মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

হেডমাস্টার

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

লেখাটি শুরু করা যাক নরেন্দ্রনাথ মিত্রের বিখ্যাত ‘হেডমাস্টার’ গল্পটি দিয়ে। ওই গল্পে পাঠক একজন চিরপরিচিত কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবুকে দেখতে পান, যিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের কোনো এক অখ্যাত গাঁয়ের স্কুলের হেডমাস্টার। দেশভাগের ফলে পাকিস্তান হলে পরে চৌধুরীরা অর্থাৎ সামন্ত হিন্দু পরিবারগুলো (যারা মোটা অংকের সাহায্য-সহযোগিতা করতো এবং একই সঙ্গে স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্রই ছিল হিন্দু) একে-একে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তাতে সহসাই দেখা দেয় স্কুলের দীর্ণদশা-হতশ্রী অবস্থা। একপর্যায়ে হেডমাস্টার কৃষ্ণপ্রসন্ন বাবুও স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে পাড়ি জমান কলকাতায়। সেখানে গিয়ে একটা চাকরির জন্য শরণাপন্ন হন তাঁরই স্কুলের একসময়ের ছাত্র নিরুপম নন্দীর কাছে। এদিকে হেডমাস্টার আর মাস্টারির চাকরি নেবেন না পণ করেন, অন্যদিকে এত মানুষের অন্নসংস্থানের জন্য একটা ব্যবস্থা নিরুপমকেই করতে হবে বলে অনুরোধ করেন মাস্টার মশাইয়ের স্ত্রী লাবণ্যরেখা। শেষঅবধি নিরুপম তাঁর ব্যাংকেই নিয়োগ দেন একসময়ের হেডমাস্টার কৃষ্ণপ্রসন্নকে। কিন্তু মাস্টারমশাই কোনোরকম প্রগলভতা-অন্যায়, ভুল ইংরাজি-ফাজলামি সহ্য করতে পারেন না। বরাবরই মাস্টারদের যে চরিত্র, সবাইকে ছাত্র জ্ঞানে দেখা, তাই তিনি করেন এবং চাকরি ক্ষেত্রে কে জ্যেষ্ঠ বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাÑ তাও দৃষ্টি দেন না। মোট কথা স্বভাব তাঁর, ভুলত্রুটি দেখলেই সবাইকে ধমকানোÑ তাই করে যান প্রতিনিয়ত। এতে নাখোশ হন ডিপার্টমেন্টের সবাই এবং সমস্ত বিভাগ থেকেই ফেরত আসেন কৃষ্ণপ্রসন্ন। শেষপর্যন্ত নিরুপম বাধ্য হয়ে ব্যাংকের বেয়াড়াদের দায়িত্ব দেন হেডমাস্টারকে। একদিন সন্ধ্যাবেলায় দেখা যায়, হেডমাস্টার সত্যি সত্যি ব্যাংকের বেয়াড়াদের পড়াচ্ছেন এবং তাদের বোঝাচ্ছেন ‘স্বাধীনতা’ শব্দের অর্থ। গল্পটি প্রকাশিত হয় ‘দেশ’ পত্রিকায় (শারদীয় সংখ্যা ১৩৫৬)। একজন আদর্শবান মাস্টারের প্রকৃত চরিত্রটি গাল্পিক বেশ চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র। এখানেই হয়তো গল্পটির সার্থকতা। আর আমরা তো জানি, জাতির সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। এই শিক্ষাকে সার্থক করে তুলেন একজন শিক্ষক। কিন্তু শিক্ষকেরও শিক্ষক থাকেন। তিনি হলেন প্রধান শিক্ষক। ‘হেডমাস্টার’ নামে যিনি সবার কাছে পরিচিত। হেডমাস্টার বলতে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। শুভ্র পোশাক পরিহিত রাশভারি, মেজাজি, দৃঢ়প্রত্যয়ী অথচ স্নেহপ্রবণ, মার্জিত, সুশিক্ষিত, রুচিশীল, দায়িত্ববান এক মানুষকেই মনে হয় এই পদের অধিষ্ঠিত ব্যক্তি-মানুষটিকে। তাঁকে তুলে নিতে হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভার, কা-ারী হিসেবে তিনি এগিয়ে নিয়ে যান শিক্ষা কার্যক্রমকে।

প্রকৃত পক্ষে, শিক্ষক হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। একটি শিশুর ভবিষ্যতে চলার পথ তৈরি করে দেন শিক্ষকরাই। কিন্তু শিক্ষকের ওপর দিয়েও এ জন্য কম ঝক্কি যায় না; বরং ছাত্রের চেয়ে শিক্ষকের পরিশ্রম ঢের ঢের বেশি। পুরাকালে শিষ্যদের বিদ্যাভ্যাস করতে হতো গুরুগৃহে অবস্থান করে। বলা হয়ে থাকে, গুরুর কাছেই লাভ হতো বিদ্যার্থীদের নবজন্ম। গুরুই ছিলেন তাদের আরেক পিতা। বিদ্যাপতিদের ভবন তো বিদ্যার্থীদের হৃদয় মন্দির, শ্রেণীকক্ষ। অন্য আর দশটা পেশার মতো নয় এ শিক্ষকতা কাজটি। এ পেশায় আত্মনিয়োজিত মানুষদের নিতে হয় জাতির গুরুদায়িত্ব। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আলোকবর্তিকা হাতে সম্মুখে এগিয়ে চলেন যে মানুষটি- তিনি হেডমাস্টার। তিনি একেধারে শিক্ষার্থীদের শিক্ষক, শিক্ষকদের শিক্ষক এবং অভিভাবকদেরও শিক্ষক। তাঁদের চির উন্নত শির; সম্মান তাঁর শিরোভূষণ। তাঁর ‘অন্তরে জাজ্জ্বল্য থাকে উজ্জ্বল রতন,/সুমেরু শিখর শিরে সূর্যের মতন/অক্ষয়কিরণ’। শিক্ষার্থীদের ওপর এই হেডমাস্টার পদধারী মানুষটির প্রভাব অপরিসীম। ক্ষেত্র-বিশেষে এমনও দেখা গেছে, কখনও তা পিতা-মাতার প্রভাবের চেয়েও অধিক। যুগের সাথে সাথে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গিরও হয়েছে আমূল পরিবর্তন। এখন তারা আর ‘শুনে’ নয়, বরং ‘দেখে’ শিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। একজন শিক্ষক তাদেরকে কী করতে বলেন- তা নয়, বরং তিনি স্বয়ং কী করেন সেদিকেই খেয়াল থাকে তাদের বেশি। তাই, ‘আপনি আচরি’ ধর্ম ‘পরেরে শেখাও’ আপ্তবাক্যটি অনুসৃত হওয়ার সর্বাধিক দাবি রাখে এখানে। একজন প্রধান শিক্ষকের কাজ শুধুমাত্র শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করা নয়, শিক্ষার্থীরা যাতে স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে পারে তাঁর অনুকূল ক্ষেত্র তৈরি করাও তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ। এ এক কঠোর ব্রত। ইংরেজি একটি কথা আছে এমন- ÒOf all the hard jobs around, one of the hardest is being a good teacher.” একনিষ্ঠ শিক্ষার্থীর মতো একজন প্রধান শিক্ষক নিজেকে ঋদ্ধ করেন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে। আর লব্ধজ্ঞান বিতরণ করেন শিক্ষার্থীদের মাঝে। তাঁর সেই অকৃপণদানে আলোকিত হয় তাদের অন্তর্লোক। তবেই হয় নবজন্ম লাভ। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি কথা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, ‘জ্ঞানশিক্ষার আশ্রম স্থাপন করিতে হইলে গুরুর প্রয়োজন। শিক্ষক কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেই জোটে কিন্তু গুরু তো ফরমাশ দিলেই পাওয়া যায় না।’ ‘শিক্ষাসমস্যা’ নামের ওই প্রবন্ধে তিনি আরো বলেন- ‘আমাদের সঙ্গতি যাহা আছে, তাহার চেয়ে বেশি আমরা দাবি করিতে পারি না এ কথা সত্য। অত্যন্ত প্রয়োজন হইলেও সহসা আমাদের পাঠশালায় গুরু মহাশয়ের আসনে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষির আমদানি করা কাহারো আয়ত্তাধীন নহে। কিন্তু এ কথাও বিবেচনা করিয়া দেখিতে হইবে, আমাদের যে সঙ্গতি আছে অবস্থাদোষে তাহার পুরাটা দাবি না করিয়া আমরা সম্পূর্ণ মূলধন খাটাইতে পারি না এমন ঘটনাও ঘটে। ডাকের টিকিট লেফাফায় আঁটিবার জন্যই যদি জলের ঘড়া ব্যবহার করি তবে তাহার অধিকাংশ জলই অনাবশ্যক হয়; আবার স্নান করিতে হইলে সেই ঘড়ার জলই সম্পূর্ণ নিঃশেষ করা যায়; একই ঘড়ার উপযোগিতা ব্যবহারের গুণে কমে বাড়ে। আমরা যাঁহাকে ইস্কুলের শিক্ষক করি তাঁহাকে এমন করিয়া ব্যবহার করি যাহাতে তাঁহার হৃদয়মনের অতি অল্প অংশই কাজে খাটে-ফোনোগ্রাফ যন্ত্রের সঙ্গে একখানা বেত এবং কতটা পরিমাণ মগজ জুড়িয়া দিলেই ইস্কুলের শিক্ষক তৈরি করা যাইতে পারে। কিন্তু এই শিক্ষককেই যদি গুরুর আসনে বসাইয়া দাও তবে স্বভাবতই তাঁহার হৃদয়মনের শক্তি সমগ্রভাবে শিষ্যের প্রতি ধাবিত হইবে। অবশ্য, তাঁহার যাহা সাধ্য তাহার চেয়ে বেশি তিনি দিতে পারিবেন না, কিন্তু তাহার চেয়ে কম দেওয়াও তাঁহার পক্ষে লজ্জাকর হইবে। একপক্ষ হইতে যথার্থভাবে দাবি না উত্থাপিত হইলে অন্যপক্ষে সম্পূর্ণ শক্তির উদ্বোধন হয় না। আজ ইস্কুলের শিক্ষকরূপে দেশের যেটুকু শক্তি কাজ করিতেছে, দেশ যদি অন্তরের সঙ্গে প্রার্থনা করে তবে গুরুরূপে তাহার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি খাটিতে থাকিবে।’

এখন কথা হচ্ছে, কী সে মন্ত্রবল যা একজন শিক্ষককে ‘গুরু’তে পরিণত করে? যার অভাবে শিক্ষকতার পেশাদারিত্ব আজ প্রশ্নবিদ্ধ? ‘দেশের শিক্ষককুল যেইদিন গুরুর আসন ছাড়িয়া ‘ঢ়ঁনষরপ ংবৎাধহঃ’ হইলেন, সেইদিন হইতেই জাতি হিসেবে গৌরব করিবার শেষ ভরসাটুকু গেলো উবে।’ ‘কখনো কখনো শোনা গেছে, বনের জন্তু মানুষের শিশুকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে পালন করেছে। কিছুকাল পরে লোকালয়ে যখন তাকে ফিরে পাওয়া গেছে তখন দেখা গেল জন্তুর মতোই তার ব্যবহার। অথচ সিংহের বাচ্চাকে জন্মকাল থেকে মানুষের কাছে রেখে পুষলে সে নরসিংহ হয় না।’ অর্থাৎ, কোন পশু বা জন্তু মানুষের মতো সহজে তার স্বভাব-স্বধর্ম বদলায় না। রবীন্দ্রনাথের এই বাক্যগুচ্ছ অনেক কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে বৈকি!

একজন হেডমাস্টারের একটিমাত্র পরিচয়, তিনি শিক্ষক। প্রথমত এবং শেষ পর্যন্ত। তাঁর আর কোন পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না। নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে কর্তাব্যক্তিদের মনোরঞ্জন আর মানভঞ্জনে সদাব্যস্ত থাকা তাঁর ধর্ম নয়। তা অগৌরবের। নীতি-বিবর্জিত নতজানু ভূমিকার জন্য অপদস্থ হতে হয় পদে পদে। তাই তা তাঁকে মানায় না। এ প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক খুবই মধুর। শিক্ষার্থীদের কখনও ছোট বা খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তাদের কাছেও অনেক কিছু শেখার আছে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-স্নেহাদর এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি। একজন হেডমাস্টার শিক্ষার্থীদের কাছে একটি জীবন্ত পুস্তক। তাঁর চলন-বলন, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা সবকিছুই অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হওয়া আবশ্যক। এ ছাড়া, পিতা-মাতার মতো শিক্ষার্থীদের মঙ্গলার্থে তাঁকেও কত না ত্যাগ আর সংযমের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়। অতঃপর মধুরেন সমাপতে। শিক্ষার্থীর গৌরবে তিনিও হন গৌরবান্বিত। গর্বে গর্বিত।’

তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে হেডমাস্টারের দায়িত্ব অনেক। তাঁর মূল কাজ শিক্ষার্থীদের মাঝে আশার আলো সঞ্চার করা এবং সর্বোপরি তাদেরকে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যে নিজেকেই তিনি উপযুক্ত করে তৈরি করবেন প্রথম। আর পুরো জাতিকে জাগিয়ে তুলবেন উদাত্ত আহ্বানে- জাগো, ‘অৎরংব, অধিশব, ধহফ ংঃড়ঢ় হড়ঃ ঃরষষ ঃযব মড়ধষ রং ৎবধপযবফ.’ তবেই না আমরা এগিয়ে যেতে পারবো সামনের দিকে। জাতি ও জগৎ পৌঁছে যাবে অভীষ্ট লক্ষ্যে, সভ্যতার স্বর্ণশিখরে।

অধ্যক্ষ হামিদা আলী বলেন, পেশাজীবীদের মধ্যে যাঁরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান বিতরণ করেন, উন্নয়ন ও সভ্যতার ভিত রচনা করেন, তারা শিক্ষক। আর একজন মানুষের শিক্ষা প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা এবং অনুপ্রেরণা দান করাই হচ্ছেন প্রধান শিক্ষকের কাজ। তিনি সভ্যতা ও সমাজের অভিভাবক, সমাজের প্রতিনিধি। কার্যত প্রধান শিক্ষক বলতে একজন আলোকিত, জ্ঞানী, গুণী ও বুদ্ধিদীপ্ত প-িত ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি বিবর্তনের অনুঘটকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষার নিবেদিতপ্রাণ সেবক, ব্যবসায়ী নন। তিনি তাঁর আচার-আচরণ, মন ও মননে নিজেই বটবৃক্ষের ছায়া। তাঁর সাফল্যের ভিত্তি হলো পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা, নির্মল চারিত্রিক গুণাবলী, জ্ঞান সঞ্চারণে আন্তরিক সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টা। তাই প্রধান শিক্ষক বলতে এমন এক অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ববান জ্ঞানী, গুণী ও প-িত ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি শিক্ষার্থীকে শিখন প্রক্রিয়ায়, জ্ঞান অন্বেষণ ও আহরণে, মেধাবিকাশ ও উন্নয়নে, শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে, নৈতিক ও মানসিক গুণাবলী বিকাশে এবং সুশীল সমাজ গঠনে সহায়তা দানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরো বলেন, ‘হেডমাস্টার পদধারী ব্যক্তিটির কাছে সমাজের প্রত্যাশা অনেক। তাঁরা সমাজের প্রত্যাশা শতকরা যত ভাগ পূরণ করতে পারবেন, সমাজও ন্যূনতম তত ভাগ সম্মান তাঁদের দেবেন। অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, এখন দেয়া এবং নেয়ার সময় যাচ্ছে। সমাজের প্রত্যাশা অনুযায়ী একজন হেডমাস্টার হবেন জ্ঞানতাপস, মেধাবী, বুদ্ধিদীপ্ত, ব্যক্তিত্ববান, চৌকস, শ্রেণীকক্ষে আন্তরিক পাঠদানকারী ও জ্ঞান বিতরণে আগ্রহী। তিনি সুবিচারক, সুপরীক্ষক, শিক্ষার মাননিয়ন্ত্রক, যুক্তিবাদী, গবেষক এবং উদ্ভাবকও। তিনি সঠিক পথের দিশারী, পথ পরিদর্শক। তিনি হবেন চারিত্রিক দৃঢ়তাসম্পন্ন, পরিশ্রমী, নিরপেক্ষ, সুপরামর্শক ও প্রাণবন্ত গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর থাকবে স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গীকার। তিনি হবেন উত্তম, দক্ষ ও সুশীল ব্যক্তি। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান সাধনায় হবেন সহযোগিতা দানের ক্ষেত্রে হৃদয়স্পর্শী ও প্রত্যয়ী।’ হামিদা আলীর মতে, সমাজ যেহেতু একজন শিক্ষককে আলোকিত মানুষ হিসেবে দেখতে চায় সে কারণে একজন জ্ঞানী হেডমাস্টার সমাজের সুশীল মানুষের অন্যতম হিসেবে সংকীর্ণ মনের হবেন না, মোসাহেবি, দালালি বা চামচামি করবেন না, অসৌজন্যমূলক আচরণ করা থেকে বিরত থাকবেন, দলাদলি পরিহার করবেন, কপটতা থেকে দূরে থাকবেন, অসৎ সঙ্গ পরিহার করবেন, সক্রিয় দলীয় নোংরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকবেন। তিনি কখনো পক্ষপাতিত্ব আচরণ করবেন না। চাকরিবিধির পরিপন্থী বলে নয়, কেবল অর্থলোলুপতার জন্য অনৈতিক কোচিং ব্যবসার সাথে জড়িত হবেন না। তিনি কখনই দেশের কল্যাণ ভাবনা থেকে পিছিয়ে পড়বেন না। মেধাবিকাশে, অজ্ঞতা দূরীকরণে, মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে, নৈতিকতার উন্নয়নে, উদ্ভাবনী কাজে, গবেষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে তৎপর থাকবেন। মনে রাখতে হবে একজন প্রধান শিক্ষক শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষক নন, তিনি সমাজের শিক্ষক- দেশের শিক্ষক। বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক শিক্ষকদের জন্য একটি দিকনির্দেশনামূলক বিধি রয়েছে। দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে লিখিত বিধি-বিধান চালু করেছে। চাকরির শর্তাবলী বা চাকরিবিধি নামে প্রকাশিত এ সকল অফিস আদেশগুলো পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা উচিত। দায়িত্ব ও কর্তব্যও বটে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়াটা লজ্জার এবং একই সঙ্গে অপমানের। তবুও অনেক প্রধান শিক্ষক সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করে না, কর্তব্যের প্রতি নেই তাদের একাগ্রতা। তাই শিক্ষকতা আজ ব্রত থেকে ছিটকে এসে বেতনভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাতারে দাঁড়িয়েছে, যা খুবই লজ্জাকর।’

আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগমের মতে, ‘শিক্ষকতা যেমন তেমন কোনও পেশা নয়। এর পরিসর অনেক বড়। আমি একজন শিক্ষক, এই বোধ যখন ক্রমাগত নিজের ভিতরের সত্তাটাকে নাড়া দিতে থাকে, তখন আরও বহু বহু পেশার মধ্যেও এই পেশার একজন হয়ে মন গর্বিত হয়ে ওঠে। জানি, এই পেশা যেন আর সেই সামাজিক কৌলিন্যে অবস্থান করে না। তবু শিক্ষক সমাজের ভাবি নাগরিকদের মেরুদণ্ড মজবুত করার কারিগর’ এই তকমাটা তো চিরকালীন। আমি তো আর পাঁচজনের মতো নই। আমি তো একজন শিক্ষক। শিক্ষাদান আমার কাজ।’

‘হেডমাস্টার’ প্রসঙ্গে তাঁর অভিমত হলো, ‘ভালো প্লেয়ার কিন্তু সবসময় ভালো ক্যাপ্টেন হয় না। এর প্রকৃত উদাহরণ হিসেবে শচীন টেন্ডুলকরের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শচীন নিঃসন্দেহে ভালো খেলোয়াড়। তবে তিনি ভালো অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তাই একজন হেডমাস্টারকে অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি হবে- তা কিন্তু নয়। তাকে একজন গুড ম্যানেজার হতে হবে সবার আগে। নেতৃত্ব দেয়ার কৌশলগুলো তাঁর আয়ত্তে থাকতে হবে সুষ্ঠুভাবে।’

উদ্দীপন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, ‘একটি পরিবারে যেমন একজন অভিভাবক থাকেন, তেমনি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকেন একজন প্রধান ব্যক্তি। তাঁকে শুধু পড়াতে পারলেই হবে না; তাঁর থাকতে হবে আরো অনেক গুণ। পড়ার কাজে তো দক্ষ হতে হবেই; সেই সাথে প্রতিষ্ঠানে সবকিছু তদারকি সুন্দরভাবে করতে হবে তাঁকে। প্রতিষ্ঠানের কোথায় কী হচ্ছে, তার সবকিছু তাঁর নজরে রাখতে হবে। সংগঠনের মতো হেডমাস্টারকে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় রাখা, শিক্ষাপরিবেশ নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলতার মধ্যে আনা- সবকিছু সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে হবে তাঁকে নিজের মেধা ও দক্ষতায়।’

তাঁর মতে, হেডমাস্টারকে অবশ্যই নীতি ও ন্যায়নিষ্ঠ হতে হবে। তাঁর ব্যক্তিত্ব এমন হতে হবে, যেন তাঁকে দেখে সবাই ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। তাঁকে একাধারে শিক্ষার্থীদের, শিক্ষকদের, এমনকি অভিভাবকদেরও শিক্ষক হতে হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও তাঁকে নজরে রাখতে হয়। সকলের প্রতি স্নেহপ্রবণ মনোভাব থাকাটা এক্ষেত্রে খুবই জরুরী।

তিনি আরো যোগ করে বলেন, ‘হেডমাস্টারের ভূমিকাটি সাধারণ শিক্ষকদের মতো নয়। তাঁকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের ভূমিকা পালন করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে শৃঙ্খলা। রুটিন তৈরি, সেই অনুযায়ী পাঠদান ও পরীক্ষা, প্রাত্যহিক টিফিন বণ্টন ইত্যাদি কত সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে এর জন্য সামগ্রিক শৃঙ্খলার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হয় তাঁকে সবসময়। শিক্ষকেরা কিভাবে পড়াচ্ছে, শিক্ষার্থীরা কিভাবে পড়ছে, আদৌ পড়ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা, আনন্দের সঙ্গে পাঠদান, ক্লাসের রুটিন করা ইত্যাদি নানাবিধ কাজ করতে হয় হেডমাস্টারকেই। তবে এক্ষেত্রে তাঁকে অবশ্যই অভিজ্ঞ ও সুশিক্ষিত হতে হবে। শিক্ষকদের ও শিক্ষার্থীদের মনের কথা তাঁকে বুঝতে হবে। তাদের মনের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। একজন আদর্শ হেডমাস্টারকে অবশ্যই দৃঢ়, নিপুন হাতে করতে হয় সবকিছু। এর মধ্যেই তাঁর সুনাম, যশ নিহিত।’ তিনি মনে করেন, ‘সমগ্র স্কুলের শিক্ষার্থীই প্রধান শিক্ষকের কাছে তাঁর সন্তানতুল্য। তাদের চরিত্রগঠনে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে, আদর্শ মানুষ হিসেবে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করতে উদ্দীপ্ত করতে হবে প্রধান শিক্ষককেই। তিনি হচ্ছেন বটবৃক্ষের মতো, যাঁর ছায়াতলে নিরাপদ ও প্রশান্তির আশ্রয় নেয় সবাই।’

প্রকাশিত : ১ মে ২০১৫

০১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: