রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিধ্বস্ত নেপাল

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫
বিধ্বস্ত নেপাল
  • ৭.৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশ
  • মৃতের সংখ্যা ৯শ’ ছাড়িয়েছে, ধসে পড়েছে ধারাহারা টাওয়ারসহ বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ॥ ধ্বংসস্তূপে আটকা অনেকে
  • এভারেস্ট বেজক্যাম্প ঢাকা পড়েছে তুষারের নিচে, অনেক পর্বতারোহী নিখোঁজ, ১৬ শেরপা গাইড নিহত
  • ৭.৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল ভারত, পাকিস্তান বাংলাদেশ
  • মৃতের সংখ্যা ১৫শ’ ছাড়িয়েছে, ধসে পড়েছে ধারাহারা টাওয়ারসহ বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ॥ ধ্বংসস্তূপে আটকা অনেক
  • এভারেস্ট বেজক্যাম্প ঢাকা পড়েছে তুষারের নিচে, বহু পর্বতারোহী নিখোঁজ
  • জরুরী অবস্থা ঘোষণা
  • দশ লাখ ডলার সাহায্য ঘোষণা মার্কিন প্রশাসনের

জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ নেপালে শনিবারের ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১৫শ’ ছাড়িয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। নেপাল ছাড়াও এ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল ভারতের উত্তরাঞ্চল, চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। ভারতে ৪২, তিব্বতে ১২ আর বাংলাদেশে ৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। খবর এএফপি, বিবিসি, এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অনলাইন ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার।

নেপালে শনিবার স্থানীয় সময় বেলা এগারোটা ৫৬ মিনিটে আঘাত হানা ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্পে রাত দেড়টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৫শ’ নিহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মার্কিন জিওলজিক্যাল সার্ভে জানায়, রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৮০ কিমি দূরে পূর্বাঞ্চলীয় পর্যটন শহর পোখরার কাছাকাছি লামজুং ছিল ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল। ভূমিকম্পের পর কমপক্ষে ৪০ বার আফটার শক হয়েছে। ভূমিকম্পের প্রভাবে তুষারধসে অন্তত আট পর্বতারোহী নিহত ও আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে রাজধানী কাঠমান্ডুর অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা ধারাহারা টাওয়ার। সার্কভুক্ত সবদেশসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে কাঠমান্ডু। যুক্তরাষ্ট্র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। ভূমিকম্পে ভারতে ৪২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ৩০ জনই বিহারে। নেপাল সরকার উপদ্রুত এলাকায় জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছে। মুহূর্তের মধ্যে আহত মানুষে ভরে যায়

কাঠমান্ডুর নরভিক আন্তর্জাতিক হাসপাতালের কেবিন। পরে আহতদের হাসপাতালের গাড়ি পার্ক করার জায়গায় রেখে জরুরী চিকিৎসা দিতে হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন দুর্যোগ মোকাবেলায় তাৎক্ষণিকভাবে ১০ লাখ ডলার সহায়তা ঘোষণা করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন টুইটারে বলেছেন, নেপালের এই বিপদের সময় তাঁর দেশ সম্ভব সব রকম সহায়তা দেবে। ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা অক্সফাম উদ্ধারকাজে সহায়তা করবে বলে জানিয়েছে।

নেপালের তথ্যমন্ত্রী মিনেন্দ্র রিজাল বলেছেন, এই বিপর্যয় মোকাবেলায় তাঁর দেশের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। ‘আমাদের এখন আন্তর্জাতিক সব সম্প্রদায় থেকে সাহায্য প্রয়োজন। আমরা এখন যে দুর্যোগের মুখে পড়েছি, তা মোকাবেলায় যাদের বেশি জ্ঞান ও সরঞ্জাম রয়েছে, তাদের সাহায্য এখন আমাদের জন্য জরুরী। নেপালে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ১৯৩৪ সালের ভূমিকম্পে; তাতে সাড়ে ৮ হাজার মানুষ নিহত হয়। ভূমিকম্পে কাঠমান্ডুর বিখ্যাত ধারাহারা টাওয়ারসহ বহু ভবন ধ্বংস হয়। এ টাওয়ারটি ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত ছিল। এর মধ্যে বেশ কিছু লোক আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেবল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজই নয়, ধারাহারা টাওয়ারটি ছিল কাঠমান্ডু শহরের একটি পরিচিতিজ্ঞাপক স্থাপনা। ভূমিকম্পের পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয় কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এ ঘটনার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জরুরী মন্ত্রিসভার বৈঠক করেন। তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী সুশীল কৈরালার সঙ্গে কথা বলে তাঁর দেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী রাজীব প্রতাপ রুডিকে মোদি নেপালের ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেন। ভূমিকম্পে কাঠমান্ডুতে ভারতীয় দূতাবাসের কয়েকটি দেয়াল ধসে গেছে বলে দূতাবাসের মুখপাত্র অভয় কুমার জানিয়েছেন। ভূমিকম্প পরবর্তী আফটার শকগুলো আরও বেশ তীব্র ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। ভূমিকম্পের আঘাতে কাঠমান্ডুর রাজপথ ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।

হিমালয় অভিযানে যাওয়া অনেক পর্বতারোহীও নিখোঁজ হন। ভূমিকম্পের প্রভাবে অনেক স্থানে জমাট বাঁধা বরফ ধসে যায়। ভূমিকম্পে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগল পারসন ফাইন্ডার নামে একটি এ্যাপ লঞ্চ করেছে। কাঠমান্ডু থেকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সংবাদদাতা অভিমন্যু চক্রবর্তী টেলিফোনে জানান, তিনি নিজে অনেক ভবন ধসে পড়তে দেখেছেন। তিনি ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে দুই ব্যক্তিকে টেনে বের করতে পুলিশকে সহায়তা করেন। ঘটনার সময় তিনি নেপালের বিখ্যাত শম্ভুনাথ মন্দিরে অবস্থান করছিলেন। অন্যদিকে সেখান থেকে এএফপির সংবাদদাতা অনুপা শ্রেষ্ঠা বলেছেন, ‘শহরের রাস্তার ওপর ভবনগুলোর দেয়াল বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যতদূর চোখ যায় শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখা যায়। মনে হচ্ছে শহরে যা কিছু ছিল সব ধ্বংস হয়ে গেছে।’

ভূমিকম্পের ফলে এভারেস্টের পাদদেশে তুষারস্তূপ ধসে যায়। ফলে সেখানে আটকা পড়েছেন প্রায় ৩০ পর্বতারোহী। এদের মধ্যে আটজন নিহত হয়েছেন। গত বছরও সেখানে অনুরূপ দুর্ঘটনায় ১৬ নেপালী গাইড নিহত হয়েছিলেন। এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পটি তুষারের নিচে চাপা পড়েছে বলে নেপাল টুরিস্ট বোর্ড নিশ্চিত করেছে। এ্যালেক্স গ্যাভান নামে রুমানিয়ার একজন পর্বতারোহী টুইটারে লিখেছেন যে, ‘বিশাল তুষারস্তূপের নিচে বহু পর্বতারোহী চাপা পড়েছেন। বেজ ক্যাম্পের তাঁবু থেকে কোন রকমে দৌড়ে বেরিয়ে আমি নিজেকে বাঁচিয়েছি। এদিকে এভারেস্ট আরোহণ মৌসুম সামনে রেখে এভারেস্ট ইস্যুটি কভার করতে আসা এএফপির নেপাল বুরে‌্যা চীফ আম্মু কান্নামপিল্লিও এ বিপর্যয়ে আটকা পড়েছেন। জায়গাটি এতই দুর্গম যে, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার সেখানে পৌঁছতে পর্যন্ত সমস্যা হচ্ছে।

কাঠমান্ডুর একটি হোটেলে অবস্থানরত ডাচ্ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক। আমরা হোটেলে সুইমিং পুলের পাশে অবস্থান করছিলাম। আচমকা পুলের সব পানি লাফিয়ে ওঠে আমাদের ভিজিয়ে দিয়ে যায়। শিশুরা ভয়ে চিৎকার শুরু করে। শহরজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসস্তূপ চোখে পড়ছে। তবে এখানে এখনও কিছু বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকে আমি ভাগ্যবান মনে করছি।’

এদিকে ভারতের আবহাওয়া দফতরের ডিরেক্টর জেনারেল লক্ষণ সিং রাঠোর বলেছেন, তাঁর দেশেরও বিশাল এলাকাজুড়ে ভূমিকম্পের ধাক্কা টের পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, উত্তর ভারতজুড়ে ভূমিকম্পের প্রভাব অনুভূত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি কম্পিত হয় উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চল, বিহার, ঝাড়খ-, উড়িষ্যা পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম। তিনি জানান, ভারতে ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৬.৬ এবং সেটি প্রথম ভূমিকম্পের ২০ মিনিট পর টের পাওয়া যায়। ভূমিকম্প বিধ্বস্ত উত্তরাঞ্চলের অবস্থা দেখতে রবিবার রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি জেলা সফর করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। বিশেষ বিমানে মমতার সকালে শিলিগুড়ি পৌঁছার কথা রয়েছে। সেখান থেকে শিলিগুড়ি এবং দার্জিলিংয়ের ভূমিকম্প বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শন করবেন। তাঁর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, পুরো ঘটনার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। ভূমিকম্পে পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ৩ জন নিহত এবং আহত হয়েছেন ৩০। ভূমিকম্প নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোদি ফোন করেন মমতাকে। পাশাপাশি ভূমিকম্প নিয়ে টুইটারে মোদি বলেন, দেশে ও নেপালে উপদ্রুত লোকজনের কাছে পৌঁছার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভূমিকম্পের পর কলকাতাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র কম্পনে শহরের একাধিক বহুতলে ফাটল দেখা দেয়। আমহার্স্ট স্ট্রিটের দুটি বাড়ি হেলে পড়ে অপরের ওপর। ফলে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শহরের ১০ বাড়ি। ফাটল দেখা গেছে সল্টলেক সিটি সেন্টারের গায়ে। তীব্র কম্পনে ফাটল ধরেছে পার্কস্ট্রিট ফ্লাইওভারে। লম্বালম্বিভাবে ফেটে গেছে রাস্তার একটি অংশ।

ভূমিকম্পের প্রভাবে ভারতজুড়ে সাময়িকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে মোবাইল পরিষেবা। একাধিক নেটওয়ার্কের সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়। আতঙ্কে ঘরছাড়া মানুষ মোবাইল ব্যবহার করতে পারেননি। দেশের প্রায় সব জায়গাতেই একই সমস্যা দেখা দেয়। মানুষ আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। ভূমিকম্পের কারণে এ সমস্যা দেখা দেয় বলে জানা গেছে। অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইল পরিষেবা চালু করা সম্ভব হয়। তবে নেপালে শনিবার রাত পর্যন্ত মোবাইল পরিষেবা স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার জেরে পাতালপথে থমকে থাকে মেট্রো। ভূমিকম্পের সঙ্গে সঙ্গে পাতালপথে প্রত্যেক স্টেশনের রেলগুলোকে স্থির দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আতঙ্কে কার্যত পাতালপথেও হুড়োহুড়ি বেঁধে যায়। স্টেশন ছেড়ে অনেকেই বাইরে বেরিয়ে আসেন। আধঘণ্টা পর স্বাভাবিক হয় পরিস্থিতি। ভারতে মৃতের সংখ্যা ৩৪। ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া হিসাব মতে, বিহারে মৃত ২৩, উত্তরপ্রদেশে ৮ ও পশ্চিমবঙ্গে ৩। অন্যদিকে কাঠমান্ডুতে আটকা পড়েছেন ১২৫ ভারতীয় পর্যটক। সবার খবর এখনও পাওয়া যায়নি।

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল ২০১৫

২৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: