আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টাইগারদের জাগরণ নেপথ্যের কারিগররা

প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল ২০১৫
  • বিউটি পারভীন
  • ১৬ বছর ধরে যে দলটিকে পরাজয় কি জানিয়ে দেয়া যায়নি তাদের বিরুদ্ধে শতভাগ জয়। এ যেন বদলে যাওয়া ‘টিম বাংলাদেশ’

মানুষের জীবন আনন্দ এবং বেদনার সংমিশ্রণ। বেদনাটা না থাকলে আনন্দের উপলক্ষ খুব ভালভাবে উপভোগ করা যায় না। এক বছর আগের বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দিকে নজর দেয়ার পর বর্তমান বাংলাদেশ দলের দিকে তাকালেই সেটা আরও ভালভাবে উপলব্ধি করা যায়। গত বছরটা শুধু হতাশায় কেটেছে, বারবার ক্রিকেটারদের দিকে সমালোচনার আঙ্গুল উঠেছে। সেই দলটিই এখন পুরো জাতিকে আনন্দ উপহার দিয়েছেন। সেটা বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস। ১৬ বছর ধরে যে দলটিকে পরাজয় কি জানিয়ে দেয়া যায়নি তাদের বিরুদ্ধে শতভাগ জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা। বদলে গেছে ‘টিম বাংলাদেশ’। আর সেই দিন বদলের হাওয়া লেগেছে গত বছরের শেষদিকে জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ দিয়ে। এরপর বিশ্বকাপেও ভাল করেছে বাংলাদেশ দল। প্রত্যাশিত সাফল্য পেয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে। এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ওয়ানডে সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছে দল এবং একমাত্র টি২০ ম্যাচেও জয় তুলে নিয়েছে। সফরকারী পাকিস্তানকে মাথা তুলেও দাঁড়াতে দেয়নি। দলের এ বদলে যাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকায় ছিলেন কিছু মানুষ! নেপথ্যে থাকা সেই নায়কদের মধ্যে আছেন জাতীয় দলের নির্বাচক থেকে শুরু করে প্রধান কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহে থেকে শুরু করে কোচিং স্টাফরাও।

২০১২ এশিয়া কাপ থেকে বেশ উত্থান হয়েছিল বাংলাদেশ দলের। প্রথমবারের মতো কোন বড় টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলে টাইগাররা। মাত্র ২ রানে পাকিস্তানের কাছে হেরে রানার্সআপ হতে হয়েছিল। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ছিল ২০১৩ সাল জুড়েই। দেশের মাটিতে যে কোন প্রতিপক্ষের জন্য ভয়াবহ এক দলে পরিণত হয় বাংলাদেশ। তবে হঠাৎ করেই যেন আবার এক অমানিশা ভর করে বাংলাদেশ দলের ওপর। দেশের মাটিতে গত বছর জুড়েই ছিল শুধু ব্যর্থতা। বারবার জয়ের কাছাকাছি গিয়েও তা অধরাই থেকেছে বাংলাদেশের কাছে। এমনকি দেশের মাটিতে হওয়া এশিয়া কাপে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে আফগানিস্তানের মতো উঠতি ক্রিকেট শক্তির কাছেও। এর চেয়েও মর্মান্তিক ঘটনা ছিল টি২২০ বিশ্বকাপে হংকংয়ের মতো দলের কাছে পরাজয়। পুরো দেশকে শোকাভিভূত করে ফেলেছিল এই পরাজয়গুলো। কোনভাবেই কূলকিনারা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের মানসিক ভীতি কাটিয়ে আবার আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার জন্য মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাও দেয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে গত বছর মনোবিদ এসে সবক দিয়েছেন ক্রিকেটারদের। তবে ওই সময় ক্রিকেটাররাই বলেছিলেন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় উজ্জীবনী সবক দেয়া হয়েছে। যেগুলো বোধগম্য করে কাজে লাগানো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

অবশেষে বছরের শেষে যেন কাজে লাগল সেই মানসিক চিকিৎসাটা। এর আগেই ভারতের বিরুদ্ধে গত জুনে তিন ম্যাচের ঘরোয়া ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশ দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিলেন শ্রীলঙ্কার চান্দিকা হাতুরাসিংহে। তাঁর সহকারী হিসেবে বোলিং কোচের দায়িত্ব নিলেন জিম্বাবুইয়ের সাবেক পেসার হিথ স্ট্রিক। স্পিন বোলিংয়ের কোচ হিসেবে শ্রীলঙ্কান রুয়ান কালপাগে। ফিল্ডিংয়ের উন্নতির জন্য আসলেন রিচার্ড হ্যালসল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। ভারতের দ্বিতীয় সারির দলের কাছেও বাজেভাবে হারল বাংলাদেশ দল। এপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরেও শতভাগ পরাজয় নিয়ে দেশে ফিরল দল। জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে সিরিজের আগেই তাই আরেকবার পরিবর্তন আসল। এবার ওয়ানডের অধিনায়কত্ব থেকে মুশফিকুর রহীমকে অব্যাহতি দিয়ে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে দায়িত্ব দেয়া হলো। শুধুমাত্র টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে বহাল থাকলেন মুশফিক। বাজে সময়টা এখান থেকেই কাটিয়ে উঠল টাইগাররা। আবারও নিজেদের ফিরে পেল ওয়ানডে সিরিজে জিম্বাবুইয়েকে ৫-০ এবং টেস্ট সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করে। বেশ কয়েকজন নতুন মুখকে এ সিরিজে সুযোগ করে দিলেন জাতীয় তিন নির্বাচক ফারূক আহমেদ, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু এবং হাবিবুল বাশার সুমন। যারা সুযোগ পেলেন তাঁরাই কিছু নৈপুণ্য দেখালেন। পুরো সিরিজে জিম্বাবুইয়ে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়তে পারল না। হাতুরাসিংহের শিষ্যরা জেগে উঠলেন। জিম্বাবুইয়ে সিরিজ থেকেই বাংলাদেশ দল নতুন এক আঙ্গিকে খেলা শুরু করল। একাদশে তিন পেসার আর একজন স্পেশালিস্ট স্পিনার নিয়ে খেলা। দারুণ সফল এই স্ট্র্যাটেজিতে টাইগাররা।

বিশ্বকাপের আগে অনুশীলনেও নতুন মাত্রা যোগ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে দলকে গড়া হলো সেভাবেই। বাউন্সি এবং গতিময় উইকেটের জন্য ব্যাটসম্যানদের খেলানো হলো বাউন্সি বলে হুক-পুল। আর বলে যাতে যথেষ্ট বাউন্স এবং গতি থাকে সেজন্য উইকেটে বিছিয়ে দেয়া হলো পাথর। নতুন আঙ্গিকের অনুশীলনে ক্রিকেটাররাও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় পেলেন। বিশ্বকাপে সেই অনুশীলনের সফলতাটা টের পাওয়া গেল ভালভাবেই। পেসাররা ভাল করলেন, ব্যাটসম্যানরাও ব্যাট হাতে দেখালেন ঝলক। তিনজন পেসারকে নিয়ে একাদশ খেলানোর কথা যেই দলটি আগে চিন্তা করতে পারেনি সেই টাইগারদের একাদশে বিশ্বকাপের ৭ ম্যাচের মাত্র তিনটিতে একজন কোয়ালিটি স্পিনার খেললেন। অথচ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে সবসময়ই বাঁ-হাতি স্পিনারদের নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করেছেন। কিন্তু সেটা বিশ্বকাপে দেখা গেল না। পেসাররাই দাপট দেখালেন। দেশের মাটিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধেও সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি দল। পেসাররা দারুণ উন্নতি করেছেন সেই ছাপটা বিশ্বকাপে দেখা গিয়েছিল। স্ট্রিকের অধীনে যেন বাংলাদেশের পেসাররা দাপুটে হয়ে উঠলেন।

এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঘরোয়া সিরিজেও পেসাররা দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখালেন। আর পাকদের চিরাচরিত নিয়ন্ত্রণটা শেষ হয়ে গেল। ১৬ বছর পর তাদের বিরুদ্ধে শুধু জয়ই আসল না, বরং অভাবনীয় সফলতা দেখিয়ে পাকদের ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ। দল গড়ার ক্ষেত্রে নতুনদের সুযোগ দেয়ার জুয়াটা এখানেও খেলেছেন নির্বাচকরা। বিশ্বকাপেও যে ঝুঁকি নিয়েছিলেন সেখানে তাঁরা সফল হয়েছেন, এবার পাকিদের বিরুদ্ধে ঘরোয়া সিরিজেও তাঁরা সফল হলেন। আর চিরাচরিত নিয়মের মতো স্পিনাররা তো ভাল করেই যাচ্ছেন। বর্তমান কোচেরা দুর্দান্ত কাজ দেখিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। এ বিষয়ে সাবেক ক্রিকেটার ও জাতীয় নির্বাচক আতহার আলী খান বলেন, ‘আমি এত তাড়াতাড়ি কোচিং স্টাফদের বিশ্লেষণ করতে চাচ্ছি না।

কিন্তু তাঁরা আমাদের বাধ্য করছেন ধন্যবাদ জানানোর জন্য। কারণ হিথ স্ট্রিকের অধীনে বাংলাদেশের বোলিং কিন্তু ভাল শৃঙ্খলা দেখাচ্ছে। তবে তাঁদের জন্য পরীক্ষা হবে এই টেস্ট ম্যাচে। তাঁদের সবার পরীক্ষা হবে এর পরে ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা আর অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভাল করতে পারলেই কিন্তু আমরা বলতে পারব যে আমরা ভাল করছি এবং কোচিং স্টাফরা দারুন কাজ দেখিয়েছেন।’

প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল ২০১৫

২৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: