মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাণিজ্য

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫
  • ডিএম তালেবুন নবী

স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় ফল আম নিজগুণে স্বমহিমায় ভাস্বর। দেশ ও বিদেশে এর জনপ্রিয়তা দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। এটি বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফলগুলোর অন্যতম। এক কথায়, বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে আম বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ধানের পরেই আমের স্থান। দেশের আম উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্রভূমি সংলগ্ন রাজশাহী, নওগাঁ অঞ্চল। কৃষি সম্প্রসারণের হিসাব মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচটি অঞ্চলে ২৪ হাজার ২৬০ হেক্টর ও এর বাইরেও আরও পাঁচ হাজার হেক্টর অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার হেক্টরে এখন আমের আবাদ হচ্ছে। আমের আবাদী অঞ্চল সবচেয়ে বেশি শিবগঞ্জ উপজেলায়। যে কোন অঞ্চলের বনায়ন এলাকাকেও হার মানাবে এই অঞ্চলের আম বাগান। বিশাল আমের এই অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে এক বছর আম এলে পরের বছর থাকে অনেকটাই আমশূন্য। কারণ একটাইÑ মুকুলের বদলে গাছের প্রতি ডগাতে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে। তাই সেই বছরকে আমের অফ ইয়ার বলা হয়ে থাকে। গত বছর আমের অফ ইয়ার ছিল। তাই এবার অন ইয়ার। মৌসুমের শুরুতেই এবার ডালপালা ভেঙ্গে মুকুল আসে। আম সাম্রাজ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষীরা তাই মহাখুশি। গত বছর আমের বছর না হবার পরেও আম থেকে এসেছিল প্রায় পৌনে তিন শত কোটি টাকা। এবার অন ইয়ার হওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলেই আমের উৎপাদন ছয় লাখ টনের বেশি থাকবে এবং তা থেকে প্রায় সাত শ’ কোটি টাকা আয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশের সবচেয়ে বড় আমবাজার কানসাট। এই বাজারে আমের আড়তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার শ’। এখানে মৌসুমে ৪ কিলোমিটার সড়কের ধারে খুচরা আমের দোকান সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাবে। এই বাজার পেরিয়ে সোনামসজিদ বন্দরে পৌঁছতে হয়। রাস্তার ধারের আম বাজারে এতটাই ভিড় ও জট থাকে যে একটি পণ্য বোঝাই ট্রাক ৪ কিলো অতিক্রম করতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। কানসাট বাজার থেকে আম ভর্তি ছেড়ে যাওয়া ট্রাকের সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে তিন শ’ ছাড়িয়ে যায়। সহশ্রাধিক অস্থায়ী চায়ের স্টল ও হোটেল বসে কানসাটে। এ ছাড়া আমের ঝুড়ি, ডালি, চট, সুতলি, পুরান খবরের কাগজ, আউড, মলাট, কার্টনের ব্যবসাও জমে ওঠে। গাছ থেকে আম পাড়া, ওজন করা, ঝুড়িতে আম ভরে চট দিয়ে সেলাই করা, পরিবহন ও পাহারাসহ নানামুখী শ্রমিকের সংখ্যা লক্ষাধিক ছড়িয়ে যাবে। এ ছাড়াও অর্ধ শিক্ষিত, শিক্ষিত বেকার যুবকরা আম মৌসুমে আড়তসহ বিভিন্ন স্থানে কাজ করে থাকে। এদের সংখ্যাও ৩০ হাজারের নিচে নয়। আমকে ঘিরে বছর জুড়ে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, হরমোন জাতীয় রাসায়নিক ও ভিটামিন ব্যবসা করে থাকে দুই শ’ দোকান। তারা ব্যবসা করে থাকে প্রায় দেয় শ’ কোটি টাকার।

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সীমিত পরিমাণ আম বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ২০০৪-০৫ সাল থেকে আম রফতানি হচ্ছে। সেবার মাত্র ৩১৪ মে. টন যার মূল্য ছিল ৬৭০ কোটি টাকা, ২০০৬-০৭ বেড়ে দায় ৩৬৪ মে. টন, পরবর্তী ২০১৪ পর্যন্ত যা রফতানি হয়েছে তার পরিমাণ খুব একটা বেশি নয়। সব মিলিয়ে গত নয় বছরে ৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। বর্তমানে বাংলাদেশের আমের চাহিদা রয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইটালি, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানে। ফ্রেশ আম ও আমজাত পণ্যাদির প্রধান বাজারগুলি হচ্ছে মালয়েশিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং, নেদারল্যান্ড। ক্যানজাত আমের প্রধান বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ড। বাংলাদেশ তেমনভাবে আম বিদেশে রফতানি না করতে পারলেও দেশের বেশ কিছু বড় বড় শিল্প কারখানা এখানকার আম প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে তৈরি পণ্য বিশ্বের ৯৪টি দেশে রফতানি করছে। বিশেষ করে ড্যানিশ, একমি, প্রাণ, বিডি ফুড, সেজান, আকিজ, স্টারশিপ, আফতাব জুস চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের বড় ক্রেতা। এর মধ্যে আকিজ গ্রুপ ও অপর একটি কোম্পানি ভোলাহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিসিক শিল্প নগরীতে পাল্প তৈরি করছে। ভোলাহাটে বিশাল কারখানা বসিয়ে পাল্প তৈরি করছে আকিজ গ্রুপ। এদের কাছ থেকে অন্যান্য কোম্পানি পাল্প নিয়ে বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যসামগ্রী তৈরিপূর্বক বাজারজাত করছে। আম থেকে উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে আচার, চাটনি, আমসত্ত্ব, জ্যাম, জেলি, জুস ক্যা-ি উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানে বাংলাদেশে কৃষির বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও আমসহ বিভিন্ন প্রকার ফলের সংগ্রহউত্তর ব্যবস্থাপনা পুরান দিনের। যার কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রচুর পরিমাণে আম সংগ্রহের পর অব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যার পরিমাণ শতকরা ৩০ থেকে ৪০ ভাগ। এই অভিমত কৃষি গবেষকদের। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ তিন শ’ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। বিশেষ করে আম সংগ্রহ, প্যাকিং, পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে সতর্কতা অবলম্বন করলে সংগ্রহোত্তর অপচয়রোধ করা সম্ভব ২০ থেকে ৩০ ভাগ পর্যন্ত। এছাড়াও আম পাড়ার সঠিক সময় নিরূপণ, আম পাড়ার পদ্ধতি, বাছাইকরণ, গ্রেডিং আম পরিষ্কারকরণ, প্যাকেটের আকার আকৃতি বিষয়ে কোন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থ নেই এই অঞ্চলে।

এসব সমস্যার সমাধান করা গেলে আম রফতানির সম্ভাবনা আরো উজ্জ্বল হবে। এ লক্ষ্যে সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও আমদানি-রফতানি ব্যুরোকে সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি শুল্কমুক্ত নীতিমালা গ্রহণপূর্বক বিদেশে বাংলাদেশী দুতাবাসগুলোর মাধ্যমে বাজার অনুসন্ধানে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করলে ভাল ফল পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও অধিক গবেষণা করে বিদেশীদের চাহিদামাফিক জাত উদ্ভাবন করা দরকার। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম গবেষণাগারটিকে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র করার মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পড়েছে আম ও জাত উদ্ভাবনে গবেষণার কাজটি। এজন্য নাম পরিবর্তন করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা দরকার।

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫

২৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: