কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

টেকসই ঢাকা টেকসই অর্থনীতি

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০১৫
  • ড. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন খান

প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদের যুক্তিসম্মত অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার নামই হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন। উন্নত পরিবেশ টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি রচনা করে। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের জনগোষ্ঠীর অপরিকল্পিত ও অবিবেচনাপ্রসূত নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকা- এবং সরকারগুলোর অত্যন্ত অপরিকল্পিত তথাকথিত উন্নয়ন কর্মকা-ের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে। মিষ্টি পানির জলাধারগুলোর অধিকাংশ মরে গেছে। পানি, বায়ু ও মাটি দূষিত হয়ে গেছে। রাজধানীর চারদিকের নদীগুলো দখল-জবরদখলকারীদের আগ্রাসনে সরু খালে পরিণত হয়েছে, আর খালগুলো তো বহু পূর্বেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গত শতাব্দীর আশির দশকে ব্যক্তিগত খাতে আবাসন শিল্পের বিকাশ তথা রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, ব্যক্তিগত ও সরকারী অপরিকল্পিত নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কারণে ঢাকা বৈষম্যপূর্ণ, দুর্গন্ধময় ও নৈরাজ্যপূর্ণ এক নোংরা বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় কম সড়ক (প্রয়োজন ২৫%, আছে মাত্র ৮%), সরু সড়ক, ক্ষুদ্র যানবাহনের আধিক্য, পাতাল রেল ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহনের অনুপস্থিতি, আধুনিক ফুটপাথ, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি আসলে মহানগরীকে মানুষের বসবাসের অনুপোযোগী করে ফেলেছে। গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে এখানে বসবাসকারী প্রায় দেড় কোটি মানুষ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ জরুরী। এক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণই পারে ঢাকা শহরের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে, যা দেশের অর্থনীতিকে টেকসই করতে ভূমিকা রাখবে।

গোটা পয়ঃপ্রণালী সড়কের পাশ দিয়ে নিয়ে তার ওপরে অন্তত দেড়-দুই ফুট উচ্চতার সøাব দিয়ে ফুটপথ গড়ে তোলা যেতে পারে। এটা করলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে এবং মানুষ ফুটপথ ব্যবহারে অবশ্যই অভ্যস্ত হবে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জৈব ও অজৈব বর্জ্যরে জন্য পৃথক ডাস্টবিনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অথবা একই ডাস্টবিনের দুটো মুখ থাকতে পারে, একটা দিয়ে জৈব ও অন্যটি দিয়ে অজৈব বর্জ্য ফেলার জন্য। অবশ্যই ডাস্টবিনের গায়ে এ সংক্রান্ত স্টিকার সেঁটে দিতে হবে। প্রত্যেক পরিবারকে প্রতিদিন দুটো করে পলিথিনের বড় কালো ব্যাগ সরবরাহ করা যেতে পারে, একটি জৈব ও অন্যটি অজৈব বর্জ্যরে জন্য। বর্জ্য রিসাইকেল অত্যন্ত জরুরী ভিত্তিতে করতে হবে। জৈব বর্জ্য থেকে বিদ্যুত ও সার উৎপাদিত হবে এবং অজৈব বর্জ্য থেকে রকমারি পণ্য উৎপাদিত হবে।

সড়কসমূহ যতটা সম্ভব প্রশস্ত করা জরুরী। বিদ্যুতের তারগুলো সব মাটির নিচ দিয়ে টানার ব্যবস্থা করলে ভাল হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটা নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হবে। রাস্তা পারাপার বা ক্রসিংয়ের জন্য উন্নত দেশের আদলে অত্যন্ত সুপরিসর আন্ডারপাস জরুরী ভিত্তিতে এবং সর্বত্র নির্মাণ করতে হবে। অবশ্যই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত অপরিসর ওভারব্রিজগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। মেগাসিটি ঢাকার পরিবহন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদে পাতাল রেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি সমাধান তথা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও রেলওয়ে নির্মাণ খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না।

খালগুলো অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। ওগুলো গভীর করে খননপূর্বক দু’তীর কংক্রিটে বাঁধাই করে দিতে হবে। এগুলোর সঙ্গে পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার সংযোগপূর্বক সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নদীগুলোর তীর মুক্ত করতে হবে যেকোন মূল্যে। ওগুলোরও দু’তীর কংক্রিটে বাঁধাইপূর্বক সুদৃশ্য ওয়াকওয়ে নির্মাণ করতে হবে। কোনক্রমেই ফেলে রাখা যাবে না। দীর্ঘসূত্রিতা এক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে না। খালগুলোর সঙ্গে সঙ্গে নদীগুলোও গভীর করে খননপূর্বক সংযোগ প্রদানপূর্বক সুসমন্বিত এক নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনকে ১৯৭২ সালের মর্যাদায় পুনর্প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এর খোল-নলচে বদলে ফেলতে হবে। দেশের সেরা বিশেষজ্ঞদের এখানে নিয়ে আসতে হবে। একে সম্পূর্ণরূপে আমলাতান্ত্রিকতামুক্ত করতে হবে। সকল বিভাগীয় শহরে এর শাখা খুলতে হবে এবং ওগুলোতেও বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের দেশের সকল সম্পদের সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এর কোন বিকল্প নেই। আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, রাজধানীকে দু’ভাগ না করে দিল্লীর আদলে সিটি গবর্মেন্ট বা নগর সরকার গঠন করা হলে ভাল হতো। আধুনিক দক্ষ ব্যবস্থাপনার স্বার্থেই এটা করা আবশ্যক।

ঢাকার টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থায়ন বড় চিন্তার বিষয়। তবে জনগণ যেহেতু পরিচ্ছন্ন, সুস্থ, জঞ্জালমুক্ত, নৈরাজ্যমুক্ত পরিবেশ চায়, তাই তারা কর দেবে। এজন্য শুধু প্রয়োজন সচেতনতা গড়ে তোলা। ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন পরিবহন মাধ্যমের টিকিটের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ লেভি আরোপ করা যেতে পারে। আর একটা ব্যবস্থা হতে পারে যে, নির্দিষ্ট চুক্তিতে বিদেশীদের বিশেষ করে চীনাদের দিয়ে দেয়া। তারা নির্মাণ করে নির্দিষ্ট সময়ের আয়টা নিজেরা নেবে। এরপর আমাদের সরকারকে বুঝিয়ে দিয়ে যাবে। অবশ্যই চুক্তি করার সময়ে লিজের সময়টা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিতে পারলে ঢাকা শহরের টেকসই উন্নয়ন যেমন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, তেমনি শহরের অর্থনৈতিক কর্মকা-েও গতি আনা সম্ভব হবে।

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ

অর্থনীতি সমিতি

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০১৫

১৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: