মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মনোজগতে মুক্তিঐতিহাসিক যুদ্ধের আধিপত্য না থাকলে দেশবোধের সৃষ্টি হবে কিভাবে?

প্রকাশিত : ১৭ এপ্রিল ২০১৫
  • ঔপনিবেশিকোত্তর ঔপনিবেশিক মন
  • মুনতাসীর মামুন

১৭ এপ্রিল ১৯৭১, মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। বাঙালী জাতির মুক্তির জন্য এবং আমাদের মহান মক্তিযুদ্ধকে সুগঠিত করে সুপরিকল্পিতভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য এ দিনটি বাঙালী জাতির ইতিহাসে শুধু গৌরবেরই নয়, বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এদিন শুধুমাত্র বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানই অনুষ্ঠিত হয়নি, এদিন শপথ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তার যেমন সাংবিধানিক স্বীকৃতি মেলে, তেমনি বঙ্গবন্ধু যে প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি তারও সাংবিধানিক বৈধতা দেয়া হয়। ১৭ এপ্রিলের আগের তারিখ ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ দিনটিও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অনন্য ঐতিহাসিক দিন। ঐদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করা হয় এবং যার ওপর ভিত্তি করে ঐদিনই মুক্তিযুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের এক বেতার ভাষণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাকামী বাংলাদশ রাষ্ট্রের একটি স্বাধীন সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ বেতার ভাষণটি প্রথম রাত সাড়ে ৯টায় আকাশবাণীর একটি কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয় এবং পরে আকাশবাণীর বিভিন্ন কেন্দ্র এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল পুনঃপ্রচার করা হয়। এ সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ নেয়। এ শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করে শোনান অধ্যাপক ইউসুফ আলী। মুক্তিযুদ্ধের এই অনন্য দলিলটি পরবর্তীতে সংবিধান রচনার সময় সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। বর্তমান সংবিধানে চতুর্থ তফসিলে ১৫০(১) অনুচ্ছদ অনুযায়ী ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলী হিসেবে এবং সপ্তম তফসিলে ১৫০ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকারের জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের (অনূদিত) উল্লেখ ও সন্নিবেশন আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আাইন সংবিধানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অন্তর্ভুক্ত করে এবং সংবিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের অভিযাত্রা একটি মাইলফলক। আর মুজিবনগর সরকার আলোচনায় আসলেই বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি আর একটি নাম জীবন্ত হয়ে ওঠে তা হলো- বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহচর জননেতা তাজউদ্দীন আহমদের নামটি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঘুমন্ত শান্তিপ্রিয় বাঙালীদের ওপর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী নারকীয়, বর্বরোচিত ও নৃশংস গণহত্যাযজ্ঞ চালায় এবং এরই প্রেক্ষিতে ২৬ মার্চ প্রত্যুষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার কারণে পাকিস্তানী সৈন্যদর হাতে গ্রেফতার হন। তাজউদ্দীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে কোনভাবেই হোক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে জানাতে হবে। শুধু তাই নয়, তিনি একটি সরকার গঠনের কথা ভাবতে থাকেন যার নির্দেশনা এবং ইঙ্গিত তিনি পূর্বেই বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এর সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে একটি তথ্য দেয়া যেতে পারে তা হলো-১৯৭১ সালের ৬ ও ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদকে তৎকালীন ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনার কৈলাশ চন্দ্র (কেসি) সেনগুপ্তের কাছে পাঠিয়েছিলেন সাহায্যের আশ্বাস পেতে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীনের সম্পর্ক, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাজউদ্দীনের অগাধ শ্রদ্ধা, সঙ্কটে ও দুর্যোগে ধীর-স্থিরসম্পন্ন মেধাবী তাজউদ্দীনের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে সহজেই অনুমেয় যে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কী করণীয় তা কেবলমাত্র তাজউদ্দীনের পক্ষেই সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব।

২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পরিচালিত বর্বরোচিত গণহত্যা বিশ্ববাসীকে জানাতে এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সরকার গঠনের কথা মাথায় রেখে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে ২৭ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করে সীমান্তের উদ্দেশে পাড়ি জমান, উদ্দেশ্য ভারত গমন। এদিনই তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঙালী জাতিকে রক্ষা ও স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে যথাসম্ভব দ্রুত একটা সরকার গঠন করা দরকার এবং এজন্য প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক ভারত সরকারের সহযোগিতা আবশ্যক। এমতাবস্থায় তাজউদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম, তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী (মেহেরপুরের মহকুমা প্রশাসক), মাহবুব উদ্দীন (ঝিনাইদহের এসডিপিও), মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, স্থানীয় আওযামী লীগ নেতা ও নির্বাচিত প্রতিনিধি ডাঃ আসহাবুল হক ও অন্যরা পারস্পরিক আলোচনা করে ভারতের সাহায্য প্রার্থনার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এ লক্ষ্যে ৩০ মার্চ বিকেলেই তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ও মাহবুব উদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে জীবননগর হয়ে কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন। চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত পথে ভারত যাওয়ার বিবরণ দিতে গিয়ে ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম লিখেছেন- ‘তাজউদ্দীন ভাই ও আমি চুয়াডাঙ্গা থেকে সীমান্তের পথে রওনা হই। তৌফিক ও মাহবুব আমাদের সঙ্গে ছিল। আমরা পলায়নী মনোবৃত্তি নিয়ে সীমান্ত পার না হয়ে স্বাধীন দেশের স্বাধীন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্য মর্যাদা নিয়েই ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। স্বাধীন দেশের প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করলেই কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের আলোচনা সম্ভব।’ সীমান্তে পৌঁছে তাই ‘উঁচুপর্যায়ের দু’জন আওয়ামী লীগ নেতার আগমন’ সংবাদ বহনকারী হিসেবে তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী ও মাহবুব উদ্দীনকে ভারতীয় চেকপোস্টে প্রেরণ করা হয় মূলত ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মনোভাব জানার জন্য। এই দু’জন সীমান্তে গিয়ে বিএসএফ কার্যালয়ে উঁচু পর্যায়ের দু’জন আওয়ামী লীগ নেতা (প্রকৃত পরিচয় না জানিয়ে) ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চান এ বিষয়টি অবহিত করেন। স্থানীয় কমান্ডিং অফিসার একজন মেজর ও কয়েকজন জওয়ান পাঠিয়ে সসস্মানে আগন্তুক দু’জনকে ভারত ভূখ-ে নিয়ে যান। অল্প সময়ের মধ্যে ভারতীয় বিএসএফের আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার এসে হাজির হন এবং যথোপযুক্ত সম্মানপ্রদর্শন পূর্বক তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে নিয়ে যান। গোলক মজুমদারকে প্রথমিক পরিচয় দেয়ার পর তাজউদ্দীন আহমদ অনুরোধ জানান, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অনতিবিলম্বে একটি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার, যা পরবর্তীকে বিএসএফের তত্ত্বাবধানে করা হয়েছিল।

প্রকৃতপক্ষেই তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম এই দু’জনকে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যথাযোগ্য সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করে। ৩০ মার্চ রাতেই তাঁরা প্রথমে কৃষ্ণনগরে পৌঁছান এবং সেখান থেকে কলকাতা যান। এরপর বিশেষ প্রটোকল ব্যবস্থায় মজুমদার নিজে গাড়ি চালিয়ে তাঁদের দমদম এয়ারপোর্টে নিয়ে যান। সেখানে মধ্যরাত নাগাদ তাঁরা নেহরু পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্বয়ং বিএসএফ প্রধান রুস্তমজীকে বিমান থেকে অবতরণ করতে দেখতে পান। দমদম এয়ারপোর্টে তাজউদ্দীন ও রুস্তমজীর সাক্ষাত হওয়ার পর তাদের নিয়ে গিয়ে সুরক্ষিত ‘আসাম ভবনে’ রাখা হয়। সেখানে প্রায় তাঁরা সারারাত ধরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ও নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনাক্রমে বাংলাদেশ সরকার গঠন করা এবং সে সম্পর্কিত পরিকল্পনার কাজ এগিয়ে নেন। এরপর কেএফ রুস্তমজী দিল্লীর উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁকে জানানো হয় এই দু’জন নেতাকে দিল্লী নিয়ে যাওয়ার জন্য। অবশেষে ১ এপ্রিল দিবাগত রাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গোলক মজুমদারের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলামকে বিএসএফের ব্যবস্থাপনায় সামরিক রসদবাহী একটি বিমানে করে দিল্লী নিয়ে যাওয়া হয়। দিল্লীতে যাওয়ার পর ভারত সরকার প্রথমে বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হন যে, তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী। গোলক মজুমদার ও রুস্তমজীর প্রচেষ্টায় তাজউদ্দীন আহমদ ও ইন্দিরা গান্ধীর প্রথম সাক্ষাত ঘটে ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা রাতে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আগের দিন এক উর্ধতন কর্মকর্তা তাজউদ্দীন আহমদকে জিজ্ঞাসা করে যে ইতোমধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের কোন সরকার গঠন করা হয়েছে কিনা এবং তিনি কোন পদাধিকারী ব্যক্তি হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাত করবেন। এমতাবস্থায় তিনি ত্বরিত সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ভারত সরকারকে জানাবেন ২৫-২৬ মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করেছেন এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের সদস্যরা মন্ত্রিসভার সদস্য। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকা সত্ত্বেও দেশের স্বার্থে তাজউদ্দীন আরও সিদ্ধান্ত নেন যে, বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ সাক্ষাত করবেন। ৪ এপ্রিলের সাক্ষাতে প্রাথমিক সম্ভাষণ বিনিময়ের পর ইন্দিরা গান্ধী প্রথম প্রশ্ন করেন ‘ঐড়ি রং ঝযবরশয গঁলরন? ওং যব ধষষ ৎরমযঃ?’ তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জবাব দেন এই বলে যে, শেখ মুজিব তাঁদের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন, তাঁর বিশ্বাস মুজিব কোন গোপন স্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের নির্দেশ দিচ্ছেন। তবে ২৫ মার্চের রাতের পর থেকে মুজিবের সঙ্গে তাঁদের কোন যোগাযোগ নেই। এ সাক্ষাতকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিকট তাজউদ্দীন আহমদ সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে সহযোগিতা প্রার্থনা করেন।

তাজউদ্দীন আহমদ কোন পরিস্থিতিতে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাতপূর্বক সরকার গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং এ অবস্থায় কী করণীয় সে বিষয়ে আলোচনার জন্য ৮ এপ্রিল কলকাতার ভবানীপুরে একটি বাড়িতে বাংলাদেশ থেকে আগত নেতাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন এবং এ বৈঠকে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মণি মন্ত্রিসভা গঠনের বিরোধিতা করে বিপ্লবী কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব রেখে বক্তব্য রাখলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। এ সময় তাজউদ্দীন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম সরকার গঠনের সুদৃঢ় যৌক্তিকতা তুলে ধরে বক্তব্য রাখলে জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে বিশেষত এএইচএম কামরুজ্জামানের হস্তক্ষেপে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও শেখ ফজলুল হক মণি ব্যতীত অন্যরা সরকার গঠনের যৌক্তিকতা মেনে নেন। ১০ এপ্রিল মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য সদস্য ও বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতাদের খোঁজখবর সংগ্রহ এবং সরকার গঠনের ঘোষণার জন্য তাজউদ্দীন আহমদ একটি রাশিয়ান ডকেটো বিমানে করে সীমান্ত এলাকায় উড়ে চলেন। সঙ্গে ছিলেন- ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম, শেখ ফজলুল হক মণি, তোফায়েল আহমেদ ও নগেন্দ্র সিংহ। মালদহ, বালুরঘাট, শিলিগুড়ি, শিলচর, আগরতলাসহ বিভিন্ন স্থানে বিমান থেকে নেমে আওয়ামী লীগ নেতাদের সংগ্রহ ও খোঁজখবর করে তাজউদ্দীন দুপুরে পৌঁছেন বাগডোরা বিমানবন্দরে। সেখান থেকে জীপে করে তিনি শিলিগুড়ি পৌঁছেন। পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত মোতাবেক শিলিগুড়িতে অবস্থিত একটি রেডিও স্টেশন থেকে তাজউদ্দীন আহমদের রেকর্ডকৃত ভাষণটি প্রচার করার ব্যবস্থা করা হয়। ওই দিন রাত সাড়ে ৯টায় তাজউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে বাংলাদেশ সরকার গঠন বিষয়ক ভাষণটি আকাশবাণীর একটি কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়।

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল আগরতলায় কর্নেল ওসমানীকে পেয়ে তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানালে তিনি তাতে সম্মতি দেন। পূর্ব সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশের ভূখ-ের অভ্যন্তরে এই সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ১৪ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গায় তা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চুয়াডাঙ্গাকে বাংলাদেশ সরকারের রাজধানী করার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ১৩ এপ্রিল পাকিস্তান বাহিনী চুয়াডাঙ্গায় হামলা চালায়। এতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে কবে কোথায় হবে তা গোপন রেখে সরকারের শপথগ্রহণের অন্যান্য প্রস্ততি সম্পন্ন করার দিকে জোর দেয়া হয়। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বেলা এগারোটায় পূর্ব নির্ধারিত স্থান মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলা নামক বৃক্ষরাজি ঢাকা ছায়াসুনিবিড় একটি গ্রামে নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জায়গাটির নাম শপথগ্রহণের আগের দিনও সাংবাদিকদের নিকট অজানা ছিল। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম মন্ত্রিসভার শপথ পাঠ করানোর পর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তাজউদ্দীন আহমদ এবং মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেন জনাব এম মনসুর আলী (অর্র্থমন্ত্রী), এএইচএম কামরুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী) এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ (পররাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী)। মুক্তিযুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জীবিত করতে শপথগ্রহণ শেষে তাজউদ্দীন আহমদ বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করেন মুজিবনগর। তখন থেকে সরকারেরও নামকরণ হয়ে যায় মুজিবনগর সরকার। এই সরকারের অধীনেই সফলভাবে আমাদের মক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর বাঙালী জাতি বিজয়ের স্বাদ পায়।

লেখক পরিচিতি : শিক্ষক, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Email : hprodhan@yahoo.com

প্রকাশিত : ১৭ এপ্রিল ২০১৫

১৭/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: