মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাজেট ভাবনা ॥ চ্যালেঞ্জ এবং বাস্তবায়ন

প্রকাশিত : ৩ মে ২০১৫
  • ড. আহমদ আল কবির

বেসরকারী খাতের ও এনজিও’দের মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের সময়মতো ব্যবহার ও বাস্তবায়ন প্রায় ৯৮ শতাংশের ওপরে। এর ফলে উন্নয়ন সহযোগীরা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে অধিকতর উৎসাহী। তবে সকল উন্নয়ন কর্মকা-ে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু সরাসরি সরকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বাস্তবায়নকৃত প্রকল্পে বা কর্মসূচীতে বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতির ব্যবহার এখন ১৮ শতাংশের নিচে। বর্তমান অর্থবছরে সরকার এই হার ২২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ করছে। নীতি নির্ধারকদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কিভাবে এই অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা অর্জন করা যায়। শুধুমাত্র উন্নয়ন সহযোগীদের আস্থা অর্জনই নয়, আমাদের উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার জন্যই বর্তমান অবস্থা ও পদ্ধতির পরিবর্তন জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দাতাদের কাছ থেকে ৮ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে ৬ হাজার ৭৫৯ কোটি ডলার ব্যবহার করা হয়েছে। মন্ত্রিসভা গত নবেম্বর ২০১৪ সালের এক বৈঠকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের মূল কারণসমূহ চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে জনবল নিয়োগে বিলম্ব, ভূমি অধিগ্রহণে জটিলতা, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন ও অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, কেনাকাটায় বিলম্ব এবং দরপত্র তৈরি ও মূল্যায়ন শেষ করে কার্যাদেশ দেয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে পুনরায় দরপত্র আহ্বানে কালক্ষেপণ উল্লেখযোগ্য। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কেনাকাটায় অনাপত্তি পেতে দেরি হওয়াকেও অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় মন্থর গতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এগুলোকে আমি সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল বাধা হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ। আর্থিক বছরের শেষ প্রান্তিকে দেশীয় অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প বা কার্যক্রমগুলোর সর্বোচ্চ খরচের মহড়া ও অপচয় দিয়ে দেশীয় অর্থায়নে প্রকল্প/কার্যক্রমগুলোতে আর্থিক বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট কার্যক্রম/প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন একইভাবে হচ্ছে না। এই বাস্তব অবস্থা আমাদের বলে দেয় যে, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে দাতাদের অসংখ্য শর্ত ও নিবিড় তত্ত্বাবধানের কারণে প্রকল্প/ কার্যক্রম বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো নিয়মিত ব্যয়ের পুনর্ভরণ দাবি না করার কারণে আর্থিক বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা অনেক পিছিয়ে আছে। এর দুটি কারণ হতে পারেÑপ্রথমত, দাতারা খরচের সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য প্রশ্ন করে বিধায় খরচ করে তার পুনর্ভরণ দাবি পেশ না করাই অনেক সহজ। এতে শুধুমাত্র খরচ বাড়ানোর জন্য তাগিদই আসবে মাত্র। দ্বিতীয়ত প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা দক্ষতার জন্য সঠিকভাবে খরচ করা এবং তার পুনর্ভরণ দাবি পেশ করার মতো সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি বা নেই। আমি ওপরের দু’টি কারণকেই বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান বাধা হিসেবে মনে করি। এর সমাধানে প্রথমত প্রকল্প বা কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কর্মকর্তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং তার সফল সমাপ্তির পরই তিনি প্রকল্প পরিচালক পদের যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তৃতীয়ত প্রকল্পের আকার অনুযায়ী এক বা একাধিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দায়িত্ব প্রাপ্ত টিমকে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়নের পূর্ণ ক্ষমতা দিয়ে প্রতি তিন মাস অন্তর বাস্তবায়ন মূল্যায়নের নীতি চালু করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিটি প্রকল্প/ কার্যক্রমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা তার দলের জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক উৎসাহ ঘোষণা করে পারফরমেন্স মূল্যায়ন করার বিধান চালু করতে হবে। একই সঙ্গে অকৃতকার্যদের জন্য নিরুৎসাহমূলক ব্যবস্থাদি থাকতে পারে।

প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী নীতিমালা প্রণয়ন ও অনুসরণ করা উচিত। প্রকল্পের ধরন, আর্থিক আয়তন, প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি কারিগরি দিক বিবেচনা করে যোগ্য ব্যক্তিকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া উচিত। দেখা গেছে, কারিগরি জ্ঞানের অধিকারী নন, আধুনিক ব্যবস্থাপনায় অনভিজ্ঞ এমন ব্যক্তিকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়েছে যিনি হয়ত মন্ত্রণালয়ে বা অধিদফতরে উচ্চ পদে আসীন। এটাও দেখা গেছে, যে সকল প্রকল্পে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ/ ভ্রমণ প্রচুর সেখানে প্রকল্প পরিচালক হতে অনেক অযোগ্য ব্যক্তিও দেন দরবার করে থাকেন এবং সিদ্ধিলাভ করেন। বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রকল্পের পরিচালক করা কোন অবস্থাতেই উচিত নয়।

প্রকল্পের জনবল নিয়োগে অদক্ষতা বা দুর্নীতি অনেক সময় প্রকল্প বাস্তবায়ন শঙ্কার মধ্যে ফেলে দেয়। সাধারণত একটি উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত জনবলকে কেবলমাত্র প্রকল্প মেয়াদে নিয়োগ দেয়া হয় এবং প্রকল্প শেষ হয়ে গেলে তারা চাকরিচ্যুত হন। তখন এদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের জন্য তদ্বির চলে। নতুবা ঐ মন্ত্রণালয়/ বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন নতুন কোন প্রকল্পে এ অতিরিক্ত জনবলকে নিয়োগ দেয়া হয়। বলা বাহুল্য, তখন মেধা ও যোগ্যতার বিচার করা হয় না। প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্পের সকল পদে যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে একটি স্থায়ী কমিটি থাকতে পাওে, যেখানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে আউটসোর্সিং পদ্ধতি অনুসরণের কথা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে শ্লথগতির আরেকটি কারণ হলো, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক অর্থ ছাড়ে অহেতুক বিলম্ব। প্রকল্পটি একনেক কর্তৃক অনুমোদিত হবার পর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ছাড় করতে কেন দীর্ঘ সময় লাগাবেন, তা আমার বোধগম্য নয়। আমি মনে করি, অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় করতে অধিকতর উদ্যোগী হতে পারে এবং এই ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণায়ে বা প্রতিষ্ঠানে বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন।

বাংলাদেশের এই সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও গতিশীল করার লক্ষ্যে দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের প্রয়োজন। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন কর্মকা- থেকে বিরত থাকার জন্য সমাজের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, তবে সমাজ উন্নয়নের সকল অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নাগরিক সমাজকে ভাল কাজে সমর্থন এবং নীতি বহির্ভূত কাজে বাধা দেয়ার চর্চা শুরু করতে হবে। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে উন্নয়ন, শান্তি ও গণতন্ত্রÑ এর মধ্যে কোনটি প্রাধান্য পাবে বা এ প্রাধান্যের ক্রম কি হবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সাধারণ গরিব মানুষ ‘উন্নয়ন’ চান, যাতে সামাজিক ও আর্থিক বৈষম্য দূর হয় এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্য উন্নয়ন ঘটে। সমাজের মধ্য আয়ের মানুষ উন্নয়নের সঙ্গে ‘শান্তি’ চায়। আর আমাদের সমাজের ধনী বা বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর অনেকেই গণতন্ত্রকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে তাঁদের নিজেদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে চান। তাঁরা নিজেদের ‘সুশীল সমাজ’ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম, আলোচনা, তত্ত্বাবধায়কসহ প্রশাসনে আসন পাওয়াসহ সরকারী- বেসরকারী প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় সুযোগ গ্রহণে ব্যস্ত। এমনকি গ্রাম-বাংলা নিয়ে যারা কথা বলেন, তাঁরা গত দশ-বিশ বছর কোনদিন গ্রামে যাননি। বস্তি নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু বস্তির মানুষের সঙ্গে কথা বলেন না। উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন, কিন্তু জীবনে কোন সফল উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন করেননি। তাই বাংলাদেশকে নিয়ে ভাবেন বা চিন্তা করেন, তাঁদের সকলকেই ‘উন্নয়ন’ ও ‘শান্তি’কে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে হবে এবং আগামী বাজেটের লক্ষ্য হিসেবে ‘উন্নয়ন’ ও ‘শান্তি’কে সর্বাগ্রে বিবেচনায় নিতে হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও রূপালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান

প্রকাশিত : ৩ মে ২০১৫

০৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: