মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপি এবার আর আন্দোলন কর্মসূচী দেয়ার সাহস দেখায়নি

প্রকাশিত : ৩ মে ২০১৫
  • নির্বাচন বর্জন করায় নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ

শরীফুল ইসলাম ॥ বিএনপি ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উত্থাপন করলেও এর প্রতিবাদে আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণার সাহস দেখায়নি। অথচ নির্বাচনের আগের দিনও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ নির্বাচনে কোন ধরনের কারচুপি হলেই সঙ্গে সঙ্গে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করার আগাম ঘোষণা দেয়া হয়। কারও সঙ্গে কথা না বলে নির্বাচন বর্জন করায় দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠা, আগের আন্দোলনের সহিংসতার কারণে জনরোষ, সাংগঠনিক দুর্বলতা, গ্রেফতার আতঙ্ক এবং মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আন্দোলনে অনীহার কারণেই আপাতত কোন কর্মসূচী দেয়া থেকে দূরে সরে এসেছে বিএনপি।

২৮ এপ্রিল ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরুর সোয়া ৩ ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে এবং সোয়া ৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। কিন্তু তারপরও বিএনপি দলীয় মেয়রপ্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পান। ৩ সিটিতে প্রায় ১৫টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হয় বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থীরা। দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ধারণা কেন্দ্র থেকে বর্জনের ঘোষণা না দিলে ভোটের ফলাফল এমন হতো না। আর এ কারণেই তারা দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। বিশেষ করে যারা বিএনপির সমর্থন নিয়ে মেয়র কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করেন তারা বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন চট্টগ্রামের মেয়র প্রার্থী মঞ্জুর আলম। তিনি দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি প্রচ- ক্ষুব্ধ হয়ে রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কেন্দ্র থেকে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার কারণেই তিনি বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে।

নির্বাচনের আগে স্বয়ং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের ভোট গণনা না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্র ত্যাগ না করার নির্দেশ দেয়ার বিষয়টি দলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে একটি অংশ ভালভাবেই দেখেছিল। তাই তারা এ নির্বাচনকে সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিল। তাই তারা নীরবে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদানসহ দলের পক্ষে কাজ করেছেন। কিন্তু দলের ক্ষমতাকেন্দ্রিক আরেকটি অংশ এ নির্বাচনে দলের স্বার্থকে প্রধান্য না দিয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এ কারণেই তারা প্রার্থীদের কাছে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে এজেন্ট তালিকায় নাম দিয়েও কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেনি। কেউ কেউ গ্রেফতার এড়াতে ভোটকেন্দ্রেই যায়নি আবার কেউ কেউ সকালের দিকে কেন্দ্রে গেলেও সরকার সমর্থক প্রার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিয়ে দ্রুত কেটে পড়েন। আর তারাই দলীয় হাইকমান্ডের কাছে উল্টা-পাল্টা তথ্য দিয়ে নির্বাচন বর্জনের পথ সুগম করেছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা ভোটের সংখ্যা দেখে এবং বিদেশি কূটনীতিকসহ বিভিন্ন মহলের সমালোচনার পর বিএনপি হাইকমান্ডও বুঝতে পারে এভাবে নির্বাচন বর্জন করা ঠিক হয়নি। আর এ কারণেই দলের পক্ষ থেকে পূর্বঘোষণা সত্ত্বেও নির্বাচনের পর আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে দলের জাতীয় কাউন্সিল না হওয়া, সাংগঠনিক জেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিট কমিটি পুনর্গঠন না করা এবং সর্বস্তরে কোন্দল বিস্তার লাভ করায় সাংগঠনিকভাবে বিএনপি এখন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই সরকার বিরোধী আন্দোলনে যাবার ক্ষেত্রে বিএনপি হাইকমান্ড সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিকেও বিবেচনায় নিয়েছে। এ কারণেই আপাতত সরকার বিরোধী আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করেনি দলটি। তবে আন্দোলনে না গেলেও এখন দল গোছানোর কাজ চলবে বলে বিএনপির কোন কোন নেতা বলেছেন।

বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজধানীতে ভোট ঠেকানোর আন্দোলনে সাদেক হোসেন খোকার নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটি ব্যর্থ হয়েছে। আর এবার ব্যর্থ হয়েছে মির্জা আব্বাসের নেতৃত্বাধীন আহ্বায়ক কমিটি। তাই রাজধানীসহ সারাদেশে দলকে শক্তিশালী না করে আবার আন্দোলনে যাওয়া ঠিক হবে না। এ ছাড়া সামনে রোজা, ঈদ, ও বর্ষা মৌসুম। এ সময়ে আন্দোলন চাঙ্গা করা কঠিন। তাই আন্দোলনে যাওয়ার আগে এ সময়ের মধ্যে দল গোছানোর কাজ করাই বিএনপির জন্য ভাল হবে।

এর আগে ৬ জানুয়ারি থেকে টানা ৯২ দিনের আন্দোলনে সারাদেশে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া বিশেষ করে পেট্রোলবোমার আঘাতে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়া এবং আরও শতাধিক মানুষ আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার মতো নেতিবাচক দিকগুলো এখনও দেশের মানুষ ভুলতে পারেনি। আন্দোলনের কথা মনে হলেই মানুষ বিএনপির বিরুদ্ধে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের অভিযোগ উত্থাপন করে। বিদেশী কূটনীতিকরাও বার বার এ বিষয়টির প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সিটি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি আন্দোলনে না যাওয়ার এটিও একটি কারণ।

সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছে। এ ছাড়া আত্মগোপনে থাকা আরও অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছেন। বর্তমানে কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যেই বেশ কিছু নেতার মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আবার আন্দোলন শুরু করলে এসব নেতাকর্মীদের আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে। এতে দলের নেতাকর্মীদের জন্য চরম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এ কারণে এসব নেতাকর্মীদের আন্দোলনের প্রতি সায় নেই। এছাড়া মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও আবার সরকার বিরোধী আন্দোলনে যাবার ব্যাপারে হাইকমান্ডের কাছে অনীহা প্রকাশ করেছে। মূলত: এ কারণেই বিএনপি নতুন করে আবার আন্দোলন শুরু করার সাহস দেখায়নি বলে জানা গেছে।

এদিকে সিটি নির্বাচনে প্রতিটি কেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় শক্তিশালী অবস্থান নিতে না পরায় বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও দলের সাংগঠনিক ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রে এজেন্ট রাখা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া কর্র্মী-সমর্থক কিংবা সাধারণ মানুষকে কেন্দ্রে এনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট দেয়ার তেমন চেষ্টা করা হয়নি। সেই সঙ্গে মাঝপথে হঠাৎ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণায় দলের সাধারণ কর্মীদের মনোবল দুর্বল করে দেয়া হয়েছে।

সিটি নির্বাচন বর্জনের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই প্রভাবশালী নেতার ফাঁস হওয়া টেলিফোন আলাপও দলের জন্য নেতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। এতে বিএনপির নির্বাচন বর্জনের বিষয়টি যে পূর্বপরিকল্পিত জনমনে এমন ধারণা দিয়েছে। তাই আন্দোলন কর্মসূচী দিলে এ নিয়ে আবারও জল্পনা-কল্পনা শুরু হতে পারে দলীয় হাইকমান্ড এমন আশঙ্কাও করেছেন। তাই আন্দোলনে যাবার আগে জনগণকে এসব বিষয়গুলো ভুলে যাবার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

প্রকাশিত : ৩ মে ২০১৫

০৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: