মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কারচুপি হলে বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট পেলেন কিভাবে?

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫
  • প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির কারচুপির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, কারচুপি হলে বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা লাখ লাখ ভোট পেলেন কী করে? কারচুপির যে অভিযোগ তুলে বিএনপি ভোট বর্জন করেছে তা সত্য হলে তাদের সমর্থিত মেয়ররা এত ভোট পেতেন না। হিসাব করলে দেখা যাবে, পূর্ববর্তী নির্বাচন ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানের নির্বাচনী গোলযোগের চেয়ে মঙ্গলবারের ঘটনা ছিল খুবই নগণ্য। আসলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু ভোটে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ভোটাররা বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির মতো একটি ‘কুৎসিত’ দলকে মানুষ এত ভোট দেয় কী করে? দেশবাসীকে আহ্বান জানাব, এই দলের (বিএনপি) প্রতি এখন কেবলই ঘৃণা দেখাতে। যারা মানুষের পেটে লাথি মারে, পুড়িয়ে মারে তাদের প্রতি কেবল ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণা।

বুধবার তাঁর কার্যালয়ে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের নামে বাস পোড়ানোয় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক হস্তান্তরকালে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। সিটি নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আজ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষ তাদের (বিএনপি) প্রত্যাখ্যান করেছে। আমি আশা করি, দেশবাসীও আগামীতে তাদের প্রত্যাখ্যান করবে।

অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধে পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতদের স্বজন ও আহত মিলিয়ে ১৯৩ জনকে আট কোটি ৪১ লাখ টাকার অর্থ সহায়তা দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির ৬৫ জন মালিককে দুই কোটি ছয় লাখ ৪০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। গত ৫ জানুয়ারি থেকে তিন মাস ধরে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধে নিহত-আহতদের পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত ২৫ কোটি ১০ লাখ ১৩ হাজার টাকার অনুদান দেয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহণমন্ত্রী শাজাহান খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষ কখনও বিএনপির মতো একটি কুৎসিত দলকে ভোট দেবে না। বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণে এবার সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। তিনি বলেন, বিএনপি একটি বা দুটি হত্যাকা- ঘটিয়ে নির্বাচন বর্জন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অধিক সতর্কতার জন্য তারা তা করতে পারেনি।

তিনি বলেন, দেশে এর আগে অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের চেয়েও মঙ্গলবারের নির্বাচন অধিক শান্তিপূর্ণ ছিল। দুই হাজার ৭শ’র মধ্যে মাত্র কয়েকটি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত ও কিছু বুথে গোলযোগ হয়েছে। তিনি বলেন, কেবল মেয়র নয়, কাউন্সিলর পদেও সিটি নির্বাচন হয়েছে। এজন্য কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। হিসাব করলে দেখা যাবে পূর্ববর্তী নির্বাচন ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানের নির্বাচনী গোলযোগের চেয়ে মঙ্গলবারের ঘটনা ছিল খুবই নগণ্য।

অবরোধ-হরতালে নাশকতার চিত্র তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এ ধরনের নোংরা রাজনীতি বা এ ধরনের নোংরামি আর যেন বাংলাদেশে না হয়, মানুষের ভাগ্য নিয়ে যেন কেউ আর ছিনিমিনি না খেলে। মানুষের রুজি-রোজগারে যেন আর কেউ আঘাত না হানে, গরিবের পেটে যেন আর লাথি না মারে। সেটাই আমরা চাই। তিনি বলেন, যারা পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করে সেই দলকে দেশের মানুষ চিরদিন ঘৃণা করবে। কারণ তারা মানুষের গ্রাস কেড়ে নিয়েছে, জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে এবং মানুষের দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনে বিএনপির কারচুপির অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হলো। বাংলাদেশে বহু নির্বাচন হয়েছে। সাংবাদিকরাও এখানে আছেন, নিশ্চয়ই সকলে স্বীকার করবেন। এর আগেও পাঁচটা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন হয়েছে। সেবারেও যতটুকু ঘটনা ঘটেছে, এবারের নির্বাচনে তাও হয়নি। বরং এবারের নির্বাচন সব থেকে শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২৭শ’ পোলিং সেন্টারের (ভোটকেন্দ্র) মধ্যে মাত্র ঢাকা শহরের দুটি সেন্টার বন্ধ, আর কয়েকটা পোলিং বুথে কিছু কিছু ঘটনা ঘটেছে। কারণ এখানে শুধু মেয়র প্রার্থীরা নির্বাচন করে না, এখানে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও নির্বাচন করে। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে। কিছু কিছু ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যরা গিয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য জায়গায়ও নির্বাচনকে ঘিরে যে ‘ঘটনা’ ঘটে তার তুলনায় মঙ্গলবারের ঘটনা ‘অত্যন্ত নগণ্য’। ভোটে কোন কারচুপি বা কারও ভোট কেড়ে নেয়া বা কাউকে ভোটে বাধা দেয়ার কোনরকম ব্যবস্থা করা হয়নি। কিন্তু আমি জানি না, কী কারণে বিএনপি হঠাৎ করে সকাল ৮টায় ভোট শুরু হওয়ার পর ১১টার দিকে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত দিল! কিন্তু যদি নির্বাচন দেখি, তাহলে এই তিন ঘণ্টায়ই ঢাকায় তাদের প্রার্থী তিন লাখের উপরে ভোট পেয়েছে। চট্টগ্রামেও তাই। তাহলে আমার প্রশ্ন, তারা যে তিন লাখ ভোট পেল, যদি কারচুপিই হতো, আর কারচুপির কারণেই যদি বর্জন করবে তাহলে এই তিন লাখ ভোট পেল কী করে?

এ সময় প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের জালিয়াতির ‘হ্যাঁ, না’ ভোট, ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের অধীনে সংসদ সদস্য নির্বাচন, ১৯৯৬ সালে বিএনপির অধীনে ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন, ভোট ডাকাতির মাগুরা ও মিরপুরের উপনির্বাচনসহ বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি ও কারচুপির দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকতে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ারা যে কারচুপি করেছে, আমরা অন্তত সেই পরিস্থিতি থেকে অনেক উত্তরণ ঘটাতে পেরেছি। তিনি বলেন, আমরা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং সিস্টেম করতে চেয়েছিলাম, এতে কারচুপি করার সুযোগ থাকে না। কিন্তু খালেদা জিয়া চাননি। কারণ কারচুপি করা বা অভিযোগ তোলা তাঁর পুরনো অভ্যাস। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি একটা ব্যাপারে অবাক হয়ে যাই- যেভাবে বিএনপি নির্বিচারে মানুষকে পোড়াল, তিন মাস ধরে হরতাল-অবরোধ, মানুষের জীবন-জীবিকা বন্ধ, ১৫ লাখ ছাত্রছাত্রীর ভাগ্য নিয়ে খেলেছে, দোকানপাট বন্ধ, গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, খেটে খাওয়া মানুষ কষ্ট পেয়েছে- এরপরেও কিভাবে মানুষ এই বিএনপি করে? যারা এভাবে মানুষকে পুড়িয়ে জ্বালিয়ে সর্বনাশ করে, সেই বিএনপিকে মানুষ কিভাবে ভোট দেয়? তারা কিভাবে বিএনপি করে, খালেদা জিয়াকে ভোট দেয়? এদের কি ঘেন্নাপিত্তিও নেই?

নাম উল্লেখ না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেখলাম একজন সাবেক ভিসি বলছেন, এই রকম খারাপ নির্বাচন নাকি দেখেন নাই। উনাকে জিজ্ঞেস করি, উনি কি জিয়াউর রহমানের ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দেখেন নাই? উনি তার প্রেসিডেন্সিয়াল (রাষ্ট্রপতি) ভোট দেখেন নাই? ১৯৭৯ সালে তার সংসদ সদস্য নির্বাচন দেখেন নাই? ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন, মাগুরার নির্বাচন, ফালুর নির্বাচন দেখেন নাই? নাকি নিজেদের দোষ দেখেন না? আসলে আমাদের দেশের এক শ্রেণীর মানুষ একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু বিএনপি ও জাাময়াতের ধ্বংসযজ্ঞে বিপুল জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগের ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণভাবে নীরব থাকেন।

তিন সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এবার সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে, মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করেছে। আসলে বিএনপির উদ্দেশ্যে ছিল যে, দু-চারটা খুন-খারাবি করে তারপরে নির্বাচন বয়কট করবে। আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো যথেষ্ট সচেতন ছিল বলে তারা করতে পারেনি। ব্যর্থ হয়ে নিজেরাই নির্বাচন বয়কট করেছে। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের এ ধরনের নৃশংসতা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। কারণ আমরা সাধারণ মানুষের কল্যাণের রাজনীতি করি। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় ও ক্ষমতার বাইরে- উভয় অবস্থানেই জনগণের ক্ষতি করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সব সময় এ দেশের জনগণের পাশে ছিল এবং আগামীতেও থাকবে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের দুঃখ আমি বুঝি। বিএনপি নেত্রীর (খালেদা জিয়া) হরতাল-অবরোধের নামে নাশকতায় কারও বাবা, কারও স্বামী, কারও সন্তান, কারও মা হারিয়েছেন। তাদের আর ফিরিয়ে দিতে পারব না। তবে আমি সাধ্যমতো আপনাদের সহযোগিতা করলাম। আমি জানি এটা প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। তারপরেও আপনারা দোয়া করবেন যেন এভাবে আপনাদের সহযোগিতা করে যেতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের জন্য দায়ী অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে তাঁর সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বস্ত করে বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে ধ্বংসযজ্ঞে জড়িত ও পেট্রোলবোমা হামলাকারীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই অপরাধীদের তন্নতন্ন করে খুঁজে তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হবে। কেননা তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে ভবিষ্যতেও তারা একই ধরনের ঘটনা ঘটাবে।

প্রকাশিত : ৩০ এপ্রিল ২০১৫

৩০/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: