মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকলে কী করবেন?

প্রকাশিত : ২৭ এপ্রিল ২০১৫
  • সাফিনা বিন্তে এনায়েত

ঘরের চারপাশে আবছা অন্ধকার, হালকা আলো। আমি আর সুমি (ছদ্মনাম) খুব ভয় পেয়েছি। একজন অচেনা পুরুষ আমাদের ধরতে চাচ্ছে। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি তার কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়ার। দু’জন মিলে দরজা খোলার চেষ্টা করছি। খুলছে না, লক করা। ঘরের মধ্যে খোঁজা শুরু করলাম কি পাওয়া যায়, যেটা দিয়ে লক ভাঙ্গা যাবে। একটা কাঁচি পেলাম। কাঁচি দিয়েই লক ভাঙ্গছি। আতঙ্কে হাত কাঁপছে। সুমি আর আমি ঘামছি। একটু একটু ভাঙ্গার পর একটা সময় লক ভেঙ্গে ফেললাম। সুমি জোরে টান দিয়ে দরজা খুলে বলল, ‘তাড়াতাড়ি দৌড়ে চল।’ আমরা এক নিঃশ্বাসে দৌড় দিলাম সিঁড়ি দিয়ে, পাঁচ তলা পার হলাম, চার তলা, এরপর তিন তলা ... এমন সময় আমার জামা সিঁড়ির গ্রিলের সঙ্গে টান লাগল, সঙ্গে সঙ্গে আমি ছিটকে পড়ে গেলাম। হাঁটুতে প্রচ- ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে উঠলাম। সুমি পেছনে তাকিয়ে আমাকে দেখে বিস্ফোরিত চোখে। দৌড়ে ছুটে এসে বলল, ‘একটু চেষ্টা কর, সময় নেই, চল তাড়াতাড়ি।’ আমি খোঁড়াতে খোঁড়াতে চললাম, ও আমার হাত ধরে টানতে থাকল। একটা সময় খেয়াল করলাম, আর মাত্র দুটো তলা পার হওয়া বাকি ছিল। সেটা অনেকক্ষণ আগেই পার হয়েছি, তাহলে সিঁড়ি কেন শেষ হচ্ছে না? এটা ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেললাম। মনে হলো পায়ের ওজন অনেক বেড়ে গেল, ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাচ্ছে। দু’চোখ বেয়ে নোনা জলের ধারা পড়ছে ... মনে হলো আটকে পড়েছি, আর কখনও বের হতে পারব না এখান থেকে।

চোখ খুলে অনন্যা (ছদ্মনাম) দেখল সে তার ঘরে আছে, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। বেডসুইচটা জ্বালালো। হাত, পা, বুক কাঁপছে। সে হাঁপাচ্ছে। ধীরে ধীরে বুঝল এতক্ষণ সে দুঃস্বপ্ন দেখেছে। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে পানি খেল। মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন অদ্ভুত স্বপ্ন সে কেন দেখল?

দুঃস্বপ্ন কি

দুঃস্বপ্ন এক ধরনের স্বপ্ন যা ঘুমের মধ্যে যখন আমাদের চোখ দ্রুত চলাচল জধঢ়রফ ঊুব গড়াবসবহঃ (জঊগ) করে তখন ঘটে থাকে। দুঃস্বপ্ন সাধারণত হয়ে থাকে রাতের শেষ দিকে, এর ফলে ঘুমন্ত ব্যক্তি জেগে ওঠে এবং স্বপ্নের ঘটনাটি মনে করার চেষ্টা করে। বেশিরভাগ দুঃস্বপ্ন হলো মানসিক চাপের প্রতি একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। কিছু চিকিৎসক (ঈষরপরধহ) মনে করেন দুঃস্বপ্ন ব্যক্তিকে তার জীবনের মানসিক আঘাতজনিত (ঞৎধঁসধঃরপ) ঘটনাটির মধ্যে দিয়ে যেতে ও সেটাকে নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করে। যদি ঘন ঘন দুঃস্বপ্ন হয় তবে তা থেকে মানসিকব্যাধি (উরংড়ৎফবৎ) হতে পারে এবং সামাজিক, কর্মক্ষেত্রে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ব্যক্তির কর্মক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। এই পর্যায়ে এটাকে বলা হয় দুঃস্বপ্ন ব্যাধি (ঘরমযঃসধৎব উরংড়ৎফবৎ) যার পূর্ব নাম ছিল (উৎবধস অহীরবঃু উরংড়ৎফবৎ) অথবা পুনরাবৃত্ত দুঃস্বপ্ন (জবঢ়বধঃবফ ঘরমযঃসধৎব)।

পুনরাবৃত্ত দুঃস্বপ্নকে নির্দিষ্টভাবে ব্যাখা করা যায় ঝবৎরবং ড়ভ ঘরমযঃসধৎবং-এর দ্বারা যার একটি দীর্ঘমেয়াদি ঘটনা আছে। দুঃস্বপ্ন সাধারণত শুরু হয় শৈশবে, ১০ বছর বয়সের পূর্বে। যতক্ষণ পর্যন্ত দুঃস্বপ্ন আমাদের পর্যাপ্তভাবে ঘুম, শারীরিক ও মানসিক বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, ততক্ষণ পর্যন্ত এটাকে স্বাভাবিকভাবে দেখা হয়। সাধারণত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে দুঃস্বপ্ন হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায় এবং প্রাপ্তবয়স পর্যন্ত দুঃস্বপ্ন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। প্রাপ্তবয়সের দুঃস্বপ্নের কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন চাপ উদ্রেককারী উদ্দীপক অথবা অন্য কোন মানসিক ব্যাধির ফলে হয়ে থাকে। দুঃস্বপ্ন হওয়ার সঙ্গে উদ্বেগ ও মানসিক আঘাতের (ঞৎধঁসধ) সংযোগ রয়েছে। দুঃস্বপ্ন একটি একমুখী রাস্তার মতো, যেখান দিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক দৈনন্দিন জীবনের চাপ, ভয় প্রভৃতির সঙ্গে মোকাবেলা করে থাকে।

দুঃস্বপ্নের কারণ

দুঃস্বপ্ন উৎপত্তির কারণ হলো দৈনন্দিন যেসব ঘটনার সম্মুখীন আমরা হয়ে থাকি যেমন- নতুন স্কুলে যাওয়া, কোথাও বেড়াতে যাওয়া অথবা বাবা-মায়ের অসুস্থতা প্রভৃতি। এক বা একাধিক দুঃস্বপ্ন জীবনের অল্প সময়ে ঘটার কারণ হতে পারে :

দ্ব জীবনের গুরুতর ঘটনা, যেমন- ভালবাসার মানুষকে হারানো, দুর্ঘটনা

অথবা কোন মানসিক আঘাতজনিত ঘটনা।

০ গৃহ অথবা কর্মক্ষেত্রের চাপ বৃদ্ধি।

০ ডাক্তার কোন নতুন ওষুধ দিলে।

০ হঠাৎ মাদকদ্রব্য সেবন বন্ধ করলে।

০ মাদকদ্রব্য বেশিমাত্রায় সেবন করলে।

০ বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক পূর্বেই খাবার খেলে।

০ রাস্তার পাশের বেঅইনী ঔষধ সেবন করলে।

০ জ্বরে আক্রান্ত হলে।

০ নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবন করা বন্ধ করলে যেমন- ঘুমের ঔষধ অথবা

ব্যথার ওষুধ।

পুনরাবৃত্ত দুঃস্বপ্ন এর লক্ষণ

দ্ব ঘুমের মধ্যে শ্বাস নিতে অসুবিধা হলে।

০ কোন গুরুতর মানসিক আঘাতজনিত ঘটনার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম

করলে।

০ মানসিক আঘাতের পরবর্তী উদ্বেগ ব্যাধি (চড়ংঃ ঃৎধঁসধঃরপ ংঃৎবংং

ফরংড়ৎফবৎ -চঞঝউ) হলে।

০ কোন বিপজ্জনক ক্ষতি অথবা মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত কিছু দেখার পর বা

এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেলে।

০ গুরুতর উদ্বেগ ব্যাধি অথবা বিষণœতায় আক্রান্ত হলে।

০ ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত কোন ব্যাধি হলে, যেমন- ঘধৎপড়ষবঢ়ংু অথবা

ঝষববঢ় ঞবৎৎড়ৎ উরংড়ৎফবৎ.

দুঃস্বপ্ন মোকাবেলায় করণীয়

০ নিয়মিত ব্যায়াম করুন। যদি সম্ভব হয় অবৎড়নরপ ব্যায়াম করুন। এটা

দ্রুত ঘুমাতে, গভীর ঘুম আনতে এবং ঘুম ভাঙার পর প্রশান্তি অনুভব

করতে সাহায্য করে।

০ ক্যাফেইন ও এ্যালকোহলের পরিমাণ নির্দিষ্ট রাখুন।

০ নিজস্ব আগ্রহ ও শখ এর প্রতি বেশি সময় দিন।

০ নিয়মিত কিছু শিথিলায়ন করুন। যেমন- গান শোনা, এঁরফবফ

ওসধমবৎু, যোগ ব্যায়াম, মেডিটেশন প্রভৃতি অনুশীলন করা যা চাপ

কমাতে সাহায্য করে।

০ একটানা কাজ না করে কাজের মাঝে বিরতি নিন।

০ প্রতি রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান এবং সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম

থেকে উঠুন, দীর্ঘ সময় ঘুমের ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন।

কখন মনোসামাজিক কাউন্সেলরের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?

০ আপনি যদি দুঃস্বপ্ন এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দুঃস্বপ্ন দেখতে

থাকেন।

০ দুঃস্বপ্নের কারণে আপনার রাতের ঘুম নষ্ট হলে।

০ দৈনন্দিন কাজ থেকে আপনি দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকলে।

দুঃস্বপ্নকে সামান্য বিষয় হিসেবে দেখা বা অবহেলা করা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা শিশুর নিজের একার পক্ষে এই দুঃস্বপ্ন মোকাবেলা করা সম্ভব নাও হতে পারে। উপরোক্ত উপায়সমূহ প্রয়োগ করার পরেও যদি দুঃস্বপ্ন হতে থাকে তাহলে অবশ্যই মনোসামাজিক কাউন্সেলরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। চেপে থাকা ভয় বা মানসিক আঘাতের বিষয়গুলো নিয়ে যখন একজন কাউন্সেলর থেরাপির মাধ্যমে সমাধান করবেন তখনই দুঃস্বপ্ন থেকে উত্তোরণ করা সম্ভব হবে।

লেখক : মনোসামাজিক কাউন্সেলর ও প্রভাষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

ছবি : আরিফ আহমেদ

মডেল :

রুনা খান

প্রকাশিত : ২৭ এপ্রিল ২০১৫

২৭/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: