মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অভিনয় জীবন আমার

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • ফেরদৌসী মজুমদার

অভিনয় শিখেছিলাম বাবা (আবদুল হালিম চৌধুরী)র কাছ থেকে। তিনি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। আমার ধারণা, বাবা অনেক কিছুই এ্যাক্টিং করতেন। মানে কিছু কিছু জিনিস বলতেন না; কিন্তু আমাদের বোঝাতেন যে তিনি ভীষণ রেগে আছেন। আমরা সেটা পরে বুঝতাম। আমার অভিনয়ের ব্যাপার সেখান থেকেও আসতে পারে। আর কান্নার দৃশ্যে আমি মায়ের (আফিয়া বেগম) কথা মনে করি। মা এত সুন্দর করে কাঁদতেন! আমার সবসময় মনে পড়ে যে, কোন কারণে মা কষ্ট পেয়েছেন আর লম্বা ঘোমটা টেনে নীরবে কাঁদছেন।

আমার অভিনয় জীবন মুনীর ভাইয়ের হাতে হাত ধরে। হঠাৎ একদিন বাড়ি ফিরে মুনীর ভাই বললেন, তুই নাটক করবি। প্রতি উত্তরে, আমি আবার কী নাটক করবো। কেন বাড়িতে যত লোক আসে, তারা চলে যাবার পর তুইতো তাদের নকল করে দেখাস। এটাইতো অভিনয়, এটাই নাটক। উত্তর, কিন্তু আব্বা যদি বকেন। আব্বা শুনলে তো মেরেই ফেলবেন। আব্বাকে নিয়ে ভাবিস না। মুনীর ভাই বললেন, আব্বাকে সামলানোর দায়িত্ব আমার। নাট্যকার শওকত ওসমান। নাটকের নাম ডাক্তার আবদুলাহর কারখানা। প্রথম মঞ্চায়ন হবে ইকবাল হলে। তোর চরিত্র রোবটের। হাত পা টান টান করে তুই শুধু কথা বলবি। ১৯৬০ সাল। মুনীর ভাইয়ের হাতে হাত ধরে সে সময়ের সে মঞ্চয়ানের মধ্যে দিয়েই আমার মঞ্চাভিনয়ের হাতেখড়ি। প্রথম টেলিভিশন নাটকে যে অভিনয় করলাম তাও মুনীর ভাইয়ের লেখা। নাম একতলা দোতলা। মুনীর ভাই আমার পথ প্রদর্শক, আবদুল্লাহ আল মামুন আমার শিক্ষক আর থিয়েটার আমার বিকাশ ও প্রকাশের নান্দনিক উপহার। মুনীর ভাইকে বড় বলতে ইচ্ছে হয়, আধুনিক নাটকের প্রবক্তা আপনি, সালাম আপনায় বারংবার।

’৭১-এর ফেব্রুয়ারি নাট্যদল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা। আবদুল্লাহ আল মামুন লিখলেন নাটক ‘সুবচন নির্বাসনে’। নীতিবান পিতার কাছ থেকে বড় সন্তান শিখেছে, সততাই মহৎগুণ। কথাটা আঁকড়ে ধরতে যেয়ে চাকরি জুটলো না, কপালে জুটলো কয়েদখানা। দ্বিতীয় পুত্র তপনকে শিখিয়েছেন, লেখাপড়া করে যেই গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সেই। লেখাপড়া ঠিকই শিখল তপন কিন্তু গাড়ি জুটলো না। গাড়ি যখন জুটাতে গেল তখন নীতি ভ্রষ্টরা নীতির দোহাই দিয়ে তপনকে কয়েদখানায় ভরলো। কন্যা রানু পিতার কাছ থেকে শিখেছিল, সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে কিন্তু বাস্তবিক সংসারে গুণ ধরে রাখতে যেয়ে দোষে দুষ্ট হলো। স্বামীর চাকরি বাঁচাতে স্বামীর নির্দেশে অফিসের বসের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে না পারার অপরাধে রানু স্বামীর বাড়ি থেকে হলো নির্বাসিত। কখনো রানু হয়ে, এখনো দুঃসময় নাটকে জরিনা হয়ে, অরক্ষিত মতিঝিল নাটকে নুপূর হয়ে, এখন ক্রীতদাস নাটকে কান্দুনী হয়ে, বিবিসাব নাটকে মরিয়ম হয়ে, তোমরাই নাটকে রঞ্জুর মা হয়ে, তথা আবদুল্লাহ আল মামুনের অসংখ্য রচিত নাটকে অভিনয় করতে যেয়ে বুঝেছি, তিনি ছিলেন সময়ের দ্বান্দিক নাট্যকার। ঘটনার আড়ালে ঘটনার উপর তার ছিল গভীর ধারণা আর তা তুলে ধরার গভীর দক্ষতা। স্ক্রিপ্ট পাঠের সময় সংলাপের অন্তর্নিহিত অর্থ এমনভাবে গল্পের ছলে বলতেন যে সেসব সংলাপ আমাদের জোর করে মুখস্থ করতে হতো না। মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আবদুল্লাহ আল মামুন, সৈয়দ শামসুল হক, মামুনুর রশীদ, এসএম সোলায়মানের মতো নাট্যকাররা দর্শকদের খুব বুঝতেন, তাদের মনের ভাষা বুঝতে পারতেন। আমার এও মনে হয়, দলীয় কর্মীদের নিয়ে চলতে তাঁরা জানতেন। কার কি সক্ষমতা তাও তাঁরা মাথায় নিয়ে লিখতেন। নইলে যে আমি নিজে একক অভিনয়ে কোকিলারা করতে রাজি হচ্ছি না, সেই আমাকে দিয়েই একরকম জোর করে কোকিলারা করালেন। নাটকটি অন্যান্য নাটকের মতো মঞ্চ সফল হলো। মঞ্চ-বেতার-দূরদর্শন এবং চলচ্চিত্রের সর্বত্র তার কাছ থেকে কাজ শিখে কাজ করে সাফল্য লাভ আমার পরম প্রাপ্তি। তিনি আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক।

বেতারে আঙ্গিক অভিনয় দেখাতে পারার সুযোগ নেই। পুরোটাই কানে শোনানোর ব্যাপার। চোখের জোরালে অভিব্যক্তিও এখানে ম্রিয়মাণ। এখানে যা কিছু সম্পদ তা হলো কণ্ঠ আর আবহ। মানুষের ছোট ছোট অনুভূতি, সংলাপ, সুখ-দুঃখের যা কিছু ফুটিয়ে তোলা সে সবেরই উপায় কণ্ঠ। কখনো স্পীকারের খুব কাছে লিপ এনে কথা বলা, কখনো মাইক্রোফোন থেকে একটু পিছিয়ে সংলাপ উচ্চারণ অর্থাৎ পরিমিত বাচিক অভিনয় এখানে মুখ্য। সেই ষাট দশক থেকে যে শুরু হলো তার সংখ্যা আজ পঞ্চাশেরও অনেক বেশি। প্রোগ্রাম অর্গানাইজার আতিকুল হক চৌধুরী, পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনসহ কতজনের কত নির্দেশনায় যে বেতারে অভিনয় করলাম সে সবতো আজ আর মনে নেই। কি চমৎকার নাটকের নাম। সারেং, দক্ষিণের জানালা, পথের দারি, নেপথ্যের নায়িকাসহ আরও কত নাম যে মনে পড়ে। আমার বেতার অভিনয় নিয়ে আতিকুল হক সাহেবের একটি মূল্যায়ন ধর্মী লেখা এখনও কানে ভাসে। লিখছেন, ‘এক. নাটকে তাঁর কথা বলার ভঙ্গি ও ঢং একান্তই ঘরোয়াÑ যেন জীবন থেকে নেয়া। দুই. অভিনয়কে তিনি জীবনে সবচেয়ে বড় সাধনা হিসাবে গ্রহণ করেছেন বলেই অনেক কিছু বর্জন করে আজ অনেক কিছু অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তিন. আমি কিংবা আমার সহকারী প্রযোজক কোনদিন দেখেনি রিহার্সেলে ফেরদৌসী মজুমদার কোনদিন দেরি করে এসেছেন’।

নাটকের মাধ্যমে, অভিনয়ের মাধ্যমে আমি যেহেতু জীবনের জয়গান গেয়ে যাই, তাই আমার কাছে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের বিভেদ নেই। সাদা কিংবা কালো, বাঙালী কিংবা সাহেবী সেসবের উর্ধ্বে সব দর্শকই আমার দর্শক। দর্শক বেশি থাকলে তৃপ্তি হয় কিন্তু কম থাকলে হাল ছেড়ে দিই না। অভিনয়ে যখন নামি তখন সবটা শক্তি নিয়েই নামি। অভিনয়ে অভিনয়ে মঞ্চ প্রদক্ষিণ করেছি ঢাকা-চট্টগ্রাম-খুলনা তথা সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে ভারত-দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান-অস্ট্রেলিয়া-সিঙ্গাপুর-ব্রিটেনসহ অন্যান্য দেশে একবার এবং বারংবার। বুঝেছি সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার মতো স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো সব দেশের মানুষেরই সমান। প্রয়োগে আঙ্গিকগত পার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু ধারণে কারও কোন বিভাজন নেই। আর সে কারণে অভিনীত ভাষা আমার বাংলা হলেও রসাস্বাধনে ব্রিটিশ কিংবা জাপান-কোরিয়ানদের কোন তফাৎ নেই। ধিক ধিক অনুভূতি ব্যক্ততার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসাবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এবং প্যারিসে ইউনেস্কো শান্তি প্রধান অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সমন্বয় এবং শান্তির বারতার ভাষা বুঝতে যেমন বেগ পাইনি, ঠিক তেমনি বিচিত্র প্রাচ্যের অভিনেত্রী কানন দেবীর চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে আমার যেমন ব্যাকুলতা আছে ঠিক তেমনি আমার মানসকন্যা ত্রপা কোন না কোন সময় পাশ্চাত্যের অভিনেত্রী সোফিয়া লরেন চরিত্র ফুটিয়ে তুলবে। আবদুল্লাহ আল মামুন যেমনিভাবে তাঁর নির্মিত তথ্যাচিত্রে দেখিয়েছে, আমার অভিনয় দেখছে শিশু ত্রপা। আবার তথ্যচিত্রের শেষে দেখিয়েছেন আমি অভিনয় দেখছি ত্রপার। এই যে মঞ্চকে ঘিরে দুই প্রজন্মের সেতুবন্ধন ঠিক তেমনিভাবেই মঞ্চাভিনয়ের মধ্য দিয়ে ঘটলেও ঘটতে পারে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের প্রবহমান মেলবন্ধন।

ইম্প্রোভাইসকে ঠিক রচিত নাটক বলে যেমন আমার মনে হয় না, ঠিক তেমনি আঙ্গিক নিরীক্ষার নামে বিষয়ের দুর্বলতা থাকলে তাও ভালো লাগে না। একজন নাট্যকারকে সর্বপ্রথম মানুষ চিনতে হয়। তারজন্য তার প্রস্তুতি থাকাটা অনিবার্য। মঞ্চনাটকে নাটকীয়তা থাকতে হয়, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ক্লাইমেক্স থাকতে হয়, বলিষ্ঠ বক্তব্য থাকতে হয়, প্রাণবন্ত সংলাপ থাকতে হয়, ধাবমান গতি থাকতে হয় তথা এত শর্ত মেনে যে সেখানে নাট্যকারকে হতে হয় মানব সচেতন, চমৎকার লেখনী দক্ষতা এবং অপরকে বুঝতে পারার সক্ষমতা। আর একটা বিষয়ও আমাকে ভাবায়, নাট্যকারের প্রতি উদাসীনতা। একটা বিষযে নাটক লিখতে গেলে ভালো বই পড়তে হয়, বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করতে হয়, সংশ্লিষ্টি ব্যক্তিদের সাথে কথা বলতে হয়। আর সেসবের জন্য দরকার হয় নগদ অর্থ। চা বানাতে গেলেতো শুধু চা পাতা আর পানি পেলেই হলনা। সাথে লাগে চিনি, দুধ, আগুন জ্বালাবার লাকড়ি আর হাঁড়ি-কাপ-প্লেটতো রইলো। ফলে টাকার যোগান ছাড়া ভালো নাটক নাট্যকারের পক্ষে লেখা সত্যি কঠিন। একটা প্রজন্মের পর স্ক্রিপ্টের অভাব যে সত্যিই দৃশ্যমান তাতো প্রমাণিত সত্য না হলে বাংলা একাডেমি দু-দুবার নাটকের স্ক্রিপ্টে পুরস্কার দিতে পারলো না কেন। নাটকের দল চালাতে দল প্রধানরা যেভাবে সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ঠিক তেমনি সঙ্কট ভালো মানের নাটকের পা-ুলিপি পাওয়া। এতদসত্ত্বেও আমি আমার ব্যক্তিগত কর্মপরিধির আলোকে বলতে চাই, ব্যর্থতা কোন অজুহাত হতে পারে না। এ বয়সেও আমি আমার শিক্ষকতার উপার্জিত অর্থ দিয়ে আমার অভিনীত চরিত্রকে আরও একটু জীবন্ত করে সাজাই, নান্দনিকভাবে ভরিয়ে তুলি। আমার করণীয় কাজে আমার কোন আপোস নেই।

গাইড হাউস মঞ্চে সবেমাত্র পায়ের আওয়াজ নাটকের অভিনয় শেষ করেছি। দর্শকরা একে একে অডিটরিয়াম ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা করছেন। আমি তখনও চরিত্রের ঘোরে বিভোর। শূন্য মঞ্চের এখানে-সেখানে ঘুরছি আর ভাবছি সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যময় সংলাপের সব উচ্চারণ ঠিক মতো বলতে পেরেছিতো। দর্শকের সব সংলাপের অর্থ বুঝেছিতো। বিপথগামী বাবা চরিত্র তার মেয়ের প্রতিবাদের ভাষায় অনুশোচিত হয়েছে নাকি হয়নি। সাপ যতই দুধ-কলা খাক শেষ পর্যন্ত সাপ যে ছোবল মারবেই এ সত্য পরিষ্কার হলো কি সবার অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। জাকারিয়া ভাইয়ের বাবার চরিত্রেরুপদান কি মধুর। আচ্ছা ত্রপা কি পড়ছে নাকি মায়ের জন্য ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। শামসুল হক কি দর্শকাসনে ছিলেন। চারদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা। আচ্ছা অস্থিরতা থাকলে মানুষের উন্নয়নটা হবে কিভাবে? আর উন্নয়ন। আনমনে কখন যে ফাঁকা পাটাতনের মাঝে পা ফেলে হ্যাচকা টান দিয়েছি ঘরে ফিরব বলে অমনি দপাৎ। প্রথমে কিছু বুঝতে পারিনি। ঘোরে ছিলামতো। সন্ধিৎ ফিরে পেয়ে এদিক সেদিক তাকাচ্ছি, কেউ দেখে ফেলল না তো। কি লজ্জার কথা। বড় একটা মানুষ আমি দড়াম করে পড়ে গেলাম। এটা কোন কথা হলো। যাই তাড়াতাড়ি উঠি, বাড়ি যেতে হবে তো। কিন্তু একি আমি দাঁড়াতে পারছি কি না। দাঁড়াবো কিন্তু আমার পা কোথায়। পায়ে কোন বল নেই। পায়ে দেহের সাথে যুক্ত তাও বুঝতে পারছি না। আমি উঠতে পারছি না। তোমরা কে কোথায় আছ আমাকে ওঠাও। আমি কি তবে মারা যাচ্ছি। আমি দাঁড়াতে পারছি না, নড়তে পারছি না। এ কোন বিভীষিকা। হ্যাঁ হ্যাঁ টের পাচ্ছি। ব্যথা, হাঁটুতে ব্যথা। ব্যথা নিয়ে কাতরাতে কাতরাতে যখন সিঙ্গাপুরের হসপিটালে শয্যাশায়ী তখন মনের ক্যানভাসে মর্মপীড়া। তাহলে আমি আর হাঁটতে পারবো না, মঞ্চে দর্শকদের সামনে অভিনয় করতে পারব না, শাড়ি পড়তে পারব না, পাহাড় ডিঙ্গাতে পারব না, সমুদ্রে নামতে পারব না, বৃষ্টিতে ভেজা হবে না। ও সেকি হৃদয়ের মর্মমূলে ব্যথা। দেহের ব্যথা আর মনের ব্যথার মিলিত চাপে আমি যখন ক্রমে বিলীন হবার মুখে তখন বাংলাদেশের অন্যতম পেইন্টার মুকতাদির সাহেবের একটি কথা আমাকে পুনঃসম্বিৎ ফিরিয়ে দিল। তিনি বলেছিলেন, ফেরদৌসী ভাবী, নিয়তি এক জোড়া পায়ের বদলে যদি এক জোড়া চোখ নিত তবে কি আপনি খুশি হতেন! কথাটা আমার কানে গীর্জার ঘণ্টার ধ্বনির মতো কম্পন দিল। পা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করছি অথচ চোখ জোড়া না থাকলে তো পুরো পৃথিবী আঁধার। আমি আর কোন কিছুই দেখতে পাব না। বাদ দিলাম দুশ্চিন্তা। কিন্তু নতুন অনুসর্গ। খবর পেলাম, সিঙ্গাপুরেরই অপর এক হাসপাতালে সাইফুদ্দিন আহমদ মানিকের নাতনি ক্যান্সারে আক্রান্ত। চিকিৎসার জন্য টাকা দরকার। অনেক টাকা কিন্তু যোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। মনে মনে ভাবছি আমি তো একজন অভিনেত্রী। অভিনয়ের বাইরেতো আর আমার কিছু করার নেই। আচ্ছা আমি অভিনয় করলে ফান্ড রাইজ হবে? হবেই যদি তবে করব না কেন। আচ্ছা ডাক্তার পারমিশন দেবে। খুব করে ডাক্তারকে ধরলাম। তিনি আমার ব্যাকুলতা দেখে উৎসাহিত করলেন। ডাঃ শ্যামল দাসের অনুপ্রেরণা নিয়ে একটি হুইল চেয়ারে বসে অডিটরিয়ামে প্রবেশ করলাম। ঢুকতেই দর্শকদের তুমুল করতালি। উচ্ছ্বাসে-আনন্দে রোগ-ব্যাধি-জ্বরা সব ভুলে অভিনয় শুরু করলাম। অভিনয়ে ক্লাইমেক্স সংলাপ উচ্চারণ করতে করতে কখন যে এই আমি হুইল চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি সে জ্ঞানও আমার নেই। চোখোর ঝাপসায় শুধু দেখছি হল ভর্তি দর্শক দাঁড়িয়ে তুমুল করতালি দিচ্ছে আর ডাঃ শ্যামল দাস সেবীকাকে ফিসফিসিয়ে বলছে, ইটস মিরাকল, ইটস মিরাকল। তার পর তো আমার হাঁটুতে আর্টিফিসিয়াল প্লেট বসানো হলো। ধীরে ধীরে সুস্থ হলাম। মঞ্চে ফিরলাম। অভিনয় করলাম এবং এখনও করছি। তাই সঙ্কট এবং সম্ভাবনার চিরন্তন উপস্থিতি দেখে আমার মনে হয়, কোন কিছুতেই উতলা হতে নেই, মেনে নেবার ধৈর্য চাই কারণ বিধাতা মানুষের জন্য পর্যায়ক্রমে সব সাজিয়ে রাখেন।

পুরস্কার একজন শিল্পীকে সম্মুখে ধাবিত হতে তাড়িত করে, তিরস্কার পক্ষান্তরে নৈরাশ্যে ঘিরে ফেলে। কিন্তু খ্যাতি আসলে অখ্যাতিও লেপ্টে যাবার চান্স থাকে। মধ্যি কথা যাকে সহস্র মানুষ তাড়িত করেনি তার পক্ষে বিখ্যাত হওয়া সত্যিই কঠিন। প্রচার প্রচারণা কিংবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে কেউ কখন বড় হয় না। সেসব হঠাৎ উল্কাপাতের মতো আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পুনঃআঁধারে মিলিয়ে যায়। তবে যে শিল্পী তার নির্মিত শিল্পের প্রতি বিশ্বস্ত, বিচ্ছিন্নতার বিপরীতে ধারাবাহিক এবং মানব মঙ্গলের জন্য নিবেদিত তবেই সে তার চাওয়ার অতিরিক্ত পেয়ে যায়। আমিও তো নানা করে একুশে পদক, প্রথম জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার, সিকোয়েন্স এ্যাওয়ার্ড অব মেরিট, শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার, উইলিয়াম কেরিপদক, ঋষিজ পদক, অন্যদিন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম পারফরমেন্স এ্যাওয়ার্ড, মুনীর চৌধুরী সম্মাননা, মেরিল প্রথম আলো তারকা জরিপ ২০০৬ আজীবন সম্মাননা প্রভৃতি পেয়েছি। তথাপি আজ যখন নতুন কোন সম্মাননায় সম্মানিত হই তখন আত্মজিজ্ঞাসা আসে, আমি আমার করণীয় কাজ করে যেতে পারছিতো। বিনয়ের বিপরীতে ঔদ্ধত্য জায়গা করে নিচ্ছে নাতো। একটা কথা, যত ভালই হোক একটা মানুষ যখন নিজেই তার প্রশংসা নিজে করা শুরু করে তখন তা অহঙ্কার এবং একই সাথে বিরুক্তিকর। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিরক্তকারীকে কারোরই ভাল লাগার কথা না। পুরস্কার পাওয়া ও দেয়ার ক্ষেত্রে আমার একটা বাহ্য দৃষ্টিভঙ্গি আছে। শুনেছি পরিচালক শ্যামবেনেগাল এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, তিনি তার সব ক্রেস্ট গলিয়ে প্লেট বানিয়ে সেই প্লেটে ভাত খান। কথার সত্যতা আমার জানা নেই। তবে আমার দৃষ্টিভঙ্গিটাও এই মুখী। অর্থাৎ অধিক ক্রেস্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, রাখবার মতো স্থানের যোগাড় প্রভৃতি একটা ঝক্কির কাজ। বরং পুরস্কারে সম্মাননার পাশাপাশি আর্থিক সম্মানী দেয়ার প্রতি জোড় দিলে সেটাই ভাল। কেননা হন তিনি অভিনয় শিল্পী, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী কিংবা সাহিত্যিক। শিল্প সৃজন সত্যিকার অর্থে একটা সাধনার বিষয় এবং সে কারণে সময়ও দাবি করে। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার কারণে শিল্পী মাত্রই আর্থিক অনটনে থাকেন। ফলে পুরস্কারের একটা অংশে যদি নগদ অর্থমূল্য থাকে তাতে করে সে তার বিগত ঋণ পরিশোধ করতে পারে আবার নতুন সৃজনের ক্ষেত্রে লগ্নিও করতে পারে। একজন প্রকৃত শিল্পী অনেকটা মরুভূমির মাঝে বেড়ে ওঠা বৃক্ষের মতন যে সামান্য একটু পানি তথা সহযোগিতা পেলে তড়তড়িয়ে বেড়ে ওঠে। এটা আমাদের কিছুতেই ভুললে চলবে না, শিল্পীদের পরিষেবা দেয়াটা আমাদের সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় দায়।

নাটকের অভিনেত্রী আমি তথাপি আমার প্রিয় চলচ্চিত্র অপুর সংসার। সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী, অপরাজিতা এবং অপুর সংসার এই ট্রিলজির মধ্যে অপুর সংসার কেন এতপ্রিয় সেটি ভাববার বিষয়। এমনতো না আমার বড় ভাই কবীর চৌধুরীর ডাক নাম মানিক আর সত্যজিৎ রায়ের ডাক নাম মানিক বলেই সত্যজিৎ রায়ের যে কোন একটি চলচ্চিত্রকে ভালো লাগতেই হবে। ভালো লাগার কারণ গভীরে। অপূর্ব কুমার রায় তথা অপু পথের পাঁচালীতে আত্মার আত্মা বোন দুর্গাকে হারিয়ে একা, নিঃসঙ্গ। অপরাজিতা যেয়ে মা এবং বাবাকে হারিয়ে আরও নিঃসঙ্গ। অপুর সংসার এ অপু যখন লক্ষ্মী বৌকে একান্ত আপন ভেবে পরিপূর্ণ নির্ভর করে স্ত্রীকে আপন করে বাঁচাতে চাইলো তখন নিয়তির ছোবলে স্ত্রী-শূন্য অপু আজীবনের মতো একা হয়ে গেল। একা আমরা কম বেশি প্রত্যেকেই। সৃজনের স্বার্থে, মনোনিবেশের প্রয়োজনে আমি নিজেই আমাকে অপরের থেকে একা করে ফেলি, আলাদা করে ফেলি কিন্তু কিছুতেই আমি একা এটা মানতে পারি না, মানতে চাই না। তাই সব সময় নিঃসঙ্গতা, একাকিত্বকে উপজীব্য করে অভিনয়ের ডাক এলে, উপস্থাপনা শিল্পে উত্তীর্ণ হবার সুযোগ থাকলে আমি না করি না। জার্মান নাট্যকারের লেখা নাটক রিকোয়েস্ট কনসার্ট অবলম্বনে নিঃসঙ্গতার চাপ সহ্য করতে না পেরে বাঁচার জন্যই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া এক শিক্ষিকার চরিত্রে প্রাণ ভরে, হৃদয় নিংড়ে, অশ্রুসজল নয়নে অভিনয় করলাম। দর্শকদের কাছে নিবেদন করলাম, মানুষ রোবট নয়। সে একাকী বাঁচতে পারে না। মানুষ চায় সংসার, চায় সমাজ আর বেঁচে থাকার আনন্দ। মানুষ যদি মানুষকে না বাঁচায়, তবে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখবে কে! কিন্তু ঐ যে বলে, স্বাস্থ্য সম্প্রসারিত হয় না কিন্তু রোগ সম্প্রসারিত হয়। কোথায় বিপদাপন্ন মানুষের প্রতি সহানুভূতি বাড়বে তা না বরং ফেরদৌসী মজুমদার যদি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে পারে তবে অনেকেই আমরা সে পথে নই কেন। আমিতো অভিনেত্রী, দর্শকদের বুঝতাম। পাছে আমার অভিনয়ে বিভোর হয়ে ভুল কিছু করে না বসে সেজন্য নাটক শেষে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলতাম, ‘জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া কিন্তু সমাধান না, মৃত্যু কোন সমাধান না’। সমাধান না যান্ত্রিকতার অজুহাতে মানবতাকে উপেক্ষা করা। ছেলে-মেয়ে কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে বার্ধক্যে আক্রান্ত বাবা-মাকে উপেক্ষা করবে সে কথা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আর তাই আমি প্রতিনিয়ত মঞ্চে ত্রপার নির্দেশনায় মুক্তি নাটকে অভিনয় করে চলেছি।

সন্তানদের উপেক্ষার কারণে সুস্থ স্বাভাবিকতার সমান্তরালে পাগলামো, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টির সমান্তরালে ক্ষীণ দৃষ্টি, বুকভরা অভিমানের পাশাপাশি তীব্র ভাবাবেগে মুখোমুখি শাসন, মুষড়ে যাওয়া আবার ভেঙ্গে না পড়া, উচ্ছ্বাসে ফুলে ওঠা মুহূর্তেই নৈরাশ্যের কুয়াশায় নিজেকে আড়াল করা প্রভৃতি নিয়ে এক মায়ের যে নিঃসঙ্গতার আর্তনাদ সেটি আমি মঞ্চাভিনয় করে নিঃসঙ্গতার বিপরীতে প্রতিবাদ জানাই। আমার জীবনের প্রথম অভিনয় ছিল রোবটের মাঝে প্রাণ প্রতিষ্ঠা। আমার আজীবনের সাধনা, আমি অভিনয়ে অভিনয়ে মানুষের প্রাণে প্রাণ প্রতিষ্ঠা যেন করে যেতে পারি। বর্তমান সভ্যতার যদি কোন অভিশাপ থেকে থাকে তবে তা মানুষ থেকে মানুষের দূরত্ব, বহুত্ব থেকে একাকীত্ব। এই অভিশাপের বিপরীতে যার লড়াই তার নাম সংস্কৃতির প্রবহমানতা। সংস্কৃতির বলয়ই শেষ পর্যন্ত সভ্যতার আলোক শিখাকে জ্বলে থাকতে রসদ জোগাবে। এই রসদ সরবরাহে আরও অনেকের মতো আমিও একজন অংশীদার আর এখানেই সার্থক অভিনয় জীবন আমার।

অনুলিখন

অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: