মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশন

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০১৫
  • ১৮৬২ - ২১৫ সালের মার্চ পর্যন্ত যাঁরা ছিলেন কর্ণধার

হাঁটি হাঁটি পা পা করে চট্টগ্রাম পৌরসভা থেকে আজকের চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। প্রায় ১৫৩ বছরের পুরনো ইতিহাস এ কর্পোরেশনের। ১৮৬২ সালে তৎকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠিত এ অঞ্চলের প্রাচীনতম পৌরসভা হয়ে তিলে তিলে আজ সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হয়েছে।

এ পৌরসভার জন্মের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ নগরীর নতুন রাস্তা, লেন, গলি, আলো, পানি নিষ্কাশনে নালা-নর্দমা ইত্যাদি প্রশস্তকরণ, শহরের শ্রীবৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য সুবিধা উন্নয়নে লক্ষণীয় চট্টগ্রাম পৌরসভার কার্যক্রম শুরু হয়। শাসনের সুবিধার্থে সর্বপ্রথম গঠিত হয়েছিল ৪টি ওয়ার্ড। এরপর ১৯১১ সালে আরেকটি বাড়িয়ে এ, বি. সি. ডি. ই নামে ৫ ওয়ার্ডে বিভক্ত করা হয় এ পৌরসভাকে। ১৮৬২ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম পৌরসভা।

সাগর, নদী, পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আধার বন্দরনগরী তখন থেকেই ছিল দেশী-বিদেশী বণিক ও পর্যটকদের আকর্ষণীয় একটি শহর। কালের বিবর্তনে এটি আজ তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত হতে যাচ্ছে।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে চিটাগং ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার অনুযায়ী ১৯৬৩ সালের ১ জুন তদানীন্তন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জে.ডি. ওয়ার্ডকে চেয়ারম্যান করে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল কমিটি গঠিত হয়। বিশ্বের অন্যতম একটি প্রাচীন বন্দর রয়েছে এই চট্টগ্রামে। যা চট্টগ্রাম বন্দর বা চিটাগং পোর্ট নামে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৮৬৪ সালের তৎকালীন ৮ম আইন বলে সে বছরের ১৫ জুলাই পুনর্গঠিত হয়েছিল চট্টগ্রাম পৌরসভা। সে সময়ে এ শহরের জনসংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ২৫ হাজার। ১৯৬৪ সালে নতুন পৌর আইন পাস হয়। ঐ সময়ে তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সি.এ স্যামুয়েলস যিনি এ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন, তিনি পদত্যাগ করলে ১৮ কমিশনারের সমন্বয়ে মিউনিসিপ্যাল বোর্ড গঠনের মাধ্যমে পৌরসভা পরিচালিত হয়ে আসছিল। এ কমিশনারদের মধ্যে ২ জন ছিলেন নির্বাচিত, ৫ জন মনোনীত, ১১ জন পদাধিকার বলে নিযুক্ত হতেন। চট্টগ্রাম পৌরসভার ঐ সময় সীমানা ছিল সাড়ে ৪ বর্গমাইল। তবে এর আগে বিধিবদ্ধ মিউনিসিপ্যাল বোর্ড গঠিত হওয়ার পূর্বে এ শহরের যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে ‘কমিটি ফর দ্যা স্যানিটারি ইনপ্রুভমেন্ট টাউন অব চিটাগং’ গঠিত হয়েছিল। এ কমিটির প্রথম সভা হয়েছিল ১৮৫৬ সালের ১৪ মে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন সি. চ্যাপম্যান, ডব্লিউ.বি.এইচ হ্যান্ডারসন, জি.সি ফ্লেচার, ঠাকুর বক্স তেওয়ারি ও হরচন্দ্র রায়। সভাপতিসহ মোট ৯ সদস্য নিয়ে এ কমিটি গঠিত হয়েছিল।

১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ জুলাই ৮ম আইন পাস হওয়ার সময় চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল গঠিত হয় বলে ইতিহাস-বেত্তাদের বক্তব্য রয়েছে। প্রতি মহল্লার ১০৫ বাসিন্দা নিয়ে মোট ১৯ মহল্লা ছিল এ পৌর এলাকার অধীনে।

ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট জে.ডি ওয়ার্ডকে চেয়ারম্যান করে চট্টগ্রাম পৌরসভার যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সে কমিটির কর্মকর্তারাই ছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৮৪০ সাল চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রতিষ্ঠা বর্ষ হিসেবেও ইতিহাস রয়েছে। ১৮৬৪ সালের ইতিহাসে দেখা যায়, মি. কার্ক উড চট্টগ্রাম পৌরসভা চেয়ারম্যান অর্থাৎ তিনিই ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। ১৮৬৪ সালকে চট্টগ্রাম পৌরসভা প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে ধরে নিয়ে ইতিহাস এগিয়ে চলেছে। ঐ বছর মিউনিসিপ্যালিটি এ্যাক্ট পাস হয় এবং সে আইন অনুসারে চট্টগ্রাম পৌরসভা পুনর্গঠন হয়। চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান খান বাহাদুর (কেবি) আমান আলী। আর প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হন খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার। আর সবচেয়ে দীর্ঘ সময় চট্টগ্রাম পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে ছিলেন শিক্ষানুরাগী নূর আহমেদ। যিনি নূর আহমদ চেয়ারম্যান নামে আজও এই শহরে সমধিক পরিচিত। তিনি ১৯২১ সালে এ শহরের বালকদের জন্য অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা ও ১৯২৮ সালে তা বাধ্যতামূলক করেন। পরে ১৯৩২ সালে বালিকাদের জন্য অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম পৌরসভা উন্নীত হয় পৌর কর্পোরেশনে। ১৯৯০ সালের ৩১ জুলাই গঠিত হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। প্রথম মনোনীত মেয়র হন জাতীয় পার্টির মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। এরপর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে মেয়র মনোনীত হন মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। ১৯৯৪ সালে এ কর্পোরেশনের আনুষ্ঠানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। এরপর ২০০০, ২০০৫ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে মহিউদ্দিন চৌধুরী হ্যাটট্টিক মেয়র পদে বিজয়ের গৌরব অর্জন করেন। ২০১০ সালে চতুর্থ দফার নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম মনজুর আলম। আজ ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৫ম দফার নির্বাচন। এ নির্বাচনে মেয়র পদে ১২ প্রার্থী ভোটযুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন। চট্টগ্রাম পৌরসভা থেকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস পরিক্রমায় দেখা যায়, ১৮৬৩ সালে জে.ডি ওয়ার্ড, ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত কার্ক উড, ১৮৬৮ থেকে ১৮৭৮ পর্যন্ত সি.এ স্যামুয়েলস, ১৮৭৮ থেকে ১৮৭৯ পর্যন্ত এইচটিএস কটন, ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত সি.এ স্যামুয়েলস, ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ক্যাপ্টেন এ আর এস এন্ডারসন্স, মি. গুড, কেবি আমান আলী, কেবি আবদুস সাত্তার, ১৯২১ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত নূর আহমদ চেয়ারম্যান, ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ পর্যন্ত রফিক উদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী, ১৯৫৮ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ১০ নবেম্বর পর্যন্ত হাসান জহুর সিএসপি, ১৯৫৮ সালের ১১ নবেম্বর থেকে ১৯৫৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এনআই খান, ১৯৫৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ নবেম্বর পর্যন্ত শামসুদ্দিন আহমেদ, একই বছরের ২৮ নবেম্বর থেকে ১৯৬০ সালের ১১ নবেম্বর পর্যন্ত আবুল খায়ের, ১৯৬০ সালের ১০ নবেম্বর থেকে ১৯৬৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত জহুরুল হাসান, ১৯৬৯ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এশরাত হোসেন, ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত শরাফত উল্লাহ ইপিসিএস, ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোঃ আমজাদ সিএসপি, ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি একদিনের জন্য মোহাম্মদ হোসেন ইপিসিএস, ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত এম জাহেদ, ’৭৩ সালের ৬ জুন পর্যন্ত এনায়েত হোসেন ইপিসিএস। এরপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ফজল করিম এ পৌরসভার কর্ণধার ছিলেন। ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এ কর্পোরেশনের প্রশাসক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মফিজুর রহমান চৌধুরী, ’৮২ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ৮৬ সালের ১৭ জুলাই পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক হিসেবে সেকান্দর হোসেন মিয়া, ’৮৬ সালের ১৭ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী, ’৮৬ সালের ১২ জুলাই থেকে ’৮৭ সালের ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সেকান্দর হোসেন মিয়া দায়িত্ব পালন করেন। এরপর সিটি কর্পোরেশন গঠিত হলে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী এমপি ৮৮ সালের ২৮ আগস্ট থেকে ৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রথম মনোনীত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ’৯০ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ৯১ সালের ১২ মে পর্যন্ত বিভাগীয় কমিশনার এমএ বারী ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ’৯১ সাল থেকে ’৯৩ সাল পর্যন্ত মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন মনোনীত মেয়র হিসেবে এ কর্পোরেশনের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় এ কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচন। আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে এ কর্পোরেশনে নাম লেখান। এরপর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত মহিউদ্দিন চৌধুরী টানা তিনবার এ কর্পোরেশনের মেয়র পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত মেয়র পদে থাকেন এম মনজুর আলম। আজ ২৮ এপ্রিল থেকে আগামী ৫ বছরের জন্য নগরবাসী নির্বাচিত করবেন নতুন মেয়র।

প্রকাশিত : ২৮ এপ্রিল ২০১৫

২৮/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: