আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারী নয় নীলকণ্ঠ

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • সাযযাদ কাদির

সেই কবে ছোটবেলায় পাড়ায় এক ভিড়ের কোলাহলের মধ্যে শুনেছিলাম কোন মহিলার ক্ষুব্ধ স্বর, ‘মাইয়ারা কি ভাইসা আইছে পানিতে?’ এতদিন পর আবারও শুনি তেমন এক তেজঃদৃপ্ত নারীকণ্ঠ ‘কন্যারা জলজ নয়’- মাইয়ারা পানিতে জন্মায় নাই- সহজে উপড়ে ফেলা যাবে না! নামটি এক কাব্যগ্রন্থের। এ গ্রন্থের কবি চৈতী আহমেদ। বছর দশেক আগে প্রথম দেখছিলাম তাঁকে। তখন ছিলেন এক টিভি চ্যানেলের কর্মকর্তা। জাতীয় কবিতা উৎসবের মঞ্চে দেখেছি অনুষ্ঠান ধারণে ব্যস্ত, পরে কবিদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে দেখেছি তিনি প্রযোজনায় যুক্ত। এত বছর পর এই জানুয়ারিতে সাহিত্যিক-সাংবাদিক দেলোয়ার হাসানের মাধ্যমে একেবারে নতুন করে পরিচয় চৈতী আহমেদের সঙ্গে। এখন তিনি এক প্রকাশনা সংস্থার অন্যতম সম্পাদক। কবিতা লেখেন। সামাজিক মাধ্যমগুলোতেও সক্রিয়। একগুচ্ছ কবিতা পড়লাম ওই সংস্থার পত্রিকায়। পড়ে বেশ আগ্রহী হলাম তাঁর লেখালেখি সম্পর্কে। একটু অন্যরকম লেখা। অবশ্য নারীরা অন্যরকমই লেখেন, তাঁদের লেখা যে আমি বেশি পড়ি তার কারণ কিন্তু ওই ভিন্নত্ব। তবে একটু দ্বিধান্বিত ছিলাম চৈতী আহমেদের লেখা পড়ার আগে। তাঁর নিকট কবি-বান্ধবী দু’-একজনের লেখা আমি পড়েছি, দুরন্বয় আর উল্লম্ফনের আধিক্যে কবিতা কিছু খুঁজে পাইনি সেগুলোতে, তাই আশঙ্কা ছিল সেই রকম কোন কাব্যদুষ্টিতে পীড়িত হওয়ার। কিন্তু না, চৈতী আহমেদ কন্যাটি ‘জলজ’ না হলেও বড় স্বচ্ছ। তাঁর চিন্তা, ভাব স্বচ্ছ, তাই তাঁর ভাষা স্বচ্ছ, তাঁর বিনির্মাণও ঋজু, স্পষ্ট। এর কারণ সম্ভবত তাঁর স্বচ্ছ কবিপ্রেরণা-

যারা কবি তারা কবিতা লিখুক

আমার মগজ-মৃত্তিকায় ইতিহাস

দেগেছে চুয়াল্লিশ বছরের ক্ষত

আমি আমার যন্ত্রণাকেই লিখি!

‘দেগেছে’ ক্রিয়াপদটি ভাল লাগেনি আমার, তবে প্রকৃত কবির অনুভব, স্বীকৃতি ও ঘোষণা বুঝে নিতে সমস্যা হয়নি কোনও। এমনটি লিখেছিলেন নজরুল-ও, ‘অমর কাব্য তোমরা লিখিও...’। তারপরও কথা থাকে। কারণ ওই যে বলেছেন ‘লিখি’, সে লেখাটা কোন মহৎ যন্ত্রণারই কবি-শিল্পকর্ম। এ যন্ত্রণার সঙ্গে নারী জীবনের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বাংলাদেশের সমান বয়সী এই কবি। বলেন, ভালবাসা মানে একা হয়ে যাওয়া... গোঁয়ারের মতো তবু ভালবেসে ফেলি। তিনি জানান, এই ভালবাসাবাসিতে আছে নারীর আত্মহননের গোপন ইচ্ছা। কিন্তু সে ইচ্ছার চেয়ে অনেক বেশি গভীর গভীরতর তাঁর প্রেমঋদ্ধ জীবন। তাই লিখেছেন কাছে এসে চলে যাওয়া এক স্বপ্নপাখির বিবরণ। প্রিয় ছিল তার মুক্ত স্বাধীনতা, তাই কোন বাঁধনে বাঁধেননি তাকে। হয়ে উঠেছিলেন তার অবাধ অভয়ারণ্য। তাই সে যখন চলে যায় তখন ভাবেন, ‘উড়তে উড়তে ওর ডানা ব্যথা করলে আরেকটি অভয়ারণ্য ওকে আশ্রয় দেবে তো!’ এভাবে তাঁর একান্ত অনুভব হয়ে ওঠে অনেক নিঃসঙ্গ নায়িকার বেদনামধুর বিরহসুখ।

ওই স্বপ্নপাখি, সম্পর্কবৈচিত্র্য, নৈঃসঙ্গ্য, হৃদয়দাহ, স্মৃতিযন্ত্রণা বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে চৈতী আহমেদের রচনায়। এসব কবিতায় আত্মজৈবনিক উচ্চারণ বেশ স্পষ্ট :

তোমার বিচ্ছেদে কাঁদিনি আমি

কেঁদেছে হৃদয় পুকুর

হু হু করে মন জলের আশায়

আমি তবু চৈতী দুপুর!

এমন গীতলতা অবশ্য তাঁর টুকরো কবিতাগুলোতেই বেশিÑ

এভাবে তাকাবে না

চোখ আকাশ হলে

কাজকর্মে মন বসে না

হৃদয় রাধা হয়ে যায়

বাঁধা পড়ে যায়

মন রাধা হয়ে যায়।

বিচ্ছেদ, বিরহ, স্মৃতি, স্বপ্ন যখন মুক্তি পায় কবিতায় তখন একালের নায়িকার মধ্যেও দেখতে পাই রাধা-ভাব। এভাব অবশ্য শাশ্বত, মধ্যযুগ থেকে বয়ে আসা বিলাপ মাথুর নয়। মনে পড়ে বিদ্যাপতির রাধার আকুতিÑ ‘তুমি আমার মাথার ফুল, চোখের কাজল, গলার মুক্তাহার, তাহা হইতেও বেশি, তুমি আমার নিকট পাখির পাখাÑ তোমাকে ছাড়া আমি একেবারে অচল হইÑ মাছের পক্ষে জল যাহা, তুমি আমার কাছে তাহাই, জল হইতে তুলিলে সে তখনই মরিয়া যায়Ñ আমি তোমাকে সব দিয়েছি, কিন্তু... আমার সর্বস্ব দিয়েও আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। তুমি আমার নিকট দুর্জ্ঞেয়Ñ বলো, তুমি কে এবং কেমন!’ (দীনেশচন্দ্র সেন, খগেন্দ্রনাথ মিত্র: ভূমিকা, বৈষ্ণব পদাবলী) চৈতী আহমেদের আকুতিতেও যেন সেই পাখি, পিপাসা ও প্রেম-অনুভব :

‘কন্যারা জলজ নয়, উষর চৌচির ফসলের মাঠ...

তৃষ্ণায় ফেটে গেলে বুক

চেয়ে খায় জল।...

বহুদিন আগে অ্যালবাট্রস এসে

তার হৃৎপিণ্ড খেয়ে গেছে

ফসলের মাঠ তবু তার জল ভালবাসে।’

‘কন্যারা জলজ নয়’ গ্রন্থে আরও অনেক রচনা আছে যা সাময়িক ঘটনা ও পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া মাত্র, সেগুলো এই আলোচনায় উহ্য রাখছি। আমি মনে করি, কবিকে সবসময়ই যেতে হয় তাৎক্ষণিকতার আবেগ ছাড়িয়ে, খুঁজে দেখতে হয় বস্তুর ভেতরকার অধিবস্তুকে, নিজস্ব পর্যবেক্ষণের আলোকে ব্যক্তিকতা ছাড়িয়ে দিতে হয় সর্বজনিক কোন কবি-উপলব্ধি। সে সত্য তিনি পেতে পারেন কোন পোস্টার-স্লোগানের ভাষা থেকেও, কিন্তু ওই ভাষা কখনওই কবিতা নয়।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: