কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শান্তির বারতা নিয়ে চম্পকনগরের উপকথা

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ বাঙালী সংস্কৃতির সিংহদ্বার হিসেবেই সর্বজন বিবেচ্য ও স্বীকৃত। সারা বাংলার গ্রাম-গঞ্জ-শহর সর্বত্র এ দুটি দিনকে ঘিরে নানা আয়োজন হয়ে থাকে। তার মধ্যে লোকজ উৎসব উপাদানই প্রধান ও অগ্রগণ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা ও নাট্যকর্মীদের নিকট এ দিনগুলো বিশেষ আকর্ষণীয়। যাতে থাকে নানা আয়োজন, যার মধ্যে নাট্য প্রদর্শন অন্যতম। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চার অন্যতম প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ প্রতিবছর বাংলা নববর্ষ বরণ উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজন করে থাকে। এ বছর চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভাগটি ১-৩ বৈশাখ আয়োজন করেছে চার দিনব্যাপী নাট্যোৎসব। যেখানে রয়েছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের পদ্মাপুরাণ কাব্য অবলম্বনে ‘চম্পকনগরের উপকথা’ শিরোনামে নাটকের প্রযোজনা ও প্রদর্শন। নাটকের বিষয়বস্তু মূলত বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায়ের লৌকিক দেবী মনসা ও চাঁদ সওদাগরের দ্বন্দ্ব। যেখানে দেবী মনসা শিবের পূজারী চাঁদ সওদাগরের পূজা প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে দেবী হিসেবে স্বর্গে অধিষ্ঠিত হতে চায়। অন্যদিকে চাঁদ সওদাগর মনসাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এবং সে কোনভাবেই মনসার পূজা করতে রাজি নয়। যার দরুণ চাঁদ সওদাগরকে বিভিন্ন সময় মনসার হিংসার বাণে বিদ্ধ হতে হয়। নাটকের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট যে, মনসা পূজা প্রাপ্তির জন্য হিংসাত্মক উপায় গ্রহণ করে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। এ চিন্তার ফলে নাটকের মঙ্গলগীতে অহিংসার বাণী আওড়ানো হয়। যার মধ্য দিয়ে বর্তমানে দেশ ও আন্তর্জাতিক সহিংসতার বিপরীতে জল ঢালার আন্তরিক প্রচেষ্টা করা হয়েছে শতভাগ। একটি মধ্যযুগীয় ধর্মীয়-লৌকিক চিন্তার প্রায় হুবহু উপস্থাপন বর্তমান সময়ে কতটা কার্যকরী? যেখানে আপন ইচ্ছায় চাঁদ সওদাগর মনসা দেবীর ভক্ত হতে চায় না কিন্তু ধর্মের প্রতীক দেবী মনসা জোরপূর্বক পূজা আদায়ে বদ্ধপরিকর, যাতে ধর্মের জন্য জবরদস্তির চিহ্ন মেলে। এতে অনায়াসে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় মৌলবাদ বনাম প্রগতিশীল চিন্তকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের সাদৃশ্য জানান দেয়। যদিও নাটকের শেষে অহিংসার কথা বলা হয়েছে কিন্তু তা কতটুকু কার্যকর যেখানে পুরো নাটকে ধর্মের ভাগেই সন্দেশের পরিমাণ বেশি রাখা হয়েছে। সুতরাং নাটকে লৌকিক-পিছিয়ে পড়া বিশ্বাসের প্রায় হুবহু উপস্থাপন না করে নয়া চিন্তার গাঁথনে মালা গাঁথলেই বোধ হয় বেশি ভাল হতো। লোক নাটক বা লোক সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে পান্তা-ভাত নিত্য খাওয়ার কোন মানে আছে কি? এক্ষেত্রে আহমদ শরীফের চিন্তায় বলা যায়Ñ চিরন্তন বাঙালী সংস্কৃতি বলতে কিছু নেই, সংস্কৃতি সদা পরিবর্তনশীল। তাই পুরোনোকে কাটা-জোড়া দিয়ে নতুন আঙ্গিকে বরণ ও ধারণ করাই উত্তম বলে বিবেচ্য হওয়া উচিত। তবে নাটকের কুশীলবদের অভিনয় উত্তম, পোশাক ও মঞ্চ পরিকল্পনা নান্দনিক-নিপুণ এবং নাটকটি নির্দেশনার জন্য কাজী তামান্না হক সিগমাকে সাধুবাদ দিতে হয়। নাটকটিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন চতুর্থ সেমিস্টারের শিক্ষার্থীবৃন্দ। তবে চোখে পড়ার মতো কুশীলবদের মধ্যে রয়েছেনÑ উম্মে সুমাইয়া, সুরাইয়া, শংকর, জুম্মান ও ফাহাদ অন্যতম। সর্বোপরি বরাবরের মতোই থিয়েটার এ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সকল প্রযোজনার মতো ‘চম্পকনগরের উপকথা’ একটি সফল প্রযোজনা হবে, তা যে কোন দর্শকমাত্রই আন্দাজ করতে পারবে। তাই ‘চম্পকনগরের উপকথা’ হোক ‘সহিংসতার বিপরীতে সংস্কৃতি’র অভঙ্গুর-স্বচ্ছ পাত্র। যেখানে দাবি থাকে লৌকিক-ধর্মীয় কুসংস্কার-কুসংস্কৃতির চিহ্ন মুছে দিয়ে বাঙালী সংস্কৃতিকে সামনে এগোতে সাহায্য করবেÑ এ সকল লোক নাট্য প্রযোজনা।

শেখ জাহিদ আজিম

প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

১৬/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: