মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মায়ের জন্য একটি দিন

প্রকাশিত : ৪ মে ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

‘মা’... এক অক্ষরের ছোট্ট একটি শব্দ। এ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সব মমতা আর ভালবাসা। জগতের অন্য কারও সঙ্গে তুলনা হয় না মায়ের; তার তুলনা তিনি নিজেই। মায়ের মতো এত মধুর শব্দ কোন অভিধানে দ্বিতীয়টি নেই আর। ‘মা’ যেন ভালবাসার এক বিশাল আকাশ, অথৈ সাগর। মা শুধু নিজের সন্তানের মধ্যেই নয়, সবার মাঝেই অকাতরে বিলিয়ে দিতে পারেন নিঃস্বার্থ ভালবাসা। তাই যুগে যুগে, দেশে দেশে, কালে কালে এই প্রিয় শব্দটি দোলা দিয়েছে সবার মনের গহীনে। কবি-সাহিত্যিকরাও পিছিয়ে নেই কোন অংশে। কবিদের মনে, কবিদের চোখে এ শব্দটি নানাভাবে, নানা আঙ্গিকে এসেছে বারবার। বলা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ কবিই ‘মা’কে নিয়ে লিখেছেন কবিতা। কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘মা’ কবিতা হয়ত মনে আছে কম বেশি সবারÑ ‘মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু যেন ভাই,/ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।/সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক মাথার ’পরে আজি/অন্তরে মা থাকুক মম ঝরুক স্নেহরাজি।/রোগ-বিছানায় শুয়ে শুয়ে যন্ত্রণাতে মরি/সান্ত¡না পাই মায়ের মধু নামটি হৃদে স্মরি।’

ত্রিভুবনের সবচেয়ে মধুরতম অপার্থিব শব্দ ‘মা’। শব্দটি ছোট্ট হলেও মা-ই বসুন্ধরা, মমতার আধার। তার সহজাত মমত্ব দিয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন অসামান্য স্নেহে। সন্তানের রোগে-শোকে মাও আক্রান্ত থাকেন একই তন্ত্রীতে। এই প্রিয়তম মানুষটির জন্য রাখা হয়েছে একটি দিন। তাকে সম্মান জানাতেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় ‘মা দিবস’। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে প্রতিবছর পালন করা হয় এ দিবসটি। তবে দেশভেদে এ দিবস পালনের তারিখে আছে ভিন্নতা। সাধারণত প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস হিসেবে পালন করার রীতি গড়ে উঠেছে অনেক দেশেই। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মা দিবস পালন করার রীতি বহু পুরোনো। আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগেও অনেক জায়গায় এ দিবসটি পালন করত মানুষ। অবাক হওয়ারই কথা বটে। খ্রিস্টের জন্মের অনেক আগে থেকেই মিসর, রোম ও গ্রীসে পালন করা হতো মা দিবস। তবে ওই দিবসটা ঠিক এ সময়ের দিবসের মতো ছিল না। সেটাকে বলা যায় দেবতাদের মায়ের আরাধনা। সে সময়ে পূজা করা হতো দেবতাদের মা; যেমনÑ দেবী আইসিস, সিবিলি, রিয়া প্রমুখের। তবে ১৬ শতকে ইংল্যান্ডে এ দিবস পালন করা হয়, যা ছিল দেব-দেবীর মা ছেড়ে নিজের মাকে নিয়ে একটি দিন উদ্্যাপন। দিবসটি তারা পালন করত মাদারিং ডে হিসেবে। সেদিন সরকারী ছুটিও ছিল। পরিবারের সবাই তাদের মায়ের সঙ্গে দিনটি কাটাত। তবে ততটা প্রসার লাভ পায়নি দিনটি। এদিকে ব্রিটিশরা আমেরিকায় তাদের কলোনি স্থাপন শুরু করার পর ইংল্যান্ড থেকে দলে দলে মানুষ বসবাস করতে শুরু করে আমেরিকায়। আমেরিকার এসব নতুন অধিবাসীর ইংল্যান্ডের ‘মাদারিং ডে’কেও প্রচলন করার চেষ্টা করে আমেরিকায়। কিন্তু নানা কারণে সেটা চালু রাখতে ব্যর্থ হয় তারা। এর প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০ সালে আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাও নামের এক গীতিকার মা দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় একটি দেশাত্মবোধক গান লিখেছিলেন তিনি। সেই গানটা ওই সময় ছিল বেশ জনপ্রিয়। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সময় হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিল কারণে বা অকারণে। এক মায়ের সন্তান হত্যা করছিল আরেক মায়ের সন্তানকে অবলীলায়। এসব হত্যাযজ্ঞ দেখে খুব ব্যথিত হয়ে পড়েছিলেন জুলিয়া। এ মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করতে আমেরিকার সব মাকে একসঙ্গে করতে চাচ্ছিলেন তিনি। এ কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক মা দিবস পালনে ইচ্ছা পোষণ করেন। তার লক্ষ্য ছিল এই দিনটি সরকারী ছুটি হিসেবে ঘোষণা করার। তবে ব্যাপকভাবে তিনি সাড়া না পেলেও তার নিজের শহর বোস্টনে দিবসটি পালিত হচ্ছিল বেশ ঘটা করেই। এদিকে ভার্জিনিয়ার একটি নারীদের দল জুলিয়া ওয়ার্ড হাওয়ের প্রস্তাবিত মা দিবসটি পালন করত বেশ মর্যাদার সঙ্গেই। এই দলের নেত্রী ছিলেন এ্যানা রিভেস জারভিস। তিনি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন ‘মাদার’স ফ্রেন্ডশিপ ডে’ পালনের। এ দিবস পালনের কারণে গৃহযুদ্ধেও সময় এনে দিয়েছিল অনেকটাই শান্তির বার্তা। এরপর অনেক পথ পেরিয়ে ১৯১৪ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মর্যাদা দেন জাতীয় মা দিবসের। আরও পরে ১৯৬২ সালে এই দিবসটি স্বীকৃতি পায় আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পালন করা হয় মা দিবস। শুধু কী তাই, দেশভেদে এই বিশেষ দিবস পালনের রীতিও ভিন্ন ভিন্ন। তবে সব দেশের রীতিতে যত ভিন্নতাই থাকুক একটা ব্যাপারে সবাই কিন্তু এক। সেটা আর কিছুই নয়, সবাই চায় এই দিনে মাকে খুশি করতে। মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে, মাকে সুন্দর সুন্দর জিনিস বানিয়ে উপহার দিতে আরও অনেক কিছু। যেমন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনার কথা ধরা যাক; এই দেশটিতে অক্টোবর মাসের তৃতীয় রবিবার পালিত মা দিবস। এই সময়টা আর্জেন্টিনায় থাকে বসন্তকালের আমেজ। তাই এ দিবসে ঘুরতে বেরোয় পরিবারের সবাই মিলে। অবশ্য সবাই যে বাইরে ঘুরতে যায় এমন নয়। যারা বাড়িতে থাকে, তারা মাকে খুশি করতে আয়োজন করে নানা কিছু। যেমন : মায়ের সম্মানে তারা একত্রে খাওয়া-দাওয়া করে, কবিতা আবৃত্তি করে। আবার স্কুলে গিয়ে মায়ের উদ্দেশে চিঠি লেখে বা নিজে হাতে কার্ড বা অন্য কিছু বানিয়ে উপহার দেয় মাকে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এইদিনে মায়ের কথা তারা পালন করে অক্ষরে অক্ষরে। এইদিনে আর্জেন্টিনায় পরিবারের সকল রান্না ও ঘরের অন্যান্য কাজ করে বাবা। যেন আজ মায়ের ছুটি। তাছাড়া সন্তানেরা সবাই মিলে ফুল, কার্ড, ক্যান্ডি, অলঙ্কার বা অন্যান্য চমকপ্রদ কিছু উপহার দেয় মাকে। অন্যদিকে ১৯২০ সাল থেকে ফ্রান্সে মে মাসের শেষ রবিবার পালিত হয়ে আসছে মা দিবস। এই দিনটি সরকারীভাবে পালন করা হয় সেখানে। মজার ব্যাপার হলোÑ মায়ের যত বেশি সন্তান, তার তত বেশি সম্মান। এজন্য যে মায়ের চার বা পাঁচ সন্তান আছে, তাকে মা দিবসে সরকারীভাবে ব্রোঞ্জ পদকে পুরস্কৃত করা হয়। একইভাবে যার ছয় বা সাতটি সন্তান তাকে রৌপ পদক এবং যার আটটি বা তারও চেয়ে বেশি সন্তান, তাকে সম্মান জানানো হয় স্বর্ণপদক দিয়ে। এছাড়া ১৯১৩ সাল থেকে জাপানী খ্রীস্টানরা মা দিবস পালন করতে শুরু করে আমেরিকান রীতিতে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে পশ্চিমাদের অনুকরণে এই দিবসটি পালন করতে জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। যুদ্ধের পর থেকে আবার তারা মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালন করছে। জাপানীরা এই দিনে মাকে উপহার দেয় ফুল, রুমাল এবং হাতব্যাগ। বাড়িতে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের। এছাড়া অনেক আগে থেকেই মা দিবস পালন করা হয় মেক্সিকোতে। মেক্সিকানরা দিবসটি পালন করে ১০ মে। সকালবেলায় পরিবারের সবাই মিলে মাকে গান শুনিয়ে শুরু করে দিনটি। মাঝে মাঝে ব্যান্ড দলও ভাড়া করে আনা হয় গান গাওয়ার জন্য। মায়ের জন্য সন্তানরা কেনে ফুল আর চকোলেট। বৈশ্বিক এ রীতি খানিকটা হলেও পৌঁছেছে বাংলাদেশে। বছরের প্রতিটি দিন কত পরিশ্রমই না করেন মা। তাই মা দিবসে মাকে একটু বিশ্রাম দিতে বাড়ির কাজগুলো না হয় নিজেই করে ফেলুন নিজে। বাড়ির ঘরগুলো যতটুকু পারেন সাজিয়ে গুছিয়ে রাখুন। কেবল মা দিবসেই নয়, অন্যান্য দিনেও নানাভাবে সাহায্য করতে পারেন মাকে। রান্না করতে পারেন মায়ের প্রিয় কোন খাবার। কিনে নয়, মায়ের জন্য নিজেই তৈরি করতে পারেন একটি কার্ড। দেখতে সুন্দর না হোক, আপনার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি এই সামান্য জিনিসটাই অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে মায়ের কাছে। যারা বিশেষ কারণে এই দিনে থাকতে পারছেন না মায়ের কাছে, তারা মাকে লিখতে পারেন চিঠি। আর ফোন কল, এসএমএস তো পাঠাবেনই। যারা কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তারা পাঠাতে পারেন মজার মজার মা দিবসের ই-কার্ড।

ছবি : অপূর্ব

মডেল : আফ্রি ও এমি

প্রকাশিত : ৪ মে ২০১৫

০৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: