কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘স্বপ্ন হলো সত্যি’

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫
  • খন্দকার জামিল উদ্দিন

২০০০ সালে টেস্ট আর ৯৭ সালে ওয়ানডে মর্যাদাপ্রাপ্তির পর স্বপ্ন দেখেছিলাম বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপ ক্রিকেটে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। সেই স্বপ্ন বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা আর ঘরের মাঠে পাকিস্তানকে (২-০) সিরিজ হারানোর মাধ্যমে পূর্ণতা পেল। সত্যি বলতে এই স্বপ্নটা দেখেছিলাম আজ থেকে বারো-তের বছর আগে, যখন আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে একজন পরিচালক ছিলাম। এর কিছুদিন পরই বিসিবির ‘গেম ডেভেলপমেন্ট’ কমিটির সার্বিক দায়িত্ব অর্পিত হয় আমার উপর। কমিটির তৎকালীন প্রধান ছিলেন অকাল প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো। তিনি সম্প্রতি অকালে চিরবিদায় নিয়েছেন। আমাকে ডেভেলপমেন্ট কমিটির সেক্রেটারির হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানালে দায়িত্ব গ্রহণ করি। তখন থেকে এই কমিটির সর্বসম ক্ষমতা ছিল আমার উপর। সভাপতি শুধু গাইড করে যেতেন। কাজ শুরুর পর প্রথম ব্যাচ হিসেবে পেয়েছিলাম শাহরিয়ার নাফীস, নাফিস ইকবালদের মতো প্রতিভাবানদের। পরবর্তী ব্যাচটিই ছিল আজকের মুশফিকুর রহীমরা। যারা কিনা ২০০৬ অনূর্ধ-১৯ বিশ্বকাপে এ যাবতকালের সেরা সাফল্য অর্জন করেছিল। সে আসরে মূলত আমাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথাছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমরা কোয়ার্টারে হেরে যাই ইংল্যান্ডের কাছে। পরবর্তীতে স্থান নির্ধারণী সবগুলো ম্যাচেই জয় লাভ করে পঞ্চম স্থান অধিকার করি। সেই আসরে বাংলাদেশ যে সাতটি ম্যাচ খেলেছিল তার ছয়টিতেই জয়। আসলে কোয়ার্টারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্ভাগ্যের শিকার না হলে হয়ত সেবার অনেক বড় কিছু অর্জন করে ফেলতাম। আমার মতে এখনও পর্যন্ত যে কোন পর্যায়ে বাংলদেশ ক্রিকেটের সেটিই সেরা সাফল্য।

দলটার নেতৃত্বে ছিলেন মুশফিকুর রহীম। আর তাঁর সঙ্গী ছিলেন সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, সামশুর রহমান শুভ, ডলার মাহমুদরা। তখন থেকেই আমাদের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষ জানতে শুরু করে বাশার-পাইলটদের পর একঝাঁক তরুণ ক্রিকেটার ওঠে আসছে। মুশফিক-সাকিবদের কথা মানুষ আগে থেকেই জানত। তখনকার প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ বর্তমানেও আছেন সেই দায়িত্বে। তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটি এই তরুণদের মধ্যে থেকেই তিনজনকে (সাকিব, তামিম, মুশফিক) সুযোগ করে দিয়েছিলেন ২০০৭ ক্যারিবীয় বিশ্বকাপ খেলার। তিনজনই সেই বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস খেলে ভারতের মতো সমৃদ্ধ দলকে বিদায় করে দিয়েছিল। এই তিন তরুণ সেবারই বিশ্ব ক্রিকেটে নজর কেড়েছিল। পরবর্তীতে এদের মধ্য থেকেই তামিম ইকবাল ২০১০ সালে লর্ডসের মাঠে সেঞ্চুরি করে অনার্স বোর্ডে নাম তুলে। সে মাঠেই ২০০৫ সালে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল মুশফিকুর রহীমের। যাকে দেখে বয়কট, গাভাস্কারদের মতো গ্রেটরা ঘোষণা করেছিলেন, এই ছোট্ট ছেলেটা বাংলাদেশ দলে অনেক দিন খেলবে। দেশকে অনেক কিছু উপহার দেবে। বরি শাস্ত্রী, রাহুল দ্রাবিডরা বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের দেখে বলেছিলেন সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে এরা একদিন বিশ্বমাতাবে। ছেলেদের পারফরম্যান্সে সেই সত্যিই কথাটা বাস্তবে প্রমাণিত হলো। পাকিস্তানের মতো পরিণত দলের বিরুদ্ধে এক সিরিজ জিতে যে চমকটা বাংলাদেশ, মাশরাফিরা দেখিয়েছে তা চমক লাগানো। বিষয়টা যে কত আনন্দের, কত বড় তৃপ্তির তা ভাষায় কিংবা লিখে প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই। পাকিস্তানকে সিরিজ হারানো বা পরাজয়ের গ্লানিতে জর্জরিত করে ফেলার আকাক্সক্ষা আমার অনেক দিনের। আজ মুশফিক-তামিমরা সেই বাসনাটাকেই পূর্ণ করে দিয়েছে।

কিছুদিন আগেও কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করতে পারতেন না যে, বড় মঞ্চে বা বড় দলগুলোর বিপক্ষে আমরা এত ভাল খেলতে পারি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার সবসয়মই বিশ্বাস ছিল এই খেলোয়াড়দের ওপর। আমি জানতান এই ছেলেদের যদি ঠিকভাবে গাইড করা যায়, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায় তাহলে তারা বিশ্বমানের খেলোয়াড় হিসেবে একদিন দাঁড়িয়ে যাবে। অল্প বয়স্ক তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যে সাকিব, মুশফিক, তামিমদের ২০০৭ বিশ্বকাপে সুযোগ দেয়ার জন্য অনেক সমালোচনা হয়েছিল। আমি কিন্তু তখন বলেছিলাম এরাই আমাদের সেরা ব্যাটসম্যান। এদের এখনই সুযোগ করে না দিলে তারা হারিয়ে যাবে। বছর ছয়েক পর আজ সেই ছেলেদেরই এভাবে বিশ্বমাতাতে দেখে সত্যিই গর্বে আমার বুক ভরে যাচ্ছে।

মুশফিকের কথা বিশেষ করে বলতে ইচ্ছে করছে। কারণ বয়সভিত্তিক দল থেকেই নেতৃত্বের মাধ্যমে এই তরুণদের আগলে রেখেছিলেন তিনি। তখন এই তরুণদের মধ্যে জয়ের তিব্র আকাক্সক্ষা বা ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে দেখেছি। সেই মুশফিক আজ বাংলাদেশ টেস্ট দলকেও নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ক’দিন আগে ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এর আগে শাহরিয়ার নাফীস-নাফিস ইকবালরাদের মধ্যেও এই বিশ্বাসটা ছিল যে তারা যে কোন দলকেই হারাতে পারে। বর্তমানেও অনেক তরুণ সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার আছে যাদের সাকিব, তামিমদের মতো পরিচর্যা করতে পারলে ভবিষ্যতে আরও বড় কিছু অর্জন সম্ভব। পাকিস্তানকে ২-০তে সিরিজ হারানো সেটির ইঙ্গিতই বহন করে। সামনে আরও বড় কিছু করার সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি। তবে মনে হয় এখন আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের দিকেও নজর দেয়ার সময় এসছে। ওয়ানডে ক্রিকেটে আমরা ভাল করছি অনেকদিন। এই মুহূর্তে দল হিসেবেও দাঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে আমরা সেই জায়গাটায় পৌঁছাতে পারিনি। এটা নিয়ে এখন কাজ করতে হবে। আমার মনে হয় সময় এসেছে তিন ফরম্যাটে আলাদা দল গড়ার। কিছু প্লেয়ার আছে যেমন মুশফিক, সাকিব, মাহমুদুল্লাহ যারা সব ফরম্যাটই খেলবে। কিন্তু এর বাইরে কিছু স্পেশালিস্ট খেলোয়াড় খুঁজে বেড় করতে হবে। যারা শুধুই ওয়ানডে কিংবা টি২০ খেলবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এখন যেভাবে দলকে সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে সেটি অব্যাহত থাকলে এবং দলটি সংগঠিত থাকলে অন্তত ওয়ানডের এক নম্বর জায়গাটায় পৌঁছে যাওয়া আমাদের জন্য দূরের সময় নয়। দলকে অগ্রিম অভিনন্দন জানাই। পরিশেষে বলতে চাই আজকের ওয়ানডেতেও আমি বাংলদেশে জয় দেখছি। বাংলাওয়াশ-দেখছি পাকিদের সামনে।

লেখক: বিসিবি ডেভেলপমেন্ট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫

২২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: