আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তরুণ ভোটার- চোখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার স্বপ্ন

প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল ২০১৫
তরুণ ভোটার- চোখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার স্বপ্ন

এমদাদুল হক তুহিন ॥ তরুণ ভোটারের উপস্থিতিতে প্রতিটি ভোট কেন্দ্র পরিণত হয় উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের ভোট কেন্দ্রেগুলোতে মূলত তরুণ ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে ভোট দিতে দেখা গেছে। যাদের অধিকাংশই এবারের প্রথম ভোটার। অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পেরে তারা উচ্ছ্বসিত। দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটবে বলেই তাদের প্রত্যাশা। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে তরুণ ভোটারদের আশাবাদ। তাই সকলের ছিল আলাদা আলাদা পছন্দ। সৎ, যোগ্য ও আদর্শবান প্রার্থীর পক্ষেই ছিল তাদের রায়। শিক্ষা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে বিবেচনা করে ভোট দিয়েছেন তারা। নির্বাচিত প্রার্থীদের কাছে তাদের দাবি, আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা। সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে ভোট প্রদান করে ব্যর্থ হবে না বলেই মনে করেন তারা।

সরেজমিনে অন্তত বিশটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেন্দ্রেই ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। ভোট কেন্দ্রের ভেতরে বাইরে তরুণদের সমান উপস্থিতি। চাওয়া ও প্রত্যাশার ব্যাপ্তি নেই। অনাবিল আশায় স্বপ্ন দেখছেন একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার। আর সে লক্ষ্য নিয়েই প্রতিটি কেন্দ্রে হাজির হয়েছি ঝাঁক ঝাঁক তরুণ। তারুণ্যের ছোঁয়ায় ভোট কেন্দ্রগুলো কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। ঢাকার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের কেন্দ্রগুলোতে এই হার ছিল লক্ষণীয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী রিদওয়ান নাহার। রোকেয়া হলে বসবাসকারী এই শিক্ষার্থী জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন উদয়ন হাই স্কুলে। ভোট প্রদান শেষে অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে জনকণ্ঠকে বলেন, ভোট দিতে পেরে সত্যিই অন্য রকম আনন্দ লাগছে। জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছি। ভোট দেয়া নিয়ে তেমন কোন আইডিয়া ছিল না। ঝামেলার আশঙ্কাও ছিল, কিন্তু এমন সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে পেরে সত্যিই আনন্দিত ও গর্বিত। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ওই ভোট কেন্দ্রে রিদওয়ানের সঙ্গে এসেছিলেন তার বান্ধবী সাদিয়া তাহসিন। ভোট দিতে পেরে রিদওয়ানের মতো তাহসিনও আনন্দিত। তিনি বলেন, নাগরিক দায়িত্ব পালন করতে ভোট দিতে এসেছি। জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করছে। আশা করি নির্বাচিত প্রার্থীরা তরুণদের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ করবেন।

‘প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছি। মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সেলফিও তুলেছি। অত্যন্ত সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট হচ্ছে। নাগরিক হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি, তবে তরুণ প্রজন্মের আশা পূরণ হবে কিনা জানি না। স্বাধীনতার ৪৪ বছরে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন হয়নি। নির্বাচিত প্রার্থীরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’ দুপুর ১২টায় ভোট প্রদান শেষে জনকণ্ঠের এই প্রতিবেদককে কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সি ভাষা সাহিত্যের ছাত্র মোঃ রবিউল হাসান সোহাগ। শুধু সোহাগ নয়, তার মত অনেকেই চান রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। উত্তর সিটির ভোটার সরকারী তিতুমীর কলেজের ছাত্রী মালিহা ভোট প্রদান শেষে বলেন, দেশে চলে আসা দীর্ঘ দিনের সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। পরিবর্তন আনতে তরুণ প্রজন্ম চেষ্টা করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চর্চার ফলে আমাদের মধ্যে একটি আলাদা চেতনার তৈরি হয়েছে। আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ নির্মাণ হোক, আর এ কারণেই লাইনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ভোট দিয়ে আনন্দিত।

তবে, সিটি নির্বাচনের ভোট গ্রহণকালে আকস্মিক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায় বিএনপি। আর এতে করে ক্ষিপ্ত হয়েছে সচেতন তরুণ প্রজন্ম। তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও। কেউ কেউ বলছেন হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই বিএনপি সরে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ বলছেন কারচুপি হবে ভেবেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি।

নাজিরাবাজার ইসলামিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান করেন দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী সাইদ খোকন। এ সময় ওই এলাকার তরুণেরা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান। নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী খোকন। ওই কেন্দ্রে ভোট দেয়া তরুণ ভোটার আরিফ জনকণ্ঠকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সপক্ষের লোককে ভোট দিতে পেরে আনন্দিত, তবে নির্বাচিত প্রার্থীদের অবশ্যই রাজনৈতিক চরিত্র পরিবর্তন করতে হবে। নিজের উন্নয়নে নয়, সমাজের উন্নয়নে নির্বাচিতরা কাজ করবেন বলে ওই ভোট দাতার আশাবাদ।

অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তরুণ ভোটার ওয়াসিম সাজ্জাদ। সিভিল এভিয়েশন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান শেষে জনকণ্ঠকে বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে নির্বাচনে ভোট প্রদান করে খুবই ভালো লাগছে। পরিবেশ ছিল বেশ উৎসব মুখর। সবার আনন্দঘন অংশগ্রহণ নির্বাচনকে উৎসবে পরিণত করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো বিএনপি ভোট বর্জন করল। তারা গাজীপুরের মতো জায়গাতেও লাখ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিল, বরিশালেও জিতল। কই তখন তো কারচুপির অভিযোগ আনেনি। ব্যাপারটা এমন- জিতলে সুষ্ঠু, হারলে কারচুপি। একই সুরে ওই কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা আরেক তরুণ ভোটার মোঃ রুপক জনকণ্ঠকে বলেন, তরুণ প্রজন্ম অগ্নি সন্ত্রাসের বিপক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা বিএনপি-জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আর এটা জেনেই বিএনপি নির্বাচন চলাকালীন সময়ে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। মূলত এর মাধ্যমে আরও একবার পরাজিত হলো এক সময়ের প্রধান বিরোধী দল।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণ প্রজন্মের একাংশ ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডেও বেশ সরব। ভোট প্রদান শেষে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতেও ভুল করেনি তারা। অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেয়া বৃদ্ধাঙ্গুলির ছবি আপলোড দিয়েছেন অনেকেই। অনিমেষ রহমান, আতিক বাঙ্গাল, পিকলু চৌধুরীসহ অনেককেই ভোট প্রদানের পর অন্যদেরও ভোট প্রদানের আহ্বান জানাতে দেখা যায়।

বেলা দুটায় পোস্ট অফিস হাই স্কুল নামের একটি কেন্দ্রে তরুণ ভোটার লিমন জনকণ্ঠকে বলেন, ঢাকার আমূল পরিবর্তন আসবে এই প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছি।

ঢাকার দুই সিটিতে তরুণ ভোটার ৪৩ লাখ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩০। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রগুলো তরুণ ভোটাদের পদচারণায় উৎসবের কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। তাদের চোখে মুুখে স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী তরুণেরা বিশ্বাস করে-বাংলাদেশ একদিন সর্বক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে পাল্লা দিবে। আর এক নতুন বাংলাদেশ গড়তে অগ্নি-সন্ত্রাস, মানুষ হত্যার রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে ভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছেন সময়ের তরুণ প্রজন্ম। বলা হচ্ছে, নির্বাচনী ফলাফলে তরুণ ভোটারদের ভূমিকাই মুখ্য হিসাবে কাজ করে।

প্রকাশিত : ২৯ এপ্রিল ২০১৫

২৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: