কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারী শ্রমিক ও মধ্যম আয়ের দেশ

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প। এ খাতকে বলা হচ্ছে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পোশাক খাত শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ৩৬ লাখ নারী শ্রমিক। নারীদের হাত ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাত দিন দিন সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠছে। এক সময় বলা হতো, ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’- কালের পরিক্রমায় সে কথার ভিন্ন মানে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে পোশাক খাতে নিয়োজিত এই বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম উঁচু করে দিচ্ছে। অর্থনীতির সূচককে সমুন্নত রাখছে।

শ্রমিকদের যথাযথ মূল্য দিতে পারলে সে দেশের অর্থনীতির চাকা গতিশীল থাকবে- অর্থনীতিবিদদের এই কথার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে সরকারী কলকারখানার শ্রমিকদের মজুরি ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন। প্রস্তাবিত মজুরি কাঠামোতে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মূল মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২৫০ টাকা। তবে মূল মজুরির ৫৫ এবং সর্বোচ্চ দু’জন সন্তানের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকা ভাতা ছাড়াও আরও কিছু ভাতার সুপারিশ করেছে কমিশন। এতে সব মিলিয়ে সরকারী শিল্প কারখানায় কর্মরত সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন শ্রমিক মাস শেষে ন্যূনতম আট হাজার টাকা পাবেন।

জানা যায়, ১৬টি গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি সুপারিশ করা হয়েছে। ২০০৫ সালের পর শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করা হয়নি। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি করা না হলেও এ সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ৩৮ দশমিক ২৯ শতাংশ।

২০০৫ সালের মজুরি কাঠামোতে শ্রমিকদের মজুরি ধরা হয় ৩২০০ টাকা। ২০১০ সালে মজুরি কমিশনের প্রস্তাবে ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৪২৫০ টাকা ও সর্বোচ্চ গ্রেডের শ্রমিকের মজুরি বাড়িয়ে করা হয় ৫৭৫০ টাকা। এছাড়া প্রত্যেক শ্রমিকের চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে করা হয়েছে ৭০০ টাকা।

সরকার শ্রমিকবান্ধব হওয়ায় কাজের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের উৎসাহ ও মনোবল বেড়ে গেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের নতুন বেতন কাঠামো ২০০৯ সালের ১ জুলাই কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এই সিদ্ধান্তে শ্রমিকরা সন্তোষ প্রকাশ করেছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের আরও একটি দাবি ছিল। তা হলো- কোন শ্রমিক মারা গেলে তার পরিবারকে এই শ্রমিকের ৩৬ মাসের বেতন জীবনবীমা হিসেবে পরিশোধ করা। এতে বেশিরভাগ মৃত শ্রমিকের পরিবার দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পেত। সরকারের পক্ষ থেকে জীবনবীমার ওই টাকার পরিমাণ কমিয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছিল। মজুরি কমিশনের মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ৩৬ মাসের বেতন হিসেবে জীবনবীমা পরিশোধ করার দাবিটিও মেনে নেয়া হয়- এতে শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কলকারখানার পাশাপাশি সরকার দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক তৈরি খাতে নিয়োজিত বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের মজুরি নিয়েও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তৈরি পোশাক খাতে মজুরির ভারসাম্য রক্ষার জন্য সরকার তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যমূলক মজুরি নির্ধারণ করেছে। পোশাক তৈরি খাতে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছিল। তবে সব ক্ষেত্রে যে বেতন বৈষম্য ছিল তা বলা যাবে না। শ্রমিকদের প্রাপ্য বেতন নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ কাজ করছিল। যার ফলে প্রায়ই পোশাক কারখানাগুলোতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হতো যা সরকারকে কখনও কখনও বিব্রত করত। এসব নানা বিষয় পর্যালোচনা করে পোশাক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে পোশাক কারখানার মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়। আলোচনার পর সরকার পোশাক শিল্প শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড তৈরি করে পরিস্থিতির আশু উন্নয়ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। শ্রমিক প্রতিনিধিরা মজুরি বোর্ড গঠনে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তকে ধন্যবাদ জানান। পোশাক শিল্প শ্রমিকদের নতুন মজুরি ঘোষণার জন্য ২০১৩ সালের মে মাসের মাঝামাঝি মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, এ মজুরি বোর্ড উল্লিখিত বছরের পহেলা মে থেকে কার্যকর হবে। শ্রম আইনের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সরকার মনে করে, কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্ক প্রয়োজন।

সর্বশেষ সরকার দেশের শ্রমিক সমাজের স্বার্থ চিন্তা করে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম কার্যকরী পদক্ষেপ হলো- সরকার পাঁচ হাজার তিন শ’ টাকা ন্যূনতম মজুরি ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য ঘোষিত নতুন মজুরি কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করেছে। গেজেটে বলা হয়েছে, নতুন এই বেতন কাঠামো ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে কার্যকর হবে। গত বছরের ২১ নবেম্বর ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের ১০ম সভায় এই মজুরি চূড়ান্ত হয়। মজুরি বোর্ডের নবম সভায় এই বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হলে মালিক পক্ষ প্রথমে প্রত্যাখ্যান করলেও, পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের পর মালিকরা তা মেনে নেন। তবে মজুরি বোর্ডের প্রস্তাবিত মূল বেতন তিন হাজার ২০০ টাকা থেকে কমিয়ে তিন হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। মজুরি কাঠামোর সর্বশেষ গ্রেড অর্থাৎ সপ্তম গ্রেডে একজন শ্রমিক ৫৩০০ টাকা পাবেন। এর মধ্যে মূল মজুরি হবে তিন হাজার টাকা, তার ওপর ৪০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া ১২০০ টাকা, ২৫০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, ২০০ টাকা যাতায়াত ভাতা ও খাদ্য ভর্তুকি বাবদ ৬৫০ টাকা রয়েছে। এছাড়া প্রতি কর্মদিবস ২৫ টাকা হারে ২৬ দিনের খাদ্য ভর্তুকি বাবদ ৬৫০ টাকা ধরা হয়েছে।

আনন্দ, বেদনা, পাওয়া না পাওয়া মহিলা শ্রমিকরা কষ্টকে কষ্ট মনে না করে অক্লান্ত পরিশ্রম করে পোশাক খাতে যে সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সেটাও দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পোশাক খাতের মহিলা শ্রমিকরা বাংলাদেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাবে মধ্যম আয়ের দেশে।

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: