আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ক্ষমা কর একাত্তর

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

বোধসম্পন্ন মানুষ আসলে কী দেখে? আলোর অধিক আঁধার? সব মানুষই কি তা দেখে, তা তো নয়, মানুষের দৃষ্টিসীমার ভেতর প্রকৃতি এসে ধরা দেয়। একেকজনের কাছে এক একরূপে তা প্রতিভাত হয়। কতিপয় ক্ষেত্রে সাযুজ্য থেকে যায়। উদার আকাশ, বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে মানুষ তো আলোকেরই সন্ধানী সাধারণত। কিন্তু অন্ধকার এসে তাকে গ্রাস করে নিতে চায়। কখনও অন্ধকার তার ভাল লাগার ভেতর আকুপাকু করে। আঁধারের অধিক আলোপ্রিয় মানুষও চায় আলোকিত থাক চারপাশ। এই চাওয়া-পাওয়া সর্বাথে মিলে যায়, তা তো নয়। মানুষ তো অন্ধকার ছেড়ে আলোর দিকেই যেতে চায়। আর এই যাবার পথে-প্রান্তরে অন্ধকার তাকে স্পর্শ করে কিংবা দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ভাবিত অথবা অনুপ্রাণিত করে। অন্ধকার তো কেবল অন্ধকারই নয়। তার আছে নানারূপ। তারও রয়েছে নিজস্ব শাখা-প্রশাখা। নিজস্ব ঘরানা। আছে তাল, লয়, সুর, ছন্দ।

মানুষের জীবন আলো-অন্ধকারের দোলাচলে আর কতইটা বা স্থির হতে পারে। তবে বোধে লালন করার ক্ষেত্রটি মানুষকেই বেছে নিতে হয়। এই যে মানুষ, সেই মানুষ যাকে প্রাণিত, ভাবিত করে, সেই কবির বোধ তাড়িত অন্তর্জগতে যে মানুষটি নিয়ত আলো-অন্ধকারে দুলতে থাকে, তার কাছে কোন পাল্লাটা ভারি, তা নির্ভর করে কোনটার প্রতি তার অন্তর্জগতের টানে মানসে আধিপত্য বিস্তার করে। তাই ‘মানুষ আড়ালপ্রিয় বলেই অন্ধকার বেশি দেখে’। কবির এই যে মানুষ, সে কোন মানুষ? কবির ভেতরের মানুষটাই আড়াল বেছে নেয়। এই আড়াল জীবন থেকে, সময় থেকে সরে গিয়ে নৈর্ব্যক্তিকতায় বসবাসের আড়াল নয়। হয়ত মুদ্রার অপর পিঠে দাঁড়িয়ে বিপরীত পিঠকে দেখতে চাওয়ার এক ধরনের বাসনা পেরিয়ে যেতে হয়। আর তখন অন্ধকার আঁকড়ে ধরে। কিন্তু মানুষ তো সোচ্চারে বলতে চায়, ‘আরও আলো চাই গো।’ এই চাওয়াটা বাঞ্ছনীয়। কারণ মানুষের মধ্যে যে বিপরীতমুখিনতা ক্রিয়াশীল। তাতে আলোতে বসে অন্ধকার নয় কেবলি, অন্ধকারে বসেও অন্ধকারই দেখে। যা কিছু দৃশ্যমান অন্ধকারে, তাতে অন্ধত্ব বাড়ে। কিন্তু কবির মনে হয়, ‘শুধু অন্ধরাই দেখে সময়ের এপাশ-ওপাশ কখনো খোলে না কেউ দিন ও রাত্রির/গোপন দুয়ারে চুপিসারে।’

কবি সোহরাব পাশার ৫৫টি কবিতা সংবলিত সর্বশেষ গ্রন্থ ‘তোমার জন্য সকল আঁধার’ পাঠ দৃষ্টিকে এভাবেই প্রসারিত করে যে, অন্ধকারই যার গন্তব্য, অন্ধকারই যার জীবনাচরণ, অন্ধকারের ভেতর যার বাসবাস, অন্ধগহ্বর থেকে হাঁকডাক মারে, সেই অন্ধকার জীব, যা এই বাংলাদেশ এবং তার মূলভিত্তিকে উপড়ে ফেলতে চায়, সেই অন্ধকার এবং তার গভীরতার ভেতর নিপতিত হওয়ার মধ্যেই আলোর দীপ্তি ছড়াতে পারে। সময়, সভ্যতা এই ভূখ-ের মানুষের উত্থানপতন, হারাজেতা। প্রকৃতির শুদ্ধতা, নিষ্ঠুরতা, জীবনের আর্তিসহ আর অন্যান্য বিষয়াবলীÑ সবই অন্ধকারকে চিহ্নিত করে তার বিনাশ সাধনে আলোকিত মানুষের বোধে নাড়া দেন কবি সোহরাব পাশা, তাঁর গত একুশে বইমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থের কবিতায়। খ-খ- কবিতায় খ-খ- দৃশ্যপট হলেও প্রতিটির ভেতর একটি গল্প লুকিয়ে আছে। অবশ্য তা লুকিয়ে থাকারই কথা। কারণ কবি তার পাঠককে সেখানে নিয়ে যেতে চান, যেখানে পাঠকই আবিষ্কার করে গল্পটি। তার আক্ষেপ, ‘পাখিদের মতো তুমুল উড়াল কেন যে খোঁজে না মানুষ!’ মানুষের ডানা তো তার কল্পনায়। তাকে মনে মনে, ভাবনার ভেতর, কল্পনার অন্তরালে ডানা মেলে উড়তে হয়। তাই পাখির ওড়াওড়ি খোঁজায় নয়, নিধনের লক্ষ্য রেখে খোঁজেন পাখি। মানুষ বলেই এমন শিকারি হতে পারে। কবি সোহরাব পাশা সত্তর দশকের কবি। তাঁর শুরুর দিকের কবিতা পাঠের মাধ্যমে তাঁর কাব্যপথ পরিক্রম করার সৌভাগ্য হয়েছে বৈকি।

তাঁর কবিতার বাঁকবদল, শব্দচয়ন, মর্মার্থ উপলব্ধির ভেতর একটা অন্যরকম নির্যাস মেলে। স্বদেশ ভাবনা প্রগাঢ় বলেই সবকিছুই তাঁকে আলোড়িত করে। যখন স্পষ্ট হয়, সোনার বাংলা তার ভালোবাসার এক সোনার চাবি। যে চাবিটি কেড়ে নিতে এখনও ঔদ্ধত্য পরাজিত শক্তি। সে কথা বলেছেনও নিজস্ব স্বরে, ‘এক জীবনে জানে না কেউ কী কী তার বড় বেশি/প্রয়োজন ছিল, কার হাতে ছিল তার স্বপ্ন খেলা/ভালবাসার সোনার চাবি।/এই চাবিটি বাঙালী পেয়েছিল ১৯৭১ সালে সশস্ত্রযুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধে, স্বাধীনতাযুদ্ধে।

সোহরাব পাশা ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার অসমাপ্ত ডাইরি’ কবিতাতে স্পষ্ট করেছেন লড়াইটা এখানও শেষ হয়নি। নানা বেশে, রূপে পরাজিত শক্তিরা ফিরে ফিরে আসছে। যাদের বিনাশই হবে মুক্তির দিগন্তপথে যাত্রা। ‘একদিন অশিক্ষিত অন্ধকার আলো জ্বেলে ছিল/একাত্তরের আদিম চোখ/ বাসনায় ছিল বুনো মাতাল হাওয়ার উন্মাদনা/বিষাদের আগুন কয়লা ছিল বুকের ভেতর/সে আগুন মান্য করেনি জলের ধর্ম/’ কিন্তু বাংলাদেশ, বাঙালীর হৃৎপি-জুড়ে যে শহীদী রক্ত তা দুর্জয় প্রতিরোধে বলীয়ান করে বাঙালীকে। এখনও মুক্তিযোদ্ধার অনেক মা ‘আজও খুঁজে ফেরে কেউ সেই সব বিনিদ্র রাত্রির/বিষণœ স্মৃতির আয়নায়/ আজও কেউ চোখ বন্ধ দীর্ঘ জেগে থাকে/কারও হঠাৎ ফেরার অপেক্ষায়/’ ‘কখনো বা নিভে যায় সব অন্ধকার।’ আর তা জানান কবি সোহরাব পাশা। একটি সময়োপযোগী সাহসী, প্রেরণাদায়ক এবং জাতির বোধের সঙ্গে সমন্বিত করে কবিতা সৃজন সোহরাব পাশার এক নিজস্ব ক্ষমতা বহন করে। তাঁর কবিতা বোধসম্পন্ন মানুষকে যেমন ভাবিত করে, তেমনি প্রাণিতও। কাব্যভাষাও তার নিজস্ব।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: