মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ভূমিকম্প বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • ইব্রাহিম নোমান

বড় ধরনের ভূমিকম্প-বিপর্যয় থেকে ২৫ এপ্রিল শনিবার রক্ষা পেয়েছে দেশ। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭.৯। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এর উৎপত্তিস্থল ছিল। তাই বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়তে পড়তে খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে শঙ্কা কাটেনি, যে কোন সময় বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

৭ দশমিক ৯ মাত্রার পর ২৬ এপ্রিল রবিবার দুপুরে আবার ৬ দশমিক ৬ তীব্রতার ভূমিকম্প হয়েছে। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলও নেপালে। ভারতের বিশেষজ্ঞদের বরাতে দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ৮০ বছরের মধ্যে নেপালে গতকালের ভূমিকম্পই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, এই এলাকায় এর চেয়েও শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, ১০ কোটি টন টিএনটি বিস্ফোরিত হলে যে শক্তি নির্গত হয় ৭ দশমিক ৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে সে মাত্রার কম্পন হয়েছে। গবেষকদের মতে, ‘এই অঞ্চলে বিশাল চ্যুতির যা বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটানোর অন্যতম কারণ। রিখটার স্কেলে ৮ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার সিরিজ ভূমিকম্পের জন্য এই চ্যুতিগুলো দায়ী।

হিমালয় অঞ্চলে ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করছেন খড়গপুরের আইআইটির অধ্যাপক শঙ্কর কুমার। তিনি বলেছেন, ‘ছোট আকারের নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণের সমান শক্তি নির্গত হয়েছে এই ভূমিকম্পে। কিন্তু ভিন্নভাবে বললে, ৭ দশমিক ৯ মাত্রার এই ভূমিকম্পে আমরা ভাগ্যবান। কারণ, এখানে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারত। মূল বিষয়টি হচ্ছে, কী পরিমাণ শক্তি নির্গত হচ্ছে সেটি। ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তা ৭ দশমিক ৯ মাত্রার চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ গুণ বেশি।’

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রজার বিলহাম সতর্ক করে বলেছেন, ২৫ এপ্রিলের ভূমিকম্প আরও বড় কোন ভূমিকম্পের পূর্বাবস্থাও হতে পারে। এমনকি এই ভূমিকম্পের পরাঘাত আগামী দুই মাস পর্যন্ত যে কোন সময় আসতে পারে।

বাংলাদেশে অতীতে যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে তা ৭ মাত্রার বেশি ছিল। ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালে ৮.৪ মাত্রার এবং মধুপুর ফল্টে ১৮৮৫ সালে ৭ মাত্রার ওপরে ভূমিকম্প হয়। এছাড়া ১৭৬২ সালে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয় সীতাকু--মিয়ানমার ফল্টে। আসাম-সিলেট ফল্টে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল প্রায় ৪০০ বছর আগে। অর্থাৎ এসব ফল্টে গড়ে ১০০ বছর পূর্বে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছিল। এখন বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন, তা এসব ফল্টে সঞ্চিত আছে। ফলে যে কোন সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার বিল হাম তার গবেষণায় বলেন, হিমালয়ের পাদদেশে মেইন বাউন্ডারি ট্রাস্ট (এমবিটি) রয়েছে, যা বাংলাদেশ থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে। এখানে ইউরেশিয়া প্লেটের নিচে ভারতের যে প্লেটটি তলিয়ে যাচ্ছে, সেটি লক হয়ে আছে। এটি খুলে গেলেই বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হবে।

জানা যায়, গত ১৫০ বছরে বাংলাদেশে ৭টি বড় আকারের ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে দুটির কেন্দ্র ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এর একটি হয় ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই। ৭.৬ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। আর ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই একই মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যার কেন্দ্র ছিল মানিকগঞ্জে। আরও কয়েকটি ভূমিকম্প বাংলাদেশের কেন্দ্রে না হলেও রেখে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন।

কেন বার বার ভূমিকম্প হচ্ছে?

ভূতাত্ত্বিক কারণেই ভূমিকম্পের উৎপত্তি। আড়াই কোটি বছর আগে পৃথিবীতে ভারত একটি আলাদা দ্বীপ ছিল, যা দ্রুত সরে এসে এশিয়ার সঙ্গে ধাক্কা খায়। মধ্য এশীয় টেকটোনিক প্লেটের নিচ দিয়ে ভারতীয় প্লেট অতি ধীরে ধীরে ঢুকে যাওয়ার ফলে এখানকার পর্বতগুলো এখনও আকার পাচ্ছে। প্রতি বছর এই দুটি প্লেট দুই ইঞ্চি করে পরস্পরের দিকে সরে আসছে। এতে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড চাপ। টেকটোনিক প্লেট হচ্ছে ভূত্বকের বিশাল খণ্ড, যা সঞ্চরণশীল।

যুক্তরাজ্যের ওপেন ইউনিভার্সিটির ভূবিজ্ঞানবিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড রথারি বলেন, হিমালয়ের পর্বতমালা ভারতীয় প্লেটের ওপর দিয়ে প্রবলভাবে ধাক্কা দিচ্ছে। সেখানে দুই থেকে তিনটি বড় ধরনের চ্যুতি রয়েছে। আর আছে কিছু খুব মৃদু গতিতে সঞ্চরণশীল চ্যুতি। এগুলোর সঞ্চরণের কারণেই ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছে।

ভূমিকম্পের সময় কতটুকু সময় পাওয়া যায়?

ভূমিকম্পের সময় প্রথম যে কম্পন টের পাওয়া যায়, তা হলো প্রাইমারী ওয়েভ বা চ-ধিাব. এর গতিবেগ ১-১৪ কিমি/সে পর্যন্ত হতে পারে। এরপর আসে সেকেন্ডারি ওয়েভ বা ঝযবধৎ ধিাব, যার গতিবেগ ১-৮ কিমি/সে। এ দুটো বডি ওয়েভ। এছাড়া লাভ এবং রেলেই নামে আরও দুটো ওয়েভ আছে, যেগুলো সারফেস ওয়েভ এবং তুলনামূলকভাবে শ্লথগতিসম্পন্ন।

আমরা ভূমিকম্পে যে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ধ্বংস হতে দেখি তার জন্য মূলত দায়ী সেকেন্ডারি ওয়েভ এবং সারফেস ওয়েভগুলো- কারণ, এগুলোই সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী। এখন প্রাথমিক ভূকম্পন বা চ-ধিাব টের পাবার কত সময় পর বাকিগুলো টের পাওয়া যাবে? উত্তর হচ্ছে, ব্যবধান খুব সামান্য। ধরুন আপনার অবস্থান ভূমিকম্পের এপিসেন্টার বা উৎপত্তিস্থল থেকে ২০০ কিমি দূরে। সেকেন্ডে যদি ১৪ কিমি বেগে চ-ধিাব আসে তবে ২০০ কিমি অতিক্রম করতে সময় নেবে প্রায় ১৪ সেকেন্ড। আর এরপর ৮ কিমি/সে বেগে সেকেন্ডারি ওয়েভ আসতে সময় নেবে প্রায় ২৫ সেকেন্ড। অর্থাৎ আপনি ভূমিকম্প টের পাবার মোটামুটি ১১ সেকেন্ডের ব্যবধানে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। এর মধ্যেই আপনাকে আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

কী প্রস্তুতি নেবেন

আপনি যদি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকেন, তবে খোঁজ নিন আপনার ভবনটিতে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা আছে কিনা থাকলে তা কী মাত্রার ভূমিকম্প সহ্য করতে পারবে। যদি না থাকে, তবে রেট্রোফিটিংয়ের ব্যবস্থা নিন। কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুরনো ভবনেও রেট্রোফিটিংয়ের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। জাপানে ভূমিকম্প একটি নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু তাদের ভবনগুলোতে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকায় তাদের ক্ষয়ক্ষতি হয় সামান্য।

ক্স পরিবারের সবার সঙ্গে বসে এ ধরনের জরুরী অবস্থায় কি করতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে- মোটকথা আপনার পরিবারের ইমার্জেন্সি প্ল্যান ঠিক করে সব সদস্যদের জানিয়ে রাখুন। ভূমিকম্পের সময় হাতে খুব সামান্যই সময় পাওয়া যাবে। এ সময় কী করবেন তা সবাইকে নিয়ে আগেই ঠিক করে রাখুন।

ক্স বড় বড় এবং লম্বা ফার্নিচারগুলো যেমন- আলমারি,শেলফ ইত্যাদি দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখুন যেন কম্পনের সময় গায়ের ওপর পড়ে না যায়। আর টিভি, ক্যাসেট প্লেয়ার ইতাদি ভারি জিনিসগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখুন।

ক্স বিছানার পাশে সবসময় টর্চলাইট, ব্যাটারি এবং জুতো রাখুন।

ক্স বছরে একবার করে হলেও ঘরের সবাই মিলে আসল ভূমিকম্পের সময় কী করবেন তার একটা ট্রায়াল দিন।

ভূমিকম্পের সময় করণীয়

নিচের পরামর্শগুলো বেশি কার্যকরী, যদি ভবনে ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকে

১। ভূমিকম্পের সময় বেশি নড়াচড়া, বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করা, জানালা দিয়ে লাফ দেয়ার চেষ্টা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা উচিত। একটা সাধারণ নিয়ম হলো- এ সময় যত বেশি মুভমেন্ট করবেন, তত বেশি আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আপনার ভবনে যদি ভূমিকম্পরোধক ব্যবস্থা থাকে বা রেট্রোফিটিং করা থাকে, তবে ভূমিকম্পের সময় বাসায় থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ।

২। আমেরিকান রেডক্রসের পরামর্শ অনুযায়ী ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো ‘ড্রপ-কাভার-হোল্ড অন’ বা ‘ডাক-কাভার’ পদ্ধতি। অর্থাৎ কম্পন শুরু হলে মেঝেতে বসে পড়ুন, তারপর কোন শক্ত টেবিল বা ডেস্কের নিচে ঢুকে কাভার নিন, এমন ডেস্ক বেছে নিন বা এমনভাবে কাভার নিন, যেন প্রয়োজনে আপনি কাভারসহ মুভ করতে পারেন।

কোন ভবন ভূমিকম্পরোধক হলে তা খুব কমই ধসে পড়ে। যেটা হয় তা হলো, আশপাশের বিভিন্ন জিনিস বা ফার্নিচার গায়ের ওপর পড়ে আহত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এগুলো থেকে বাঁচার জন্য এ সময় কোন শক্ত ডেস্ক বা টেবিলের নিচে ঢুকে আশ্রয় নেয়া জরুরী।

৩। ভূমিকম্পের সময় এলিভেটর/লিফট ব্যবহার পরিহার করুন।

৪। ভূমিকম্পের সময় যদি গাড়িতে থাকেন, তবে গাড়ি বন্ধ করে ভেতরে বসে থাকুন। গাড়ির বাইরে থাকলে আহত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

৫। ‘মেইন শক’ বা মূল ভূমিকম্পের আগে এবং পরে মৃদু থেকে মাঝারি আরও কিছু ভূমিকম্প হতে পারে, যেগুলো ‘ফোরশক’ এবং ‘আফটার শক’ নামে পরিচিত। সতর্ক না থাকলে এগুলো থেকেও বড় বিপদ হয়ে যেতে পারে। সাধারণত কোন বড় ভূমিকম্পে ‘আফটার শক’ প্রথম ঘণ্টার মধ্য থেকে শুরু করে কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে।

৬। প্রথম ভূমিকম্পের পর ইউটিলিটি লাইনগুলো (গ্যাস, বিদ্যুত ইত্যাদি) একনজর দেখে নিন। কোথাও কোন লিক বা ড্যামেজ দেখলে মেইন সুইচ বন্ধ করে দিন।

ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়লে করণীয়

১। ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য আগেই সঙ্গে রুমাল বা তোয়ালে বা চাদরের ব্যবস্থা করে রাখুন।

২। ম্যাচ জ্বালাবেন না। দালান ধসে পড়লে গ্যাস লিক হয়ে থাকতে পারে।

৩। চিৎকার করে ডাকাডাকি শেষ অপশন হিসেবে বিবেচনা করুন। কারণ, চিৎকারের সময় মুখে ক্ষতিকারক ধুলাবালি ঢুকে যেতে পারে। পাইপে বা ওয়ালে বাড়ি দিয়ে বা মুখে শিস বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে পারেন। তবে ভাল হয় সঙ্গে যদি একটা রেফারির বাঁশি বা হুইসেল থাকে, তার প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন আগেই।

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: