মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

অবশেষে কর্তৃত্ব হারাল বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫
অবশেষে কর্তৃত্ব হারাল বাংলাদেশ
  • প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৩২/১, পাকিস্তান ২২৭/১; দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশ ১৫ রানে এগিয়ে

মিথুন আশরাফ, খুলনা থেকে ॥ বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই পাকিস্তানের ওপর কর্তৃত্ব চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। ওয়ানডে সিরিজের পর টি২০ ম্যাচেও সেই কর্তত্ব বজায় ছিল। এমনকি খুলনা টেস্টেও প্রথম দিনেও পাকিস্তানের কাছে কর্তৃত্ব হারায়নি মাশরাফি, তামিম, সাকিবরা। অবশেষে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনে কর্তৃত্ব হারাল বাংলাদেশ। স্কোর বলছে পাকিস্তান এখনও ১০৫ রানে পিছিয়ে রয়েছে। কিন্তু হাতে যে এখনও প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের ৯ উইকেট আছে আর বাংলাদেশ ৩৩২ রানেই অলআউট হয়ে গেছে, সেখানেই বাংলাদেশের কর্তৃত্ব হারিয়ে গেছে। পুরো দিনটি জুড়ে তো পাকিস্তানই বাজিমাত করল।

প্রথমদিনে ৪ উইকেটে ২৩৬ রান করেছিল বাংলাদেশ। সেখান থেকে দ্বিতীয় দিন প্রথম সেশন শেষ হওয়ার আগেই আরও ৪ উইকেটের পতন ঘটে যায়! রানও স্কোরবোর্ডে জমা করা যায় ৮৯। যখন দ্বিতীয় সেশনে খেলতে নামে বাংলাদেশ, ৩ ওভারেই ইনিংসের পতন ঘটে যায়। শেষপর্যন্ত প্রথম ইনিংসে ৩৩২ রান করে বাংলাদেশ। এ রানের জবাব দিতে নেমে দ্বিতীয় দিন শেষে ১ উইকেটে ২২৭ রান করে পাকিস্তান। হাফিজ শতক হাঁকিয়ে দেন। ১৩৭ রান করে এখনও অপরাজিত আছেন। আর তার সঙ্গে দ্বিতীয় সেশন থেকে পুরোটা খেলে যাওয়া দুইবার ‘নতুন জীবন’ পাওয়া আজহার আলীও ৬৫ রান করে ব্যাট করছেন। ৫০ রানেই সামি আসলাম (২০) আউটের পর থেকে এ দুইজন মিলে দ্বিতীয় উইকেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে সর্বোচ্চ ১৭৭ রানের জুটি গড়েন। পাকিস্তানও বড় সংগ্রহের পথেই এগিয়ে চলছে। আজ হাফিজ ও আজহার তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করবেন।

বাংলাদেশের ইনিংস দ্বিতীয় দিনে এত দ্রুত গুটিয়ে যাবে, তা কেউই ভাবতে পারেননি। প্রথমদিনের দিকে তাকালে দ্বিতীয় দিন অন্তত দ্বিতীয় সেশন পর্যন্ত খেলবে বাংলাদেশ। এমন ভাবনাই করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম সেশন অতিক্রম করে দ্বিতীয় সেশন শুরু হতেই বাংলাদেশের ইনিংসের পতন ঘটে যায়। এরপর পাকিস্তান ব্যাট করতে নেমে দ্বিতীয় সেশন শেষ হওয়ার আগে ২৫ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৮৪ রান তুলে। পাকিস্তান দ্রুত রান তুলতে থাকে। যেখানে ৩০ ওভারে গিয়ে বাংলাদেশ ৬১ রান করেছিল, সেখানে ১৫ ওভারে পাকিস্তান ৬০ রান তুলে ফেলে। এর আগেই অবশ্য সামি আসলামের (২০) উইকেটটি তুলে নেন স্পিনার তাইজুল। ৭৩ রানের সময় ১১ রানে থাকা আজহারকেও আউট করা যেত। কিন্তু সাকিবের বলে মুশফিক ক্যাচটি ধরতে পারেননি। মুশফিকের গ্লাভসে লেগে বলটি সিøপে যায়। সেখানে থাকা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও ক্যাচটি ধরতে পারেননি। এরপর অবশ্য দ্বিতীয় উইকেটে হাফিজ-আজহার মিলে ১৭৭ রানের জুটি গড়ে ফেলেন।

আজহারকে আউট করার আরেকটি নিশ্চিত সুযোগও মিস হয়। আজহার তখন ২৮ রান করেছেন। আর দলের স্কোর বোর্ডে জমা ১২৬ রান। অভিষেক টেস্টে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট উইকেটটি পেতে পারতেন মোহাম্মদ শহীদ। কিন্তু শহীদের বলটি আজহারের ব্যাটে লেগে মুশফিকের কাছে গেলেও সহজ ক্যাচটি লুফে নিতে পারেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। এ ক্যাচ ধরতে গিয়ে অবশ্য ব্যথা পেয়ে মাঠ থেকে বের হয়ে যেতে হয়েছে মুশফিককে। তার পরিবর্তে ইমরুল কায়েস শেষপর্যন্ত উইকেটরক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। সেই আজহার শেষপর্যন্ত ক্যারিয়ারের ১৯তম টেস্ট অর্ধশতক করেন। দুই দলের জন্যই প্রথমদিনটি ছিল সমানে-সমান। বাংলাদেশ যেখানে ২৩৬ রান করেছিল, সেখানে পাকিস্তান ৪ উইকেট তুলে নিয়েছিল। অবশ্য দিনের শেষ বলে মুমিনুল হক আউট না হলে দিনটি বাংলাদেশেরই হতো। কিন্তু যে বাংলাদেশ দল প্রথমদিনে এত ভাল ব্যাটিং করল। স্কোরবোর্ডে খুব বেশি রান জমা না হলেও উইকেটে আঁকড়ে থাকল ব্যাটসম্যানরা। দ্বিতীয় দিন শুরুতেই ছন্দপতন ঘটে গেল। আগের দিন সাকিব ১৯ রানে ব্যাট করছিলেন। দ্বিতীয় দিন সাকিবের সঙ্গে ব্যাট হাতে নামেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম। ৭ রান যোগ হতেই সাকিব (২৫) আউট হয়ে যান। এই যে ব্যাটিংয়ে ছন্দপতন হয়, তা চলতেই থাকে। ৯৬ রানে প্রথমদিনের পর হাতে থাকা ৬ উইকেটের পতন ঘটে যায়। অবশ্য প্রথমদিনের চেয়ে একটু ভিন্নতাও দেখা যায়। রান দ্রুত স্কোর বোর্ডে জমা হয়। প্রথম দিনে ১০০ রান তুলতে যেখানে বাংলাদেশের ৪৫ ওভার খেলতে হয়েছিল। সেখানে দ্বিতীয় দিনে ৯৬ রান যে করে দল, তা আসে ৩০ ওভারে। উইকেটও যেমন যেতে থাকে, রানও তেমন হতে থাকে। সাকিবের আউটের পর মুশফিক ও অভিষেক টেস্ট খেলতে নামা সৌম্য মিলে বড় জুটি গড়ার সম্ভাবনাই তৈরি করেন। এ দুজন মিলে ষষ্ঠ উইকেটে ৬২ রানের জুটি গড়েন। যা দলকে পাকিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয়বারের মতো ৩০০ রানে নিয়ে যায়। আশা ছিল ২০০৩ সালে জয়ের সম্ভাবনা জাগানো মুলতান টেস্টের স্কোরকেও অতিক্রম করবে বাংলাদেশ। মুলতান টেস্টে প্রথম ইনিংসে যে ৩৬১ রান করেছিল বাংলাদেশ, তা পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বোচ্চ স্কোর ছিল। কিন্তু দেখা গেল ৩০৫ রানে যেই ৩৩ রান করা সৌম্য আউট হলেন, ২৭ রানেই শেষ ৪ উইকেটের পতন ঘটে গেল। ৩১০ রানে মুশফিক (৩২) আউট হওয়ার পর ২ রান যোগ হতেই তাইজুল ইসলামের (১) উইকেটেরও পতন ঘটে যায়। কোন রকমে বাংলাদেশ ২ উইকেট হাতে রেখে মধ্যাহ্ন বিরতিতে যায়। তখন ৮ উইকেটে স্কোর বোর্ডে ৩২৫ রান যোগ হয়। যেই মধ্যাহ্ন বিরতি শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাটিংয়ে নামে আবার, ৭ রানেই অভিষেক টেস্ট খেলতে নামা মোহাম্মদ শহীদ (১০) ও রুবেল হোসেন (২) আউট হয়ে যান। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের ইনিংসও গুটিয়ে যায়। শুভগত হোম ১২ রানে অপরাজিত থাকেন।

ম্যাচের প্রথমদিন থেকেই স্পিন ধরতে শুরু করেছিল। এরপরও বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা উইকেট আঁকড়ে থাকতে পেরেছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় দিনও স্পিন ধরল, এবার আর হাফিজ, বাবর, ইয়াসিরদের স্পিন বিষের সামনে মৃত্যু ছাড়া কোন পথই বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের সামনে খোলা থাকল না। টপাটপ পাকিস্তান স্পিনাররা উইকেট তুলে নিতে থাকলেন। পুরো ইনিংসে যে বাংলাদেশের ১০ উইকেট পড়ল, ৭টিই স্পিনাররা দখল করে নিলেন। ইয়াসির ৩, হাফিজ ও বাবর ২ উইকেট নিলেন। পেসার ওয়াহাব রিয়াজ শেষ দুই উইকেট তুলে নিয়ে ৩ উইকেট নিজের দখলে করার আগে স্পিনারদের একাধিপত্বই দেখা গেল। অথচ বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা স্পিন খুব ভাল খেলেন!

বাংলাদেশ প্রথম টেস্টে ৮ ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলছে। কারণ, ব্যাটিং মজবুত করে নেমেছে। যেন স্কোর বোর্ডে বেশি রান তুলে পাকিস্তানকে চাপে ফেলে দেয়া যায়। টস জিতে ব্যাটিং করে প্রথম ইনিংসে সেই কাজটি কোথায় করতে পারল বাংলাদেশ। মুমিনুল প্রথমদিনে ‘নতুন জীবন’ পেয়েও ৮০ রান করলেন। ইমরুল কায়েসের ব্যাট থেকে আসল ৫১ রান। মাহমুদুল্লাহ মাঝখানে ৪৯ রান করলেন। বাকিরা কী করলেন? তিন বোলার তাইজুল, রুবেল, শহীদ ছাড়া বাকি সবই ব্যাটসম্যান। অথচ মুমিনুল, ইমরুল, মাহমুদুল্লাহ ছাড়া কেউই তেমন জৌলুস ছড়াতে পারলেন না। পারলেন না বলেই বাংলাদেশও ৪০০ রানের কাছে যেতে পারল না। ম্যাচে বাংলাদেশ বেশি ব্যাটসম্যান নিয়ে খেলছে মানেই ‘ড্র’র ভাবনাই মাথায় আসছে। সেই ড্র হওয়ার মতো রানও কী স্কোর বোর্ডে প্রথম ইনিংসে জমা হয়েছে? প্রথম দিন শেষে যেখানে দুই দল সমানে-সমান ছিল। সেখানে আধিপত্যের দিক থেকে দ্বিতীয় দিনে তো পাকিস্তানই এগিয়ে রইল। দ্বিতীয় দিনেই পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ।

এখন উপায় কী? উপায় বাংলাদেশ ক্রিকেটারদেরই বের করতে হবে। হয় পাকিস্তানকে অল্পতেই বেঁধে ফেলতে হবে। যা অনেক কঠিন। না হয় যত বেশি সময়, ঘণ্টা, দিন অপচয় করা যায়। অল্পতে পাকিস্তানকে রুখে দিতে পারলে, এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে ভাল কিছু করে দেখাতে পারলে জয়ের সম্ভাবনাও থাকবে। আর যদি পাকিস্তান বড় কিছু করে ফেলে তাহলে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের প্রথম ইনিংস শেষে দ্বিতীয় ইনিংস চারদিন বা সাড়ে চারদিনে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে সেই ‘ড্র’র সম্ভাবনাই থাকছে। তবে আপাতত বাংলাদেশ তো পিছিয়েই গেল। প্রথমবারের মতো পাকিস্তানের এবারের বাংলাদেশ সফরে কর্তৃত্বও হারাল বাংলাদেশ।

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫

৩০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

খেলার খবর



ব্রেকিং নিউজ: