মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আজও কি তামিম ঝলক!

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫
আজও কি তামিম ঝলক!
  • মোঃ মামুন রশীদ

তাঁকে চিনে রাখাটা অতীব জরুরী। যুগে যুুগে সফল ব্যক্তিরা, চ্যাম্পিয়নরা এমনই হয়ে থাকেন। সেই কাতারে রাখা যেতেই পারে তাঁকে। দল থেকে বাদ দেয়ার দাবি চারদিকেই শোনা যাচ্ছিল। তবে যাঁরা তামিম ইকবালের পর্যায়টা জানেন, যাঁরা জেনেছেন তাঁর বিশেষ কিছু করার ক্ষমতা আছে তাঁরা হাল ছাড়েননি। ভুলুণ্ঠিত ধারাবাহিকতার কারণে নড়বড়ে হতে শুরু করা তামিমকে ঠিকই দলে রেখে দিয়েছিলেন। সেই আস্থার প্রতিদান অবশেষে ঠিকই দিয়ে দিলেন তামিম। তীব্র সমালোচনা, হাঁটুর ইনজুরি, দলের যখন বিতিকিচ্ছিড়ি পরিস্থিতি একেবারেই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি ফিরে এলেন। শুধু ফিরলেন না, ব্যাট হাতে চপেটাঘাত করলেন নিন্দুকদের, সমালোচকদের গালে। অতীত ভুলে গিয়ে যাঁরা কঠোর সমালোচনা করেছেন তাঁরাই এখন ভ--তপস্বির মতো প্রশংসাবাণ ছুড়ছেন। কিংবা গুণগান গাইতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ তাঁর নিজেকে কিছু বলার প্রয়োজন পড়ছে না, তাঁর নৈপুণ্যই স্তবগীতি গেয়ে যাচ্ছে। টানা দুই সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন এবং দুটিতেই দলকে জেতাতে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। প্রথম ম্যাচে ১৩২ রান করলেন নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে কিছুটা স্বভাবের বাইরে দেখেশুনে খেলে। কিন্তু এ তামিম তো অতীতের তামিম নয়? যার ব্যাটে সবসময় মারকুটে আর ধ্বংসাত্মক মনোভাব প্রকাশ পেত! আগে বাঁচো, তারপর বাঁচাও এবং বীরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ো-এই মন্ত্রই যেন নিয়েছিলেন। আলগা যে খোলস আঁটতে বাধ্য হয়েছিলেন বাজে সময়টা কাটানোর জন্য, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সেটা ভেঙ্গে ফেললেন। পাকিস্তানী বোলারদের তুলোধুনো করে তুলে নিলেন অপরাজিত ১১৬ রানের ইনিংস। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম কোন সিরিজ জয়ের নায়ক তামিম। প্রতিপক্ষ বোলারদের জন্য ভীতিকর তামিমের আবার নবজন্ম ঘটল এই ইনিংসের মধ্য দিয়ে।

ক্রিস গেইল, তিলকারতেœ দিলশান, ব্রেন্ডন ম্যাককুলাম, ডেভিড ওয়ার্নার, শেন ওয়াটসন, এবি ডি ভিলিয়ার্স এই নামগুলো সারাবিশ্বে যত ক্রিকেটপ্রেমী ছড়িয়ে আছেন এর মধ্যে কে শোনেননি? এমনকি ক্রিকেট পছন্দ করেন না তাঁরাও শুনেছেন। কারণ বিস্ময়কর কিছু উপহার দিয়েছেন তাঁরাই। এজন্য লোকমুখে ছড়িয়েছে তাঁদের নাম। সারা দিনব্যাপী চলা ক্রিকেট উপভোগ করার মতো ক্রীড়া সেটা তাঁরাই বুঝিয়ে দিয়েছেন আক্রমণাত্মক মেজাজের ব্যাটিং করে। সেই গেইল ছিলেন দীর্ঘ দেড় বছর আর ১৯ ইনিংস রান খরায়। এই ১৯ ইনিংসে তিনি একটি মাত্র অর্ধশতক হাঁকাতে পেরেছিলেন। তবু তাঁকে বাদ দেয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল। দিলশান ব্যাট হাতে অতীতে যা করেছিলেন সেজন্য মাঝে অনেকদিন ব্যাটে রানের খরা থাকলেও বাদ দেয়া হয়নি। ওয়াটসন একইভাবে টিকে আছেন এখনও। ম্যাককুলামের ব্যাটেও ধারাবাহিকতার চরম অভাব। তিনি এখন দলের অধিনায়ক। দলকে উজ্জীবিত করার জন্য, বাড়তি অনুপ্রেরণা পাওয়ার জন্য এসব ব্যাটসম্যানের প্রয়োজন। এছাড়া প্রতিপক্ষ শিবিরে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্যও। ফর্মে থাকুন বা না থাকুন গেইল, ভিলিয়ার্স, ম্যাককুলাম, ওয়ার্নার, ওয়াটসন, দিলশানরা শুধু এই একটি কারণেই দলে থেকে যান। কারণ একটা দিন জ্বলে উঠলেই হলো, সেটা অগ্নিকু- নয় হয়ে যায় দাবানল। প্রমাণ এবার বিশ্বকাপে রানখরা কাটিয়ে জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে গেইলের ২১৫ রানের অতিমানবীয় বিধ্বংসী টর্নেডো ইনিংস। এ কারণেই প্রতিপক্ষদের সবসময়ই পরিকল্পনা আঁটতে হয় এই ব্যাটসম্যানদের নিয়ে। আর ওই সুযোগে যে ক্রিকেটারের ওপর তেমন আলো নেই তিনিই দলের জন্য বড় কিছু করে বসেন। বাংলাদেশ দলে এমন ওপেনার অনেকদিন আসেনি। শেষ পর্যন্ত আসলেন তামিম। এমন কিছু ইনিংস খেললেন যার কারণে তাঁকে সবসময়ই প্রতিপক্ষ দলের পরিকল্পনায় রাখতে হলো।

ধারাবাহিকতা কেমন হতে পারে সেটারও কি প্রমাণ তিনি দেননি? অনেক জল্পনা-কল্পনা আর বিতর্ক পেছনে ফেলে দলে জায়গা করে নিয়ে ২০১২ এশিয়া কাপে টানা চারটি হাফ সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। ফিটনেস সমস্যা এবং ফর্মহীনতার অভিযোগে তাঁকে প্রাথমিকভাবে বাদ দেয়া হয়েছিল ঘোষিত দল থেকে। অথচ টানা চার হাফসেঞ্চুরি এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান করে দেখাতে পারেননি। সারা বিশ্বই অবাক হয়ে দেখেছিল তামিমকে। এ কারণেই তামিম থাকবেন, আছেন এবং ছিলেন। কারণ তিনিই পারেন রূপকথাকে বাস্তব করতে।

রানখরায় থাকলেও তামিমকে নিয়ে প্রতিপক্ষ শিবির সবসময়ই আলাদা পরিকল্পনা করেছেন। এখন আর বাংলাদেশ দল একক কোন ক্রিকেটার নির্ভর দল নয়। বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে দারুণ কিছু করে ম্যাচজয়ী নৈপুণ্য দেখিয়েছেন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, মুশফিকুর রহীম ও রুবেল হোসেনরা। আর আগে সাকিব আল হাসান ও মাশরাফি বিন মর্তুজারা ছিলেন এককভাবে। বিশ্বকাপ শেষে এখন পর্যন্ত চলতি সিরিজে সেই দায়িত্বটা নিয়েছেন তামিম-মুশফিক। প্রতিপক্ষ বোলারদের দুমড়ে-মুচড়ে দেয়া, প্রতিপক্ষ শিবিরে ত্রাসোদ্দীপক চেহারাটা দেখিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো সেটা যেন হারিয়ে গিয়েছিল। সে কারণেই বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৯৫ রান করার পরের ম্যাচেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে যখন ২ রানে আউট হয়ে গেলেন তখনও তাঁকে সমালোচনার বিষাক্ত থাবা আঘাত করল। পরে আর হতাশায় বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতেও ভাল করতে পারেননি। তবে হতাশ হলেও ভেঙ্গে পড়েননি তামিম। এর কারণ দলের সতীর্থরা। সবাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন তামিম একটা কিছু করবেন। সেই প্রত্যাশা কোন ম্যাচেই বিন্দুমাত্র কমেনি। আর সবচেয়ে বেশি সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা ও টেস্ট অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম। মন থেকে এ দু’জনকে ও সতীর্থদের বিশ্বাসকে কৃতজ্ঞতা জানালেন তামিম। ফিরে আসার পেছনে সমালোচনাও অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। তামিম জানিয়েছেন এ কারণে আরও তাগাদা অনুভব করেছেন দারুণ কিছু একটা করতে হবে। অবশেষে তাই করলেন।

নাফীস ও মাহমুদুল্লাহর পর তৃতীয় বাংলাদেশী হিসেবে ওয়ানডেতে টানা দুই শতক হাঁকালেন। দ্বিতীয় ওয়ানডেতেও (১১৬*) সেঞ্চুরি হাঁকানোর পর ওয়ানডে ক্যারিয়ারে শতক সংখ্যা হয়েছে সাকিব আল হাসানের সমান ৬টি। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বাধিক। প্রথম ওয়ানডেতে তামিম করেছিলেন ১৩২। টানা দুই শতক হাঁকিয়ে তামিম ওয়ানডেতে রান করার দিক থেকেও এখন সবাইকে ছাড়িয়ে। ১৪৩ ম্যাচে ৩১.২৩ গড়ে তাঁর রান ৪৩৭৩। তাঁর পেছনেই সাকিব ১৪৯ ম্যাচে ৩৪.৮০ গড়ে ৪২১১। ব্যাটে ঝড় তোলাতে জুড়ি নেই তামিমের। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মাত্র ৩১ বলে অর্ধশতক হাঁকিয়ে সেটার জানান দিয়েছেন। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বাধিক চার-ছক্কার মালিকও তিনি। এখন পর্যন্ত ৪৯৬টি চার ও ৫৭ ছক্কা হাঁকিয়েছেন। ৩৭৫ চার হাঁকিয়ে সাকিব এবং ৫০ ছক্কা হাঁকিয়ে মুশফিক আছেন দুইয়ে। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসটাও বেরিয়ে এসেছে এ আক্রমণাত্মক মেজাজের ব্যাটসম্যানের উইলো থেকে। ২০০৯ সালের ১৬ আগস্ট জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে বুলাওয়েতে ১৩৮ বলে ৭ চার ও ৬ ছক্কায় করেছিলেন ১৫৪! দ্বিতীয় স্থানে সাকিবের অপরাজিত ১৩৪। তিনি সেটা করেছিলেন কানাডার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেন্ট জনসে।

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫

২২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: