কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টার

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশ। শস্যের পাশাপাশি ফলমূলেও প্রসিদ্ধ আমাদের দেশ। আর এ ফলমূলে আমাদের দেশকে আরও প্রসিদ্ধ করতে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টার। আমেরিকার টঝ-উঅজঝ-এর গবেষণায় এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বাংলাদেশের মধ্যে একমাত্র সর্ববৃহত ফল গবেষণা ও ফলের সংগ্রহশালা। নানা ফলের গবেষণা, জাত উদ্ভাবন, উদ্ভাবিত জাতকে প্রচার প্রসার-এক কথায় বলতে গেলে এ যেন এক ফলের জাদুঘর। কণ্টকাকীর্ণ অমসৃণ কাণ্ড, আগুন রাঙা চোখ এবং ড্রাগনের অবয়বের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গায়ে খাঁজ কাটা, ক্যাকটাস পরিবারের একটি ফল ড্রাগন! শুনেই মনে হচ্ছে আরব্য রূপকথার সেই দানবের কথা। না এবার সেটি দানব হিসেবে নয়, খ্যাত হবে ফল হিসেবে। গায়ের রং সবুজ থেকে হালকা লাল বর্ণের। শুধু ড্রাগন নয়, এমন হাজার প্রজাতির আকর্ষণীয় বিরল দেশী-বিদেশী ফলের গাছ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে খোলা আকাশের নিচে এক ফালি জমিন কামড়ে। এখান থেকে উদ্ভাবিত হয়েছে সুস্বাদু ফলের প্রায় ৭৫টি নতুন জাত। কোনটি মৌসুমী, কোনটি দোফলা, কোনটি ত্রিফলা আবার কোনটি বারমাসী। কোনটি দেশী, কোনটি বিদেশী আবার কোনটি উদ্ভাবিত। সময়ের সঙ্গে ফল ঝরে পড়ে আবার নতুন ফলে ভরে যায় গাছ। তাই এটি একেবারেই জীবন্ত। এছাড়া প্রতি বছর বিভিন্ন সময়ে দেশী-বিদেশী অনেক গবেষক ও দর্শনার্থী এখানে আসে এ ফল জাদুঘর দেখতে। শুধু দেখতেই নয় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চারা সংগ্রহ করতে আসে হাজার হাজার মানুষ। দেশের বাইরেও এর প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে দিন দিন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশবিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের সহযোগিতায় সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট এ্যান্ড কো-অপারেশনের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করা হয় এই ফল জাদুঘরের। তখন প্রকল্পের নাম ছিল ফ্রুট ট্রি স্টাডিজ। পরবর্তীকালে এ প্রকল্পের নাম দেয়া হয় ফল গাছ উন্নয়ন প্রকল্প। যার বর্তমান নাম ফলদ বৃক্ষের জার্মপ্লাজম সেন্টার। ফলের জিন সংরক্ষণ, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের কেন্দ্র, ফলের হিডেন নিউট্রেশন সংরক্ষণ, কৃষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে এ জার্মপ্লাজম সেন্টার ১৯৯১ সালে ২২ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৯১ সাল থেকে মেধাবী ও বুদ্ধিদীপ্ত গবেষকদের নিরলস গবেষণার ফলে সর্বমোট ৭৫টি বিভিন্ন প্রজাতির ফলের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। এ জাতগুলোর মধ্যে আমের ১৭টি, পেয়ারার ১০টি, কুলের ৩টি, লেবুর ৩টি, জাম্বুরার ৫টি, কামরাঙ্গা ৩টি, বাউকুলের ৩টি, লিচু ৩টি, জলপাই, আমলকী, ডুমুর, মালটা, অরবরই ও কাজুবাদামের ১টি করে জাত, জামরুলের ৩টি ও সফেদার ৩টি, বাউ রসুন ৩টি, বাউ গাজর ২টি, বাউ মিষ্টি কুমড়া ২টি জাত, বাউ মাল্টা-১, বাউ স্ট্রবেরি-১ এবং বাউ ডুমুর-১। এছাড়া বাউ ড্রাগন ফল-১ (সাদা), বাউ ড্রাগন ফল-২ (লাল), বাউ ড্রাগন ফল-৩, বাউ লঙ্গা-১ (বোগর), বাউ তেঁতুল-১ (মিষ্টি), বাউ তেঁতুল-২ (টক), বাউ কদবেল-১ (বনলতা), বাউ পেয়ারা-৭ (বীজশূন্য গোল), বাউ পেয়ারা-৮ (বীজশূন্য ডিম্বাকার) উল্লেখযোগ্য।

এ জাদুঘরে রয়েছে ১৮১ প্রজাতির প্রায় ১১৯৫টি দেশী-বিদেশী বিরল জাতের মাতৃগাছ। এছাড়া ১০ হাজার দেশী-বিদেশী বিরল গাছের মধ্যে রয়েছে ২২০ রকমের আম, ৫৭ রকমের পেয়ারা, ২৩ রকমের লিচু, ৪৭ রকমের লেবু, ৯৪ রকমের কাঁঠাল, ৬৭ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় অপ্রধান ফল, ৬৮ প্রজাতির ফলদ ঔষধি গাছ, ২৭ প্রজাতির ভেষজ গাছ ও ৪২টি দেশ থেকে সংগ্রহকৃত ৫২ প্রজাতির বিদেশী ফল। জ্যৈষ্ঠ মাসে বামন গাছগুলোতে ঝুলে থাকে অসংখ্য কাঁচা-পাকা আম যা দেখে জিহ্বায় পানি এসে যায়। এখানে দেখতে পাবেন আঁটিবিহীন আম, বাণিজ্যিকভাবে সফল সুমিষ্ট আম্রপালি, মল্লিকা, গোপাল ভোগ, সুবৃহৎ হাইব্রিড-১০, শ্রাবণী, সূর্যপুরী, মিশ্রিদানা, রাতুল, পাহুতান আমসহ বিভিন্ন জাতের ও নান রকমের জানা-অজানা ফল। আর এ সবই সেন্টারটিকে পরিণত করেছে ফলের স্বর্গরাজ্যে।

এ সেন্টারে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত পিএইচডি ও এমএস পর্যায়ের ছাত্রছাত্রী দ্বারা। বর্তমানে ২৮ জন এমএস এবং ৭ জন পিএইচডি ছাত্রছাত্রী গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া পরিচালক হিসেবে আছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএ রহিম ও গবেষণা সহযোগী হিসেবে কৃষিবিদ ড. মো. শামছুল আলম মিঠু। এ পর্যন্ত গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ এ সেন্টারটি জাতীয়ভাবে সরকারী ও বেসরকারী পুরস্কার পর্যায়ে পেয়েছে অনেক। যার মধ্যে ২০০৩ সালে বৃক্ষ রোপণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম পুরস্কার। বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সংবর্ধনার মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছে ২৫ বারেরও বেশি। এছাড়া জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ড. এমএ রহিম পেয়েছেন সুদূর আমেরিকা থেকে নরমেন আরনক বোরলক পুরস্কার। সম্প্রতি কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে লাভ করেছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪১৯।

প্রকল্পের অন্যতম গবেষণা সহযোগী কৃষিবিদ ড. মো. শামছুল আলম মিঠু জানান, বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান ও ক্ষুদ্র আয়তনের তীব্র জনবহুল দেশ। ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণে সম্প্রতি বাংলাদেশ দানাদার ফসল এবং শাক-সবজিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দিকে। এখন প্রয়োজন পুষ্টিসাধনযোগ্য ফসলের উৎপাদন ও উন্নয়ন। এগুলোর মধ্যে ফল অন্যতম। দেশের মানুষের দৈনন্দিন পুষ্টি ঘাটতি মেটানো এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে এ জার্মপ্লাজম সেন্টারটি।

নাজিব মুবিন

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫

২৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: