কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ক্রিকেটের নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ!

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫
ক্রিকেটের নতুন পরাশক্তি বাংলাদেশ!
  • নজরকাড়া ধারাবাহিক সাফল্য
  • অতশী আলম

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রধান সমস্যা ছিল ধারাবাহিকতার অভাব। কিন্তু সম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধারা থেকে দারুণভাবে বেরিয়ে এসেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। দুর্দান্ত ধারাবাহিক পারফর্মেন্স উপহার দিয়ে চলেছেন মুশফিক, তামিম, সাকিব, মাশরাফিরা। চলতি বছরও সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত আছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নজরকাড়া সাফল্যের পর দেশে চলমান ওয়ানডে সিরিজে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। এক ম্যাচ হাতে রেখে টাইগারদের এই সাফল্য গোটা ক্রিকেট বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটের বড় শক্তি অর্থাৎ পরাশক্তি।

পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলকে বলেকয়ে হারিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম দুই ওয়ানডেতেই হেসেখেলে জয় তুলে নিয়েছে টাইগাররা। দুটি ম্যাচের কোন সময়েই প্রতিদ্বন্দ্বীতা গড়ে তুলতে পারেনি আজহার আলীর দল। বাংলাদেশের এই সাফল্যকে এখন আর কেউ চমক হিসেবে দেখছে না। কেননা টাইগাররা গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিক পারফর্মেন্স প্রদর্শন করে চলেছে। গত মার্চে বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও দুর্দান্ত খেলে মাশরাফি বিন মর্তুজার দল। ইংল্যান্ডকে টপকে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে লাল-সবুজের এই দেশ। আম্পায়ারদের কারণে ভারতের কাছে হেরে শেষ আট থেকে বিদায় নিতে হলেও টাইগারদের পারফরর্মেন্স ক্রিকেটবিশ্বে প্রশংসিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবার পাকিদের টানা দুই ম্যাচ হারিয়ে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ জয় করেছে বাংলাদেশ। আজ ১৯৯২ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়নদের ‘বাংলাওয়াশ’ করার পালা।

প্রথম ওয়ানডেতে ধরাশায়ী হওয়ার পর ইনজামাম-উল-হক বলেছিলেন, পাকিস্তান সিরিজ হারলেও খুব বেশি অবাক হবেন না তিনি! এটা যে কতটা হতাশার বহির্প্রকাশ ক্রিকেটের সত্যিকারের অনুরাগী মাত্রই বুঝবেন। অবশেষে ইনজুরির শঙ্কাই সত্যি হয়েছে, এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ হারের লজ্জায় ডুবেছে সফরকারী পাকিরা। ইনজামামের মতো হতাশার অনলে জ্বলছেন জাভেদ মিয়াদাদ, ওয়াসিম বারি, রশিদ লতিফের মতো পাকিস্তানের সাবেক তারকারা। পাশাপাশি টাইগার ক্রিকেটের প্রশংসাও করেছেন তারা। পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার জাভেদ মিঁয়াদাদ বলেন, বাংলাদেশের কাছে এভাবে সিরিজ হার পাকিস্তান ক্রিকটের জন্য সবচেয়ে বড় লজ্জা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়া হয়, তবে একদিন আমাদের ধ্বংসের দিকে যেতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের খেলা দেখে মুগ্ধ সাবেক পাকিস্তান অধিনায়কের মন্তব্য, যেমন ভাবা হতো বাংলাদেশ এখন আর তেমন নেই। আমি মনে করি ওরা এখন যে কোন দলকে হারিয়ে অঘটন ঘটাতে পারে। প্রতিদিনই উন্নতি করছে।

২০০২ সালে বাংলাদেশে কিছুদিনের জন্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। এ নিয়ে এখন গর্ব হচ্ছে ৫৮ বছর বয়সী মিঁয়াদাদের। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কয়েকদিন ওদের কোচিং করিয়েছিলাম। ওরা শর্টপিচ ডেলিভারিতে খুব দুর্বল ছিল, সেই বেসিকগুলো নিয়ে অবিরাম পরিশ্রম করেছে। এখন তারা দিন দিন উন্নতির দিকে যাচ্ছে। সাবেক উইকেটরক্ষক ও নির্বাচক ওয়াসিম বারি পাকিস্তানকে ধুয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান দলের কৌশল বলে কিচ্ছু নেই, নেই কোন পরিকল্পনা। এ কারণেই এই লজ্জা। বিশ্বকাপে ভাল খেলার ধারাটা ধরে রেখে বাংলাদেশ যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা পেছনে হাঁটছি। পাকিস্তানের ক্রিকেট এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। আরেক সাবেক অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক রশিদ লতিফ বলেন, আমরা আসলে কি চাই তা নিজেরাই জানি না। গত পাঁচ বছরে ৯০ জন ক্রিকেটারকে খেলানো হয়েছে, পৃথিবীতে এমন নজির কম। ওপেনিংয়ে ১৯ জনকে দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। কাউকেই থিতু হতে দেয়া হয়নি। দীর্ঘ ১৬ বছর পর প্রথম ম্যাচে হারের পরই ইনজামাম বলেছিলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিশ্বে ওয়ানডেতে জয়-পরাজয় থাকবে। তাই বলে এভাবে! বাংলাদেশের কাছে হারের ধরনই বলে দেয় পাকিস্তানের ক্রিকেট কোন পথে যাচ্ছে। গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ যেখানে অনেক উন্নতি করেছে, সেখানে আমরা হাঁটছি উল্টো পথে। সত্যি বলতে, পাকিস্তান ক্রিকেটের এই অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারছি না।

পাকিস্তানের জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম ডন-এ ছাপা হওয়া পরাজয়ের প্রতিবেদনে মন্তব্যে জসিম হায়দার নামের একজন লিখেছেন, ২৪০ রান তাড়ায় বাংলাদেশ এত সহজে অতিক্রম করল, মনে হচ্ছে আরও এক-দেড়শ রান বেশি থাকলেও সেটি তাদের জন্য কঠিন হতো না! তামিম-মুশফিকদের কাছে আজহারদের ব্যাটিং শেখা উচিত। আরেক পাকিস্তানী দানিয়েলের মন্তব্য, প্রথম হারটাকে অঘটনই ভেবেছিলাম। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই এমন লজ্জার পর বলব, বাংলাদেশ আসলেই যোগ্যতর দল হিসেবে সিরিজ জিতেছে। মজার বিষয় এক ভারতীয় সমর্থক অমিত লিখেছেন, দুঃখিত পাকিস্তানী ভাইয়েরা! অনেক বছর ধরে ক্রিকেট খেলা দেখছি। পাকিস্তানের এই দলটির মতো এমন বাজে দল আর দেখিনি। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ আসন্ন ভারত সিরিজের জন্য প্রস্তুতি সারছে!

পাকিস্তানকে ক্রিকেট শেখানোর কথা বলছেন স্বয়ং দেশটির সাবেকরাই। ক্রিকেটবিশ্বেও প্রশংসার স্রোতে ভাসছেন মাশরাফি, মুশফিকরা। এখন টাইগাদের লক্ষ্য, আজকের তৃতীয় ওয়ানডে জিতে পাকিদের বাংলাওয়াশ করা। এ প্রসঙ্গে অধিনায়ক মাশরাফি বলেন, ৩-০ সমীকরণ তো এসে গেছে। শেষ ম্যাচে চেষ্টা করব সেরাটা দেয়ার। প্রথম দুই ম্যাচে আমরা পারফেক্ট খেলেছি। শেষ ম্যাচে এমন খেললে হোয়াইটওয়াশ সম্ভব। এর আগে বিশ্বকাপে সফল অভিযান শেষে দেশে ফিরে মাশরাফি বলেছিলেন, আল্লাহর রহমতে বিশ্বকাপ মঞ্চে আমরা ভাল খেলেছি। গত জিম্বাবুইয়ে সিরিজের পর থেকেই আমাদের পারফর্মেন্সে উন্নতি হয়েছে। দল যদি এই পারফর্মেন্স ধরে রাখতে পারে তাহলে আগামীতে আরও বেশি সাফল্য পাব, এগিয়ে যাব। আমি বিশ্বাস করি, আগামী বিশ্বকাপে আমরা আরও ভাল করতে পারব। কথা রেখেছেন ম্যাশ। ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে তার দল। যে কারণে বাংলাদেশকে এখন বড় শক্তি হিসেবেই বিবেচনা করছে ক্রিকেটবিশ্ব।

কপিল দেবের নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে ভারত এবং অর্জুনা রানাতুঙ্গার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিশ্বকাপ জয় ক্রিকেট ইতিহাসের স্মরণীয় ঘটনগুলোর মধ্যে শীর্ষে। এ দুটি বিশ্বকাপে ক্রিকেট দেখেছিল দুটি নতুন পরাশক্তির উত্থান। ’৮৩-র বিশ্বকাপ জিতে ভারত ও ’৯৬-র বিশ্বকাপ জিতে শ্রীলঙ্কা বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয়। ভারত, শ্রীলঙ্কার পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশও এখন ক্রিকেটের পরাশক্তি? বিশ্বকাপে মাশরাফির নেতৃত্বে সাকিব, তামিম, নাসিররা বহির্বিশ্বকে দেখিয়েছে বাঘের গর্জন। ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্বকাপ জয়ে না হোক ২০১২ সালের এশিয়া কাপে রানার্সআপ, এবারের বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা ও পাকিস্তানকে ওয়ানডে সিরিজে নাস্তানাবুদ করে বাংলাদেশ জানান দিয়েছে, তারাও এখন ক্রিকেটের বড় শক্তি। তিন বছর আগে এশিয়া কাপে বলতে গেলে পাল্টে যাওয়া বাংলাদেশকেই দেখে ক্রিকেট বিশ্ব। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হার দিয়ে মিশন শুরু হলেও ওই ম্যাচেই বাংলাদেশ জানান দেয় শুধু অংশগ্রহণই তাদের লক্ষ্য নয়। পরের দুই ম্যাচে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো এশিয়ার সেরার আসরের ফাইনাল মঞ্চে জায়গা করে নেয় লাল-সবুজের দেশ। ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারলেও বাংলাদেশের পারফর্মেন্স সবাইকে বিমোহিত করে।

সাফল্যের এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে ২০১৪ সালে। কিন্তু সাময়িক এই ব্যর্থতা কাটিয়ে আবারও চেনা ছন্দে ফিরেছে টাইগাররা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিবর্তনের এ হাওয়া লেগেছে ২০১১ সালের অক্টোবরে সফরকারী ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজ থেকে। এরপর ধারাবাহিকভাবে সাফল্য পেয়ে চলেছে টাইগাররা। ২০১৫ বিশ্বকাপ, ২০১২ সালের এশিয়া কাপ ও পাকিদের বিরুদ্ধে সিরিজ জয়ের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সেরা সাফল্য ছিল ২০০৭ বিশ্বকাপ। ক্যারিবীয় দীপপুঞ্জে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হারিয়েছিল দুই পরাশক্তি ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে। যোগ্যতা অর্জন করেছিল সুপার এইটে খেলার। এবারের বিশ্বকাপে টাইগাররা খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। এরপর ধারাবাহিকতা ধরে রেখে পাকিদের দিয়েছে লজ্জা। ধারাবাহিক এমন নৈপুণ্যের কারণে বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে এখন বড় শক্তি হিসেবেই দেখছে ক্রিকেট বিশ্ব। শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা, ভারতের শচীন টেন্ডুলকরসহ আরও অনেকেই নিঃশঙ্কোচে এমন বলেছেন।

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫

২২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: