কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফ্যাশনে-বিপ্লবে বৈশাখ

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • রেজা ফারুক

নতুনের এক আনন্দঘন আবেশ বুকে জড়িয়ে নিসর্গ এবং জনজীবনে আসে বৈশাখ। ভিন্নতর আমেজের উন্মনা প্রবাহের যে ধারা বসন্তের স্পন্দনকে উৎফুল্ল করে রাখে। সেই উৎফুল্ল আবহের রেশ প্রবলভাবে এসে নিঃসীম প্রগাঢ়তা নিয়ে বৈশাখে ঝাকড়া চুল দুলিয়ে প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। চৈত্র্যের দাবদাহের উত্তাপে জীবনের প্রতিটি বাঁকে যখন এক অস্থিরতার ফুল ফুটতে থাকে। ঠিক তখনই বৈশাখ গ্রীষ্মম-লের রেখায় বৈচিত্র্যময়তার রঙের আঁচড় টেনে তপ্ত ক্যানভাসে ঝড়োত্তাল দুলুনি নিয়ে বছর ঘুরে ফিরে আসে। ফিরে আসে ধুলোবালির শিরস্ত্রাণ জড়িয়ে মাথায়। বৃক্ষের সবুজ স্কার্ফে রাঙা ক্রুদ্ধ আলপনা এঁকে দিতেই যেন বৈশাখের আগমন। পহেলা বৈশাখ বাঙালীর জীবনে এক অন্যতর বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয়। চারপাশে স্ফুরিত হয় বাংলা নববর্ষের ছন্দময় গুঞ্জরণ। যে গুঞ্জরণে পুলকিত হয় জনজীবন থেকে শুরু করে নৈসর্গিক দৃশ্যপট, ফুল, পাখি, নদী, সমুদ্র, আকাশম-লীসহ সৃষ্টির সকল অনুষঙ্গ। আর এখানেই বৈশাখের প্রাবল্য বাঙালীর জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভবিষ্যত জীবনছন্দের নিবিড় উঠোনে।

বৈশাখ যেমন বাঙালীকে গুছিয়ে-মুছিয়ে স্থিত হবার মন্ত্র শেখায়। একইভাবে এই বৈশাখই হয়ে ওঠে আবার বিপ্লবের লাল অনুপ্রেরণা। সম্মিলিত সাহসের এক অপর প্রতিবিম্বের রূপ হলো পহেলা বৈশাখ। যার রয়েছে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।

সকল কূপম-ূকতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলা নববর্ষ বারবার চৈতন্যের দরোজায় কড়া নেড়ে গেছে। ষাটের দশকে যার অভিরূপ সূচিত হয় রমনার বটমূলে। সংগ্রামী চেতনার স্ফুলিঙ্গকে শোনিতে ধারণ করে বাঙালী সংস্কৃতির নিদারুণ প্রবহমানতা বয়ে বয়ে এসে ছায়ানটের উদ্যোগে প্রাণের আবেগকে সঞ্চারিত করার মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ দুঃস্বপ্নে প্রহর ছিন্ন করে এক নতুন অরুণোদয়ের স্বপ্নিল সময়কে আলিঙ্গনের লক্ষ্যে যে ক্যানভাস দিগন্তে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেÑ তারই নাম অনন্য পহেলা বৈশাখ।

গ্রামীণ এবং নগর জীবনের প্রতিটি স্তবকের স্তরে জমে থাকা ধুলো-ময়লাকে মুছে দিয়ে বৈশাখের রক্তিম বাতাস জায়গা করে নেয় নতুনভাবে। আর ওই নতুনত্বের ভাষার গহিনে যে অফুরন্ত প্রাণশক্তি, সেই শক্তির গভীর থেকেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পায় বাঙালী। এই প্রেরণাই জাতি হিসেবে বাঙালীকে দিয়েছে নিপুণ বলিষ্ঠতা। যার ছাপ পাওয়া যায় ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটা অসাম্প্রদায়িক আন্দোলনে, সংগ্রামে। বৈশাখ যেমন বাঙালীর স্বাধীনচেতা মনোজগতকে দৃঢ়তা দেয়। তেমনি এই বৈশাখ বাঙালীর সকল সৃজন কাজের এক অনবদ্য মহিমারূপে আবির্ভূত হয়। যার থেকে বাদ পড়ে না দৈনন্দিন জীবনের প্রতিপাদ্য কোন বিষয়ই। শিল্প সংস্কৃতি, সাহিত্যের এক অবিরল উৎসারণ যেমন বৈশাখ। পাশাপাশি বৈশাখ মানুষের নিভৃত শিল্প চৈতন্যের উদ্যানেও সৌন্দর্যের অমিয় বর্ণোজ্জ্বলতা ছড়িয়ে দেয়। হাজার বছরের এই বাঙালী সংস্কৃতির এক অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পোশাক-পরিচ্ছদ। নিত্য ব্যবহার্য এই পোশাকের গহনেও রয়েছে বৈশাখের ছোঁয়া। যা সময়ের নিরিখে বদলে গিয়ে এক নিখুঁত সুন্দরতম সৌকর্যে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে বৈশাখের কাব্যময় স্পর্শে।

বৈশাখ যেমন শস্য-শ্যামলা বাংলার আদি লৌকিকতার ছবিটা ফুটিয়ে তোলে। একইরকমভাবে বাঙালীর ব্যবসা-বাণিজ্যে শুভ হালখাতার অনুরণনটাও বাজিয়ে যায় প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে। লোকজ উৎসব থেকে শুরু করে সারা বাংলায় বৈশাখী মেলার যে উপযোজন সিঞ্চিত হয় পহেলা বৈশাখকে ঘিরে তার আদি পত্তন ঘটে মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। সেই থেকে অদ্যাবধি-বাঙালী চৈত্র সংক্রান্তির বিদায়লগ্নে আলোক শিখা জ্বালিয়ে প্রতীক্ষা করে নতুন বছরের, নতুন দিনের, নতুন ক্ষণের। যখন পহেলা বৈশাখের চন্দ্রডোবা ভোরের প্রথম উষার আলোক রেখাটি পূর্বাকাশে উদিত হয়। তখনই বাঙালীর মর্মে এক অন্য মানস জেগে ওঠে। আর এই জেগে ওঠার স্ফুরণকে আরও সজীব করে তোলে ইলিশ-পান্তার এক উজ্জ্বল প্রভাত। এখানেই বাঙালী পেয়ে যায় স্বকীয়তা। প্রতিটা বাঙালী প্রাণই উজ্জীবিত হয়ে ওঠে পহেলা বৈশাখের অনাবিল স্পর্শে। যে বৈশাখ বাঙালীকে নতুন পথের দিকে এগিয়ে যেতে সাহস জোগায়। তেমনি নগর জীবনে, এমনকি গ্রামীণ জীবনেও এক অনন্য শিল্পধারার প্রকাশ ঘটিয়ে যায় ভিন্ন মাত্রায়। আর এই ভিন্নতর মাত্রার বিন্দুতে উন্মোচিত হতে দেখা যায় ফ্যাশন চেতনার। লাল-সাদার নিবিড়-মিলনে লোকজ ফর্মেটে চিরায়ত বাংলাকে চিরন্তন বাঙালীয়ানায় বর্ণিল করে দেয়ার এক বিশাল আয়োজন সাজিয়ে বসে ফ্যাশন হাউসগুলো। ছোট-বড় সবার জন্যই বৈশাখী পোশাকের সম্ভার মুক্ত আকাশের মতো ছড়িয়ে দেয় বাংলা নববর্ষকে ঘিরে। আর পহেলা বৈশাখকে বরণের লক্ষ্যে সমবেত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল বাঙালী এক কাতারে এসে শামিল হয় আর গেয়ে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ মন মঞ্জরিত করে বৈশাখের আগমন প্রহরের এই যে বর্ণচ্ছটা। এতটা বর্ণময়তা যেন প্রকৃতির আর কোন উৎসবে খুঁজে পাওয়া যায় না।

সুরের মূর্ছনা থেকে শুরু করে শিল্পের সকল শাখাতেই যেন বৈশাখের তানপুরাটা এক কোমল সাঙ্গীতিক ধ্রুপদী ছন্দময়তায় বেজে ওঠে নদীর কলতানের মতো। বেজে ওঠে পাখির শিসের মতো। জাহাজের ভেঁপু আর ট্রেনের হুইসেলের মতো। দূরের তাঁতকলের সাইরেনে বেজে ওঠা বৈশাখের হৃৎস্পন্দনে যে আলোড়ন ওঠে বৈশাখের। তার তরঙ্গে নেচে ওঠে বাঙালীর আবেগমথিত হৃদয়। যে হৃদয় পহেলা বৈশাখে গেয়ে ওঠে আবহমান বাংলার চিরচেনা সঙ্গীতবীথি। পহেলা বৈশাখের ভোরে এক অন্য বাংলাদেশকে মানুষ খুঁজে পায় লাল পেড়ে সাদা-শাড়ি, লাল-সাদা’র কম্বিনেশন ফোটা থ্রি-পিস, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, টি-শার্টসহ নানাবিধ পোশাকের মিহিন অবয়বে। আর এভাবেই পহেলা বৈশাখ বাঙালীর জীবন সত্তাকে রাঙিয়ে দেয় বিপুল উৎসাহ, উদ্দীপনায়।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: