কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নন্দনের খেয়ালি সাধক

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

বিশ্বের সবচেয়ে নান্দনিক ও কঠিন দুটি শিল্পকর্ম কবিতা এবং চিত্রশিল্প সম্পর্কে একটি কথা প্রচলিত আছে- এরা সহদোরা। হাত ধরাধরি করে সমান্তরালভাবে চলে অথচ মিলিত হয় না একবিন্দুতে। এখনও পর্যন্ত শিল্পের এ দুটি মাধ্যম সগৌরবে মাথা উঁচু করে আছে, বিশেষত নিজস্ব মার্গের কারণে। মহৎ শিল্পের স্রষ্টারা কেমন হন সে কৌতূহল গুণমুগ্ধ ভোক্তা বা ভক্তের জানার আগ্রহ অনেকটাই সংশ্লিষ্ট সহজাত। যদি এই উঁচু মার্গের দুই শিল্পের স্রষ্টা কোন এক ব্যক্তিত্বের মাঝেই নিহিত থাকে তবে তাঁর আসন অন্য সবার চেয়ে বেশি শ্রদ্ধায় হয় সিক্ত; তা বোধকরি বলার অপেক্ষা রাখে না। আরও একধাপ এগিয়ে তিনি যদি হন সামাজিক দায়বদ্ধ ও রাজনৈতিক সচেতন মানুষ এবং সৃষ্টিকর্মে ঘটে তার প্রতিফলন তবে তিনি হবেন অন্যান্য সৃষ্টিশীল মানুষের চেয়ে অগ্রগণ্য ও অধিকতর নমস্য। এমনই একজন সৃষ্টিশীল মানুষ মুর্তজা বশীর।

মুর্তজা বশীর আমাদের চিত্রশিল্পের এক অগ্রগণ্য ও অনিবার্য নাম। সাহিত্যেও রয়েছে তাঁর অবদান। কবিতা, গল্প, আত্মজৈবনিক উপন্যাস ও শিল্প-সংলগ্ন প্রবন্ধের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্য। ভাবতে অবাক লাগে এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারীর রযেছে ইতিহাসকে উপজীব্য করে এক গবেষণা গ্রন্থ। যা সচরাচর কোনো চিত্রশিল্পীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। চলচ্চিত্রেও রয়েছে তাঁর উজ্জ্বল অবদান। এতসব গুণ আর যোগ্যতাকে ছাপিয়ে তিনি আমাদের সামনে স্থায়ী হয়েছেন চিত্রশিল্পী হিসেবে।

তাঁর শিল্পীখ্যাতি ভারতীয় উপমহাদেশ শুধু নয়, আন্তর্জাতিক পরিম-লে ছড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। সেটা শিক্ষা জীবনকালেই ঘটে। এমনটা বিরল। তাঁর সৃষ্টিকর্মের বৈশিষ্ট্য ও ধারা সম্পর্কে শিল্পবোদ্ধা, সমালোচক ও শিল্পীবন্ধুরা যে ধারণা পোষণ করেন সেটার নির্যাস অনেকটা এরকমÑ তিনি নিরীক্ষাবাদী। নিরন্তর ভাঙচুর করেন। ধ্বংস, ভাঙা-গড়ার মাধ্যমে ন্যাচারালিজম থেকে কিউবিজম হয়ে এক্সপ্রেশনিজমে পৌঁছেছেন। বিমূর্ততার মাঝে মূর্ততা খোঁজার প্রয়াস পান তিনি। কবি, সাহিত্যিক ও বিশিষ্ট চিত্র সমালোচক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তাঁর সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন এভাবেÑ বাংলাদেশে এখন যারা কাজ করছেন তাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুর্তজা বশীর। তিনি কাজ করতে করতে দেশ ও পৃথিবীটা পরিভ্রমণ করে আসেন। এই পরিভ্রমণার যে ক্ষমতা তা অনন্য। তিনি কী আঁকছেন সেটার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কীভাবে আঁকছেন। এই যে কীভাবে আঁকার পদ্ধতি, কাজের পর কাজ করে আবিষ্কার করেছেন, তাঁর সঙ্গে আমরাও আবিষ্কৃত হচ্ছি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই মানুষটি কিন্তু চিত্রশিল্পী হতে চাননি। হতে চেয়েছিলেন রাজনীতিক বা অন্য কিছু। তবে বাল্যকাল থেকে ছবির প্রতি ছিল অদম্য আকর্ষণ। একটু জেনে নেয়া যাক তাঁর শিল্পী ও সামাজিক, রাজনৈতিক মানস কীভাবে গড়ে উঠেছিল সে সবের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

জননী ও কল্পনাবিলাস

চিত্রশিল্পের জন্য কল্পচিত্র, কল্পনা এক অনিবার্য অনুষঙ্গের নাম। দৃশ্যকল্প এমন এক বিষয় যার বিস্তৃতি তুলির মাধ্যমে ক্যানভাসে যার যত বেশি প্রস্ফুটিত হবে, স্পষ্ট হবে তার শক্তিমত্তা। এটা শিল্পীমাত্রই স্বীকার করেন। মুর্তজা বশীরের চিত্রকল্পের মানস প্রেক্ষাপট শৈশবেই বিস্তার ঘটেছিল স্নেহময়ী জননী মরগুবা খাতুনের মাধ্যমে। আকাশে যখন মেঘের ভেলা ভেসে যেত মা বলতেন, ওই দেখ আকাশে গরুর পাল, মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। শিশু মুর্তজা তখন কল্পনায় খুঁজতেন গরু বা মানুষের শরীর কিংবা অবয়ব। এ যেন বিমূর্তের মাঝে মূর্ত খোঁজার চেষ্টা, আর কল্পনা শক্তির প্রসার ঘটানো।

চিত্রের প্রতি কৈশোরেই ছিল দুর্বলতা। পিতা জ্ঞান তাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্্র ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ছিল বসুমতি, প্রবাসী, বিচিত্রা, মডার্ন রিভিউ, ভারতবর্ষ, বঙ্গশ্রী প্রভৃতি সাময়িকী। এতে প্রকাশিত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, সুধীর খাস্তগীর, সারদা ও বরদাচরণ প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীর চিত্রকর্মের সঙ্গে পরিচিত হন। এ ছাড়া বাসায় আসা নানা রকমের পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবি কেটে কেটে সংগ্রহে রাখতেন। পিতার কাছেই ছিল জগদ্বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামের ছবি সংবলিত দুটি ভলিউম। ওই বয়সেই পরিচিত হন রাফায়েল, রেমব্রাঁ, ভেরমিয়র, ইনবিল, ইনগ্রে, ভেলাক্রুয়েজ, ভ্যান ডাইক, দেলাক্রোয়া, এল গ্রেকো, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি প্রমুখের নাম ও চিত্রকর্মের সঙ্গে। পরবর্তীকালে শিল্পস্রষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠার নেপথ্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করে ওই অভিজ্ঞতা।

শিল্পকলায় প্রবেশে সহায়ক হাত

গত শতাব্দীর মাঝামাঝি রাজনৈতিক বাস্তবতায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রকাশ্যে কাজ করার অনুমতি ছিল না। গোপনেই পার্টির কাজ করতে হতো। মুর্তজা বশীর তখন পার্টির সহযোগী সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের সক্রিয় কর্মী। পার্টির নির্দেশেই নিয়ন্ত্রিত হতো জীবনাচরণ। পার্টির সিদ্ধান্তে ভর্তি হতে হলো আর্ট স্কুলে। উদ্দেশ্য পার্টির সাংগঠনিক কাজের প্রসার। ছবি আঁকতে তাঁর মোটেও ভালো লাগত না। আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপাল তখন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। প্রথম বর্ষের পরীক্ষার ফল হলো ভয়ানক রকমের খারাপ। মনে কষ্ট পেলেন বশীর। এক সময় জয়নুল আবেদিনকে বলেই ফেললেন, ‘আমার দ্বারা ছবি আঁকা হবে না। আমি আর পড়ব না।’ জয়নুল আবেদিন ধৈর্যশীল ও প্রজ্ঞাবান মানুষ। ক্লাসের মেধাবী ছাত্র আমিনুল ইসলামকে ডেকে তার সঙ্গে জোট বেঁধে দিলেন। আমিনুলও ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কর্মী। কিন্তু পরস্পর গোপন রেখেছিলেন এ তথ্য। আমিনুলের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য মনে মনে উদগ্রীব ছিলেন বশীর। অনেকটা মেঘ না চাইতে জলের মতো হলো। বর্তে গেলেন আমিনুলের সঙ্গে। আমিনুল শিল্পের হাত ধরালেন বশীরকে। মুর্তজা বশীর আমিনুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এভাবেÑ ‘আমিনুল ইসলাম আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেল শিল্পকলার জগতে।’

পিতার নিমরাজি ও আনুকূল্য

আর্ট স্কুলে ভর্তির আগের ঘটনা। পিতা চাননি তাঁর সন্তান আর্টিস্ট হোক। তিনি প্যারিসে দেখা শিল্পীদের কষ্টকর জীবনের কথা সন্তানকে জানালেন। পিতা হয়ে পুত্রের নিশ্চিত কষ্টকর জীবন মেনে নিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিলেন। মুর্তজা বশীর তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। ঢাকায় থাকার কথা পিতাকে জানালেন। পিতা চাইলেন আলীগড় বা কলকাতার শান্তিনিকেতনে শিক্ষাগ্রহণ করুক পুত্র। পুত্রও জানিয়ে দিলেন তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা। পিতা কিছুটা আহত হলেন। তিন দিন কথা বললেন না পুত্রের সঙ্গে। শেষে পুত্রের ইচ্ছার প্রতি ভালোবাসা দেখাতে আর্ট স্কুলে ভর্তির অর্থের জোগান দিলেন। আর উপহার হিসেবে দিলেন মূল্যবান দুটি ছবির এ্যালবাম। যা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্কে প্যারিসে ভারতীয় ছাত্র এ্যাসোসিয়েশন দিয়েছিল। সে এ্যালবামে ছিল অনেক বিবস্ত্র নারীর পেইন্টিং। মুর্তজা বশীর তা পেয়ে অবাক হলেন। পিতা মৃদু হাসলেন। এই হাসি আর এ্যালবাম শিল্পীজীবন শুরুর সম্মতি, আশীর্বাদ ও পাথেয়।

শিল্পের নান্দনিক পথে বন্ধুর যাত্রা

শিল্প নান্দনিক হলেও এর পথ মুর্তজা বশীরের জন্য কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না মোটেও। ওই বয়সেই বুঝেছিলেন পিতার মতো মহীরুহের ছায়াতলে থেকে নিজের বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। পিতার পরিচয় নিয়ে তাঁর গর্ব ছিল। তবে তাঁর পরিচয়ে পরিচিত হতে চাইলেন না। স্বাতন্ত্র্যের প্রত্যাশায় বাড়ালেন পা বন্ধুর পথে। অনেকটা ‘একলা চলো’ রীতিতে। শিল্পচিন্তা তখন আষ্টেপৃষ্ঠে জেঁকে ধরেছে মনোজগত। ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত সে সময়ের গবর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট আর্টসে লেখাপড়া শেষ করে ভাবলেন নিজেকে কিছু করতে হবে। ’৫৪ সালে পিতা পাঠালেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসুতোষ মিউজিয়ামে টিচার্স ট্রেনিং সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করার জন্য। ১৯৫৬ সালে পিতাই আবার পাঠালেন ইতালির ফ্লোরেন্সে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে। ১৯৫৮ সালের শেষদিকে ঢাকায় ফিরে এসে চেষ্টা করেন কর্মসংস্থানের। ঢাকায় ব্যর্থ হয়ে চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। লাহোরে ওঠেন সাঈদ আহমেদের কাছে। সেখানে শুরু করেন আবার ছবি আঁকা। স্থায়ী আয়ের উৎস ধরা দেয় না। ১৯৫৮ সালে লন্ডনে যান স্থায়ী বসবাসের আশায়। রেস্তরাঁ ও পানশালায় থালাবাসন ধোয়া, রান্নাঘরের মালসামানা আনা-নেওয়ার কাজ নেন জীবিকার তাগিদে। আবার বিবিসি’র বাংলা অনুষ্ঠান ‘আঞ্জুমান’-এ খবর ও অন্যান্য বিষয়ে পাঠের কাজ করেন। বেকার অবস্থায়ই ১৯৬২ সালে আবদ্ধ হন বিবাহ বন্ধনে। প্যালেটে যোগ হলো দুটি রং সোনালি ও রুপালি। বোঝাই যায় এটা বিয়ের প্রভাব। তবে তাঁর মধ্যে শুরু হয় অস্থিরতা। স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। কীভাবে চলবে সংসার! তাই বলে স্রষ্টার সৃষ্টি তো থেমে থাকে না। একের পর এক নিজেকে ভেঙে-গড়ে নিরীক্ষা করে আঁকতে থাকেন উজ্জ্বল সব ছবি। এরপর প্যারিসে যান। থাকেন প্রায় দু’বছর। সেখান থেকে ১৯৭৩ সালে দেশে ফিরে এসে যোগদেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

লাল রঙের পতাকাতলে

১৯৪৭ সালের কথা। প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা ভবানী সেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। ছবি আঁকার কথা জানালেন নেতাকে। বশীরের ছিল আবার বিখ্যাত মানুষের অটোগ্রাফ সংগ্রহের শখ। অটোগ্রাফ খাতা ভবানী সেনের দিকে এগিয়ে দিতেই তিনি লিখলেন ‘আর্টিস্টের কাজ হলো শোষিত জনগণের ভাব ও দুঃখ-দুর্দশাকে চিত্রের ভেতর দিয়ে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা যাতে সমাজে সে আর্ট নবজীবন সৃষ্টি করতে পারে।’ ভবানী প্রসাদের এমন উদ্দীপনামূলক আকাক্সক্ষা বশীরকে পেয়ে বসল। উৎসাহ-উদ্দীপনার আগুনে যেন ঘি পড়ল। সেই যে দর্শনের সঙ্গে নতুন প্রেরণা যোগ হলো তা শিল্পী ও ব্যক্তি জীবনে আজও সমানভাবে প্রবাহিত।

নবম শ্রেণীতে পড়াকালীনই যুক্ত হন ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে। ১৯৫০ সালে হাজং বিদ্রোহে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পড়ালেখা ও পার্টির নির্দেশে কৌশলগত কারণে আর্ট স্কুলেই থেকে যান সাংগঠনিক বিস্তারের দায়িত্ব নিয়ে। বশীরের রাজনৈতিক দর্শন এতটাই জেঁকে বসে যে, এক সময় তার মাথায় আসে লেখাপড়া আর করবেন না, হবেন না শিল্পী। পিতা চাপ দিতে থাকেন হাফেজি পড়ার। রাজি নন বশীর। পাঠাতে চান শান্তিনিকেতনে। তাতেও রাজি নন। একবার ভাবলেন আর্টিস্ট হওয়া আমার কর্ম নয়। তিনি পার্টির প্রতি মমত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার উদ্দেশ্য তো আর্টিস্ট হওয়া নয়, পার্টির সংগঠন গড়ে তোলা।’

বিদেশে গিয়েও তিনি ভোলেননি একজন কমিউনিস্টের অন্যতম প্রধান জায়গা রাজপথ। ১৯৫৮ সালের ২৯ জুন। সেদিনের স্মৃতি উল্লেখ করেন এভাবে- “সেদিন বিকেলে লন্ডনে ‘ব্রিটিশ ইনডিপেনডেন্স, ওয়ার্ক এ্যান্ড পিস’ এই ব্যানার নিয়ে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির মিছিল। হাইড পার্ক থেকে প্রায় পনেরো হাজার মানুষ ধীরপায়ে চলেছে অক্সফোর্ড স্ট্রিট ধরে রিজেন্ট স্ট্রিট, সেখান থেকে পিকাডেলি সার্কাস ফেলে ট্রাফালগার স্কয়ারের দিকে। রাস্তার ফুটপাথে অসংখ্য ইংরেজ নর-নারী হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছিল। এই মিছিলে আমার সঙ্গে লোহানী, বদরুল আমিন...।”

কমিউনিস্ট পার্টি করতে গিয়ে একবার জীবন বিপন্ন হতে চলেছিল। বলা যায় একেবারে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসেন। সেটা ১৯৫৩ সালের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্ট্যালিনের মৃত্যু দিবস পালন করে পৈত্রিক নিবাসে ফিরছিলেন। তখন বেশ কিছু ছাত্র তাঁকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে ধাওয়া করে। তখন নাজিমুদ্দিন রোডে একটা রেল লাইন ছিল। ধাওয়া খেয়ে চানখাঁরপুলের দিকে যাওয়ার প্রাক্কালে একটি মালগাড়ি এসে পড়ে। রেলক্রসিংয়ের ওপর একটি ঘুমটি ঘর। কয়েকজন ছাত্র তাঁকে চেষ্টা করছে মালগাড়ির নিচে ফেলে দিতে। আর ওপর থেকে তার দিকে ছুড়ছে নুড়ি পাথর। তিনি বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কিছু মানুষ দৌড়ে এসে ‘কমিউনিস্ট হয়েছে তাতে কী হয়েছে’ বলে মানব প্রাচীর তৈরির মাধ্যমে রক্ষা করে। হত্যাচেষ্টাকারীদের ধারণা ছিল কমিউনিস্টরা পাকিস্তান চায়নি। এর আগে পার্টির কাজ করতে গিয়েই মুর্তজা বশীর ১৯৫০ সালে জেল খাটেন, সে অন্য এক অধ্যায়।

মাতৃভাষার প্রেম ও বরকতের রক্তাক্ত স্মৃতি

স্বাধীন বাংলাদেশের সূতিকাগার ৫২’র ভাষা আন্দোলনে মুর্তজা বশীরের অংশগ্রহণ তাঁকে করেছে মহিমান্বিত। ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল জাদুঘরে ঢাকা আর্ট গ্রুপের দ্বিতীয় প্রদর্শনী। সে প্রদর্শনীতে মুর্তজা বশীরের ছবিও প্রদর্শিত হবে।

গুলির পর দৌড়ে গিয়ে দেখতে পেলেন একটা লোক আহত অবস্থায় পড়ে আছে। পরের ঘটনা মুর্তজা বশীরের জবানিতেই শোনা যাক-“...দেখাম প্যান্টের মধ্যে শর্ট গোঁজা, লম্বা শেভ করা একজনকে। তার সারা মুখে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটার মতো ঘাসের বিন্দু। আর কল খুলে দিলে যেমন অঝোরে পানি পড়ে তেমনি রক্ত ঝরছে। সে বারবার জিভ বের করছে আর বলছেÑপানি পানি। আমার হাতের রুমালটা ঘামে পানিতে ভেজানো ছিল। আমি ইতস্তত করেছিলাম রুমালটা নিংড়ে দেব কি না। সে কাটা মুরগির মতো ছটফট করছিল। অবশেষে আমি নিংড়ে দিলাম। সে ফিসফিস করে বলল, ‘আমার নাম আবুল বরকত, বিষ্ণুপ্রিয়া ভবন, পল্টন লাইন, আমার বাড়িতে খবর দিয়েন।’...

বিকেলে জাদুঘরে ফিরে গেলেন তারা। প্রদর্শনী হবে না সিদ্ধান্ত নিলেন। মায়ের ভাষা রক্ষায় জীবনাহুতি দেয়া শহীদদের সম্মানে এ তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ইতিহাসেও ভাস্বর হয়ে আছে। সে প্রদর্শনী উদ্বোধন করার কথা ছিল গবর্নরের স্ত্রী ভিকারুননেসা নূন।

মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’তে মুর্তজা বশীর লিখলেন ‘একটি বেওয়ারিশ ডায়েরির কয়েকটি পাতা’। লিনোতাটসহ নিজের কিছু চিত্রকর্ম এ সংকলনে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় হলেন অমর। সামাজিক ও সময়ের দায় মেটাতে এ এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কথা প্রসঙ্গে তিনি আফসোসের সঙ্গে বলেন, বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠায় এবং বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ বিকাশে কোন অবদান নেই অথচ তাদের নামে দেশে স্থাপনাসহ অনেক সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। দুঃখজনক যে, কোন ভাষা শহীদের নামে রাজধানীতে একটি সড়কের নামও নেই।

সাহিত্যের তিনি-তাঁর সাহিত্য

শিল্পী মুর্তজা বশীর তুলি না ধরে যদি শুধু কলম ধরতেন অর্থাৎ সাহিত্য সৃষ্টি করতেন তা হলেও পেতেন বিশিষ্ট আসন। অন্তত তাঁর রচিত কবিতা, গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী, গবেষণা গ্রন্থ তাই সাক্ষ্য দেয়। তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু, সদ্য প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী যথাযর্থই বলেন-‘ছবি না এঁকে সে লেখায় নিজেকে নিয়োজিত রাখত তাহলেও বাংলাদেশের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারত।’ (প্রথম আলো, ১০ আগস্ট, ২০০৭) তিনি প্রথম কবিতা লেখেন ভাষা আন্দোলনের পেক্ষাপটে ১৯৫২ সালে। ‘পারবে না’ শিরোনামে কবিতাটি ছাপা হয় কলকাতার ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। ত্রসরেণু, তোমাকেই শুধু, এসো ফিরে অনসূয়া তাঁর কাব্যগ্রন্থ। প্রথম গল্প লেখেন জেলখানায়, তা ছাপা হয় দৈনিক ‘সংবাদ’-এর ঈদ সংখ্যায়। গল্পটির নাম ছিল-পার্কের একটি পরিবার। ১৯৬৯ সালে জহির রায়হানের ভূমিকা সংবলিত গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ‘কাচের পাখীর গান’ নামে। তাঁর চারটি গল্প ইংরেজিতে অনুবাদ করেন আলমগীর কবীর, একটি শফিক রেহমান। ১৯৬৮ সালে ‘মিতার সঙ্গে চার সন্ধে’ নামে উপন্যাস প্রকাশিত হয়। আলট্রামেরিন নামে আত্মজৈবনিক উপন্যাস বেশ আলোড়িত হয়। আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও অন্যান্য’ বেরিয়েছে সম্প্রতি। নির্বাচিত লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘মুর্তজা বশীর : মূর্ত ও বিমূর্ত।’ গবেষক হিসেবে তিনি বোদ্ধা মহলকে চমকে দেন ‘মুদ্রা ও শিলালিপির আলোকে বাংলার হাবসী সুলতান ও তৎকালীন সমাজ’ গ্রন্থটি লিখে।

সেলুলয়েডের ফিতায় শিল্প

শিল্পের বহুগামী নান্দনিক পুরুষ মুর্তজা বশীর চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে শৈল্পিক অবদান রাখার কথা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না। জীবনভিত্তিক প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সাদেক খান পরিচালিত ‘নদী ও নারী’র তিনি সংলাপ লেখক, শিল্প নির্দেশক ও প্রধান সহকারী পরিচালক। উর্দু চলচ্চিত্র ‘কারওয়াঁ’র তিনি কাহিনীকার ও সংলাপ লেখক। ‘ক্যায়সে কহু’র শিল্প নির্দেশক। নানাভাবেই ১৯৬৪ থেকে ৬৬ পর্যন্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা

১৯৭১-এর মার্চের শুরুতেই প্রগতিশীল, স্বাধীনতাকামী সব শিল্পীই প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। শুধু চারুকলা শিল্পীই নন, বেতার-টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, নাট্যÑ সব শিল্পীর সমন্বয়ে ৬ মার্চ ঢাকার শিল্পীসমাজ গঠন করে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ’ নামে একটি সংগ্রাম পরিষদ। বর্তমান শিল্পকলা একাডেমি তখন সেখানে ছিল আর্ট কাউন্সিল। ১২ মার্চ এখানে এক সভায় কাইয়ুম চৌধুরী ও মুর্তজা বশীরকে আহ্বায়ক করে একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। কর্মসূচীতে মুক্তি সংগ্রামের প্রতীককে সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বলা হয় পোস্টার ফেস্টুনে গণজাগরণমূলক স্কেচসহ ছবি আঁকার কথা।

১৬ মার্চ বাংলা চারু ও কারুশিল্পী সংগ্রাম পরিষদ শহীদ মিনারে এক সমাবেশের আয়োজন করে। জয়নুল আবেদিন ও মুর্তজা বশীর এ সভায় বক্তৃতা করেন। সভার পর মিছিলে নেতৃত্ব দেন জয়নুল আবেদিন। পুরোধা হিসেবে ছিলেন মুর্তজা বশীর। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালের যেসব ছবি ্আছে সেসব ছবির মধ্যে একটি উজ্জ্বল ছবি এমনÑ চারজন নারীর হাতে ধরা স্বা-ধী-ন-তা শব্দটি দেখা যায় তা এই মিছিলের।

একাত্তরে তুরস্কে ইরাক ও পাকিস্তানের ১০ জন করে শিল্পীর যে প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল তা বর্জন করা হয় ১০ মার্চ এক বিবৃতির মাধ্যমে। যে বিবৃতির অন্যতম উদ্যোক্তা, স্বাক্ষরদাতা মুর্তজা বশীর।

১৯৭১-এ নবেম্বরে যখন বুঝতে পারেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এ দেশে তাঁর মতো দ্রোহী শিল্পীর নিরাপত্তার অভাব, তাই চলে যান প্যারিসে। তবে আফসোস ও অপরাধবোধের ভারমুক্ত হন শহীদদের স্মরণে সিরিজ ‘এপিটাফ ফর মার্টয়াস’ সৃষ্টি করে।

এই সমাজসচেতন মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ মহৎ শিল্পস্রষ্টা এখনও মনে করেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়নি। স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি সার্বিক মুক্তি এখনও আসেনি। সেই মুক্তিযুদ্ধ সামনে। তিনি বিশ্বাস করেন, কাক্সিক্ষত মুক্তি আনবে দেশের নিপীড়িত মানুষ। ভুখা নাঙারা আনবে সামাজিক বিপ্লব। সেই যোদ্ধাদের হাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে। কেননা ওই বিপ্লবীদের চোখে তিনি বুর্জোয়া। বুর্জোয়া শ্রেণীর উচ্ছেদ ঘটবে সর্বহারা শ্রেণীর হাতে। ওই মৃত্যু হবে তাঁর জন্য গৌরবের।

রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার, জঙ্গী ও মৌলবাদের আস্ফালন সম্পর্কে তিনি বলেন, ধর্মের ব্যবহার করছে কিছু রাজনীতিবিদ। সেই সুযোগে ধর্মের অপব্যবহারকারী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ঘটাচ্ছে একের পর এক নৃশংস ঘটনা। এ পরিস্থিতিতে শিল্পী সমাজের করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, নান্দনিকতা আর সৌন্দর্য দিয়ে মানুষের মনে সুন্দরের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। শিল্প-সৌন্দর্য দিয়ে কদর্যকে করতে হবে প্রতিহত।

এক সময়ের দুর্বিনীত, অবিমৃষ্যকারী আর খেয়ালি এই শিল্পী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে অবসর নিয়ে রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় নিজস্ব ফ্ল্যাটে এখনও সৃষ্টিশীল। আগামী ১৭ আগস্টে ৮৩ বছরে পা দেবেন। শয়নকক্ষে বই-পুস্তকের মাঝে অক্সিজেন সিলিন্ডার, ফুসফুস-বান্ধব যন্ত্রপাতিতে ভরপুর। মাঝে মাঝেই দৌড়াতে হয় হাসপাতালে। যৌবনের বিপরীতধর্মী স্থিতধী, গৃহী, সৌম্য-শান্ত এ শিল্পী হয়ে পড়েছেন কিছুটা মেডিক্যালসামগ্রী আর ওষুধের আজ্ঞাবাহী। বার বার অক্সিজেনের নল, হার্টবিট মাপার যন্ত্রের দ্বারস্থ হতে হয়।

শারীরিক এমন অবস্থায় অতিথি বিদায়ের জন্য দরজা পর্যন্ত না আসতে অনুরোধ করার পরেও স্মিত হেসে নিজ হাতে খুলে দেন দরজার সিটকিনি কিংবা হাতল। একটু পড়ে হয়ত যাবেন শয্যাশায়ী স্ত্রীর পাশে। মন থেকে শ্রদ্ধা উঠে আসে। আকাক্সক্ষা জেগে ওঠেÑ মূর্ত হয়ে উঠুক ক্যানভাস মুর্তজা বশীরের রং মিশানো দৃঢ়-নান্দনিক তুলি।

প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৫

২৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: