আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলা বছরের সম্ভার

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

বৈশাখ বাঙালীকে এক সূত্রে গেঁথে নেয়ার একটি শুভ দিন। বাঙালীকে আরও একবার তার বাঙালীসত্তার কাছে, মূল শিকড়ের কাছে পৌঁছে দেয়ার মহাসুখের দিন এ বৈশাখ। পৃথিবীর যেখানে যত বাঙালী আছে তারা সকলেই এ দিনটিকে মনে রাখে। কলকাতা এবং আসাম ও ত্রিপুরায় বাংলা নববর্ষ পালিত হয় মহাধুমধামের সঙ্গে। কলাকাতায় পূজা, গান, নাচসহ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখকে পালন করে নেয় ভারতীয় বাঙালীরা। ত্রিপুরাতে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে প্রভাতফেরিতে গান গেয়ে বরণ করে নেয়া হয় বাংলা নতুন বছরকে। এরপর চলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অসমের বাঙালীরাও নতুন বছরকে স্বাগত জানায় নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু বাংলা নতুন বছর সবচেয়ে আদরের হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। এ বাংলার জনগণের নাড়ির সঙ্গে বাংলা নববর্ষ তার অস্তিত্বের শিকড়ের নিগূঢ় বাঁধনে আবদ্ধ হয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। এই দিন বাংলাদেশে থাকে জাতীয় ছুটির দিন।

অনেকেই ভাবে কেমন করে এই বর্ষ উদযাপনের পরম্পরা পালন করে আসছে বাঙালী জাতি? বঙ্গাব্দ শুরুর প্রচলন সম্পর্কে দুটি অভিমত রয়েছে। প্রথম অভিমতটি হল বঙ্গদেশের অর্থাৎ সেই সময়ের গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক প্রথম বঙ্গাব্দ প্রচলন করেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্ক ছিলেন বঙ্গদেশ বা গৌড়ের শাসক। সেই সময় বিহার এবং উড়িষ্যাও ছিল গৌড় রাজ্য বা বঙ্গ দেশের রাজার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। ধারণা করা হয় যে, শাসন কাজের সুবিধা বিবেচনা করে রাজা শশাঙ্ক জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার, ১২ এপ্রিল এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১৪ এপ্রিলকে ধরে ৫৯৪ বঙ্গাব্দের শুভ সূচনা করা হয়েছিল।

দ্বিতীয় অভিমতটি বেশি প্রচলিত রয়েছে আমাদের দেশে। মুগল আমলে কৃষি ও ভূমি কর বা খাজনা ইত্যাদি আদায় হতো ইসলামী হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে। তাতে এই বাংলার কৃষকদের অসুবিধা দেখা দেয়। প্রচলিত আছে যে সেই সময় এ অঞ্চলের কৃষক সম্প্রদায় বাদশাহের নিকট প্রার্থনা জানায় যেহেতু তারা চান্দ্র মাস অনুযায়ী তাদের সবকিছু হিসাব করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে তাই চান্দ্র মাসের হিসাবে তাদের খাজনা ও কর নেয়া হোক। তাদের কথার যুক্তি মেনে সম্রাট আকবর সেই সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজীকে নির্দেশে দেন সৌর সন এবং আরবী হিজরী সনের ওপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করতে। ফসলি সাল নাম দিয়ে প্রথমে এই সাল শুরু হয় ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে। যদিও এ সময়ে এ সাল গণনা করা শুরু হলেও এ পদ্ধতি কার্যকর করা হয় ১৫৫৬ সালের ৫ নবেম্বর অর্থাৎ আকবরের সিংহাসনে আরোহনের সময় থেকে। পরবর্তিতে আকবর বাদশাহ কর্তৃক প্রবর্তিত এই বর্ষপঞ্জি বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। আকবরের সময় থেকেই মূলত পহেলা বৈশাখ পালিত হয়ে আসছে। এই দিন বাংলার ঘরে ঘরে নতুন বছর উপলক্ষে নানা রকম অনুষ্ঠান হতো। সারাবছরের কঠোর পরিশ্রম শেষে কৃষকরা এই একটি দিনে ঋণশোধের আনন্দে একটু ভাল-মন্দ রান্না করে নিজেদের মধ্যে সামান্য সুখ উদযাপন করত।

বাংলা নববর্ষের সঙ্গে হালখাতার এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। এ দিন ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাবগুলো মিটিয়ে নতুন করে হিসাবের খাতা খোলে। সাড়ম্বরে তাই সবাইকে মিষ্টিমুখ করান বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আজকাল অনেক বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জাঁকজমকের সঙ্গে হালখাতা অনুষ্ঠান করছে। সঙ্গে দিচ্ছে নানা রকমের উপহার। ফলে প্রসারিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সুনাম। এই দিন বাংলাদেশের টিভিতে প্রচারিত হয় নানা অনুষ্ঠান। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নানা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থে এই অনুষ্ঠানগুলো প্রচার করে থাকে।

বৈশাখের মেলা বাঙালীদের ঐতিহ্যের অঙ্গ। প্রাচীন বাংলায় মেলা ছিল বাঙালীর সারাবছরের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটার এক মিলন স্থল। তখনকার জীবনে এখনকার আধুনিক জীবনের মতো হাতের কাছেই সব কিছু পাওয়া যেত না। সারাবছর অপেক্ষার পরে গ্রামেগঞ্জের মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সঙ্গে সৌখিন জিনিসপত্রও মেলা থেকে কিনে নিত। এখনও এই আধুনিক যুগে মেলার আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমেনি। তাই বৈশাখে নগর ও গ্রামে মেলা হয়। তাতে কাঁচের চুড়ি থেকে স্টিল, প্লাস্টিক ও কাঠের বানানো নানারকম হাঁড়ি-পাতিল, বাসন-কোসনের সঙ্গে থাকে আলতা, সিঁদুর, ফিতা, টিপ, জামা-কাপড়, জুতো, ব্যাগ, রঙ্গীন পাখা, শোলার ফুল পাখি, পর্দা, রঙ্গীন আলপনা আঁকা হাঁড়ি-কুড়ি সবকিছু। মেলার অন্যতম আকর্ষণ যাত্রাপালা। নববর্ষ উপলক্ষে আগে বিভিন্ন যাত্রা পার্টি নতুন বই নামাত। রাধাকৃষ্ণের প্রেম থেকে লাইলি মজনুসহ বিভিন্ন সামাজিক ঘটনার অভিনয় হয় এসব যাত্রাপালায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজ শিল্পীরা মেলা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন মেলায় নানা গান, মারফতি, লালন, মুরশিদী, ভাটিয়ালী, কীর্তন শোনায়। আরও আছে সার্কাস। বাঘ, ভালুক, হাতির খেলার সঙ্গে থাকে পুতুল নাচ, পাতালে মোটর সাইকেল চালনাসহ দুর্ধর্ষ সব খেলা। থাকে নাগরদোলাসহ নানাপ্রকার খেলার ব্যবস্থা। নগরজীবনের যান্ত্রিকতাকে ভেঙ্গে নাগরিক শিশুরা প্রথম নাগরদোলায় চড়ার আনন্দ উপভোগ করে এই বৈশাখী মেলায়। পাশাপাশি থাকে লোকজ খাবার চিড়া, মুড়ি-মুড়কি, খই, সন্দেশ, দানাদার, বাতাসাসহ নানারকম পিঠার সম্ভার। থাকে ইলিশ-পান্তা, নানারকমের শুঁটকি, আলুভর্তা, বেগুন পোড়া ও ভাজা আর সবুজ লকলকে কাঁচামরিচ।

এই একই দিনে পালিত হয় আমাদের তিনটি পার্বত্য জেলায় বৈসাবি অনুষ্ঠান। চাকমাদের ঐতিহ্যে সুন্দর বিজু উৎসব, মারমা ছেলেমেয়েদের পছন্দের অপুর্ব জলখেলার সঙ্গে পালিত হয় সাংগ্রাই আর ত্রিপুরাদের অপূর্ব সুরলহরি ও নৃত্যে উদযাপিত হয় বৈসুক। এই তিন মিলেই পালন করা হয় বৈসাবি।

এক সময় শুভেচ্ছা কার্ড দখল করে ছিল পহেলা বৈশাখের নানা অনুভব আর অনুভূতিকে। যদিও এখন এ জায়গাটা বেশি দখল করে নিয়েছে মুঠোফোন আর ফেসবুক। তবুও এখনও রয়েছে বই বিনিময়, উপহারের আদান প্রদান।

১৯৬৫ সালে প্রথম ছায়ানটের উদ্যোগে পালিত হয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ। এই দিন কাকডাকা ভোরে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানে বাংলা মায়ের প্রথম দামাল মাস বৈশাখকে বরণ করে নেয়া হয়। আর্ট কলেজের বকুলতলায় হয় আরও একটি বৈশাখী অনুষ্ঠান। ধানম-ির রবিন্দ্র সরোবরে, লালমাটিয়ার সুরের ধারায়, গুলশান বনানী উত্তরাসহ ঢাকা শহর নাছে গানে আনন্দে, সেজে উঠে নতুন সাজে। আর থাকে অপেক্ষা, আর্ট কলেজ থেকে কখন বেরিয়ে আসবে সমগ্র বাঙালী জাতিকে মুহুর্মুহু আনন্দে ভাসাতে মঙ্গল শোভাযাত্রা। পহেলা বৈশাখ বাঙালীর একটি সর্বজনীন অনুষ্ঠান। সব ধর্মের সকল মানুষ এই দিন এক হয়ে এক সুরে মিশে বরণ করে নেয় বৈশাখকে। এতবড় মিলন মেলা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। নতুন জামাকাপড়ে সেজে বাংলার ছেলেমেয়েরা তাদের নতুন বছর শুরু করে নতুন উদ্যোমে। এবারের পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি নতুন প্রতিজ্ঞায়, নতুন প্রত্যয়ে আর নতুন পরিকল্পনার আনন্দে ভরে উঠুক। প্রতিটি বাঙালী ফিরে পাক নতুন জীবনের মঞ্জুষা বেঁচে থাকার মন্ত্রণা।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: