মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

একুশ শতক ॥ কম্পিউটার মানেই রোমান হরফ

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০১৫
  • মোস্তাফা জব্বার

॥ দুই ॥

ইডেন কলেজের ছাত্রীদের বাছাই পরীক্ষা নেয়ার ঘটনাটির পর আমি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্তদের কাছ থেকে জেনেছি, এই প্রশিক্ষণটি পরিচালনা করছে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। তারা নাকি ইংরেজীতে প্রশিক্ষণ দেবে। দুনিয়ার আরও কয়েকটি দেশে তারা এমন পরীক্ষা নিয়েছে ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ জন্য তারা তাদের পুরনো কোর্স ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করার সুবিধার্থে ইংরেজী জানা লোকজনকে বাছাই করছে। এরই মাঝে তারা তিতুমীর কলেজেও এমন আরও একটি পরীক্ষা নিয়েছে। সেখানকার প্রশ্নপত্রেও একইভাবে প্রশিক্ষণার্থীর ইংরেজী জ্ঞান যাচাই করা হয়েছে।

খুব সঙ্গতকারণেই বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে এ ধরনের কাজ করা হচ্ছে বলে আমি বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের গোচরে আনি। আমার সৌভাগ্য যে, এরপর প্রকল্প পরিচালক শিল্পখাতের সঙ্গে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেন। আবারও ধন্যবাদ যে, তারা আমাকেও সেখানে আমন্ত্রণ জানান এবং কথা বলারও সুযোগ দেন। সেখানে আমি প্রসঙ্গটি উত্থাপন করি। আমি আনন্দিত এটি জেনে যে, বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর জানান, প্রশিক্ষণটি বাংলায় দেয়ার জন্য তারা আগেই দাবি উত্থাপন করেছেন এবং মন্ত্রণালয় ও প্রকল্পের পক্ষ থেকে সেটি তারা মেনেও নেন। সেখানেই জানতে পারি, বেসিস সদস্য মামনুন কাদের ইংরেজীতে প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রস্তাব করেন এবং বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী বাংলাকেই প্রশিক্ষণের বাহন হিসেবে স্থির করার বিষয়ে মতামত প্রদান করেন।

এর অর্থটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, দেশের ৯৬ ভাগ ছাত্রছাত্রী বিশ্বব্যাংকের এই প্রকল্প থেকে প্রথমেই বাদ পড়েছে। তাদের যতই জ্ঞান-বুদ্ধি বা দক্ষতা থাকুক না কেন ওরা সরকারের এই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারবে না। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে যারা ইংরেজীর মাধ্যমে পড়াশোনা করেছে কেবল তারা পুরো সুযোগটাই নিতে পারবে।

আমরা জানি, এখন দেশে যার সঙ্গেই কথা বলবেন, তিনিই বলে দেবেন, ইংরেজী না জানলে দুনিয়াতে টিকে থাকা যাবে না। তারা বলবেন, ইংরেজী ভাষা নয়, প্রযুক্তি। তারা বলবেন, সফটওয়্যার রফতানি করতে হলে ইংরেজী লাগে। কম্পিউটারের নাম নিলেই ইংরেজীর কথা ওঠে। যদিও আমি হলফ করে বলতে পারি, যারা কম্পিউটার দিয়ে বিদেশের কাজ করে, তারাও ভাল ইংরেজী জানে না এবং জানার প্রয়োজনও হয় না। বাংলাদেশ কল সেন্টার সংস্থাসমূহের সভাপতি আহমেদুল হক আমাকে জানিয়েছেন, তাদের ব্যবসাটা যেখানে বিদেশনির্ভর ছিল, সেটি এখন দেশনির্ভর হয়ে পড়েছে এবং তাদের কর্মীদের এখন বাংলা শেখাতে হচ্ছে। দেশী কল সেন্টারের লোকজনকে বরং সুন্দর করে ভাল উচ্চারণে বাংলা বলতে হচ্ছে।

আমি মনে করি, আমাদের রফতানি বাজারের চেয়ে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি বাজার বহুগুণ বড়। সফটওয়্যার ও সেবাখাতের যেসব লোককে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে, তাদের শতকরা ৯০ জনকেই দেশের ভেতরেই কাজ করতে হবে। তাদের জন্য ইংরেজী জানার চেয়ে কম্পিউটার জানাটাই বেশি জরুরী। তবুও যদি ইংরেজীর দক্ষতা প্রয়োজনই হয়, তবে সেটি প্রশিক্ষণ চলাকালে দেয়া যায়। কম্পিউটারে কাজ করতে শেখা কেউ মাতৃভাষায় যত সহজে বুঝতে পারবে, সেটি দুনিয়ার অন্য কোন ভাষায় সেটি পারবে না। আমরা ইতোমধ্যেই বাংলা ভাষায় কম্পিউটার শেখার জন্য লিখিত অডিও ভিজ্যুয়াল এবং মাল্টিমিডিয়া উপাত্ত তৈরি করেছি। সেই সব শিক্ষা উপকরণ দিয়ে দেশে তিন দশক যাবত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বস্তুত কম্পিউটার এমন কোন বিষয় নেই যার বিষয়ে বাংলায় বই নেই। এমতাবস্থায় প্রশিক্ষণার্থীদের বাংলায় প্রশিক্ষণ দিয়ে ইংরেজী শেখানো যায়। যদি কোন বিষয় ইংরেজীতে শেখাতেই হয়, তবে বাছাই করার পর তাদের ইংরেজী শিখিয়ে তারপর সেই বিষয়টি শেখানো যায়।

২৮ বছরে আমরা কম্পিউটারের পর্দায় রোমান হরফের বদলে বাংলা হরফের যে রাজত্ব কায়েম করেছি, সেটি কোনভাবেই নষ্ট হতে দিতে পারি না। দেশের মানুষের ঋণের টাকায় মুষ্টিমেয় কিছু ইংরেজী জানা লোক সুযোগ নেবে, সেটির বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আসুন রুখে দাঁড়াই।

আমি যদি ভাষা নিয়ে আবেগের কথা উল্লেখ নাও করি, তবুও এই কথাটি আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কোন নাগরিক ইংরেজীতে দক্ষ নয় বলে কোন ধরনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে না। এটি বাস্তব যে, দেশটি স্বাধীন হওয়ার পর সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের জন্য যেসব উদ্যোগ থাকা উচিত ছিল, সেগুলো নেয়া হয়নি। ইংরেজীর নামে দেশের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এভাবে যদি চলতে থাকে তবে বাংলাদেশে বাংলা ভাষাই বিদেশী ভাষা হয়ে যাবে। এমনকি আমরা বাংলা হরফ দিয়ে বাংলা লেখাও ভুলে যেতে পারি।

সরকারের বিভ্রান্তি ও রোমান হরফের পৃষ্ঠপোষকতা

ইদানীং সরকারী উদ্যোগ ও বেসরকারী প্রচেষ্টায় রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখার প্রচেষ্টাও প্রবল হয়েছে। সরকার শিক্ষকদের রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এমনকি যারা বাংলা হরফের কীবোর্ডে বাংলা লিখতে চায়, তাদেরও বাংলার বদলে রোমান হরফে বাংলা লিখতে বাধ্য করা হচ্ছে। তথাকথিত সহজ বলে একে চালানো হচ্ছে।

সাধারণভাবে বাংলা হরফের রোমানাইজেশন একটি নিরীহ উদ্যোগ বা একটি স্বাভাবিক প্রবণতা মনে হলেও বাস্তবে এর পেছনে আরও একটু গভীর চক্রান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। আমি বিশেষ করে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল, নির্বাচন কমিশন এবং একসেস টু ইনফরমেশন সেলের একটি সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম নিয়ে কিছু কথা উল্লেখ করা আবশ্যক মনে করি। জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল যখন ফখরুদ্দীনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করার জন্য সহায়তা প্রদান করে, তখন নির্বাচন কমিশনকে তারা একটি বিশেষ ফ্রি সফটওয়্যার ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়। সেই সফটওয়্যারটিতে বিজয় কীবোর্ড বেআইনীভাবে যুক্ত করা হয়েছিল। আমি নিজে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিল ও নির্বাচন কমিশনকে এ বিষয়ে প্রতিবাদ করি এবং এ ধরনের পাইরেসি থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করি। কিন্তু তারা আমার প্রতিবাদকে কোন ধরনের গুরুত্ব না দিয়ে নির্বাচন কমিশন সেই বিশেষ সফটওয়্যারটিকেই ব্যবহার করতে থাকে। বাংলাদেশের কোন সরকারী অফিসে এটি সবচেয়ে বড় পাইরেসি। জাতিসংঘের কোন অফিসেও এটি সবচেয়ে বড় পাইরেসি। এরপর আমি কপিরাইট অফিসে ওই সফটওয়্যারটির বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করলে, একটি সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে সেই সফটওয়্যার থেকে বিজয় কীবোর্ড প্রত্যাহার করা হয়। এখন এতে ইজি নামের একটি কীবোর্ড আছে, যাতে বাংলা লিখতে হলে ইংরেজী বর্ণ টাইপ করতে হয়। ফলে, যদি শুধু সেই সফটওয়্যারটিই কেবল ব্যবহার করা হয়, তবে রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। এক সময়ে এতে বিজয় কীবোর্ড থাকলেও এখন যেহেতু তাতে বিজয় কীবোর্ড নেই, সেহেতু তাদের বাধ্য হয়েই সেই রোমান হরফ দিয়ে বাংলা লেখার কীবোর্ডই ব্যবহার করতে হয়। দেশের সরকার এবং জাতিসংঘের মতো একটি প্রতিষ্ঠান কেমন করে এমন ভয়ঙ্কর একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্ত কেমন করে প্রয়োগ করতে পারে, সেটি আর যাই হোক অন্তত কোন মানুষের মাথায় আসতে পারে না। আমরা যে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি এবং যে ভাষার নামে এই দেশটি স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশটিতে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার এমন প্রচেষ্টা সরকারীভাবে কেমন করে গ্রহণ করা হতে পারে, সেটি আমি অন্তত বুঝতে পারি না। আমরা যখন একটি বাংলা হরফকে একজন বাঙালীর প্রাণ বলে সেøাগান দিই, তখন রোমান হরফে বাংলা লেখার এই সরকারী প্রয়াসকে কি বলা উচিত?

বিষয়টি যদি ওখানেই থেমে থাকত তবে আমার তেমন কোনকিছু বলার ছিল না। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালের সেই স্বেচ্ছাচার বর্তমান সরকারের আমলেও অব্যাহত থাকে। এমনকি সেটি আরও গতি পায়। এই সরকারের একসেস টু ইনফরমেশন সেল আরও একধাপ ওপরে ওঠে। তারা নিজেরা যত জায়গায় সম্ভব সেই কীবোর্ডটি ব্যবহার করার নির্দেশ প্রদান করে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে লোকজনকে ডেকে এনে সেই কীবোর্ড ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সরকারের সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে সেই কীবোর্ডটি সকল ক্ষেত্রে ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়। নিজের বিবেকের তাড়নায় আমি যখন আবার সরকারের সংস্থাপন সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করি এবং একটি বিশেষ সফটওয়্যার ও কীবোর্ডকে পৃষ্ঠপোষকতা করা সরকারের নীতিমালা এবং বিধানাবলীর লঙ্ঘন বলে দাবি করি তখন আমাকে জানানো হয় যে, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সেই নির্দেশটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করি যে, এরপরও সরকারের কোন কোন দফতর যখন বাংলা সফটওয়্যার কেনার জন্য টেন্ডার আহ্বান করে, তখন সেই নির্দিষ্ট কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের কথা উল্লেখ থাকে। ক’দিন আগে সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক এবং গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কয়েকটি টেন্ডার আহ্বান করেছে। নির্বাচন কমিশন যথারীতি তাদের পাইরেসি অব্যাহত রেখেছে এবং সকল নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন তহবিলও একই কাজে সহায়তা করে যাচ্ছে।

বরকত, সালাম, রফিক ও জব্বারসহ শহীদের রক্তেরাঙ্গা আমাদের মাতৃভাষাকে নিয়ে অতীতেও অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। নানা নামে নানা আবরণে আমরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিপন্ন করার প্রস্তাবনাও দেখেছি। বাংলাকে ইংরেজী বা আরবী হরফে লেখার প্রস্তাবের পাশাপাশি বাংলা হরফের সংস্কারের প্রস্তাবও আমরা শুনেছি। ক’দিন আগেও নববাংলা নামক একটি প্রস্তাবনা আমরা দেখেছি। বাংলা হরফ সংস্কারের কথা যখন-তখন আমরা শুনি। তবে এভাবে খুব নিরীহ প্রকৃতির কার্যক্রমে বাংলা হরফকে বিলীন করার প্রচেষ্টা অতীতে আর দেখিনি আমরা। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন বা সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে এমন উদ্যোগ নিতে বা এমন উদ্যোগকে সহায়তা করতে কখনও শুনিনি আমরা।

যদি এই ভয়ঙ্কর কাজগুলো বন্ধ করা না হয়, তবে রক্ত দিয়ে মুক্ত করা বাংলা ভাষা একদিন তার হরফমালাকে হারিয়ে ফেলবে। আমাদেরও মনে হবে বাংলায় লেখাপড়া করা অপরাধ, বাংলা হরফ দিয়ে বাংলা লেখাও অপরাধ।

ঢাকা, ১৮ এপ্রিল, ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ:ww w.bijoyekushe.net,ww w.bijoydigital.com

প্রকাশিত : ১৯ এপ্রিল ২০১৫

১৯/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: