কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

হারাতে চাই না নিজস্ব জাগরণ

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • সুশান্ত মজুমদার

বহু দিন হলো, পহেলা বৈশাখ বাঙালীর সর্বজনীন উৎসব হিসেবে আমরা পালন করছি। বর্ণাঢ্য বহুবিধ আনন্দ আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা বাংলা নববর্ষকে বরণ করি। উৎসবে থাকে অনেক রঙ ও বৈচিত্র্য-হালখাতা, ভোরের সঙ্গীতানুষ্ঠান, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও দিনব্যাপী লোকজ সংস্কৃতির মেলা। নববর্ষের অভিষেক উৎসব সর্বজনীন কি সার্বজনীন যাই বলি অর্থ একটাই-সবার জন্য বা বারোয়ারি। বাংলা সালের প্রথম দিনটির ধুমধাম আমোদ-পর্বের ক্রিয়াকর্ম-উদ্যোগ-আয়োজন হচ্ছে সব মানুষের। পুরনো দিনের পৃষ্ঠা উল্টে বা গবেষকদের অনুসন্ধানে আমরা জেনেছি, অতীতে বাংলা নববর্ষ বরণের আগের দিন চৈত্রসংক্রান্তি, পরের দিন মানুষের মিলিত আনন্দ-অনুষ্ঠানে পার হতো। অতীতেও শ্রেণী ছিল, শ্রেণীদ্বন্দ্ব এত প্রকট ছিল না; আর ধর্মের ভেদাভেদ নিয়ে মানুষ আদৌ ভাবিত ছিল না বলে বাংলা নববর্ষে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, সৌজন্যবোধ রমনীয় হয়ে উঠত। পহেলা বৈশাখে আছে ছড়ানো অফুরান প্রাণ, মানুষের সঙ্গে মানুষের অটুট বন্ধন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার স্পষ্ট প্রকাশ। বাঙালীর আদি ও অকৃত্রিম দৈনন্দিন লোকশিল্পের বিষয়াদির বিকিকিনি, খাদ্যাদি গ্রহণ এবং লোকজ পার্বণে দিনটি থাকত ভরপুর।

মূলত গত শতাব্দীর ষাটের দশকে আমাদের এই ভূখ-ে নববর্ষ পালনের চিরাচরিত অনুষ্ঠান জনমনে সাড়া জাগিয়ে ব্যাপকভাবে ফিরে আসে। বাঙালীর স্বরূপ সন্ধান, সঠিক আত্মপরিচয় ধারণে মানুষের সংঘবদ্ধ ন্যায্য তৎপরতার মাধ্যম হিসেবে রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী, বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি পালন জোরালোভাবে শুরু হয়। অবাঙালীদের কর্তৃত্বের বিপরীতে উত্থান ঘটে বাঙালী মধ্যবিত্তের এবং তারাই স্বাজাত্য প্রেরণায় পহেলা বৈশাখকে নিয়ে এলো বড় আঙ্গিকের উৎসবে। এর পেছনে ক্রিয়া করেছে বাঙালী জীবনে নেমে আসা দুর্যোগ মোকাবেলার উপায়। ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত দেশের দুই খ-ের দূরত্বের কারণে পূর্ববাংলার মানুষ প্রথম থেকেই মানসিকভাবে পশ্চিমাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। ভাষা নিয়ে বিরোধের শুরু হলে পাকিস্তানের ভাবাদর্শ অসার ও সরকারের ওপর অনাস্থা ত্বরান্বিত হয়। শাসক গোষ্ঠীর উপরমহল থেকে তখন বাঙালী সমাজের প্রচলিত ক্রিয়াকর্ম, নববর্ষ পালন, সঙ্গীত, কপালে টিপ পরা নিয়ে বিতর্ক চাপিয়ে দেয়া হয়। বলা হলো, বাঙালী কৃষ্টি-সংস্কৃতি ইসলামসম্মত নয়। এর প্রতিবাদ মূর্ত হয়ে উঠল বাংলা নববর্ষ পালনের উৎসবে। এরই অন্যতম প্রতিক্রিয়ায় বাঙালীর নিজস্ব দেশের প্রতিষ্ঠা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির আবহে রীতিমতো প্রচার চালিয়ে রাজধানী ও প্রধান শহরসমূহে নববর্ষ পালন করি। ছুটি কাটানো ও বিনোদন উপলক্ষ করেও মানুষের ঢল নামে। একদিনের জন্য হলেও আমাদের বাঙালিয়ানার জোয়ার বয়ে যায়। পরদিন থেকে আমাদের বাঙালী সত্তার কোন খোঁজ থাকে না। সত্য হচ্ছে, শহুরে মানুষ বাংলা কত সাল, মাস, তারিখ বলতে পারে না। অভ্যাস ও চর্চার অভাব, বহির্বিশ্বের প্রতি মনোযোগ হতে এটা হচ্ছে। এটাও অস্বীকার করা যাবে না, অধিকাংশ মানুষ মনে-প্রাণে এখনও শেকড়ের টান অনুভব করেন। আমরা পেছনে যে মফস্বল বা গ্রামজীবন রেখে এসেছি, যে মাটির জগতে আমাদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে, আজ জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে শহরবাসী কিংবা সুযোগবঞ্চিত পাড়াগাঁর লোকালয়, সুশীতল ছায়া ছেড়ে ইট-পাথরের বাসিন্দা, এই আমরা কখনও কখনও স্মৃতিকাতর হয়ে বাংলাকেই খুঁজে ফিরি। নবান্ন উৎসব থেকে বসন্ত উৎসবে তাই অনায়াসে সাড়া দিই। বাংলা নববর্ষ নিয়ে এখনও আলোড়িত হই। আমাদের উদার অসাম্প্রদায়িক সমন্বয়ধর্মী চেতনার প্রতিফলন ঘটে নববর্ষের কার্যক্রমে। সমাজ ও রাষ্ট্রের অশুভ শক্তি নিয়ে বোঝাপড়ার প্রতীকী উদ্যোগ গণ্য করে মঙ্গল শোভাযাত্রায় আমাদের অংশগ্রহণ প্রতিবছর বাড়ছে। শুভ ও অশুভ’র অবয়ব-নিদর্শন-প্রতিমূর্তি হিসেবে বিভিন্ন জীবজন্তু পশুপাখি মঙ্গলযাত্রায় থাকে এবং তা আমাদের মনোযোগের, আস্থার, বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সকাল থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অসংখ্যজন শামিল হন। আমরা পুরনো বছরের জরাজীর্ণতা মুছে এবং নতুন বছরের সূচনালগ্নে ঐতিহ্য অনুযায়ী বৈশাখ উদ্যাপনে মাতোয়ারা হই। এমন কি বাংলার গ্রামজীবনেও নববর্ষের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

কিন্তু বাংলা নববর্ষ পালনে বর্তমানে আমরা কি কিছু হারিয়েছি? এসব জানার বিষয়ে আমাদের আদৌ কোন আগ্রহ আছে কিনা? এভাবেই বলা ভালো, পুরনো দিনের নববর্ষ পালনের সঙ্গে এখনকার উদ্যাপনের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ অনেক কিছু বর্জনও করে। আমরা যেমন বন্ধুত্ব-জীবনযাপনের উপায়, আচরণগত স্বভাব নবায়ন করি, নতুন সময় ও শর্তের দাবি মেনে নিই, তেমনি অজ্ঞাতে, নীরবে, না- বুঝে পরিবর্তিত হই। এই রদবদলের অনেক কিছু আসে ভেতর থেকে, মৌলিক কাঠামোগত কারণে রূপান্তরিত। আবার নকল-জাল-মেকি-অপ্রাকৃত, ক্রিয়াসিদ্ধ বা প্রকৃতসৃষ্ট নয় এমন বিষয়ও গ্রহণ করি, তার প্রতি সাড়া দিই। মানুষের দুরূহ চরিত্র এমনই যা মৌলিক নয় তার জন্য মুগ্ধতা ও আকর্ষণ অধিক। নববর্ষের অনুষ্ঠানের জন্য নিকট অতীতেও আজকের মতো এত অর্থ ব্যয় হতো না। বিভিন্ন কোম্পানি, আবার এসব কোম্পানির মালিকদের রয়েছে নিজস্ব সংবাদপত্র ও টেলিভিশন, তারা নববর্ষের অনুষ্ঠান স্পন্সর করে আসছে। এদের অর্থায়নে অনেক বেশি রঙিন, নববর্ষ নিয়ে অনেক বাকোয়াজি, কোলাহল, বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে নড়ে ওঠে সাধারণজনের মনোযোগ। কিন্তু দিন ফুরালেই সব শেষ। অনেক উদ্যোগ-জোগাড়, ধুমধাম, আমোদ-আহ্লাদ শুধু ভঙ্গি দিয়ে চোখ ভুলাচ্ছে, কিন্তু মনের তলদেশ অব্দি কোন আলো ফেলছে না। বছরব্যাপী জমানো ভেতরের অন্ধকার, গ্লানি, পশ্চাৎপদতা মুছে দেয়ার মতো কোন প্রয়াস দেখা যায় না। জ্ঞানের ওপর যে ধুলো জমে, চেতনায় যে জং ধরে তা পরিচ্ছন্ন, প্রাণবান, জীবন্ত, সজীব করছে না। এ-কথা শুনে অনেকের ভুরু বাঁকা হয়ে আসতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, পহেলা বৈশাখের প্রথম দিনটি চলে যাওয়ার পর আমরা কি বাঙালী থাকি কিংবা সেই যে লোকপ্রসিদ্ধ করা শতাব্দীর প্রাণরাঙ্গা ঐতিহ্য আমরা কি ধারণ করি? নববর্ষ বরণের নামে এই বৈশাখে কোন্টা চাই, পোশাক, শাড়ি, চুলবাঁধা, দুলপরা, রঙিলা বসন, দেশি ঢঙ, বৈশাখের দিনে অতিথি আপ্যায়ন ও রাতের নিমন্ত্রণের সাজসজ্জা নিয়ে এখন চলে কত কিসিমের আলোচনা। এতে উসকানি যোগাচ্ছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া। তারা চায় ব্যবসা। অর্থ-সামর্থ্যে বলিয়ান কোন কোন প্রবাসী বাঙালী স্বদেশের রাজধানীতে আসেন। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বিগলিত হয়ে শুধু অংশগ্রহণ না তাঁরা বছরের অনেক কেনাকাটা করে বিদেশ-বিভুঁইয়ে ফেরেন। ফ্যাশন হাউসগুলো তাই জাঁক-জমকপূর্ণ থাকে। এদের কর্মপ্রবাহ কেবল বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট, নববর্ষের সঙ্গে সম্পর্কহীন।

বড় বিপদ রয়েছে নেপথ্যে, লোকচক্ষুর আড়ালে। আমাদের অসচেতনার সুযোগে কৃষ্ণ মেঘ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলা নববর্ষ পালনের বিরুদ্ধে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তীব্র ধর্মীয় ঝাঁজ। চতুর মুখ ও স্বরে বলা হচ্ছে, নববর্ষের উৎসব-আনন্দ ধর্মসম্মত নয়। সেই যে কয়েক দশক আগের পাকিস্তানী ভূতের অপনসিহত তা নতুন মোড়কে নতুন বাক্যে পরিবেশন করা হচ্ছে।

আমরা অনেক হারিয়েছি, বাংলা নববর্ষ পালনকালে মমতাময়ীদের খাওয়া ও উপহার এগিয়ে দেয়া হাত, সুরের অমৃত ধ্বনি, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, হালখাতার আয়োজন ও ঢাকের বাধ্য। কোনক্রমেই বৈশাখী উৎসব নিয়ে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা, বাঙালীর শত বছরের জাগরণ ও আচরণ, মনোভাব আমরা হারাতে চাই না।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: