কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পুলিশ বলছে নারীর বিবস্ত্র করার চিত্রটি সঠিক নয় ॥ চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০১৫
  • বিবস্ত্র করা ছবিটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ম ব্যাচের ছাত্র নাজমুলের
  • সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতে চাপদাড়ি মুখে চার রহস্যজনক যুবককে দেখা যাচ্ছে

জনকণ্ঠ রিপোর্ট ॥ পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বর্ষবরণ উৎসবে নারীর যৌন হয়রানির ঘটনাটি নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে উগ্র মৌলবাদী ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। পরিকল্পিতভাবে এক যুবককে গণধোলাই দিয়ে বিবস্ত্র করার পর তা নারীকে বিবস্ত্র করে যৌন হয়রানি করা হয়েছে বলে অপপ্রচার শুরু করেছে মহলটি। প্রগতিশীল ধারাকে স্তব্ধ করে দিতে জঙ্গী কায়দায় মাঠে নামানো হয়েছে একদল উচ্ছৃঙ্খল যুবককে, যাদের মুখে দাড়ি দেখা যাচ্ছে ধারণ করা ভিডিওতে। এই ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মুখপাত্র পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোঃ মনিরুল ইসলাম বলেছেন, নারীকে বিবস্ত্র করে যৌন হয়রানি করার কোন ঘটনা ঘটেনি, এক যুবককে গণধোলাই দিয়ে বিবস্ত্র করে তার ছবি মিডিয়ার মাধ্যমে অপপ্রচার করানো হচ্ছে।

পুলিশের তদন্তে দেখা গেছে, পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বর্ষবরণ উৎসবে কতিপয় যুবক নারীকে বিবস্ত্র করে যৌন হয়রানি করছে বলে খবর প্রচার করার পর পুলিশ ও গোয়েন্দারা তদন্তের জন্য মাঠে নেমেছে। তারা ঘটনাস্থলের ভিডিওতে ধারণ করা দৃশ্য পরীক্ষা করেছে। ওই ঘটনার সংবাদের সঙ্গে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ছবি নয়। এটি ওইদিন বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় নাজমুল নামে এক যুবককে গণধোলাই দেয়ার ছবি। নাজমুল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ৭ম ব্যাচের শিক্ষার্থী বলে পরিচয় পেয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরে দেশের কিছু গণমাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারীর যৌন হয়রানির ছবি বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যে ছবিটি নিয়ে বর্তমানে এত বিতর্ক সেই ছবিটির ঠিক আগে-পরে তোলা ছবি দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। বিভ্রান্তি থেকে বিতর্কের সৃষ্টি হয়ে শুরু হয়েছে তোলপাড়।

ডিএমপির মুখপাত্রের দাবি ॥ পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় যৌন হয়রানির ঘটনায় প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজের বিবস্ত্র ছবিটি কোন মেয়ের নয় বলে দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, চানখারপুলের গণপিটুনির একটি ঘটনাকে মেয়ে বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। শনিবার সকালে ইসলাম সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, আসলে যে ঘটনা ঘটেছে, যেটা নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড় হচ্ছে, সে বিষয়টি আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত করার জন্য আমাদের দুটি কমিটি গঠিত হয়েছে। শুধু পুলিশের ওই দিন যারা ডিউটিতে (দায়িত্ব) ছিল, তাদের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য একটা কমিটি হয়েছে। আরেকটা কমিটি হয়েছে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, সেটি জানার জন্যও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেবে বলে জানান তিনি।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে যে ইনফর্মেশন রয়েছে, যেটা সিসি টিভির ফুটেজ। এ ছাড়া পত্র-পত্রিকায়, মিডিয়ায় প্রকাশিত-প্রচারিত যেসব ফুটেজ আছে, তা আমরা বিশ্লেষণ করেছি। তা থেকে যেটা পেয়েছি, বিবস্ত্র করার যে ছবি প্রকাশিত হয়েছে সেটি আসলে কোন মেয়ের ছবি নয়, এটি ঢাকা ইউনিভার্সিটি বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেরও নয়; এটি চানখারপুলে একটি ছেলেকে কয়েকজন ধরে গণপিটুনি দিচ্ছে। আমরা দেখেছি তাকে মেয়ে বলে চালিয়ে দেয়ার একটা চেষ্টা কেউ কেউ করেছে। তবে টিএসসির আশপাশের এলাকায় ঠেলাঠেলি হয়েছে বলে স্বীকার করে মনিরুল ইসলাম বলেন, এখানে ঠেলা-ধাক্কা, হাতাহাতি হয়েছে। একেবারেই কিছু বিকৃতমনা যুবক এবং যারা অপুুরুষসুলভ, তারাই হয়ত এ কাজটি করেছে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

পরিচয় গোপন রাখা হবে ॥ পহেলা বৈশাখের সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে নারীর যৌন হেনস্থার ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য দিয়ে সাহায্য করার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। এমন ঘটনার শিকার নারী বা অন্য কেউ পুলিশকে তথ্য দিয়ে গেলে তার পরিচয় গোপন রাখা হবে বলেও নিশ্চয়তা দিয়েছে তারা। আজ শনিবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে ডিএমপির মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। তিনি আরও জানান, টিএসসির ওই ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত ওই ঘটনার কোন অপরাধীকে শনাক্ত করা যায়নি বলেও জানান তিনি।

তদন্ত কমিটির তদন্ত শুরু ॥ পুলিশের তদন্ত কমিটি ছাড়াও ওই দিনের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। কমিটির আহ্বায়ক সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক নাসরীন আহমাদের দফতরে আগামী ২৩ এপ্রিলের মধ্যে প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। টিএসসির ওই ঘটনা তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে আইজিপি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে কেন শাস্তিুমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে আদালত রুল জারি করেছে।

পুলিশের ভিডিও ॥ পুলিশের একটি ভিডিওতে দেখা গেল, নববর্ষের দিনে যে চার যুবক নারীকে হেনস্থা করছে, তাদের সবার মুখে দাড়ি। এরাই ঘুরে ঘুরে এসব করছিল। পরিকল্পিতভাবেই এটা করা হচ্ছিল বলে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল। নারীর শ্লীলতাহানির অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে বসানো পুলিশের পাঁচ নম্বর সিসি ক্যামেরায় সন্ধ্যা ছয়টা ২২ মিনিট থেকে সাতটা ২২ মিনিট পর্যন্ত ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, একদল তরুণ বার বার মেয়েদের ঘিরে ধরছে। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করছে। এ রকম দশটি দৃশ্য ধরা পড়েছে ফুটেজটিতে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অন্তত চারজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। যারা ওই জায়গার মধ্যেই ঘোরাঘুরি করেছিল এবং ঠেলাঠেলি করে জটলা তৈরি করেছিল তারা মেয়েদের ঘিরে ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে গায়ে হাত দিচ্ছিল। এসব কাজে যে চারজন ছেলের মুখ বার বার এসেছে তাদের মুখে হাল্কা চাপদাড়ি লক্ষ্য করা গেছে। এদের হামলা থেকে বয়স্ক নারী ও শিশুও রক্ষা পায়নি। ওই সব ফুটেজে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি লিটন নন্দীকে ওই তরুণদের সঙ্গে মারামারি করতে দেখা যায়। সন্ধ্যা সাতটার পরে দৃশ্যপটে পুলিশ আসে। লাঠিপেটা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এর পরই ওই এলাকায় ভিড় হাল্কা হয়ে আসে। যানবাহনও চলাচল শুরু করে। লাঠিপেটার পর তরুণদের একজনকে ঘটনাস্থলে ঘুরতে দেখা যায়।

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০১৫

১৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: