কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মে দিবসে নারীর বঞ্চনা

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • রুখসানা কাজল

প্রতি পহেলা মে কলকারখানা, অফিস আদালতে ছুটি থাকে। সারা বিশ্বে এই ছুটি। কেননা এই দিনটি শ্রমিকদের একটি একান্ত নিজস্ব দিন, মহান শ্রমিক দিবস। কিন্তু পান্থপথের সিগন্যাল ছুঁয়ে এইদিনেও কাজের আশায় বসে থাকে কিছু খ- সময়ের অদক্ষ শ্রমিক। সম্বল প্রাগৈতিহাসিক কালের কাঠের আছাড়িসহ কোদাল, দড়ি, কুড়াল, নিজের শরীরের শক্তি আর বেঁচে থাকার সুতীব্র আকাক্সক্ষা। মে দিবসে এদের পেটের কিন্তু কোন ছুটি নেই।

ঢাকা শহরের বাসাবাড়িতে যে সমস্ত গৃহকর্মী ছুটা অথবা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টার বাঁধা কাজ করতে আসে, এই মহান শ্রমিক দিবসে তাদেরও কোন ছুটি নেই। মূলত গৃহকর্মে নিয়োজিত নারী-পুরুষরা এখনও বাংলাদেশে শ্রমিক হিসেবে গণ্য নয়। তারা মনিবের বাসার টিভি অথবা নিজের বস্তিতে আসা কোন এনজিও বা বাম কিছু দলের কল্যাণে মে দিবস সম্পর্কে জানলেও, কখনও মনে করে না যে এই দিনটিতে তারা ছুটি হিসেবে ভোগ করতে পারবে। আমাদের মতো দেশে মে দিবস সভা, সেমিনার, টিভি টক শোর মধ্যেই আবদ্ধ। সরকার বা সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোন সচেতনতা গড়ে তুলতে পারেনি।

ইদানীং বাংলাদেশের উন্নয়ন বোঝাতে একটি কথা খুব উচ্চারিত হয়। তা হলো বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে। অর্থাৎ বাংলদেশের জনগণ তাদের আকাক্সিক্ষত চাহিদার বেশিটা পূর্ণ করতে সমর্থ হচ্ছে। অর্থ, শিক্ষা, কর্মসংযোগ ছাড়াও বাংলাদেশের বিলাসী উপকরণ ভোগের পরিমাণ আগের তুলনায় শহর ও গ্রামে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্য জয়ে এদেশের জনগণ সম্পূর্ণ সমর্থ না হলেও অন্তত দারিদ্র্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। আর এই উন্নয়নের পথকে যথেষ্ট সুগম করে তুলেছে এদেশের ছোট বড় কাজ করা কর্মজীবী মানুষ।

বাংলাদেশের মানুষকে দু’দুটো ঔপনিবেশিক শাসন পেরিয়ে আসতে হয়েছে। ইংরেজ আসার আগে এদেশের মানুষ বিভিন্ন রাজা-রাজড়ার শাসনে সাধারণ কৃষিভিত্তিক জীবন কাটিয়েছে। ইংরেজ এবং পাকিস্তান আমলেও কৃষিকাজ ছিল প্রধান জীবিকা। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাঙালী নিজ শিরদাঁড়ার ওপর ভরসা করে সদ্য স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে শুরু করে।

বাংলাদেশের শ্রম বাজার আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারে পরিচিতি পেয়েছে পোশাক শিল্প গড়ে ওঠার কারণে। ১৯৭৮ সালে ক্ষুদ্র আকারে বাংলাদেশে পোশাক শিল্প কারখানা গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই শিল্প বিস্তৃত হয়ে বাংলাদেশের শ্রম বাজারকে ছাড়িয়ে এশিয়ার শ্রম বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়। আরও পরে এই শিল্প ইউরোপের শ্রম বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। যদিও কর্মদক্ষতার পাশাপাশি সস্তা শ্রমের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পোশাক শিল্প কারাখানাগুলো বাংলাদেশকেই টার্গেট করে পোশাক আমদানি রফতানির মূল ক্ষেত্র হিসেবে। বর্তমানে পোশাক শিল্পে প্রায় ৯০ শতাংশ নারী শ্রমিক কাজ করছে অর্থাৎ প্রায় পনেরো লাখ নারী শ্রমিক প্রতিদিন এই শিল্পের বিভিন্ন শাখায় কাজ করে। পোশাক শিল্প বাংলাদেশের নারীদের শিক্ষিত অশিক্ষিত স্বল্প শিক্ষিত নারীদের মধ্যে এমন কর্মোন্মাদনা সৃষ্টি করেছে যে, প্রতিনিয়ত গ্রাম বাংলার নারীরা শহরে এসে কাজ খুঁজে নিচ্ছে এই পোশাক শিল্প কল কারখানাগুলোতে।

মহান মে দিবসকে সামনে রেখে একটি প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, বর্তমানে সর্বাপেক্ষা লাভজনক শিল্পের শ্রমিকরা কেমন আছে?

বাংলাদেশের ভুঁইফোড় ধনিক শ্রেণীর অধিকাংশ যারা অভিজাত ও বিলাসী জীবনযাপন করছে, তাদের অর্থের যোগানদাতা এই পোশাক শিল্প। অথচ দেখুন এই শিল্প কারখানার শ্রমিকরা প্রতিদিন কেমন নিরাপত্তাহীন পরিবেশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে চলেছে। নব্বই সাল থেকে পোশাক শিল্পে আগুন লাগার বিষয়টি প্রায় লাগাতার হয়ে উঠেছে। এক সময় মনে করা হতো বৈদ্যুতিক গোলযোগে, অদক্ষ ব্যবহারের জন্যে এই আগুন লাগছে। কিন্তু ইদানীং একটি বিষয় ধারণা করা হচ্ছে তা হলো সংশ্লিষ্ট সকলকে হাত করে বীমার টাকা পাওয়ার জন্যে এই আগুন লাগানোর ফাঁদ ব্যবহার করা হচ্ছে না তো? শিল্প ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনেক প্রাচীন আর লাগসই ষড়যন্ত্র।

তাজরীন গার্মেন্টস, রানা প্লাজাসহ বিভিন্ন কারখানার কথা নিশ্চয় আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। অভাবী জীবনের চাহিদা মেটাতে লাল নীল কালো সুতায় যারা একটুখানি সচ্ছলতা কিনতে এসেছিল, তারা অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর শিকার হয়ে ঝরে গেছে। আজও এদের পরিবারকে কোন রকম ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। প্রতিদিন লেখালেখি, টক শো তে এদের কথা আসছে কিন্তু কথা পর্যন্তই। প্রতিশ্রুতির এক কণাও পূরণ করা হয়নি। সরকার থেকেও উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। শ্রমিকের রক্তে বিলাসিতা করা মালিক শ্রেণী ছারপোকার মৃত্যুর মতো ভুলে গেছে এই মৃত শ্রমিকদের কথা। কেননা অধিক জনসংখ্যার দেশে শ্রমিক পাওয়া এমন কিছু কঠিন ব্যাপার নয়।

সরকারের সচেতন উদাসীনতা, মালিকদের জোঁকের মতো শোষণ, মালিকদেরই তৈরি বিজিএমই’র শ্রমিকদের প্রতি তাচ্ছিল্য আজ এই পোশাক শিল্পকে একটি মৃত্যু ফাঁদে পরিণত করেছে। যেখানে উপায়হীন শ্রমিকরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, শ্রম আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে স্বল্প মজুরিতে চোরাগোপ্তাভাবে নানাভাবে শ্রমিকদের দৈহিক ও মানসিক শ্রম কিনে নেয়া হচ্ছে। সব চেয়ে বেশি বঞ্চিত করা হচ্ছে নারী শ্রমিকদের। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পুরুষের কাজ করেও নারী শ্রমিকদের মজুরি কম। নেই মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুদের রাখার ব্যবস্থা নেই, কারখানায় চিকিৎসাসেবা দেয়া হয় না, অধিকাংশ নারী শ্রমিককে নিয়োগপত্র দেয়া হয় না, অনেক সময় বেতন বোনাস আটকে রাখা হয় যাতে অন্য কারখানায় চলে যেতে না পারে। নেই প্রভিডেন্ট ফান্ড, শ্রমিক সংগঠন করার অধিকার।

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে শ্রমিকদের বঞ্চনা দেখে প্রশ্ন উঠতেই পারে, মে দিবসের মূল উদ্দেশ্যকে ভূলুণ্ঠিত করে এইভাবে কি মে দিবসকে পালন করা যায়? বাংলাদেশের শ্রমিকদের মুক্তি দিতে কোনদিন কি আগস্ট স্পিজের অমর বাক্য সত্যে পরিণত হবে? লাগাতার চলে আসা শ্রমিকদের ওপর করা অত্যাচারের প্রতিবাদে কি ভেসে আসবে প্রতিরোধ, ‘আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।’

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: