কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সম্ভাবনাময় পায়রা সমুদ্রবন্দর

প্রকাশিত : ৩ মে ২০১৫
  • শংকর লাল দাশ ও মেজবাহউদ্দিন মাননু

পটুয়াখালীর ‘পায়রা’ সমুদ্রবন্দর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। চলতি বছরের মাঝামাঝি থেকেই সীমিত আকারে এর কার্যক্রম শুরু হলেও অদূরভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী নানামুখী বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড এতদঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় নিয়ে আসবে অকল্পনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন। সমুদ্রবন্দর ঘিরে নির্মিত হবে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুতকেন্দ্রসহ নানা অবকাঠামো। বিকাশ ঘটবে পর্যটন শিল্পের। কর্মসংস্থান হবে লাখো মানুষের। অদূর ভবিষ্যতে এ সমুদ্রবন্দর দেশের অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। তাই এ সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে উপকূলের কোটি মানুষ এখন নতুন স্বপ্নের জাল বুনছে।

চট্টগ্রাম ও মংলা দু’টি সমুদ্রবন্দরের চ্যানেলেই রয়েছে নাব্য সঙ্কট। দু’শ’ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯ মিটারের বেশি গভীরতার জাহাজ বন্দরগুলোতে ভিড়তে পারছে না। বহির্নোঙর থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। এ জন্য জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন বহির্নোঙরে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে পণ্য খালাস ব্যয়। ঘটছে সময়ক্ষেপণ। যা ব্যবসায়ীদের অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ২০০৮ সালে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেই তৃতীয় একটি পরিপূর্ণ সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ব্যাপক সম্ভাব্যতা যাছাই শেষে পটুয়াখালীর উপকূলে এ সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর নামকরণ করা হয় ‘পটুয়াখালী পায়রা সমুদ্রবন্দর’। কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০১৩ সালে পায়রাবন্দর অধ্যাদেশ পাস হয় এবং ওই বছরের ১৯ নবেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে সমুদ্রবন্দরের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন। প্রাথমিকভাবে সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে আনুমানিক সময় ধরা হয়েছে ১৩ বছর। এজন্য গঠন করা হয়েছে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে পায়রা বন্দর প্রকল্পে আর্থিক, কারিগরি ও জনবলসহ যাবতীয় সহায়তা দিচ্ছে। এরই মধ্যে সীমিত আকারে বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। কলাপাড়া উপজেলার রামনাবাদ চ্যানেলের তীরে ১৬ একর জমি নিয়ে টারমিনাল ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে তিনটি পন্টুন ও দু’টি ক্রেন।

টিয়াখালী এলাকায় প্রায় ৬ হাজার একর জায়গা নিয়ে এ সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা হচ্ছে। রামনাবাদ চ্যানেলের গভীরতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে এ বন্দরটিকে আন্তর্জাতিক মানের বন্দরে রূপ দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে চলছে নানা কর্মকা-। রামনাবাদ চ্যানেলে পানির সর্বনিম্ন গভীরতা ৫ মিটার হলেও এর ভিতরে ১৬ থেকে ২১ মিটার গভীরতা রয়েছে। চ্যানেলের মাত্র ৩৫ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করলে ১৪ মিটার গভীরতার জাহাজও অনায়াসে বন্দরে ঢুকতে পারবে। এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরে রূপ নেবে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্রিটেনের এইচআর ওয়েলিংফোর্ড সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল হাইড্রোলিকস নামের একটি বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা নদী শাসন, চ্যানেল ডিজাইন, ড্রেজিং, জেটি ও টারমিনালসহ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্ভাব্যতা বিষয়ে মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করবে। যার ওপর ভিত্তি করে শুরু হবে মূল কর্মকা-। পরিকল্পনা অনুযায়ী পায়রাবন্দরের সঙ্গে ঢাকা ও অন্যান্য জেলার মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। এরই মধ্যে লেবুখালী সেতুর ডিজাইন পরিবর্তন করে তাতে রেললাইন সংযুক্ত করা হয়েছে। বরিশাল থেকে পটুয়াখালী হয়ে কুয়াকাটা পর্যন্ত চারলেনের সড়ক পথ নির্মাণ করা হবে। পায়রা বন্দর এলাকায় নির্মিত হবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিমানবন্দর। নদী পথে পণ্য পরিবহনেও নেয়া হচ্ছে উদ্যোগ।

পায়রা বন্দর ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনাও বেড়েছে। বন্দরটি চালু হলে দেশী-বিদেশী ব্যাপক সংখ্যক পর্যটকদের আনাগোনা নিঃসন্দেহে বাড়বে। কুয়াকাটার পাশাপাশি সোনারচরকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপ দিতে চলছে নানা কার্যক্রম। এরই মধ্যে সোনারচরে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে আধুনিক মানের রেস্টহাউস নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শীঘ্রই সোনারচর পর্যটন কেন্দ্র আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন। তাই পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান ও আয়ের বিশাল ক্ষেত্র তৈরি হবে। এতে জাতীয় প্রবৃদ্ধি নতুন মাত্রা লাভ করবে।

পায়রা সমুদ্রবন্দর পরিপূর্ণভাবে চালু হলে এটি হবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এখানে কর্মসংস্থান ঘটবে বিপুল সংখ্যক মানুষের। সমুদ্রবন্দর ঘিরে গড়ে উঠবে ইপিজেড, এসইজেড, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত শিল্পসহ অসংখ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী স্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগ হবে হাজার হাজার কোটি টাকা।

পায়রা সমুদ্রবন্দর ঘিরে দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, বরগুনা ও ভোলা জেলা জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে প্রাণ চাঞ্চল্যের। এ অঞ্চলের বিশেষ করে পটুয়াখালী জেলার দরিদ্র-হতদরিদ্র লাখো মানুষ প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের চার-পাঁচ মাস কর্মহীনতায় ভোগে। পায়রা সমুদ্রবন্দর শ্রমজীবী মানুষকে এখন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এলাকায় এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বেড়ে গেছে জমির দাম। বেড়েছে মানুষের দৈনিক মজুরি। আর্থিক দৈন্যদশার ইতি ঘটতে যাচ্ছে বঞ্চিত মানুষের।

প্রকাশিত : ৩ মে ২০১৫

০৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: