রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সাহিত্যের অনতিক্রান্ত বৃত্তে

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • রহমান মতি

গল্পপাঠের সময়ে আমরা যখন লেখককে গাল্পিক আবহের সঙ্গে একাত্ম করে ফেলি প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে প্রাবন্ধিক মনের দিক থেকে। স্বাতন্ত্র্যের গভীর জায়গায় হাসান আজিজুল হক ঋণী করেছেন একের পর এক। ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’ (১৯৮১), সক্রেটিস (১৯৮৫), লোকযাত্রা আধুনিকতা সাহিত্য (২০০৫), চিন্তনকণা (২০১৩) গ্রন্থগুলো সে ঋণের পাশে আমাদের আবদ্ধ করেছে। প্রবন্ধকে উন্মুক্ত করে তার মতোই যুক্তি, তুলনা, সিদ্ধান্ত, দিক-নির্দেশনার ইঙ্গিত, দায়বদ্ধতাগত মনমানসিকতা থেকে এ গ্রন্থগুলো এগিয়েছে। সঙ্গে থেকে গেছে সুনির্দিষ্ট কালের পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রকাশ এবং সেকাল-একাল সাদৃশ্য বা সম্পর্কের ইতিবৃত্ত। সব নিয়ে বলতে গেলে অনেক সময় বা সুযোগ দুটোই দরকার। ভবিষ্যতের জন্য কিছু রেখে আজ বলছি তাঁর বহুল পঠিত ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’ বইটি নিয়ে। কথাসাহিত্যিক ও কথাসাহিত্য এ দুটি যেমন গা জড়াজড়ি করে থাকে হাসান আজিজুল হকের দর্শন কথা বলে এ দুটির পূর্ণতার জন্য।

একজন সমালোচক হিসেবে কথাসাহিত্যের কাছে হাসান আজিজুল হকের প্রত্যাশা অনেক। সমালোচনা পাঠ করতে গিয়ে যখন তাঁর সৌন্দর্য বোধ করা যায়। আনন্দ অথবা ভারসাম্যের দিকটি শনাক্ত করার প্রচেষ্টা দৃশ্যমান হয় আমাদের কাছে সেটি কেবলই সমালোচনা থাকে না আর। হয়ে পড়ে সমালোচনা সাহিত্য। আপনি যখন চেতন বা অবচেতনে সমালোচনার মধ্যে ওই রসটি পাবেন আপনার আগ্রহ বাড়বে; সমালোচকের যুক্তি, আবেগ, সিদ্ধান্তের সঙ্গে আপনারও ঐক্য থাকবে। দেখা যাবে সাহিত্য পাঠের একটা আনন্দ মিলে যাচ্ছে। হাসান আজিজুল হক দায়বোধ করেই ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’য় সে কাজটি করেছেন। ধরনটি প্রবন্ধের, ভাষাটি সমালোচকের অথবা বিষয় নির্বাচন ও যুক্তি, আবেগ, সিদ্ধান্ত ইত্যাদির প্রায়োগিকতায় পরিশীলিত একটি মন মিলে যাচ্ছে সেখানে। গ্রন্থটিতে তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয় আছে : ক. দুষ্পাঠ্য কররেখা : আমাদের কথাসাহিত্য, খ. সাহিত্যের বাস্তব গ. লেখকের উপনিবেশ।

বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করলে প্রবন্ধগুলোর আয়োজন চোখে পড়ে। পরিপাটি বা সারি সারি দৃশ্যের যে বন্ধন থাকে প্রবন্ধগুলোর মধ্যে সেই বন্ধন আগাগোড়াই উজ্জ্বল। সমালোচক প্রতিবন্ধকতাকে যেমন বিস্তৃত আয়োজনে তুলে আনার কর্তব্য নেন পাশাপাশি প্রতিবন্ধকতার ইস্যুগুলোকে চিহ্নিত করে দেন। সরাসরি বলেন না কী করতে হবে কিন্তু উপলব্ধিতে আসে যে ছকটা এভাবে বা ওভাবে হতে পারে। কোথাও কোথাও একান্তই আপন দর্পণের সঙ্গ, অনুষঙ্গে কথাসাহিত্যের সূক্ষ্ম দার্শনিক ক্ষেত্রের অবয়ব ব্যাখ্যা করেন। সেখানে জ্বলজ্বল করে হাসান আজিজুল হকের ভাষা ও যুক্তির কারুময়তা।

আমাদের কথাসাহিত্য সংগ্রামমুখর পথ-পরিক্রমার ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে এগিয়েছে। শুরু থেকে আজ অবধি সংগ্রাম চলমান। কথাসাহিত্যিক কোন মন-মর্জি থেকে কথাসাহিত্য রচনায় এগিয়ে আসেন; তাঁর সমকালীন নানা পরিবেশ-পরিস্থিতি কোন পথে যায়; তাঁকে তা কতটা প্রভাবিত করে আর তাঁর মধ্যে সেই কথাসাহিত্যিক নিজের কোন বাঁক বা পরিচয় বেছে নেন এবং তাঁর কোন সাহিত্যিক প্রতিফলন ঘটান এসব স্বাভাবিক প্রথাগত প্রসঙ্গ। প্রথাগত বাস্তবই বড় বাস্তব তাঁকে অতিক্রম করে সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নতুন নির্মিতির দিকে অগ্রসর হলেই যে কোন মাধ্যমের সাহিত্যিকদের সার্থকতা আসে; হাসান আজিজুল হকের প্রত্যাশার ঝাঁপি এভাবেই বড় হয়েছে ‘দুষ্পাঠ্য কররেখা : আমাদের কথাসাহিত্য’ প্রবন্ধে। প্রথমেই বলেছেনÑ ‘সমকালের কোন মায়া বা স্বপ্ন রচনা করা কথাসাহিত্যিকের একটা কাজ হতে পারে। তবে দূর অতীত কিংবা দূর ভবিষ্যতকে নিয়ে স্বপ্ন তৈরি করা যতটা সহজ বর্তমানকে নিয়ে ততটা নয়।’ তাঁর কথায় স্পষ্ট হয় ভবিষ্যতকে নিয়ে আমরা কথা বলব আশাবাদ ব্যক্ত করার জন্য কিন্তু বর্তমানকে নিয়ে কাজ করার বা ভাবার অবকাশ তার চেয়েও জরুরি। তিনি প্রশ্ন করেছেন ‘কথাসাহিত্যিক কোথায় কাজ করবেন?’ ক্ষেত্রগুলোর কথাও বলেছেন। হাসান আজিজুল হক অত্যন্ত দায়বদ্ধ কারণ তিনি যে প্রশ্নগুলো রাখেন তার জবাব বা পথগুলো নিজেও দেখান। কথাসাহিত্যিক তাঁর পাঠককে যে স্বপ্ন দেখান তাতে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত তিন ধরনের পাঠ তৈরি হয়। ভবিষ্যত নিয়ে বলার সময় কথাসাহিত্যিক আসলে ‘মায়া’ তৈরি করেন কিনা বা তিনি পাঠককে স্বপ্ন দেখানোর কাজ করান কিনা তা গুরুত্বের দাবি রাখে। আলাদা স্বরূপ রয়ে যায় তার ওপর ভিত্তি করে স্বতন্ত্র ব্যাখ্যাও দিয়ে দেন। অতীতের কাছে কথাসাহিত্যিক যে দায় দেখান সেখানে থাকে স্মৃতিকাতরতা যাকে লেখক ‘বাল্যকাল’-এর উদাহরণে এনেছেন। সবারই ‘বাল্যকাল’ থাকে তাই কথাসাহিত্যিক এতে প্রবেশ করতে পারলে বাকি কাজটা তার জন্য সহজ হয়ে যায়। ভবিষ্যতের কথা বলার পথটা আরও পরিষ্কার হয়ে যায়। আরও গভীরভাবে ভাবলে দেখা যাবে হাসান আজিজুল হক বিশ্বের সব কথাসাহিত্যিকের মনোজগতকেই এখানে ব্যাখ্যা করেন। যেহেতু সব কথাসাহিত্যিক-ই নিজস্ব ও অন্যের দেখা অভিজ্ঞতার কাছে ঋণী এবং তাকেই আশ্রয় করে লিখে যান। এভাবে তাঁর বা তাঁদের রচনায় অতীতের অভিজ্ঞতা আসে, বর্তমান থাকে আর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত থাকেÑ এই তো সার্বিক দিক। অসাধারণ এই বোধ। কথাসাহিত্যে জীবনের সমগ্রতা পাওয়া যায় কি নাÑ এ জিজ্ঞাসা আছে সমালোচকের। জীবনকেই কথাসাহিত্যিক রূপায়ন করতে চান কিন্তু তাকে তো অনেক আগে থেকেই অনেকেই করে গেছেন তাই কাজটি কঠিন বটে। তবুও যে পাঠক একটা সমগ্রতার ছাপ খোঁজেন এটাই সত্য। কথাসাহিত্যে নাগরিকতা আধুনিককালের বড় ঘটনা হলেও আবহমান গ্রামীণ পটভূমিই যে চিরকালীন আবেদন রাখে সেটি কথাসাহিত্যিককে মনে রাখতে হয়।

হাসান আজিজুল হক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসের কথা বলেন যার অবদান আবহমান উপাদানে চিহ্নিত এবং সামাজিক সমস্যার জায়গাটিতে অসামান্য কাজ। সমালোচকের লক্ষ্য বড় কোন বক্তব্যের দিকে যায়। কথাসাহিত্যিক সাহিত্যে ব্যক্তি ও সমাজের ‘অমানবিক দিক’কে যদি দেখাতে না পারেন তাহলে তার আর কোন মূল্য থাকে না। অথচ আমাদের সাহিত্যে বাজারি কথাসাহিত্য যে স্থান দখল করেছে এবং সেসব লেখক যাঁরা লেখাকে একটা পণ্য ভাবেন এবং ভাল দর পেলেই বিক্রি করেন তার বাস্তবতা বলেছেন। ক্রেতা যখন বই কেনে তাতেই ওই লেখকগোষ্ঠী খুশি হন। কিন্তু ক্রেতা ওই বই কিনে পড়বেন নাকি ফেলে দেবেন সে চিন্তা করেন না। ‘মুক্তিযুদ্ধ’ নিয়েও যে আমাদের এখানে ভাল কথাসাহিত্য অল্পই রচিত হয়েছে সে ব্যাপারে তাঁর একটা আক্ষেপ আছে। তাঁর কাছে অনুসন্ধানটি হলো ‘মুক্তিযুদ্ধের লেখক স্বাধীনতার মহত্ত্ব আবিষ্কারে আজ ক্লান্ত’। স্বাধীনতার মহত্ত্ব যে কত বড় এ অসীম সত্যটাই হয়ত এখানে সেভাবে অনুভূত হয়নি তাই ক্রাইসিসও বড়। যদি বলা যায় জহির রায়হানের গল্পের কথা সেখানে স্বাধীনতার মহত্ত্ব অসামান্যভাবে এসেছে। ‘সময়ের প্রয়োজনে’, ‘কয়েকটি সংলাপ’ বা ‘একুশের গল্প’র যে ভেতরের বাস্তবতায় যা কিছু ঘটেছিল তার করুণ পরিবেশ তৈরি করার যে অসাধারণত্ব এই দিকটাই থাকা দরকার। হাসান আজিজুল হক স্বাধীনতার প্রকাশে কথাসাহিত্যের এরকম মহৎ দিককে ‘সৎ লেখকের’ অনুসন্ধান হিসেবে ভাবেন। তাঁর চিন্তায় ‘মনে হয় দু-একজন সৎ লেখক ছাড়া এই কাজের জন্যে তৈরি হবার চেষ্টাও করেননি কেউ। যদিও একটা দেশে বড় বড় লেখক গ-ায় গ-ায় কেন এক গ-া থাকাও খুবই ভাগ্যের কথা। আমাদের তো দু-একজন হলেও চলে।’ সংখ্যা ও গুণের তফাতটা যে সব যুগেই দরকার এ কথাটা সেটাই বলছে।

‘লেখকের উপনিবেশ’ প্রবন্ধতে শেষের লাইনটি অনেক কথা আছে এক কথাতেইÑ ‘সোজা কথায়, লেখককে স্থাপন করতে হয় একটি নিজস্ব উপনিবেশ।’ লেখকমাত্রই উপনিবেশ গঠন করে এবং তার মূল আদলটি হয় মানসিক উপনিবেশ- এটাই হাসান আজিজুল হকের ভেতরের অনুসন্ধান। নানাদিক দেখে কথাসাহিত্যকে ঘিরেই তাঁর এ অনুসন্ধান। সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষাযাপন’ কবিতার ছোটগল্পের সংজ্ঞা নিয়ে কথা উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের প্লটভিত্তিক বিষয়ে বলেছেন, ‘নিতান্তই সহজ সরল’। ‘সহজ-সরল’ জীবনের আখ্যান হিসেবে ছোটগল্প কতটুকু যুক্তিযুক্ত অবস্থানে থাকে এবং ছোটগল্প কী বড় প্লট বা বিস্তৃত জীবনের ইঙ্গিতকে প্রকাশ করে না; এমনকি মানুষের জীবন যেখানে ক্রমশ জটিল হয়ে যায় ছোটগল্প সেখানে কীভাবে ‘সহজ-সরল’ জীবনাভিজ্ঞতাকে তুলে ধরবে। জিজ্ঞাসাগুলো প্রাসঙ্গিক এবং কালগত বিচারে বা সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে মানানসই। হাসান আজিজুল হক এখানে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বিরেধিতার মনোভাব দেখান না বরং ছোটগল্পের বড় ক্যানভাসকে প্রকাশ করবার যে ক্ষমতা বা সম্ভাবনা থাকে তার গভীর সত্যকে বলেন। হয়ত রবীন্দ্রনাথ ছোটগল্পের সংজ্ঞা প্রদানের জন্য কবিতায় তা আনেননি; হয়ত কবিতার প্রসঙ্গানুসারে এসেছে এটাও হতে পারে। তবে এ প্রসঙ্গের সূত্র ধরে রাবীন্দ্রিক সংজ্ঞার আলাদা একটা অবস্থান আছে। ঠিক একই অবস্থান থেকে হাসান আজিজুল হকের মতো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসও তাঁর ‘সংস্কৃতির ভাঙা সেতু’ বইতে ‘বাংলা ছোটগল্প কি মরে যাচ্ছে’ প্রবন্ধেও ছোটগল্পের রাবীন্দ্রিক সংজ্ঞার বর্তমান প্রয়োগ নিয়ে বলেন। ইলিয়াস তাঁর মতো করে বলেন আর হাসান আজিজুল হক তাঁর মতো করে। তিনি মানুষের যে চিন্তার জায়গা আছে তাঁর পরিচিতিকে ‘উপনিবেশ’ বলেছেন। যে উপনিবেশ প্রত্যেক লেখকের আছে। তিনি বলেছেনÑ ‘তারাশঙ্করের সাহিত্যের জনপদ, ঘরগেরস্থি, মানুষজন, দালান-কোঠা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে অনেক দূরে।’ এই যে আলাদা জগত এতে থাকে লেখকের নিজস্ব আইডিওলজি এবং সে অনুসারে তাঁর রচনার প্রতিফলন হয়। সবই ঘটে অভিজ্ঞতার আলোকে। অভিজ্ঞতা বহুমুখী হয়ে জীবনের নানাপ্রান্তকে স্পর্শ করে। তাই লেখকে লেখকে সাদৃশ্য থাকলেও স্বকীয়তা থাকে। কিন্তু, ‘নিজস্ব অবাধ চিন্তার জায়গায় মানসিক উপনিবেশ থাকলেও লেখক মূলত একা। অনেক লেখকের লেখা তিনি পড়তে পারেন, অনেক জানাশোনা তাঁর থাকতে পারে কিন্তু সবকিছু গ্রহণ করে সেখান থেকে নিজের লেখাটি তাঁকে বেছে নিতে হয় আর তখনই তিনি একা। তাঁর শব্দ আছে অনেক অথচ যথেষ্ট নয় তা’। অনেকের মধ্যে একজন হয়ে উঠতে পারাটাই সাহিত্য শিল্পীর অর্জন। কী চমৎকার দর্শন চেনাচ্ছেন হাসান আজিজুল হক।

‘সাহিতের বাস্তব’ নিয়ে বলতে জিজ্ঞাসা দিয়েই শুরুটা করেনÑ ‘যা কিছু যেমন আছে অবিকল তেমনি তুলে ধরাই কি সাহিত্যে বাস্তবতা?’ এ প্রসঙ্গে প্রকৃতির নানা উপাদান প্রকৃতিতে যেভাবে আছে সাহিত্যে ঠিক সেভাবে থাকলে কি বুঝতে হবে এটাই বাস্তবতা নাকি অন্য কোন কিছু থাকে এতে। চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচিত একটি উক্তি ‘আমি ছবি আঁকি না বরং ছবি লিখি।’ আমরা ছবিকে আঁকার মাধ্যম হিসেবে জানি, যখন ছবিকে লেখার বিষয়রূপে জানব কেমন দাঁড়ায়। নাকি নতুন কোন তত্ত্ব সৃষ্টির জন্য বলা এটি। হাসান আজিজুল হক জানান, ‘বহিরঙ্গের বাস্তবিক অবিকল তুলে ধরা সাহিত্যের কাজ না। আন্তর বাস্তবতাও তার অংশ’। ‘প্রকৃতি’Ñ লেখকের কাছে ‘পরিপ্রেক্ষিত’, ‘মানুষ’ বা ‘সমাজ’ তাঁর কাছে আগ্রহের বিষয় আর বাকিটা মিলে যে বাস্তব তৈরি হয় তার পারা না পারা লেখকের নিজস্ব কাজ। সাহিত্যের বাস্তব বলতে তাঁর কাছেÑ ‘সাহিত্যের বাস্তব তাই বাস্তব ভেঙে বাস্তব গড়া।’ ভেঙে গড়ার সত্যতা বিশেষ অর্থে বাস্তবতা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র শশী-কুসুম কথোপকথনে- ‘শরীর। শরীর। তোমার মন নাই কুসুম?’ Ñএ অংশটিকে সমালোচক ‘মানুষের ভেতরের একেবারে ঝক্ঝক্ েবাস্তব’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু মানিকের মার্ক্সবাদী পর্যায়ের ‘চিহ্ন’ বা ‘ইতিকথার পরের কথা’ উপন্যাসের ‘তির্যক নির্মাণ’কে বাস্তব অবস্থা তৈরির পক্ষে রাখেন না তিনি। তত্ত্ব থেকে সাহিত্যে আসা নাকি সাহিত্য থেকে তত্ত্বে আসা এই বিচারে বাস্তবকে অন্য একটা অবস্থানে নিয়ে যান। বিষয়টি মতানৈক্য তৈরির অবকাশ রাখে তবে হাসান আজিজুল হকের কথা মৌলিক।

কথা আরও রয়েছে। তিনি বলেছেনÑ ‘বাস্তবকে দুমড়ে বাস্তব নির্মাণ, সেটায় লেখকে লেখকে ভেদ আছে। মতে বিশ্বাসে পথে অবস্থানে যোজন যোজন তফাত আছে, কিন্তু মিল আছে এই যে কেউই জগদ্দল অবিকল তৈরি করতে চান না।’ ‘জগদ্দল’ বা ‘স্থির’ পরিবেশ-পরিস্থিতির উপাদান বাস্তবের প্রতিফলনের জন্য নয়। একটু হলেও কিংবা চাহিদামতে তা বিচিত্রভাবে নানা রংরূপরেখাকেন্দ্রিক। তিনি আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, মার্কেজ, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁদের কথাসাহিত্যের উদাহরণ এনে বাস্তব ভেঙ্গে বাস্তব গড়া বা প্রতীকী বাস্তবতা তৈরির স্বকীয় দক্ষতাকে তুলে ধরেছেন যা দরকারি। এগুলো উদাহরণের প্রেক্ষিতে বিস্তারিত আনা শক্ত তবে দু-একটা বলা যায়। কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলী-যাত্রা’ উপন্যাস থেকে যে অংশের প্রসঙ্গ এনেছেন প্রাবন্ধিক সেটি বলা যেতে পারে। কমলকুমার ‘আলো ক্রমে আসিতেছে’- বাক্যে যে মহাকালীন সময়কে ইঙ্গিত করেন তা আঠারো শতকের বাস্তবতার গঙ্গা, চ-াল, বৃদ্ধ, এক যুবতী এদের মিলিয়ে বাস্তবতায় ফুটে ওঠা দৃশ্যে তা করুণ ও আবহমান সমাজচিত্র। কিন্তু, মনোজগতে রেখাপাত করল ওই বাস্তব যা আছে নৌকার গায়ে আঁকা মানুষের চোখে অথচ তা কাঠের। এই প্রতীকী বাস্তবতা তো হুবহু প্রকৃতির বাস্তবতা নয় যা লতাপাতা, মানুষ ইত্যাদির মধ্যে বিমূর্ত বরং তা বিশেষ বাস্তব। হাসান আজিজুল হক বলে যান, কথাসাহিত্যিক যদি নিজে তাঁর সক্ষমতায় এক আলাদা রংরেখাচিত্রের বাস্তবতা গড়তে পারেনÑ সেটাই অসামান্য। অন্যদিকে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর অনেক উৎস থেকে নদীর কান্না শোনার মাধ্যমে ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসে সখিনা খাতুনের কান্নার আওয়াজ আবিষ্কারের ব্যাপারটি বহুমাত্রিক বাস্তবতার দৃশ্যায়ন। এসবের মধ্যেই থাকে সমাজবাস্তবতা। তার আলাদা রকমফের নেই। আমাদের চোখের সামনে যা ঘটছে সেটাই সমাজবাস্তবতা। কথাসাহিত্যিকের সীমাবদ্ধতার সুগভীর ক্ষেত্রও থাকে। সমালোচকের চোখে, বাস্তবের নির্মাণের পথে চলতে চলতেÑ ‘আমাদের চেতনা বুদ্ধি অনুভবের সচলতা ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। বাস্তবের বোধকে আয়ত্ত করে সেখানে রদবদলের কাজে হাত লাগাতে উদ্যম দেখা দেয় না।’ কথাটা দাঁড়াল কথাসাহিত্যিক তাঁর বাস্তব নির্মাণের পথে দীর্ঘ এক পথে কখনো কখনো একঘেয়েমিতার পরিচয় দিলেও দিতে পারেন। এত আর এক বাস্তব।

কথাসাহিত্যিককে কত বড় দায়বোধ নিয়ে কথাসাহিত্য সৃষ্টির পথে এগোতে হয় হাসান আজিজুল হকের তা জানা। প্রাবন্ধিক, সমালোচক হাসান আজিজুল হক নিজেও একজন কথাসাহিত্যিক। ব্যক্তিক দায়বোধ থেকেও ‘কথাসাহিত্য’র এই অমূল্য দর্শনকে তিনি অনুভব করেন, বিশ্বাস করেন। পুরাতন ও নতুন ঐতিহ্য দু’দিকেই তাঁর দর্শন প্রতিনিধিত্বশীল।

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: