কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫
  • প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ

জনকণ্ঠ : প্রথম দুই ম্যাচ জিতে এখন পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার প্রহর গুনছে বাংলাদেশ। বিপক্ষ দল আজ বাংলাওয়াশ হতে যাচ্ছে?

ফারুক আহমেদ : প্রথম দুটি ম্যাচ দাপটের সঙ্গে জিতার পর হোয়াইটওয়াশ এখন অসম্ভব কিছু নয়। সত্যি বলতে এই সিরিজে কিন্তু আমরাই ফেবারিট ছিলাম এবং আমাদের প্লেয়ারদের সেই বিশ্বাস খুব ভালভাবেই ছিল। আমার মনে হয় টানা দুই ম্যাচ জিতে ইতিমধ্যে আমরা সেটি প্রমাণ করতে পেরেছি। সেসঙ্গে বিশ্বকাপে আমাদের ভাল পারফর্মেন্সের ধারাও বজায় থাকল। এটা অনেক বড় প্রাপ্তি। সিরিজে যেভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে পাকিস্তান তাতে মনে হয় না এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

জনকণ্ঠ : বাংলাদেশ এবার নিয়ে যে দু’বার বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলল এবং এই দু’বারই নির্বাচক কমিটির প্রধান আপনি। নির্বচক হিসেবে এই সাফল্যে নিশ্চই খুব আনন্দিত আপনি?

ফারুক আহমেদ : আসলে আমরা সবাই কিন্তু একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করি। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতি বা বাংলাদেশের ক্রিকেটের সাফল্য। সেই দিক বিবেচনা করলে প্রথম মেয়াদের পর দ্বিতীয় মেয়াদে এসেও এক বছরের মাথায় এই সাফল্যে সবার সঙ্গে আমিও অত্যন্ত খুশি যে, আমরা দ্বিতীয় পর্বে খেলেছি। এবারই কিন্তু প্রথম বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনাল খেলল। সবচেয়ে বড় কথা, শুধু দ্বিতীয় রাউন্ড বা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাই নয়, বাংলাদেশ প্রত্যেকটা ম্যাচ চমৎকার খেলেছে, ভাল পারফর্ম করেছে। এটা চোখে পড়ার মতো। এমন হয়নি যে কেবল ভাগ্যের সহায়তা নিয়ে দুটা-তিনটা ম্যাচ ভাল খেলেই আমরা দ্বিতীয় রাউন্ডে চলে গেছি। পুরো আসরে চমৎকার খেলেছি। ফলে সবার মতো আমিও গর্ব অনুভব করছি। সবাইকে অভিনন্দন। বিশেষ করে খেলোয়াড়, ম্যানেজম্যান্ট এবং ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তা যারা এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছেন। যে কোন ভাল কিছু অর্জনের পেছনে আসলে অনেক বিষয়ই কাজ করে। বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা থেকে একটা দল কখনও ভাল করে না। তাই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। সেই সঙ্গে নিজের কথা বা আমার নির্বাচক কমিটির কথা বলব, আমরা যখন একটা টিম দেই তখন সব দিক বিবেচনা করে সেরা টিমটাই দেয়ার চেষ্টা করি। বিশ্বকাপে সে চেষ্টাই ছিল এবং টিমের রেজাল্ট তা প্রমাণ করে।

জনকণ্ঠ : আপনার দৃষ্টিতে এবারের বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী?

ফারুখ আহমেদ : কাগজে কলমের হিসেবে প্রথম পাপ্তি অবশ্যই কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ দল যে বিদেশের মাটিতেও ভাল ক্রিকেট খেলতে পারে এটা এবার প্রমাণ হয়েছে। আমরা যাওয়ার আগে কন্ডিশন নিয়ে বলেছি যে খুবই কঠিন হবে। কিন্তু সেখানে চমৎকার পরফর্ম করেছে ছেলেরা এবং খুব ভাল খেলেছে। আমি চাইব এবার যে আত্মবিশ্বাসটা আমরা অর্জন করেছি সেটা যেন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মাটিতে আগামী দিনগুলোতেও চোখে পড়ে। আমি বিশ্বাস করি জয়-পরাজয় খেলারই একটা অংশ। কিন্তু আপনি যখন ভাল পারফর্ম করা শুরু করবেন তখন জয় আর বিচ্ছিন্নভাবে আসবে না আপনা আপনিই চলে আসবে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ এখন দল হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এটা ধরে রাাখতে পারলে আরও ভাল কিছু অর্জন সম্ভব। তাই খেলোয়াড়দের কাছে ধারাবাহিকতাই বেশি আশা করব।

জনকণ্ঠ : ২০০৭ বিশ্বকাপের পরই বলতে গেলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের দ্রুত উত্থান। এবারের বিশ্বকাপে যে পারফর্মেন্স তাতে আগামী দুই বছর পর বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান?

ফারুক আহমেদ : আমরা যদি ভালভাবে ট্র্যাকে থাকি এবং সব কাজ যদি সুচারুভাবে হয় এবং পাইপলাইনে অনেক খেলোয়াড় থাকে তাহলে সব সময়ই আপনি একধাপ এগিয়েই চিন্তা করবেন। লক্ষ্য করলে দেখবেন ২০১১ বিশ্বকাপে দুটা ম্যাচ বাজেভাবে হারলেও সেবারও কিন্তু আমরা তিনটি ম্যাচ জিতেছিলাম। আসলে সব কিছুই নির্ভর কবরে আপনি কেমন ফিডব্যাগ দিচ্ছেন দলকে। যদিও সবাই খুব তরুণ তবুও দু-চারজন প্লেয়ার হয়ত থাকবে না আগামী বিশ্বকাপে। সেক্ষেত্রে আমাদের ফিডব্যাক ভাল থাকলে আগামী বিশ্বকাপ আরও ভাল করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করি।

জনকণ্ঠ : ২০১৯ বিশ্বকাপটা হয়ত দশ দলেরই হবে। সেই ক্ষেত্রে সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে খেলতে হলে বাংলাদেশকে র‌্যাঙ্কিংয়ে দ্রুত উন্নতি করতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষে কাজটা কতটা সম্ভব?

ফারুক আহমেদ : পরবর্তী বিশ্বকাপ যখন আপনি সেমিফাইনালে খেলার চিন্তা করবেন তার মানে তো অবশ্যই আপনি সেরা চারটি টিমের মধ্যে থাকতে চান। সেক্ষেত্রে আটে ওঠে আসার লক্ষ্য তো থাকাই উচিত। আমার মনে হয় র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করতে হলে আমাদের এ বছর অনেক খেলা আছে, সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি বিশ্বাস করি না যে আটে না আসতে পারলে আমাদের কোয়ালিফাই খেলতে হবে। এমনিতেই এখন আমাদের র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করা দরকার। আটে না আসতে পারলেই যে আমরা বিশ্বকাপ খেলতে পারব না এমন কিন্তু নয়। যেহেতু কোয়ালিফাইংটা আমাদের দেশে হবে, তাই ভাল সুযোগই থাকবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ভাল জায়গায় যাবে এমনটাই চাই আমরা।

জনকণ্ঠ : ব্যক্তিগতভাবে কি আপনি বিশ্বাস করেন আমরা সেটা পারব?

ফারুক আহমেদ : আমি তো মনে করি, হোমে আমরা ওয়ানডে ক্রিকেটে অনেক শক্তিশালী। যেটা আমরা ২০১২ এশিয়া কাপে প্রমাণ করেছি। অবশ্য ২০১৪ সালটা আমাদের তেমন ভাল ছিল না। যদিও ভাল ক্রিকেট খেলেছি কিন্তু ম্যাচ খুব বেশি জিততে পারিনি। আমার মনে হয় আমাদের সামনে ভাল করার খুব ভাল সম্ভাবনাই আছে।

জনকণ্ঠ : বাংলাদেশ দলে বর্তমানে একটা প্রজন্ম দাঁড়িয়ে গেছে। এই দলটার ব্যাকআপ হিসেবে পাইপলাইনে কেমন প্লেয়ার দেখছেন?

ফারুক আহমেদ : আমি মনে করি, ক্রিকেট বোর্ড জোরেশোরে তৎপরতা চালাচ্ছে হাই পারফর্মেন্স একটা উইনিট তৈরি করার জন্য। যাতে করে জাতীয় দলের প্রত্যেকটা ছেলে সারা বছর প্র্যাকটিসে থাকতে পারে এবং উন্নত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে। এই কাজটা করতে পারলে আমার মনে পাইপ লাইনটা অনেক সমৃদ্ধ হবে এবং আমার মনে হয় আমাদের যুব দলটাও খুব ভাল। এই জিনিসগুলো ঠিকভাবেই চলছে। তবে পাশাপাশি আমার যেটা মনে হয় হাইপারফর্মেন্স ইউনিটটা ভালভাবে দাঁড় করাতে পারলে চল্লিশটা ছেলে সবসময় তৈরি থাকবে যে কোন প্রতিযোগিতায় খেলার জন্য।

জনকণ্ঠ : ওয়ানডেতে আমরা নিয়মিত ভাল করলেও টেস্ট ক্রিকেটে ভাল করতে পারছি না। এই জায়গায় ভাল করতে হলে কি করা প্রয়োজন?

ফারুক আহমেদ : টেস্ট ক্রিকেটে আসলে আরও বড় মঞ্চ। ছোটখাটো পরিকল্পপনা করে টেস্ট ক্রিকেটে ভাল করা কঠিন। টেস্টে একটা ভাল দল হিসেবে তৈরি হতে বেশির ভাগ দেশেরই অনেক সময় লেগেছে। আমরাও ব্যতিক্রম নই। ১৫ বছর হয়ে গেছে আমরা এখনও এই ফরমেটে আশানোরূপ ফলাফল করতে পারিনি। সেজন্য পরিকল্পনার পাশাপাশি ভাল কন্ডিশনে ব্যাটসম্যানদের লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেট খেলাতে পারি তাহলে ভল করা সম্ভব। আমরা লঙ্গার ভার্সন খেলি। কিন্তু আমাদের উইকেট উঁচু মানের থাকে না। পেস বোলার বের করার জন্য বোলিং বান্ধব উইকেট তৈরি করতে হবে। টেস্ট ক্রিকেট জিততে হলে প্রতিপক্ষ দলকে দু’বার অলআউট করার দক্ষতা থাকতে হয়। ওয়ানডে ক্রিকেটে অলআউট না করলেও সুযোগ থাকে। সেক্ষেত্রে কিছু মানসম্মত বোলার তৈরি করতে হবে। যারা প্রতিপক্ষকে দুইবার অলআউট করতে পারবে। এটা তখনই হবে যখন উইকেটে বাউন্স থকবে বা মোভমেন্ট থাকবে। বোর্ড অবশ্য এখন খুব ভালভাবেই পরিকল্পনা করছে। লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটটা যখন হবে তখন যদি আমরা বোলিংবান্ধব উইকেট তৈরি করতে পারি তাহলে ব্যাটসম্যান এবং বোলার উভয়েরই সুবিধা হবে।

জনকণ্ঠ : আপনার সময়ে আপনি অনেক বড় ক্রিকেটার ছিলেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের বেশির ভাগই আপনাকে সফল নির্বাচক হিসেবে চেনে। ব্যক্তিগতভাবে আপনার কাছে কোনটা বেশি গর্বের?

ফারুক আহমেদ : দুটা ভিন্ন জিনিস। বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ যেখানে দাঁড়িয়ে তার পেছনে আমরা যারা সেসময় ক্রিকেট খেলেছি সবার অনেক বড় অবদান ছিল। তবে নিজে আমি অবশ্যই খেলোয়াড়ী জীবনটাই বেশি উপভোগ করেছি। কারণ ওটাই আমার প্যাশন ছিল। সিলেকশন কাজটাও অত্যন্ত উপভোগ করি। ২০০৩ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছি এবং দ্বিতীয় মেয়াদ তো মাত্র এক বছর হলো। অল্প সময়ের হলেও এই এক বছরের দায়িত্বে বাংলাদেশ অনেক সাফল্য পেয়েছে। এগুলো সবই ভাল লাগার। তবে অবশ্যই আমি খেলোয়াড়ী জীবনটাকে এগিয়ে রাখব। ওটার সঙ্গে জীবনের অনেক আনন্দ, সুখস্মৃতি জড়িত।

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫

২২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: