আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কবিতা

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

শব্দে লেখা চাই

রুবী রহমান

চোখের পানিকে আমি শব্দে লিখতে চাই।

চাপাতির কোপে গোনা মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণা

সাদা কাগজের ফ্রেমে কি করে সাজাই!

বার্ন ইউনিটের বুকফাটা আর্তনাদ

পোড়া মানুষের গন্ধ বুজে আসে নাসারন্ধ্র

সেই গন্ধে ঘুম আসে না একলা জাগি রাত।

বত্রিশ নম্বর থেকে নেমে আসা রক্তের ধারায়

বাংলাদেশের যত মরা গাঙে বান ডেকে যায়

এই মহাবেদনাকে ইতিহাসে কোন বাঁকে

কী মহতী বর্ণমালা মহকাশে মশাল জ্বালায়!

বাম হাতে চোখ মুছি ডানহাতে শব্দ খুঁজি

চলে যাওয়া ওরুণের ফেলে যাওয়া স্বপ্ন-ইশতেহার

আর তার বোনের রোরুদ্যমান রোষ

কোন বর্ণে কোন শব্দে লিখি এই মহান আক্রোশ।

এ বড় কঠিন কাজ। এ বড় কঠিন দুঃসময়

টু-শব্দ করোনা কেউ। তাড়াহুড়ো মোটেও নয়।

বৈশাখের প্রথম রোদ্দুর

মাহবুব সাদিক

বড্ড বেশি ফুল ফোটাল বসন্ত এবার

মনে হয় সবগুলো রঙের পাত্র

উজাড় করে কেউ দিয়েছে ঢেলে গাছে গাছে,

তাদের রাঙ্গা ডাল থেকে

সন্তর্পণে ঝুল খেয়ে কতবার আমি নেমে গেছি

সংক্রান্তির নিবিড় আঁধারেÑ

সেইখানে রঙ ও জন্মান্ধ আঁধারের সখ্যতা দেখে

সর্বনাশের ঢেউ দোলে আমার বুকেই;

আমি তাই পুরানের রথে চেপে আরও নামি

পাতালের দিকেই বরংÑ

তারপর প্রপাত ও পাতালব্যাপী কানামাছি খেলে

পথে পথে শয়তানের কনুয়ের মতো

নানা বাঁক ঘুরে ঘুরে

আজ ভোরে এসে গেছি বৈশাখের প্রথম রোদ্দুরে।

মা, আমাদের অস্তিত্বে তুমি

সৈয়দ রফিকুল আলম

টুকরো টুকুরো অবিমিশ্র স্মৃতিগুলো ভেসে বেড়ায় ক্ষণে ক্ষণে মাÑ

হারানোর আবেগ জর্জর অনুভূতির ক্ষত, তা বহু চেষ্টায়ও

মন থেকে তাড়াতে পারি না, বলা যায় কিশোর বয়স হতে

অদ্যাবধি প্রাত্যহিকতায় কলম হাতে সাদা পৃষ্ঠায় লেখা আসুক

কিংবা না আসুক প্রয়াস চলতো। আজ দু’মাস গত, চোখের

জল ও কালি মিশ্রণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে চিত্রপটের আখ্যানগুলো

চারদিকে ঘুরে বেড়ায়-কিছু হয়ে ওঠেনা। প্রত্যেক সন্তানের

জন্য মা অনিরুদ্ধ কল্পনাতীত। মা-মা-ই এখানে দ্বিতীয় কোন

শব্দ উচ্চারিত হতে পারেনা, সর্বংসহার পর একমাত্র মায়েই

সন্তানের অন্তঃশীল পাঠক্রম। শতবর্ষ পূর্বে দাপুটে সম্পন্ন

পরিবারের কন্যা স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে চার শ্রেণীÑ

পর্যন্ত আরবী বাংলায় পড়াশুনা অতঃপর বিবাহ। প্রথম সন্তান

আমিসহ চারভাই-চারবোন। শিশুকাল হতে দেখে আসছিÑ

আরবী বাংলা পঠন-পাঠনে ঝোঁক, আর ছিল শ্বশুরের গ্রামসহÑ

পার্শ্ববর্তী আর দশ গ্রামের যতো গরিব দুঃখীর অনাহার ক্লিষ্ট

নিপীড়িত জনমানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের স্কুলে যাওয়ার

বই-পুস্তক বস্ত্র প্রদান করা, আর যতদূর সম্ভব তা মুক্তহস্তে দান

করে দেয়া এমনকি দামী-দামী শাড়ি গয়না উজাড় করে দেয়া।

কিন্তু কোন প্রকার প্রচার-প্রচারণায় অসন্তোষ প্রকাশ করতে। তাই

তো তুমি হতে পেরেছিলে আবালবৃদ্ধ সবার বড় মা। মা তুমি;

যেখানেই থাকো আমাদের অস্তিস্তে¡র মধ্যে তুমি থাকো। আর

সন্তানের বিনম্র প্রার্থনা কিঞ্চিদধিত তোমার সর্বগুণের পরশ

আমরা যেন শোধ করতে পারি।

লকলকে জিহ্বার গর্জন

মিনার মনসুর

তুমি যখন তোমার মখমল বাহু দুটি ভাসিয়ে দিয়েছিলে চৈত্রের উদ্দাম হাওয়ায়Ñ ঠিক তখনই গর্জন করে উঠেছিল তার লকলকে জিহ্বা। আবহমান কালের রক্ত-হিম-করা সেই গর্জন চোয়ালবন্দি থাকলেও তার তীক্ষè দুটি চোখ ঠিকই সেঁটে থাকে আমাদের হৃৎপিণ্ডের নধর মাংসে। কিন্তু কেই-বা তা গ্রাহ্য করে? আর উদীয়মান যে-সূর্য তার গল্প তো একেবারেই আলাদা।

তুমি সেই আলবাট্রসÑ জন্মলগ্নেই ভেঙে দেওয়া হয়েছিল যার ডানা। নুলো ভিখিরির মতো তুমি জনবহুল রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে। কংক্রিটের খোঁচায় চামড়া ছিঁড়ে যাবে। যক্ষ্মারোগীর শ্লেষা আর কুকুরের বিষ্ঠায় ঢাকা পড়ে যাবে তোমার দেহের বিদ্যুৎ। তার পরও তুমি হাসবে। বাড়িয়ে দেবে করুণার্দ্র, বিবর্ণ, এবড়োথেবড়ো থালাÑ যেখানে প্রতিবিম্বিত হবে তোমার প্রতিকৃতি।

কিন্তু ইকারুসের বংশধর তা গ্রাহ্য করবে কেন? কত রূপেই না ফিরে ফিরে আসবে জিহ্বার গর্জন। সমুদ্র শাসাবে। গ্রাম্য মোড়লের মতো হামলে পড়বে বৃদ্ধ সূর্যের ক্রোধ। যদিও যথেষ্ট বিনম্র তুমি, তবু কেই-বা সহ্য করে উদীয়মান সূর্যের স্পর্ধা? আর স্বনির্মিত ডানার যে-দ্যুতিÑ সে তো আরও শাশ^ত, আরও মহৎ।

ঢাকা : ৪ এপ্রিল ২০১৫

নিমন্ত্রণের খসড়া

রেজাউদ্দিন স্টালিন

যখন তোমার ইচ্ছে হবে এস

যে ছিল সে চলেই গেছে কবে

বাধা দেয়ার কে আর আছে বল

যখন তোমার ইচ্ছে হবে এস

এখন বোশেখ গাছের পাতা ঝরে

ঘাসের ঘাড়ে তপ্ত রোদের রেখা

আসবে তুমি কোন পরবের ’পরে

পথ পেয়েছে নিরুদ্দেশের দেখা

চতুর্দিকে হরেক রকম কাজ

ইস্কাবনের ছবির মতো নারী

বক্ষ খুলে দেখায় কারুকাজ

এবার অতীত ভুলতে যদি পারি

গন্-গনে রোদ শহর পুড়ে ছাই

গাড়ি ঘোড়ার ঈর্ষাকাতর গতি

এসব কথা বলার তো কেউ নাই

গাছ-গাছালির করুণ পরিণতি

রাত্রি এলে স্মৃতির পরে স্মৃতি

শুনিয়ে যায় আবার হবে দেখা

যখন তোমার ইচ্ছে হবে এস

আমি আছি আগের মতো একা

সে

নান্নু মাহবুব

উড়ন্ত রুমাল থেকে সে নেমে এল মাটিতে, ঘাসের ওপরে।

আমি তার সামনে মেলে ধরলাম একখ- ম্যাপ।

মৃদু কৈফিয়তের সুরে দেখালাম, কোথায় কোথায় তার ভূগর্ভস্থ দ্বীপ,

তার ফসিল থেকে কোথায় উড়ছে রূপালী ধোঁয়া, কবেকার নির্জন তার

জলাশয় আড়াল করেছে জঙ্গল, কোন প্রতœখ-ে এখনো লেগে আছে

তার অস্পষ্ট চুম্বনের চিহ্ন।

সে আমাকে বলল, ‘চালবাজ! পৃথিবীর সকল কবিই চালবাজ!’

সে-মুহূর্তে তার মুখে মিশে গেল পৃথিবীর সকল দুঃখী নারীর মুখ,

আর আমি সকল পুরুষের অপরাধ নিয়ে মাথা নিচু করে রইলাম।

সে যখন বাতাসে মিলিয়ে গেল, প্রান্তরে জেগে রইল পান্নারঙ ঘাস,

দূরে সেই পুরাতন, বিস্তৃত বিশাল অরণ্য।

সহজিয়া

রহিমা আফরোজ মুন্নী

আর কোনও রা ছিল না

শুধু চেয়ে থাকা

বিহবল পৃথিবী

আর পাথরের চোখঅলা

না ঈশ্বর, না মানুষ

একইভাবে আলোয়ান গায়ের

চরিত্রবান এক নীরবতার দিকে

শুধুই চেয়ে থাকা

কী তবে আছে আমার...?

মাঝরাতে ঝলমলে তারা

হৃষ্টপুষ্ট মেঘ, কী অশেষ কৃপা

ফুসফুস ভরা দিনের মাধুরী

লুটপাট শেষের আধা-খেঁচড়া ঘাস

নিশ্চিত বিশ্রামের বিছানা

প্রিয় পথজুড়ে এখন জাগছে

জেগে উঠছে ।

এই বার চেপে ধরা!

প্রত্যাখ্যাত রক্ত দ্বিগুণ উল্লাসে নাচছে মস্তিষ্কে

শরীরে জড়িয়ে নির্যাস, ভরে উঠছি আগুনে।

জলচক্র

পিয়াস মজিদ

বন্দর জাহাজ ভূমধ্যসাগর তারপর রুটি গাছের বন। জৈব-ইচ্ছার পাহাড় ডানে রেখে সামনে সবুজ সুড়ঙ্গ। মৃত্যুরঙ চুড়ি পরা পরীর দল সেখানে ফিসফিস করে কথা কয় আর তাদের মৃদু-মিহি গুঞ্জনে সুড়ঙ্গে জেগে ওঠে একের পর এক রক্তরেখা।

দৃশ্যটির আরও বিনির্মাণ চাই। কাছেই সমুদ্র তবু সুড়ঙ্গ এতটা শান্ত? পাশাপাশি এত রঙÑসবুজ, মৃত্যু, রক্ত? পটভূমে একই সঙ্গে বন ও পাহাড়! না, তুলিতে স্বপ্নের ভাগটা একটু বেশি হয়ে গেছে। একটা ঝড় এঁকে ওলটপালট করে দেই সব।

হ্যাঁ, এবার হলো ছবিটির যথাযথ ভাঙচুর। সুড়ঙ্গ-টুড়ঙ্গ উধাও। ক্যানভাসে শুধু মৃত সমুদ্রের কিছু বালিও ফেলা।

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: