আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব বেশি

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫
  • ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক
  • মুনতাসীর মামুন

(২১ এপ্রিলের পর)

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত হয় সামরিক ফ্রন্টের বেসামরিক রাজনীতিবিদের যোগাযোগ। সব মিলিয়ে এ ধারণার সৃষ্টি করা হয় যে, ‘আগের সরকারই ছিল ভালো।’

গত তিন-দশকে সামরিক আধিপত্যের কারণে বেশ কিছু বদ্ধমূল ধারণার সৃষ্টি করা হয়েছে প্রচার-মাধ্যমের যথেচ্ছ ব্যবহারে। যেমন, ত্রাণকাজ।

পৃথিবীর সব দেশেই ত্রাণকাজে নিযুক্ত করা হয় সামরিক বাহিনী এবং এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কিন্তু এখানে ত্রাণকাজে সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ নিয়ে মাত্রাতিরিক্তভাবে এ-কথাই তুলে ধরা হয়েছে যে, ত্রাণকাজে বেসামরিক কর্তৃপক্ষ দুর্বল ও দুর্নীতিপূর্ণ। দুর্নীতির কথা আংশিক সত্য হলেও এ-কথা কেউ তলিয়ে দেখেনি যে, একটি দুর্গত এলাকায় সামরিক বাহিনী যত দ্রুত যেতে পারে, বেসামরিক কর্তৃপক্ষ তত দ্রুত হয়ত যেতে পারে না লজিস্টিক কারণে। ফলে, দেখা যায় যে, দুর্যোগে তারা সামরিক বাহিনীকে চায়। ১৯৯১ সালে বেসামরিক কর্তৃত্ব স্থগিত হওয়ার পর দুর্যোগের সময় অনেকেই এ কথা বলেছিলেন যে, এরশাদ থাকলে আরও দ্রুত ত্রাণকাজ করা যেত। শুধু তাই নয়, সেবার দুর্যোগ এলাকার মানুষ দেশীয় সামরিক বাহিনীর থেকে বিদেশী মার্কিন বাহিনী সম্পর্কে আরও বেশি উচ্ছ্বাস দেখিয়েছে।

॥ ৪ ॥

ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে পাকিস্তানে সামরিক কর্মকর্তারা প্রবলভাবে ধর্ম ব্যবহার করেন। আইয়ুব খান ও জিয়াউল হক এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পাকিস্তান আমলে সরকারবিরোধী কোন আন্দোলন শুরু হলেই প্রচার করা হতো ইসলামবিরোধীরা মাঠে নেমেছে ভারতীয় হিন্দুদের সাহায্যে। জিয়াউল হক পাকিস্তানকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন যা থেকে পাকিস্তানীরা মুক্তি পাচ্ছেন না। বাংলাদেশে জিয়াউর রহমান প্রথম ধর্মের ব্যবহার শুরু করেন, সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেন আর এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করেন। বঙ্গবন্ধু সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়ে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় নীতি করেছিলেন। এখন শেখ হাসিনা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি অনুগত থাকলেও বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম থেকে সংবিধান ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে পারছেন না। তাত্ত্বিকভাবে ধর্ম ব্যবহার ও মৌলবাদ আলাদা বিষয় কিন্তু পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায় দু’টি প্রত্যয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান এবং এ কারণে দেখা যাচ্ছে, ধর্ম ব্যবহারের ফলে ধর্মের প্রতি বা ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতি সাধারণের বিরূপ মনোভাব দেখা দেয়নি এবং মৌলবাদ বিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে যা অন্তিমে আবার সাহায্য করে সামরিকতন্ত্রকে। পাকিস্তানী এই মনোভাব কী ভাবে বাঙালীদের প্রভাবিত করেছে তার একটি উদাহরণ দিই।

মানবতাবিরোধী অপরাধ সব দেশ পরিত্যাজ্য এবং যে সব রাজনৈতিক দল এসব অপরাধ করেছে তাদের জন্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ প্রভৃতিকে সামরিক শাসকরা রাজনীতিতে শুধু ফিরয়ে আনা নয়, প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবং দেশের মানুষ শুধু তা মেনেই নেয়নি, তাদের সমর্থকদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীতে কোন দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের কোন ব্যক্তি প্রকাশ্যে সমর্থন জানায় না, জানাতে পারে না। বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যেখানে বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দল বিএনপি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের দলকে সমর্থন করে, ক্ষমতায় নিয়ে যায় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধীর দণ্ড দিলে তার প্রতিবাদ করে। পাকিস্তানও সঙ্গে সঙ্গে তা অনুমোদন করে। কাদের মোল্লার দণ্ড ও দণ্ড কার্যকর এর উদাহরণ। স্বাধীন হয়েছি বলি কিন্তু মনটা বাঁধা আছে পাকিস্তান, ঔপনিবেশিক প্রভুদের কাছে।

এ উপমহাদেশে, বিশেষ করে অষ্টাদশ-উনিশ শতকে উলেমা শ্রেণী শাসকবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তৎকালীন পূর্ববঙ্গে শরীয়তউল্লাহ, দুদু মিয়া বা কেরামত আলী এর উদাহরণ। কিন্তু ক্রমে এ ঐতিহ্য লোপ পেয়েছে। ১৯৪৭ ভারত বিভাগের পর পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিশেষ করে সামরিক শাসনের ত্রিশ বছরে পরিবর্তন হয়েছে পরিস্থিতির। এ প্রক্রিয়া শুধু ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশে ধর্ম ব্যবহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালে যা বিদ্যমান ২০০৮ সাল পর্যন্ত। বিশেষ করে এরশাদ ও খালেদার শাসনামলে তা জোরদার হয়েছে। এ কারণে দেখি, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের অবস্থার মিল আছে আবার অন্যদিকে, বার্মা এবং একসময় ভিয়েতনামেও ধর্ম-ব্যবহার বা ধর্মে হস্তক্ষেপের কারণে বৌদ্ধ-ভিক্ষুরা জোরালোভাবে প্রতিরোধ করেছে।

সামরিক শাসকরা দু-ভাবে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত (এখানে ইসলাম ধর্ম বোঝানো হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান) মোল্লা-মৌলভীদের বশে আনেন। এক, ধর্মের প্রচার করে; দুই, পার্থিব সুবিধা বা প্রলোভন দিয়ে। যারা অধিক পরিমাণে ধর্মভীরু কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান কম, তারা প্রচার-ঝড়ে ভাবেন দেশে বুঝি ধর্মের প্রতিষ্ঠা হলো এবং এ প্রচারে এটাও বোঝানো হয় যে, কর্তৃত্বের প্রতি অনুগত থাকা বাঞ্ছনীয়। গ্রামাঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই এ প্রচার বিস্তার লাভ করে এবং ধর্মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা প্রান্তিক ক্ষমতা বা সামাজিক কর্তৃত্ব লাভ করে। শহরাঞ্চলে পার্থিব সুবিধা বেশি কাজে দেয় এবং ধর্মীয় এলিটরা ক্ষমতায় একধরনের অংশীদার হিসেবে পরিগণিত হন। এভাবে, জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করা হয়। অন্যদিকে, প্রচারে মৌলবাদ বিকশিত হতে থাকে যা আবার অন্তিমে সাহায্য করে সামরিকতন্ত্রকে, কর্তৃত্ব বিস্তারে। ইরানে যারা মৌলবাদ বিকাশে সহায়তা করেছিলেন তারা তা অনুধাবন করে একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। বাংলাদেশে তা নয় বরং তা সহায়তা করে একনায়কতন্ত্রকে। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি-

১। জিয়াউর রহমানের সময় থেকে টেলিভিশন, রেডিও ও সরকারী কর্মকাণ্ডে ধর্মের ব্যবহার শুরু হয়। তিনি শাসনতন্ত্র থেকে বঙ্গভবনে চেয়ারের পেছনে যুক্ত করলেন বিস্মিল্লাহির রাহ্মানের রাহিম। বাংলাদেশে প্রায় সব মুসলমানই কোন কাজ শুরু করার আগে বিস্মিল্লাহ বলেন। কিন্তু সর্বগ্রাসী লোক-দেখানো এই প্রচারে এ বক্তব্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বলা হয়েছে যে পূর্ববর্তী আমল ছিল ধর্মবিরোধী, অর্থাৎ হিন্দু-ভারতের পক্ষে। সেনাবাহিনী মুসলমান অর্থাৎ মুসলিম বাংলা জাতীয়তাবাদের পক্ষে। ফলে, জামায়াত বা এ ধরনের দলগুলোর সঙ্গে স্থাপিত হলো সম্পর্ক।

এরশাদ এ প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার করলেন। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মসজিদ নির্মাণে উৎসাহ যোগানো হলো। তিনি প্রতি শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে ভাষণ দিতে লাগলেন। মসজিদে বিদ্যুত পর্যন্ত বিনামূল্যে দেয়া হলো। তিনি ঘন ঘন পীরদের কাছে যেতে লাগলেন।

যারা ধর্ম-ব্যবসায়ী তারা এ থেকে পার্থিব সুবিধা পেল। যেমন, আলবদর আবদুল মান্নান মাদ্রাসা-শিক্ষকদের একত্রিত করে এরশাদকে সোচ্চার সমর্থন করলেন। নিজে প্রভূত অর্থের মালিক হলেন, মাদ্রাসা-শিক্ষকদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হলো। তারা নিজেদের ক্ষমতার অংশীদার মনে করলেন এবং গ্রামাঞ্চলে মাদ্রাসা-শিক্ষকরা এরশাদ-বন্দনায় নিযুক্ত থাকলেন। কারণ তারা মানসিকভাবে নিজেদেরকে তখন ক্ষমতার প্রান্তিক অংশীদার ভেবে তৃপ্তি পেতেন। মসজিদের নামে দামী জায়গা দখল করা হলো, যার নিচে বা পাশে দোকান নির্মিত হলো। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে ঢাকা শহরে অন্তত এ বিষয়ে দুটি উদাহরণের কথা অনেকে উল্লেখ করেন- কাঁটাবন ও মহাখালী।

এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগ যে কোন দলে নেতা বক্তৃতা শুরুর আগে ‘বিস্মিল্লাহ’ বলে নেন যা একান্তই লোক দেখানো বা লিপ-সার্ভিস। ‘বিস্মিল্লাহ’ না বললে মনে হয়, ‘অপরাধ’ করা হলো। অনুষ্ঠান শুরুর আগে কোরান তেলাওয়াত এখন বাধ্যতামূলক। ‘খোদা হাফেজ’ এর জায়গায় স্থান নিয়েছে ‘আল্লাহ হাফেজ’। প্রথমোক্তটি ফার্সি। সুতরাং জায়েজ নয়। নতুন প্রজন্ম জানে না যে ‘খোদা হাফেজ’ বলে দুটি শব্দ ছিল। গণভবন, বঙ্গভবন থেকে, সেনানিবাস থেকে, সবখানে বড় অক্ষরে উৎকীর্ণ কোরানের আয়াত যা দেখা যাবে শুধু পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে। অবৈধ জায়গায় মসজিদ স্থাপিত হলে তা থেকেই যাচ্ছে।

২. মসজিদে, ওয়াজে, মাহফিলে প্রগতিবিরোধী বক্তব্য হাজির করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে বলা হতো, নারী নেতৃত্ব নাজায়েজ। এখানে উল্লেখ্য, এরশাদবিরোধী আন্দোলন নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন দুজন মহিলাÑ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা। পাকিস্তানেও বেনজীর ভুট্টোর বিরুদ্ধে একই বক্তব্য হাজির করা হয়েছিল এবং হচ্ছে। বাংলাদেশে গণআন্দোলনের পরও ঐ প্রক্রিয়া অব্যাহত। অনেক ক্ষেত্রে এর প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু প্রায় ক্ষেত্রেই হয়নি। কারণ প্রতিবাদকারীরা ধর্ম-উন্মাদনার সম্মুখীন হতে চাননি অথচ এরশাদের চরিত্র যে ফুলের মতো পবিত্র ছিল না, তা অধিকাংশ মানুষের অজানা ছিল না।

সে আমলে বড় বড় বিলবোর্ড বসানো হয়েছিল। হাদিসের উদ্ধৃতি সেখানে থাকত। এই সব হাদিসের মূল বক্তব্য ছিল, কর্তৃত্বের [অর্থাৎ এরশাদের] প্রতি অনুগত থাকা বাঞ্ছনীয়।

৩. সামরিক শাসনে দেশের অর্থনীতি সঙ্কটময় হয়ে উঠলে মানুষ পরিত্রাণের বিকল্প পথ না-পেয়ে নিয়তিবাদী হয়ে ওঠে। এ কারণে, গত ২০ বছরে লক্ষ্য করেছি, মসজিদ স্থাপনে মানুষ দান করেছে বেশি এবং জুমার দিনে মুসল্লিদের ভিড়ে মসজিদ একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

৪. এ ধরনের প্রচারে মৌলবাদের চরিত্রগুলো বিকশিত হতে থাকে। যেমন, হঠাৎ করে এরশাদ আমলে ঘোষণা করা হলো রোজার দিন সমস্ত খাবারের দোকানপাট বন্ধ থাকবে। অফিসে-আদালতে নামাজ পড়ার আলাদা স্থান নির্দিষ্ট হতে লাগল। গ্রামাঞ্চলে মহিলাদের বোরখা ও শহরাঞ্চলে শিক্ষিত মহিলারা স্কার্ফ পরা শুরু করলেন। শিশুরা এ ধরনের প্রচারে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত হয়ে অপেক্ষাকৃত কম ধর্মভীরু পিতামাতার ধর্মীয় চালচলনে আধিক্য না-দেখে প্রশ্ন করা শুরু করল। এভাবে, সামগ্রিকভাবে পরিবার, পাড়া, কর্মস্থল, সমাজে ধর্ম-ব্যবসায়ীদের বিরোধী বা প্রগতিশীলরা মানসিক চাপের সম্মুখীন হলেন। মসজিদে না গিয়ে রোজার দিনে রোজা না রেখে অপরাধবোধের শিকার হতে লাগলেন।

এখন রোজার সময় যে বাধ্যবাধকতা মানুষ অনুভব করে পাকিস্তান আমলেও তা ছিল না। স্বল্প বয়সে হিজাব আগে দেখা যায়নি। এখন অসংখ্য।

(চলবে)

প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৫

২২/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: