আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রতিশ্রুতি নয় ॥ নাগরিক সমস্যার সমাধান চান ভোটাররা

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৫
  • ওয়ার্ড পরিক্রমা ১৯, ২ ও ২১

আনোয়ার রোজেন ॥ ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে সুপেয় পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে চারটি গভীর নলকূপ বসানো হয়েছিল প্রায় এক যুগ আগে। এরপর সংস্কার না করায় ও স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ওয়াসার সেই নলকূপগুলো থেকে এখন ওয়ার্ডবাসী পানি পায় সামান্যই। ২০ নম্বর ওয়ার্ডে সবচেয়ে ‘সহজলভ্য’ সমস্যা হলো মাদক। ওয়ার্ডজুড়ে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার। সেগুনবাগিচা ও পুরাতন রেলওয়ে কলোনি এলাকা পরিণত হয়েছে বেকার তরুণদের মাদকের আখড়ায়। ছিনতাই, মাদক, মশার উপদ্রব ও ছিন্নমূল বাসিন্দারা ২১ নম্বর ওয়ার্ডের দীর্ঘদিনের সমস্যা। আবর্জনার অব্যবস্থাপনা, অনুন্নত রাস্তাঘাট ও ড্রেনেজ সিস্টেম, বিশেষ বিশেষ স্থানে জলাবদ্ধতা, খেলার মাঠ না থাকা- এসবই তিনটি ওয়ার্ডের বহুল চর্চিত নাগরিক সমস্যা। আসন্ন নির্বাচনে জিততে ১৯, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোটারদের এসব সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে ভোটাররা বলছেন, মৌখিক প্রতিশ্রুতির দিন শেষ, এবার চাই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন। তাদের প্রত্যাশা, যে দল সমর্থিত প্রার্থীই নির্বাচিত হোন না কেন, নাগরিকদের সমস্যা সমাধানই যেন তাঁর অগ্রাধিকার হয়।

১৯ নম্বর ওয়ার্ড ॥ আগে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড নামে পরিচিত ছিল। মিন্টো রোড ও বেইলী রোডসহ আশপাশের এলাকা নিয়ে এই ওয়ার্ডটি গঠিত। সরকারী বিভিন্ন অফিস ও মন্ত্রী-আমলাদের বাসভবনের কারণে এই ওয়ার্ডটি বিশেষভাবে পরিচিত। ওয়ার্ডে রয়েছে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনা ও যমুনা, অতিথি ভবন সুগন্ধা, ভৌগোলিক জরিপ ভবন, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়, সার্কিট হাউস, টেলিযোগাযোগ ভবন, ফরেন সার্ভিস একাডেমি, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়- ‘অডিট ভবন’, শ্রম ও জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরো, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ভবন ইত্যাদি। এছাড়াও আছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, ভিকারুননিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ। রয়েছে লেডিস ক্লাব ও ঢাকা অফিসার্স ক্লাব। মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪ হাজার ২৯৬। পুরুষ ভোটার ১৮ হাজার ১৫৯ আর নারী ভোটার সংখ্যা ১৬ হাজার ১৩৮।

ওয়ার্ডভুক্ত এলাকাগুলো হলোÑ মিন্টো রোড, কাকরাইল (রমনা থানার অংশ), সার্কিট হাউস রোড, সিদ্ধেশ্বরী রোড ও লেন, মগবাজার এলিফ্যান্ট রোড, মগবাজার ইস্পাহানী কলোনি, নিউ ইস্কাটন রোড, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, আমিনাবাদ কলোনি ও ইস্টার্ন হাউজিং এ্যাপার্টমেন্ট, বেইলী স্কয়ার ও বেইলী রোড, ডিআইটি কলোনি, পশ্চিম মালিবাগ ও নিউ বেইলী রোড।

প্রার্থী পরিচিতি : নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে এই ওয়ার্ডে মোট কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন মাত্র ছয়জন। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুন্সী কামরুজ্জামান কাজল (ঘুড়ি প্রতীক) পেয়েছেন দলীয় সমর্থন। আর দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে লাটিম প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠ গরম করছেন রমনা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ আবুল বাশার। সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার মোঃ আরিফুল ইসলামকে (রেডিও প্রতীক) সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। দলের সমর্থন না পেলেও বিএনপি হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ আব্দুল জাকির নির্বাচনে আছেন ঠেলাগাড়ি প্রতীক নিয়ে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন দু’জনÑ আবু জুবায়ের মোঃ মিরাতিল্লাহ (করাত প্রতীক) ও সৈয়দ মাহমুদুল হক আক্কাছ (ট্রাক্টর প্রতীক)। ভোটের অতীত হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী ওয়ার্ডে এগিয়ে আছেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোঃ আরিফুল ইসলাম। ১৯৯৪ ও ২০০২ সালের সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর হিসেবে শেষ হাসি তিনিই হেসেছেন। আওয়ামী লীগে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় নির্বাচনী লড়াইয়ে এবারও তিনি এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে আরিফুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থীই আমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে আগের দুই নির্বাচনে ওয়ার্ডবাসীর রায় আমার পক্ষেই ছিল। আশা করি, তাঁরা এবারও আমাকেই বেছে নেবেন। মুন্সী কামরুজ্জামান কাজল বলেন, দল এককভাবে আমাকে সমর্থন দিয়েছে। তাই অন্য কাউকে দল সমর্থিত প্রার্থী ভাবার সুযোগ নেই। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীই আমার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এ বিষয়ে আবুল বাশারের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

২০ নম্বর ওয়ার্ড ॥ ডিসিসির সাবেক ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডটি নতুন ২০ নম্বর ওয়ার্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বুয়েটসহ এর আশপাশের এলাকা নিয়ে এই ওয়ার্ডটি গঠিত। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠগুলো ছাড়াও এই ওয়ার্ডে রয়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ওসমানী উদ্যান, রমনা পার্ক, শিশু একাডেমি, কেন্দ্রীয় কচিকাঁচার আসর, এশিয়াটিক সোসাইটি, পরিসংখ্যান ব্যুরো, ঢাকা ক্লাব, রূপসী বাংলা হোটেল, প্রেসক্লাব ও সচিবালয়। ওয়ার্ডভুক্ত এলাকাগুলো হলোÑ সেগুনবাগিচা, তোপখানা রোড, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ও রেস্ট হাউস, টিবি ক্লিনিক এলাকা, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকা, হাইকোর্ট স্টাফ কোয়ার্টার, ফুলবাড়িয়া স্টেশন পূর্ব এলাকা, ফুলবাড়িয়া পশ্চিম ও সেক্রেটারিয়েট রোড, আব্দুল গনি রোড ও সচিবালয় স্টাফ কোয়ার্টার, পুরাতন রেলওয়ে কলোনি পশ্চিম, সরকারী কর্মচারী হাসপাতাল এলাকা, ইস্টার্ন হাউজিং ও টয়েনবি সার্কুলার রোড, রমনা গ্রিন হাউজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক এলাকা, মেডিক্যাল ও বুয়েটের ছাত্রাবাস ও ছাত্রী হল। রাজধানীর সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের পদচারণায় মুখর এই ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ হাজার ৬৫। তবে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা অর্ধেকের চেয়েও কম। ১৬ হাজার ৯২৫ পুরুষ ভোটারের বিপরীতে নারী ভোটার আছেন মাত্র ৮ হাজার ১৪০ জন।

প্রার্থী পরিচিতি : মনোনয়নপত্র জমাদান, যাচাই-বাছাই, বাতিল ও প্রত্যাহার শেষে এই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদের লড়াইয়ে টিকে আছেন ৮ প্রার্থী। দলের সমর্থন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ রতনের (ঠেলাগাড়ি) পক্ষে গেলেও মাঠ ছাড়ছেন না স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মোঃ খায়রুল হাসান জুয়েল (মিষ্টি কুমড়া) ও আওয়ামী লীগ নেতা সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী (লাটিম)। বিএনপি এই ওয়ার্ডে কোন কাউন্সিলর প্রার্থী দেয়নি। তবে বিএনপি হিসেবে পরিচিত আবদুল বাসেত (টিফিন ক্যারিয়ার) এবং মোঃ জাহিদ হোসেন (রেডিও) মাঠে আছেন সক্রিয়ভাবেই। জাতীয় পার্টির সমর্থনে লড়ছেন আমানত উল্লা চৌধুরী (ঝুড়ি)। সাম্যবাদী দলের প্রার্থী হারুন চৌধুরীর নির্বাচনী প্রতীক ঘুড়ি। আর ট্রাক্টর প্রতীক নিয়ে মাঠে নেমেছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোঃ জাকির হোসেন জিকু। আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীরাই ভোটের লড়াইয়ে পার্থক্য গড়ে দেবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টি সমর্থিত প্রার্থী আমানত উল্লা চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, আওয়ামী প্রার্থীদের অন্তর্কোন্দলের কারণে ভোটের চেহারা পাল্টে যেতে পারে। ভোটাররা শান্তি চায়, সংঘর্ষ নয়। তাই বিকল্প প্রার্থীদের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে অন্তর্কোন্দলের বিষয়ে কথা বলতে একাধিকবার ফোন করেও আওয়ামী লীগের কোন প্রার্থীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

২১ নম্বর ওয়ার্ড ॥ ছোট্ট এই ওয়ার্ডটি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত (সাবেক ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড)। শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পরীবাগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা নিয়ে এটি গঠিত। ওয়ার্ডভুক্ত অন্য এলাকাগুলো হলো- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা, জহুরুল হক হল, সলিমুল্লাহ হল, স্যার এএফ রহমান হল, শামসুন নাহার হল, জগন্নাথ হল, কবি জসীমউদ্দীন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, সূর্যসেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, ময়মনসিংহ লেন, ময়মনসিংহ রোড, জাতীয় জাদুঘর অফিসার্স কোয়ার্টার, হাবিবুল্লাহ রোড, আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস, রোকেয়া হল, পরীবাগ শাহ সাহেব রোড।

মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ হাজার ৭২১। পুরুষ ভোটাররা সংখ্যায় অনেক বেশি; ১১ হাজার ২০৩। বিপরীতে নারী ভোটার সংখ্যা ৭ হাজার ৫১৮।

প্রার্থী পরিচিতি : কাউন্সিলর পদে নির্বাচনী দৌড়ে টিকে আছেন ছয় প্রার্থী। ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন পেয়েছেন এমএ হামিদ খান (ঠেলাগাড়ি প্রতীক) আর রেডিও প্রতীক পাওয়া খাজা হাবীবুল্লাহ হাবীকে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। বাকি চার প্রার্থীর সবাই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সাবেক বা বর্তমান নেতা। এঁরা হলেনÑ এসএম এনামুল হক (ঘুড়ি), মঈন উদ্দিন আহমেদ (কাঁটাচামচ), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (লাটিম) ও মোঃ শাহাব উদ্দিন আহমেদ পিন্টু (ঝুড়ি)। ওয়ার্ড ঘুরে জানা গেছে, প্রার্থী সমর্থন নিয়ে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। নিজেদের প্রচার-প্রচারণার চেয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচারে তাঁদের বেশি মনোযোগ। দল সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতাদের অভিযোগ, হামিদ খান বিএনপির ‘এজেন্ট’। টাকা দিয়ে মনোনয়ন নিজের নামে নিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মোসাদ্দেক আলী ফালুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্টতার ‘প্রমাণ’ ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে রয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে হামিদ খান বলেন, সারাজীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। জোট সরকারের আমলে ফালু একবার এলাকার মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছিল। মসজিদ কমিটির দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমি তাঁর কাছে অর্থ অনুদান চেয়েছিলাম। ব্যস, ওই টুকুই। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগে দ্বন্দ্ব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় এর ‘সুফল’ বিএনপি প্রার্থী পাবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রার্থী খাজা হাবীবুল্লাহ হাবী বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দ্বন্দ্বের বিষয়টি ভোটাররা কিন্তু ঠিকই খেয়াল রাখছেন। তাই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়ের কোন বিকল্প ফল দেখছি না। সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ওয়ার্ডের সচেতন ভোটারদের মধ্যে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ ভাল। তাঁরা আমাকেই বেছে নেবেন বলে আমার বিশ্বাস।

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

১৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: