আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারীকর্মীর নিরাপত্তা ও আইন

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • রহিমা আক্তার

আলেয়া বেগমের গ্রামের বাড়ি রংপুরে। অভাবের তাড়নায় গ্রাম ছেড়ে শহরে আসেন। দুমুঠো খাবারের জন্য কাজ খোঁজেন। সামান্য বেতনের একটি চাকরিও জোটেনি আলেয়ার ভাগ্যে। অবশেষে বস্তির এক খালা তাঁকে বাসাবাড়ির কাজ জোগাড় করে দেন। ২-৪ দিন ভাল গেলেও আলেয়ার উপর কু-নজর পড়ে বিত্ত ঐশ্বর্য্যরে মালিকের। এসব আলেয়ার ভাল লাগে না। খালাকে সব খুলে বলে। একদিন দু’দিন তিন দিনের পর খালা বলে, এসব মাথায় রাখিস না। না খেয়ে মরে যাবি যে। কাজ না করলে খাওয়াবে কে। সাদাসিধে আলেয়া এসব মানতে পারে না। বাধ্য হয়ে শহর ছাড়ে। গ্রামে গেলেও অনেকে অনেক বাজে কথা বলে, বলে শহুরে নারী,ওর সব শেষ।

কহিনুর কন্যাসন্তান হয়েও অসুস্থ বাবা-মায়ের মুখের দিক চেয়ে আসে শহরে। সামান্য যোগ্যতায় একটা চাকরি জোটায়। মাস যায় বেতন পায়। গ্রামে পাঠায়। বাবা-মা ভাল আছে, দু’বেলা খাবার খেতে পারছে। সন্তান হিসেবে কহিনুরের এ যে অনেক পাওয়া। অফিসের সিনিয়রের পরামর্শ, বেশি কাজ কর ভাল মাইনে পাবে। একসময় কহিনুরকে অন্য কাজের কথা বলে নিয়ে তুলে দেয় মালিকের ভাইয়ের হাতে। কয়েক ঘণ্টায় কহিনুর নারীত্বের সতীত্ব হারায়। উল্টো কহিনুরকে বলে, কাউকে বললে চাকরি তো যাবেই তোমারই কলঙ্ক হবে। বাবা-মা না খেয়ে থাকবে। শুধু অর্থের কাছে বন্দী রাখে নিজের সতীত্বকে।

মিথ্যে সাজানো নাটকে ফাঁসানো হয় আদিবাকে। পুলিশের কাস্টডিতে থাকতে হয় আদিবাকে ২ দিন। এই অপরাধে আদিবা চাকরি হারায়। অনেক অনুরোধ করেও কোন লাভ হলো না। নতুন কাজের সন্ধানে আদিবা। আদিবার চাকরির খুব প্রয়োজন। বান্ধবী রূপাও চেষ্টা চালায়। বিত্তবান আজাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় রূপা আদিবাকে। আজাদের অনেক শ্রমিক আছে। তাদের সঙ্গে যদি আদিবার একটি চাকরি হয়। আজাদ আর আদিবার দু’দিন কথা হয়। চাকরি দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়। অফিসে দেখা করার কথা বলে। আদিবা কিছু সময় নেয়। এর মাঝে ২ দিন কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে আজাদ বলেÑ ‘তুমি তো প্রতিষ্ঠিত হতে চাও। আমি জানি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সব যোগ্যতা তোমার আছে। তোমার জীবন যৌবন সব আমার কাছে বন্ধক রাখার বিনিময়ে তুমি কয়েকদিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। আমি তোমার সঙ্গেই আছি। আমি সব করব তোমার জন্য।’

আদিবা আর যোগাযোগ করে না। তবে কি আদিবা চাকরি পাবে না। বেকার থাকবে। শিক্ষিত হয়েই এভাবে বসে দিন কাটাবে। তবে কি আদিবা নিজের জীবন যৌবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হবে।

পহেলা মে বিশ্ব মে দিবস। ১৮১১ সাল থেকে শুরু হয় মে দিবস। পার করে এসেছে দীর্ঘপথ। মোচেনি শ্রমিক বঞ্চনা। ঘোরেনি শ্রমিকের ভাগ্যের চাকা। নারী শ্রমিকরা তো আছে আরও বঞ্চনার মাঝে। নারী শ্রমিক বলে তাদের নেই ন্যায্য মজুরি, নেই উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

স্বাধীনতার পর দেশে দায়িত্বে নারীরা থাকলেও বাস্তবে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, তারা নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সদিচ্ছা পোষণ করে। সরকারী সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত মহিলা প্রতিনিধিরা তেমন কিছু করতে পারে না। নারী শ্রমিকদের অধিকার আদায়েও তারা কাজ করতে পারে না। এজন্য সামাজিকভাবে যে পরিবেশ থাকা প্রয়োজন, তা নেই বলে নারীরা আজও প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিকার বঞ্চিত। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা কাজ পায় না। কাজ পেলেও হারাতে হয় নিজের মূল্যবান অনেক কিছু। প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে থাকতে হয় নিজের নিরাপত্তা নিয়ে। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে নানামুখী সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রশাসনিক পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও হতাশাজনক। ১৯৯৭ সালের জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় প্রশাসনে নারীর অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দেয়া হলেও গত দেড় দশকে কার্যত কোন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ২০১২ খসড়া পরিসংখ্যানেও এমনটাই উঠে আসে।

শ্রম আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছেÑ শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরির হার নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কার্যকালে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের জখমের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্প বিরোধ উত্থাপন ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ ও চাকরির অবস্থা এবং পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে আইন খুব জরুরী। কিন্তু আইন থাকা সত্ত্বেও নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়।

আন্তর্জাতিকভাবে জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে সকল প্রবাসী এবং তাদের পরিবারের অধিকারের নিরাপত্তা বিধান করতে কনভেনশন করে। এখানে প্রবাসীদের জন্য নতুন করে কোন আইন করা হয়নি। বরং এখানে দেশের নাগরিক শ্রমিকের মৌলিক অধিকারগুলোই প্রবাসীদের প্রাপ্য করা হয়েছে। কাজের পরিবেশ, সমমজুরি, শ্রমের জন্য নির্ধারিত সময়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান ইত্যাদি। এছাড়া নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ ১৯৭৯ বা সিডো সনদের প্রতিটা অনুচ্ছেদই প্রবাসী নারীর ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সিডো সনদে প্রবাসী নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার কথা সাধারণ সুপারিশ ২৬-এ সুনির্দিষ্ট করে বলা আছে।

১৯৯৫ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ন পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ২০০৯ পর্যন্ত মাত্র ৩টি সভা হয়। বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মহিলা ও শিশু উন্নয়ন পরিষদ মোট ৫০ জন সদস্যকে নিয়ে পূনর্গঠন করে। বলা হয়, প্রতি ৬ মাস পর পর সভা করা হবে। কিন্তু যেখানেও ২ বছরে মাত্র দু’বার সভা করা হয়। নারীর ক্ষমতায়ন বাড়লেও, শ্রমজীবী নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে দেশ আশানুরূপ উন্নতির দিকে যেতে পারবে না।

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: