রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মামার বাড়ির ভূত

প্রকাশিত : ১৮ এপ্রিল ২০১৫
  • মোস্তফা হোসেইন

বাড়ির দক্ষিণের অংশে ছোট মামার ঘর। মাঝখানে মেঝ মামা আর সবচেয়ে উত্তরে থাকেন বড় মামা। মামাদের পশ্চিমের ঘরগুলোর পশ্চিম দিকে একটি রাস্তা সোজা উত্তরে দক্ষিণে গেছে। সেই পথেই যেতে হয় পুুকুরপাড়ে। আমরা মামা বাড়ি গেলে সেই পথের ব্যবহার যেন আরও বেড়ে যায়। কারণ আমরা মানে আমি, সুনীতি, সুহাস এবং আমাদের মামাত ভাই চিহ্ন, দিগন্ত মামাত বোন রিমঝিম ওই পথ দিয়েই পুকুরপাড়ে যাই। ঘরের পেছন দিয়ে যাওয়ার সময় মামিদের জানিয়ে যাই আমরা পুকুরপাড়ে যাচ্ছি আমাদের যেন ডিস্টার্ব না করা হয়।

কেউ আমাদের ডিস্টার্ব করবে এটা আমরা চাই বা না চাই আসলে আমাদের পেছনে কেউ না কেউ লেগেই যাবে। হয়ত বা আধঘণ্টাও যাবে না,দেখা যাবে ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে। এই সুনীতি এই সুহাস, দিগন্ত কোথায় তোরা তাড়াতাড়ি ঘরে আয়।

এ এক বিড়ম্বনা। কোথাও গিয়ে একটু যে মনমতো কিছু করব তার কোনো সুযোগ নেই। শুধুই ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি। অথচ মা-ও তার দেয়া কথা ভুলে যান। সেই যে মামা বাড়ি আসার আগেই বলেছিলেন, এখানে আমরা একবারে মুক্ত থাকব। কোথাও কেউ খবরদারি করবে না কেউ কিছুতে বাধা দেবে না। শুধু কি তাই মামাবাড়ি আসার পরও কিন্তু মায়ের এই কথাটা ছোট মামিকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কথা বলা আর তা পালন করা এক কথা নয়। সেইটাই বুঝতে পারলাম পুকুরপাড়ে যাওয়ার পর।

তখনও দুপুর হয়নি। পুকুরের উত্তরপারের মাঝামাঝি জায়গায় আমরা বসে আছি। পুকুর ঘেঁষে একটা কদম গাছ। অনেক মোটা। তার উত্তরে আছে একটা শেওড়াগাছ। সেই গাছের গোড়াতেই আসলে আমাদের খেলার আসর। আর আসরের জায়গাটার কারণেই নাকি আমাদের মা-মামির যত আপত্তি।

ছোট মামি কার কাছ থেকে যেন শুনেছেন আমরা শেওড়াগাছের গোড়ায় চুলো বানিয়েছি। তিনি জেনে ফেলেছেন, আমরা গাছের শুকনো পাতা কুড়িয়ে সেই চুলোতে আগুন জ্বালিয়েছি। এটা মামির কাছে ভয়ঙ্কর বলে মনে হয়েছে। তার কথা- ভরদুপুরে পুকুরপাড়ে যাওয়াটা আমাদের ঠিক হয়নি। তারপর আবার শেওড়াগাছের গোড়ায় গিয়ে বসেছি। শুধু তাই নয় আমরা কিনা সেখানে আগুন জ্বালিয়েছি। এটা কি করে হয়।

মামির উদ্বেগের কথা আমাদের কানে লোক মারফত পৌঁছানোর আগেই বাড়ি থেকে ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে আবার সুকণ্ঠীও পৌঁছুছে পুকুরপাড়ে। তার কথা মামি বলেছেন, এই শেওড়া গাছে নাকি ভূত-পেতœীদের আড্ডা। তাই আমাদের সেখানে আর থাকা ঠিক হবে না। মামি বলেছেন, দরকার হলে তিনি উঠোনের কোণায় চুলো বানিয়ে দেবেন। যাতে সেখানে আমরা খেলতে পারি। তিনি বলে দিয়েছেন, দরকার হয় আগামী সন্ধ্যায়ই জোলাভাতির ব্যবস্থা করবেন। তবুও যেন আমরা এই মুহূর্তে শেওড়াতলা থেকে সরে আসি। সুনীতির কথা- চল আমরা চলে যাই।সুহাসের তাতে সায় নেই। তার স্পষ্ট বক্তব্য, ভূত বলতে কিছু নেই। আর তাই তো হরর ছবি দেখার সময় আমার কোন ভয় লাগে না। চিহ্ন বলে, দেখ ভাই ভূত যদি না থাকে তাহলে ভূত নিয়ে এত লঙ্কাকাণ্ড ঘটাবেন কেন লেখকেরা আর কেনই বা কবিরাজরা তাবিজ-তুমার দেবে? দিগন্তের কথা- শোন আমরা এখন এই তর্ক বাদ দিতে পারি। মনে কর ভূত নেই। কিংবা যে বিশ্বাস করো যে, ভূত আছে তাকেও আমরা অগ্রাহ্য করব না। তবে মুরব্বিদের কথা কিন্তু আমাদের মানতে হবে। যেহেতু বড়রা শেওড়াতলা ছাড়ার জন্য বলেছেন, তা আমাদের মেনে নেয়া উচিত। বরং চল আমরা পুকুরের পশ্চিমপাড় হয়ে ঘুরে ঘুরে বাড়ির দিকে আগাই। দিগন্তের এই প্রস্তাবে সবাই রাজি হয়। বলা হলো- চুল্লির আগুন নিভিয়ে ফেলতে হবে। যেই কথা সেই কাজ। কচুপাতায় করে পানি আনার দায়িত্ব পড়ল দিগন্ত আর চিহ্নর ওপর।

সুনীতি আবার পুকুরের কাছে যেতে ভয় পায়। না সেটা ভূতের ভয় নয়। আসলে ও তো সাঁতার জানে না। ভয় হয়- যদি পানিতে ডুবে যায়। তাহলে যে আর ওঠে দাঁড়াতে পারবে না। যাই হোক শেষ পর্যন্ত হৈ হুল্লুর করে পাতার আগুনে পানি ঢালা হয়। ভেঙ্গে দেয়া হয় খেলাঘর। তারপর লেফ্ট রাইট করতে করতে পশ্চিমে রওনা। কিন্তু কয়েক গজ পশ্চিমে যেতেই পা ফসকে চিহ্ন পড়ে যায় পানিতে। ভাগ্য ভাল চিহ্ন খুব ভাল সাঁতার কাটতে জানে। পানকৌড়ির মতো সাঁতার কাটতে কাটতে সে চলে গেল পশ্চিমপাড়ের কাছে। আর সুনীতিদের পশ্চিমপাড়ে পৌঁছার আগেই সে পাড়ে ওঠে যায়।

চিহ্ন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি দেখে সুনীতি আর সুহাসের মুখে হাসি ফুটে। কয়েক মুহূর্তেই তাদের মনে হাজার চিন্তা এসে উঁকি দেয়। তার মনে হয়, শেওড়াগাছে কি তাহলে সত্যিই সত্যিই ভূত-টুত কিছু আছে নাকি। আর সেই ভূতেরই কাজ কি এটা?

কিন্তু চিহ্নর হাসিমাখা মুখ দেখে তার এই চিন্তা দূর হয়। তারপরও তারা মনে করে, না আর বাইরে নয়। বাড়ি ফিরে চল।

ছোট মামাকে দেখা গেল পুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় দাঁড়িয়ে আছেন। এগিয়ে এলেন তিনি। চিহ্নকে ভেজা কাপড় পরিহিত দেখে বকুনি দেবেন এমন বোঝা যাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সুনীতি তাকে বারণ করে। বুঝিয়ে দেয় আসলে ঘটনাটা ইচ্ছা করে ঘটেনি। পা ফসকে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ছোট মামির কানে পৌঁছে গেছে ইতোমধ্যে পুরো ঘটনা। তিনি দৌঁড়ে এলেন। তার চোখে মুখে আতঙ্ক। বললেন, আমি আগেই মানা করেছি, এই ভরদুপুরে যেন শেওড়াতলায় না যাওয়া হয়। এবার বোঝ মজা। আমি কিচ্ছু জানি না। ছোট মামা জানতে চান কী হয়েছে। সুনীতি আর সুহাস বলে, মামি বলেছেন শেওড়াতলায় নাকি ভূত আছে। মামির কথা ঠিক কি ভুল সেটা বড় কথা নয়। চিহ্ন কিন্তু অনেক দূরে এসে পানিতে পড়েছে। তার মানে হচ্ছে- চিহ্নকে শেওড়াতলার ভূতে ফেলে দেয়নি। আসলে ভূত বলতে কিছু নেই, এটাই তো সত্য।

মামা বললেন, শোন ভূত আছে কি নেই এই বিতর্ক রেখে দাও। আমি খুশি হয়েছি, তোমরা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছো। এখনই যে গোসল করতে হবে। আর সবচেয়ে খুশির কথা হলো, তোমরা মুরব্বীর কথা শুনেছ। মনে রেখ বড়দের কথা শোনা খুবই জরুরী।

প্রকাশিত : ১৮ এপ্রিল ২০১৫

১৮/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: