইসব শহীদের স্বপ্ন বা পরবর্তীকালে প্রণীত দৈশিক ও বৈশ্বিক শ্রম আইন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে বা হচ্ছে সে প্রশ্ন এখনও মীমাংশিত নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তো এ কথা আরও সত্য। বাস্তবতা কেমন সেটা দেখা যাক কয়েকটি ঘটনায়।

কেসস্টাডি-১

রাজধানীর মালিবাগ চৌধুরী পাড়া। সময় বেলা ১টা। রাস্তার দু’পাশ থেকে তরুণ-তরুণী কিশোর-কিশোরীর ঢল নামল একযোগে। সবারই কর্মক্লিষ্ট মুখ। দুপুরের খাবার সময় হয়েছে। এখানে আছে অর্ধ শতাধিক গার্মেন্টস। এসব তরুণ-তরুণী বা কিশোর-কিশোরী সবাই গার্মেন্টস শ্রমিক। রাস্তা পার হয়ে খুব দ্রুত পা চালাচ্ছেন সবাই। একটু কথা বলার সময় নেই কারও। তুবও কথা হয় এক তরুণের সঙ্গে। নাম জামিলুর রহমান। ডাকনামÑজামিল। কাছে মসজিদের দিকে যেতে যেতে কথা হয়। জামিল নামাজী মানুষ। এসেছেন কুড়িগ্রাম থেকে। এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন।

লেখাপড়ার খরচ পরিবার জোগাতে পারেনি। ঢাকায় এসে ভর্তি হন গার্মেন্টসে। একটা সার্টিফিকেট আছে বলে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর পদে চাকরি হয়। বেতন যা ধরা হয়েছে তা নগণ্য। বেশি কথা বলতে চাইছেন না তিনি। তাড়া দেখাচ্ছেন। বলেন, ‘নামাজ পড়ি খাই-দাই শ্যাষক টাইম ধরতি পারমু না বাহে।’ খাবার তো নিয়ে আসেন। জামিল বলেন, ‘আধাঘণ্টায় পারি উঠি না বাহে’ শুনে অবাক হতে হয় লাঞ্চ আওয়ার বা দুপুরের খাবার সময় মাত্র আধাঘণ্টা!

এ সময়ের মধ্যে নামাজ, খাওয়া দাওয়া সারবে কীভাবে? একটু দেরি হলে আবার লেট ফাইন। সেটা কেটে নেবে মাস শেষে বেতন থেকে। জামিল জানান, এই আধাঘণ্টা সময় আবার সব কারখানায় নয়। কিছু কিছু ফ্যাক্টরিতে এ অমানবিকতা; শ্রমঘণ্টা কেড়ে নেয়ার প্রবণতা রয়েছে। শরীর খারাপ হলেও ওভার টাইম বাধ্যতামূলক। ওভার টাইমের টাকা কেউ চাকরি ছেড়ে দিলে তা পাওয়া দুষ্কর। জামিলের সঙ্গে আর বেশি কথা বলা হয় না। তাঁর জোহরের নামাজ পড়া, খাওয়া আর বিশ্রামের জন্য মাত্র আধাঘণ্টা সময়ের কথা ভেবে একজন শ্রমিককে কষ্ট দেয়া কারইবা প্রবৃত্তি হয়?

কেসস্টাডি-২

মেরিনা জাহান হ্যাপি। কাজ করেন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার স্বাস্থ্য বিভাগে। পোস্টিং চলনবিলের হাওড়াঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকায়। সরকারী চাকরির জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন, হয়নি। বায়োডাটা, ছবি, আনুষঙ্গিক কাগজপত্র, রেজিস্ট্রি বা কুরিয়ার ও যাতায়াত বাবদ যে খরচ হয়েছে তা হিসাব করলে বেশ বড় অঙ্কের টাকা হয়। চাকরির বয়সের প্রায় শেষদিকে এ চাকরি দায় ঠেকেই নিয়ে নেন। পোস্টিং দুর্গম এলাকায়। ক’বছর আগে হন সন্তানসম্ভবা। নিয়মানুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি পাওয়ার কথা সবেতন ছয় মাস। কিন্তু নিয়োগ প্রদানকারী সংস্থা দেয় তিন মাসের তাও আবার বেতন ছাড়া। নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও উন্নয়নে কাজ করলেও নিজের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র সন্তানের দিকে তাকানোর মতো নেই তার সময়।

কেসস্টাডি-৩

জহির ও সেন্টু। দুজনই রাজধানীতে চলাচলকারী পাবলিক বাসের কন্ডাক্টর ও হেলপার। ভোর পাঁচটা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত চলে ডিউটি। কোন কোনদিন গোসল করারও সময় পান না। অধিকাংশ দিনই দুপুরে হয় না খাওয়া। মালিকপক্ষ নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে। নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা মালিককে জমা দিতে হবে। যা বাঁচবে তা থেকে ড্রাইভারসহ নিজেদের মজুরি। মালিকের টার্গেট পূরণ করতে গিয়ে কোন দিন মজুরি পায় আবার পায় না। কদাচিৎ বেশিও পাওয়া যায়, যদি ভাগ্য প্রসন্ন হয়। রাস্তায় নানা রকম খরচ। বাসস্ট্যান্ডের চাঁদা, মালিক-শ্রমিকের নামে চাঁদা, মস্তানের চাঁদা, পুলিশী ঝামেলা মেটানো, ‘বিট’ খরচ, জ্বালানি খরচ ইত্যাদি। যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিদিন ভাড়া নিয়ে ঘটে অপ্রীতিকর ঘটনা। ছাত্র না হয়েও কেউ কেউ দেয় হাফ ভাড়া, কেউবা দেয় কম। ক্ষেত্র বিশেষে অমানবিক কিছু যাত্রীর হাতে মারধরও খেতে হয়। মাঝে মাঝে দুজনে আক্ষেপ করে, আমাগো জীবন কি হালার মানুষের জীবন?

বর্ণিত ঘটনাগুলো বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীর সাম্প্রতিক চিত্র নয়, তবে খ-াংশ। খ-াংশ হলেও তা যে গ্রহণযোগ্য নয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। গার্মেন্টস শ্রমিক হোক আর বেসরকারী উন্নয়নকর্মী কিংবা বাস শ্রমিক হোক এরা তরুণ প্রজন্ম। আধাঘণ্টা মধ্যাহ্নবিরতি পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে তো নেই-ই বরং আন্তর্জাতিক শ্রম আইনেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন। পোশাক খাত থেকে বড় একটা অঙ্ক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, যেখানে এমন বাস্তবতা অনভিপ্রেত

দ্বিতীয় ঘটনায় একজন নারীর শ্রমঘণ্টা এতটাই কর্তৃপক্ষ শুষে নিচ্ছে যে সেখানে আইন-কানুন, নিয়মের বালাই নেই। উপরন্তু তার মাতৃত্বকালীন অবস্থায় সরাসরি ঠকানো হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা একটি মানবিক কাজ নিঃসন্দেহে। শুধু শ্রমঘণ্টা বিসর্জনের জন্য নিজ সন্তানের স্বাস্থ্যই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। সন্তানের সঙ্গে গড়ে উঠছে না মায়ের আত্মিক সম্পর্ক। বাস শ্রমিক শুধু রাজধানীতে নয়, সারা দেশেই বিদ্যমান। দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্র সমৃদ্ধ হতে অবশ্যই প্রয়োজন যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম পরিবহন। পরিবহন সেক্টরে যদি শ্রমিক বঞ্চনা-লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে সেটা অবশ্যই অমানবিক ও বেআইনী। মালিকপক্ষ যে কৌশল অবলম্বন করে থাকে তা এককথায় মেনে নেয়ার মতো নয়।

শ্রমিক বা কর্মী যাই বলা হোক না কেন এরা বেশিরভাগ তরুণ। এই তারুণরাই মেরুদ-। বাংলাদেশে অনেক আইন আছে, শ্রমিকদের জন্যও আছে। সেসব আইন খাতা-কলমেÑপুস্তকে শ্রমিকবান্ধব। কিন্তু কার্যত এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নেই। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শ্রমিক, শ্রমরাজনীতিক, সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তা, আইনবেত্তা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা কিংবা মালিকপক্ষ সমন্বয়ে এ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এজন্য আগে প্রয়োজন সচেতনতা। আর এ দায়িত্ব পালনে সব সময় এগিয়ে আসে তারুণ্য।

প্রকাশিত : ৫ মে ২০১৫

০৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: