মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মানবমুক্তির অন্বেষণে ম্যাকাব্রে

প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদ বধ কাব্যের সমালোচনা লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, যিনি সৃজন করেন তিনি আপনাকেই নানাভাবে প্রকাশ করেন। সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) এর মতো পেশাদার থিয়েটার সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কামালউদ্দীন নীলু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন, আলোচনার ঝড় তুলেছেন কিন্তু করণীয় কাজটা অব্যাহত গতিতে করে চলেছেন। জাতীয় পরিসর জয় করেছেন আবার আন্তর্জাতিক আবহে উড়াল দিয়েছেন। দেশ এবং বিদেশের ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে উপজীব্য করে নির্মাণ করেছেন ‘দ্য কমিউনিকেটর’, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র বিশ্ব পরিভ্রমণে ব্যাপ্ত। ডিপ্লোম্যাট চানক্য বলেছেন, পরগৃহে এবং পরদেশে বাস কষ্টকর। কামালউদ্দীন নীলু নির্মাণ করলেন ‘প্রিজন’, যেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্রের কাছে পুরো বিশ্ব ব্যবস্থাটাই একটা আস্ত কারাগার। ফ্রান্সের দার্শনিক মিশেল ফুকোর দর্শনে, আত্মহত্যাও একটা উপভোগ্য বিষয়। শুধু উপভোগ্য বললেই বলা হয় না বরং ফ্রান্সে শবাধারকে ঘিরে একটি আদিবাসীর নৃত্য পরিবেশন দৃষ্টিনন্দন, আনন্দের এবং উৎসব উদযাপনের। শবদেহ এবং শবাধারকে ঘিরে প্রচলিত এই নৃত্য ম্যাকাব্রে নামে স্বল্প পরিচিত। স্বল্প পরিচিত শব্দটাকেই বিস্তৃৃত পরিসরে, বৃহৎ ক্যানভাসে মঞ্চায়ন উপযোগী করে তুললেন নির্দেশক কামালউদ্দীন নীলু। বাস্তব জগতে ঘেরাও হয়ে, কল্পনা আশ্রিত এক জগৎ নির্মাণ করে, সেখানে ভার্চুয়াল জগতের একজন বাসিন্দা হয়ে মরা-বাঁচার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা এক বন্দী আত্মার মুক্তির লড়াই নিয়েই নাটক ‘ম্যাকাব্রে’। আনিকা মাহিন একা রচিত, কামালউদ্দীন নীলু ভাবিত-পরিকল্পিত ও নির্দেশিত সিএটি প্রযোজিত নাটক ম্যাকাব্রে মঞ্চায়িত হলো সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায়।

ঢাকার নাট্যশালায় হোক কিংবা আমেরিকার অফ ব্রডওয়েতে নাটক মঞ্চায়ন করা হোক, সৈয়দ জামিল আহমদ কিংবা কামালউদ্দীন নীলুর মতো নির্দেশকের নির্দেশনায় নাটক সৃজন প্রক্রিয়াটা নাট্যকারদের জন্য সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জিং। প্রযোজনা দেখে বোঝা কঠিন, নাটক রচনা আগে নাকি প্রযোজনার লাইন আপ আগে। নাট্যকারের ভাবনা আগে নাকি নির্দেশকের ভাবনা আগে। ‘ভাবনা’ বিষয়টা জরুরী এসব ক্ষেত্রে। নইলে ম্যাকাব্রে নাটকে পরিকল্পক এবং নির্দেশক হিসেবেই কামালউদ্দীন নীলুর উপস্থিতিই যথেষ্ট হতে পারত। পারার বিষয় নয় বলেই কামালউদ্দীন নীলু একাধারে ভাবনায়, পরিকল্পনায় এবং নির্দেশনায়। ফলে এখানে নাট্যকার আনিকা মাহিন একার উপস্থিতি নাট্যকার হিসেবে কিন্তু নির্দেশকের লাইনআপে। অর্থাৎ তুমি তোমার মতো করেই চা পান কর ঠিক আমি যেভাবে করি সে রকমভাবে। ফলে নাটকের সকল ক্রেডিট যেমন নাট্যকার আনিকা মাহিন একার না, আবার একাকে অস্বীকার করেও না।

অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, আমরা নানাভাবে উপায়হীন, নিরাপত্তাহীন, বিনোদনহীন, অর্থ-প্রতিপত্তিহীন, মনুষত্বহীন, মানহীন, বাসস্থানহীন, সুস্বাস্থ্যহীনসহ আরও কত হীন তথা উপায়হীন। এতসব হীনের পেছনে স্বজন-সমাজ-রাষ্ট্র নাকি বিশ্ব ব্যবস্থা দায়ী সে প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত কিন্তু কেউ না কেউ তো দায়ী। যে শক্তির আধিপত্যের জোরে বাম্পার ফসল ফলা সত্ত্বেও দেশে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ হয়, নিরস্ত্র অফিসগামী যাত্রী এ্যাটমিক শক্তির দাবানলে পুড়ে কয়লা হয়, স্বভূমি থেকে উৎক্ষিপ্ত হয়ে উদ্বাস্তু হয়, রাজনৈতিক দূষণ সত্ত্বেও রাজনৈতিক অবয়বে সত্য মিথ্যের বিভেদকে একাকার করে ফেলা যায়, সেই আধিপাত্যবাদী শক্তির শক্তিমূল থাকে আড়ালে, অন্তরালে এবং অদৃশ্যে। এই অদৃশ্য শক্তির আগ্রাসনে আক্রান্ত ম্যাকাব্রে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাকে আটকে রাখা হয়েছে কয়েদি করে কয়েদখানায়। কয়েদি জানে না তার কৃত অপরাধ কিংবা সম্ভাব্য শাস্তি। কার কারণে তার এই করুণদশা তাও কয়েদির কাছে অস্পষ্ট। তথাপি যন্ত্রণাকে লাঘব করে, বিদ্রোহকে নিয়ন্ত্রিত করে, দমননীতিকে মেনে নিয়ে, অনিবার্য এবং শেষ পরিণতি মৃত্যুকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করে কয়েদি পরাধীনতার গ্লানির বিপক্ষে লড়াই করার প্রস্তুতি নেয় স্বপ্ন ডানায় উড়াল দিয়ে, আর সেখানেই শেষ হয় নাটক ম্যাকাব্রে।

ম্যাকাব্রে নাটকের নাট্যকার আনিকা মাহিন একার নাটক রচনার দক্ষতা নিয়ে যেহেতু অংশীদারত্বের প্রশ্নে চূড়ান্ত বিশ্লেষণ করা গেল না তথাপি কিছু বলার থাকে। বাংলাদেশের নাট্যাকাশে প্রয়াত নাট্যকার এসএম সোলায়মান ছিলেন একাধারে অভিনেতা-নাট্যকার এবং নির্দেশক। মিউজিক্যাল ড্রামা প্রডাকশনে তার জুড়ি মেলা যেমন ভার তেমনি মৌলিক নাটক রচনার পাশাপাশি বিদেশী নাটকের অনুবাদ-রূপান্তরে বিদেশী নাটকের বাঙালীকরণে এসএম সোলায়মান অবিসংবাদিত। উপরন্তু নাটকে সিরিয়াস ইস্যুকে ফ্যান্টাসির অবয়বে টুইস্ট করে পাথরকে তরমুজ বানিয়ে ফেলায় তিনি অনন্য। এসএম সোলায়মানের কন্যা আনিকা মাহিন একা স্বীকার করুক কিংবা না করুক, কোর্টমার্শাল নাটকের সংলাপ ‘আমরা প্রত্যেকেই রাজনৈতিক শক্তির উত্তরাধিকারের মতো করেই সাংস্কৃতিক শক্তির উত্তরাধিকার। ফলে বাবার মতো করেই কন্যা একা সিরিয়াস এবং টুইস্টের বহমান ধারার ধারক ও বাহক। ম্যাকাব্রে নাটকের সার্কাস অংশে টুইস্টের ঝলকানি এবং আইনস্টাইন অংশে সিরিয়াসের ভারিক্কিতে তা দৃশ্যমান। একাকিত্বকে মেনে নেব, নাকি জন-অরণ্যে জোয়ার আনব জাতীয় সংলাপ রচনায় একা ধারালো। তবে বয়স কম, অভিজ্ঞতা কম কিন্তু পরপর তিন দিন জাতীয় নাট্যশালা হাইসফুল নাটকের নাট্যকারের প্রতি সবিনয় নিবেদন, সবাই গ্রান্ড কিংবা মেটা ন্যারেটিভের বিভাজন হয়ত নাও বুঝতে পারে। কিন্তু বুঝতে চাওয়ার জিজ্ঞাসা যদি সত্য হয় তবে অবহেলা কিংবা কপাল কুঁচকে তাচ্ছিল্য প্রকাশ না করাটাই ভাল। টিকিট কেটে নাটক দেখতে আসা দর্শকদের শিল্পপিপাসা নিবৃত্তির জন্য এসএম সোলায়মান যদি গায়ের রক্ত বিক্রি করে প্রযোজনা নামিয়ে থাকেন তবে দর্শকদের স্থান কত উঁচুতে তা বোঝাতে নিশ্চয় আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরেট হয়ে ফেরত আসার প্রয়োজন নেই।

নেই নেই করেও অসংখ্য নেই এর ভিড়ে মঞ্চায়নে নৃত্য, সুর, সংলাপ, অভিনয়ের পাশাপাশি আবৃত্তি, পাপেট্রি, অ্যানিমেশন, জাদু, সার্কাস, চলচ্চিত্র, থ্রিডিভার্সান প্রভৃতির সফল প্রয়োগে নির্দেশক কামালউদ্দীন নীলু দক্ষ, স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রম এবং নান্দনিক। ইন্টারনেটের এই ভার্চুয়াল গতিপ্রবাহে সবই যখন সবার চোখের সামনে ঠিক সেই সময়ে কোন জিনিসটি যে নেই, সেই ‘নেই’ কে নেই দেখানো অসম্ভব ব্যাপার। শূন্যস্থান, শূন্য সময় বলে নির্দেশক- নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টার যে কাল্পনিক জগতই নির্মাণের পথ দেখান না কেন নির্মিত ম্যাকাব্রে প্রযোজনা কাল্পনিক জগত এর রি-মেক তথা বিনির্মাণ। বাক্সবন্দী অবস্থাটা যেমন শূন্য সময়, শূন্য স্থানের ইঙ্গিত দেয়, কামালউদ্দীন নীলু নির্দেশিত ম্যাকাব্রে মঞ্চায়ন তেমনি অবস্থা সৃজন করে। উপরন্তু মানুষের কল্পনার ছোঁয়া-ধরার বাইরের বিমূর্ত ভাবনাগুলোকে নানা রঙে-নানা বর্ণে, নানা ঘাত-প্রতিঘাতের দোত্যনায় নির্দেশক কামালউদ্দীন নীলু নির্দেশিত ম্যাকাব্রে প্রয়োজনা দেখায় দৃশ্যত বন্দীর দেয়ালে ঘেরা, বন্দীদশা, নিরুপায়তার শেষ সীমায় পৌঁছে স্বপ্ন নির্মাণের একটি মাত্র পথকে ধরে বাঁচতে চাওয়া প্রভৃতি। আর অদৃশ্যে রয়ে যায় নীরব আকুতি। আধিপত্য শক্তিকে চিনে নেয়ার আকুতি, বন্দীদশা থেকে মুক্তি লাভের আকুতি। কিভাবে কোন পথে এই যাত্রা সে ব্যাপারে নির্দেশক কামালউদ্দীন নীলুর নির্ভরতা শিল্পানুরাগী দর্শকদের ওপর। উত্তরের বিপরীতে সঠিক প্রশ্ন করাটা যেমন তাঁর রুচি, ঠিক তেমনি শত বিভাজন সত্ত্বেও মানুষ মাত্রই এক এবং সম্মানের সঙ্গে জীবনধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠা তার ইস্পিত চাওয়া। আর তাই কফিনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা তানপুরা পা-সা-পা সুরে আবহ ধরে থাকে। বেসুরো সময়ে কেউ না কেউ তার কথা ও গায়কি দিয়ে সুরের মূর্চনায় মুক্তির পথ নির্মাণ করে, স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাবে। মানবমুক্তির অন্বেষণে এক অনন্য প্রযোজনা ম্যাকাব্রে।

প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল ২০১৫

২৩/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: