কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অভিনেতার মুখোমুখি...

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫

আনন্দকণ্ঠ : আপনি কি জানতেন ড. রোবার্তো মিরান্ডা চরিত্র হয়ে আপনি যখন মঞ্চে অভিনয়ে বিভোর তখন দর্শকাসনে বসে নিমগ্ন ২১ বছর আগে একই চরিত্রে রূপদানকারী এবং বর্তমান সরকারের সংস্কৃত মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর।

গৌতম হালদার : জানা ছিল না। পরে জানলাম। জানলে শ্রদ্ধায় বিনম্র হতাম। আরও অনেক স্বপ্ন জাগত বয়ে চলা জীবনকে নিয়ে। কয়েক বছর পরে আমি হয়ত দেখব আমি প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আসনে বসে আছি আর ড. রোবার্তো মিরান্ডা চরিত্রে অভিনয় করে চলছে কোন এক তরুণ অভিনয় শিল্পী। এই কথাগুলো মনে আসত। থিয়েটারতো তাই যা একই সঙ্গে অতীত এবং ভবিষ্যৎ বেঁধে রাখে বর্তমানে। অতীতের জ্ঞান, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর বর্তমানে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়েই তো তৈরি হয় অভিনয়। মঞ্চায়ন শেষে যখন জানলাম, আমাদের মেয়েটি এখানে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মুখোশ নামে মঞ্চায়ন হতো তখন ভাল লাগল। নাট্যকার সৈয়দ শামসুল হক, নির্দেশক সারা যাকের এবং একই চরিত্রাভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরকে আমার বিনম্র প্রণাম।

আনন্দকণ্ঠ : অপরাধী কিন্তু বাধ্যবাধকতা, অনুশোচনা কিন্তু প্রাত্যহিকতা, শাস্তির প্রত্যাশী কিন্তু ক্ষমা প্রদর্শন, বীভৎসতা কিন্তু পরিত্রাতা-এরকম সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অনুভূতি গোটা মেয়েটি নাটকে আপনি কিভাবে করেন বলে বিশ্বাস।

গৌতম হালদার : সেতো ভাগ্য আর করুণাময়ের দয়া। একই সঙ্গে নিজেকে খোঁজা, চরিত্রকে খোঁজা, এই সময়কে খোঁজা, নাট্যকারের দর্শন বোঝার চেষ্টা। একজন সাধারণ মানুষের মধ্যে কিভাবে পৈশাচিকতা-নিষ্ঠুরতা জন্ম নেয় তা বোঝার চেষ্টা। তারওতো স্নেহশীল বাবা-মা আছে, প্রেয়সী স্ত্রী আছে, আদরের ছেলেমেয়ে আছে, তথাপি কি কারণে তার জীবনে এই বাঁক এল তা ধরার চেষ্টা।

আনন্দকণ্ঠ : ব্যক্তির অস্তিত্বহীনতার যন্ত্রণা আপনি ‘আমাকে দেখুন’ নাটকে দেখলেন কোন অনুভব থেকে।

গৌতম হালদার : জানতো এটা কমন ম্যানের স্টোরি। সাধারণ মানুষের চাওয়া, ছোট ছোট চাওয়া, ছোট ছোট ভালবাসা, ছোট ছোট কষ্ট, ছোট ছোট স্বপ্নÑ সেগুলো গভীরভাবে ভাবতে ভাবতে বড় হয়ে যায় ছোট মানুষের জীবনে। আমি কে, কি চাই, প্রেম কোথায়, কষ্ট কোথায় এসব প্রসঙ্গে, এসব জিজ্ঞাসা আমাকে টেনেছে। এই জিজ্ঞাসাই বড় জিজ্ঞাসা। একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে নিজেকে খোঁজা।

আনন্দকণ্ঠ : বড়দা বড়দা নাটকে একটি চেয়ারে বসে এক দেহে দাদা-ভাইকে ধরতে পারলেন কিভাবে।

গৌতম হালদার : গানটি শোননি, ‘একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনিতো আগে’। উর্দু সাহিত্যিক মুন্সি প্রেমচাঁদ কিভাবে তাঁর বড়দাকে দেখেছেন, আমার বড়দা কেমন, কোন কথাটার তাল-লয়-সুর কেমন সেসবতো ভাবি। দাদার সাথে আপন মনে কথা বলি বলেই হয়তো ভাই হয়ে যাই। তবে বিভাজন করি না, সমন্বয় করে পথ দেখতে দেখতে পথ পাড়ি দেই অজানাকে জানব বলে।

আনন্দকণ্ঠ : মিসড কল নাটকে প্রযুক্তির বেগ কিভাবে আবেগকে ভোঁতা করে দিচ্ছে তা দেখালেন, এ ক্ষেত্রে আপনার ভাবনা।

গৌতম হালদার : মোবাইল ফোন আবিষ্কার হয়েছিল পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য। যোগাযোগ গভীরতর করার জন্যে। সেই মোবাইল ফোন এখন কিভাবে ব্যবহার হয় পরস্পরের সাথে ব্যবধান তৈরি করতে, সেটিই নাটকটির বিষয়। যতদিন যাচ্ছে তত ব্যবধান বাড়ছে অথচ উপরে উপরে দেখানো হচ্ছে যোগাযোগ বাড়ছে, কমিউনিকেশনের জায়গা দখল করছে কমিউনিফেকিং তথা নকল কিংবা মিথ্যা যোগাযোগ। আর এটাই শতাব্দীর এক নতুন অভিশাপ। অপরপ্রান্তে যে, সে সত্য কিনা কিংবা আদৌ আছে কিনা। সংযোগের ছড়াছড়ি কিন্তু একাকিত্ব বাড়ছে বই কমছে না।

আনন্দকণ্ঠ : মেঘনাদবধ, বড়দা বড়দা, মরমীয় মন, কাব্যে গানে গৌতম হালদার তথা আপনিতো একক অভিনয়ের বরপুত্র। একক অভিনয় নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি।

গৌতম হালদার : একক অভিনয় করবে কিন্তু কিছুতেই একাই করে ফেলছি, এই পাপকে মনে প্রশ্রয় দেবে না। একক কিন্তু অসংখ্য চরিত্র নিয়ে বোঝাপড়াটা থাকতেই হবে। কলাকুশলী-মিউজিশিয়ান-লাইটেশিয়ান, ডিজাইনারÑদর্শক সকলকে ভেতরে একত্রিত করেই একক অভিনয়। স্ক্রিপ্টের অসংখ্য চরিত্র অসংখ্য খোঁজাতো রইলই। তৃপ্তি মিত্রের অপরাজিতা, তিজেন বাইয়ের পা-বাণী, ফেরদৌসী মজুমদারের কোকিলারা আমি ভুলিনি।

আনন্দকণ্ঠ : আপনার নির্দেশনাও বহুল আলোচিত ও অনুকরণীয়। যে প্রাঙ্গণেমোর-এর আমন্ত্রণে আপনি ঢাকায় এলেন সেই প্রাঙ্গণেমোর-এর প্রতিষ্ঠার প্রেরণা আপনার নির্দেশিত সোজন বাদিয়ার ঘাট দেখে। নির্দেশনা প্রক্রিয়ায় আপনার ভাবনা।

গৌতম হালদার : শরবতে মিষ্টিত্ব ছড়িয়ে চিনি যেভাবে নিজে আড়ালে আবডালে থাকে তেমনি যে প্রযোজনা দেখে প্রযোজনার সবটাতে নির্দেশককে পাওয়া যাবে অথচ আলাদাভাবে, বলতে হবে না আমার সেট কিংবা আমার লাইট অথবা আমার তৈরি অভিনেতা-অভিনেত্রী তবেই তিনি ভাল নির্দেশক। নির্দেশকের উপর ভরসা এবং ভালবাসা থাকলে অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্দেশককে সাজিয়ে তোলে, প্রযোজনা ভাল হয়।

আনন্দকণ্ঠ : যারা আপনাকে দেখে অভিনয়ে আসতে চায় তাদের কি বলবেন।

গৌতম হালদার : বলি শুধু দেখে এসো না, বুঝে শুনে এসো। এত বলি তবু বুঝতে চায় না। আর এরকম কিছু অবুঝ, কিছু সরল মানুষ আছে বলেই পৃথিবীর স্বপ্নগুলো বেঁচে আছে, বেঁচে থাকে।

আনন্দকণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

গৌতম হালদার : তোমাকেও ধন্যবাদ।

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫

৩০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: