কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মাঠ পর্যায়ের হতাশা অন্ধকার পথে টানছে বিএনপির ভবিষ্যত

প্রকাশিত : ৪ মে ২০১৫

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ বিগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে এরপর থেকে বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সরকারবিরোধী জোরালো আন্দোলনের সূত্রপাত। এরপর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন। ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন বর্জন করলেও মাঝপথে অনুষ্ঠিত কয়েক সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিয়েছে। সর্বশেষ তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও দলীয় সমর্থনের প্রার্থী দিয়ে অংশ নিয়ে ভোটের দিন মাঝপথে নির্বাচন বর্জন করেছে। বর্তমান জাতীয় সংসদের তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। কয়েক সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে বিজয়ী হলেও বর্তমানে তারাও আইনী নানা কারণে ক্ষমতায় নেই। ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত দেশের প্রধান নগরীর ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদেও তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা পরাজয় বরণ করেছে। ফলে দেশের রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার মূল স্টিয়ারিং সর্বক্ষেত্রে এখন সরকারী দল আওয়ামী লীগ ও এর সমর্থিত নেতাদের হাতে। বিএনপি বিরোধীদলের আসনটিও হারিয়েছে সংসদ নির্বাচন বর্জনের কারণে। এরপরে স্থানীয় সরকারের অধীন যে সব সংস্থা রয়েছে এসবের ক্ষমতা থেকেও ছিটকে পড়েছে। ফলে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতা থেকে বিএনপি বহু পেছনে পড়ে গেছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিএনপির আগামী রাজনীতি কোন পথে যাবে তা এখনও স্পষ্ট না হলেও ধারণা করা হচ্ছে আন্দোলনের মাধ্যমে রাজপথ উত্তপ্ত করার কর্মসূচী দেয়া ছাড়া তাদের আর কোন গত্যন্তর নেই। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সে শক্তিও তাদের নেই। কেননা, দেশের জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর একটি অংশ বিএনপির অপরাজনীতির শিকার হয়ে শুধু হতাশ নয়, তাদের উপর প্রচ- ক্ষুব্ধও বটে।

বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় রাজনীতিতে ওয়ানম্যান শো হওয়ায় নেতাকর্মী ও সমর্থক পর্যায়ে কারও কাছে দলের ভবিষ্যত কর্মকা- নিয়ে কিছুই জানা নেই। সবকিছু নির্ভর করছে দলীয় চেয়ারপার্সনের চিন্তা চেতনা ও সিদ্ধান্তের উপর। চেয়ারপার্সনের চিন্তা চেতনা ও সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে কারা একান্ত সহযোগী সেটাও দলের অধিকাংশের কাছে অজানা। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারির পর থেকে বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট যে সহিংস রাজনীতিতে জড়িয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে বিকাশমান গণতন্ত্রকে যে রুদ্ধ করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এরপরও সরকার পক্ষে বিএনপির অপরাজনীতিতে মাঠ পর্যায়ে এগুতে না দেয়ার যে প্রক্রিয়া বেছে নেয়া হয়েছে তা ক্ষেত্রবিশেষে নিপীড়নমূলক হলেও দেশের অধিকাংশ মানুষ ওই প্রক্রিয়ার পক্ষে সমর্থন দিয়েছে। কেননা, ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় যেতে ইচ্ছুকদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেশের রাজনীতিতে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে তাতে সাধারণ মানুষের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি ডেকে এনেছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি রাজনীতির নামে যা করেছে তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা নিয়ে সচেতন মানুষ এখনও মনে করে ওই সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। সর্বশেষ, ২৮ এপ্রিল তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ জনমনে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনায় আসলেও ভোটের দিন মাঝপথে শুধু তিন সিটিতে দলের সমর্থিত তিন মেয়রের বর্জন করানোর ঘোষণাটি আবারও নেতিবাচক হয়ে উঠে এসেছে। সঙ্গত কারণে, বিএনপির রাজনীতির ভবিষ্যত কোনদিকে যাচ্ছে তা জনমনে স্পষ্ট না হলেও এটা নিশ্চিত যে, তারা আবারও মাঠে নেমে রাজনীতির মাঠকে উত্তপ্ত করার চেষ্টা চালাবে। আর সরকার পক্ষে তাদের অর্জিত সকল শক্তি ব্যবহার করে তাদের মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগটিও না দিতে তৎপর হবে। এছাড়া বিগত দিনের সহিংস আন্দোলন ও অপরাজনীতির কারণে দলের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ আত্মগোপন ও জেলে থাকার কারণে বিএনপির মেরুদ- অনেকটা এখন ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এ ভঙ্গুর অবস্থা থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর পরিবেশ সৃষ্টি করতে বিএনপিকে বহু কাঠখড় পোড়াতে হতে পারে। সফলতা ব্যর্থতা ভবিষ্যতের গর্ভে। রাজনীতিতে যেহেতু শেষ বলতে কোন কথা নেই, সেহেতু কোন পরিস্থিতিতে কাদের অবস্থান কি হয় তা আগেভাগে বলা কারও পক্ষে সম্ভব না হলেও এটা নিশ্চিত যে, বর্তমান রাজনীতির পরিবেশ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিএনপিতে ভাঙ্গন ধরাও অসম্ভব কিছু নয়। এছাড়া তাদের জোটের শরিক দলের মধ্যে অন্যতম প্রধান শক্তি জামায়াত মৃতপ্রায়। কাগজেপত্রে নাম থাকলেও এদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকা- নেই বললেই চলে। বিশেষ করে তাদের শীর্ষ দুই নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারে ফাঁসিতে ঝুলেছেন। আরও কয়েকজন ফাঁসির দ-প্রাপ্ত হয়ে আপীল করে বাঁচার লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছেন। কিন্তু তাদের বাঁচার এ লড়াই যে সফল হবে না তা নিশ্চিত।

জামায়াতের ব্যাপারে বিএনপির ভেতরকার অবস্থা ইতিবাচক হলেও জনরোষের কারণে তা প্রকাশ্য নয়। ফলে জামায়াতের নেতাকর্মী ও সমর্থক মহল জোটের নেতৃত্বদানকারী দল হিসেবে বিএনপির উপর এতই ক্ষুব্ধ যে সর্বশেষ তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে তারা বিএনপির প্রতি সমর্থনও দেয়নি, কাজও করেনি। ক্যাডার বাহিনী দিয়ে কোন হাঙ্গামাও ঘটায়নি। ফলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে উত্তরণের চেষ্টা করলেও ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো কাতরাচ্ছে। এছাড়া জোটের অন্যান্য যেসব দল রয়েছে এগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। এসব দলের অধিকাংশ প্যাড সর্বস্ব। পাশাপাশি ইসলামী মনোভাবাপন্ন দলগুলোও বিএনপি থেকে তাদের ইতোপূর্বেকার আন্তরিক সমর্থন অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। হেফাজতসহ জঙ্গী মনোভাবাপন্ন যেসব দল রয়েছে সেগুলো নিজেদের রক্ষার কাজে এতই ব্যস্ত যে, যা অনেকটা ‘চাচা আপন প্রাণ বাঁচা’ প্রবাদের মতোই প্রতীয়মান।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে বিএনপি এখন কি করতে যাচ্ছে বা কি করতে পারবে তাই এখন আলোচনার বিষয়। পাশাপাশি সরকারও বিএনপিকে কি করতে দেবে আর কি করতে দেবে না তাও আলোচিত হচ্ছে। তবে এ কথা সত্য যে, রাজনীতির লড়াইয়ে সরকারী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির রাজনীতি বড় ধরনের মার খেয়েছে। রাজনীতির ময়দানে এ মারের ক্ষত বিএনপির শুকাতে সময় নেবে।

প্রকাশিত : ৪ মে ২০১৫

০৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

অন্য খবর



ব্রেকিং নিউজ: