মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আনন্দিত শক্তি

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • স্বদেশ রায়

পহেলা বৈশাখ নিয়ে সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখায় বেশ মজা পেয়েছিলাম। বালক মুস্তফা সিরাজ কিভাবে বাবার সঙ্গে হালখাতার মিষ্টি খেয়ে ফেরার পথে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়েন। ওই ঝড়ের ভিতর তাঁর সব থেকে বড় চেষ্টা ছিল, ঝড়-বৃষ্টির হাত থেকে ভাণ্ডারির দেয়া মিষ্টির হাঁড়িটি বাঁচানো। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের সঙ্গে শেষ দেখায় তাঁর এই স্মৃতিটি নিয়ে কথা তুলেছিলাম। তিনি সেই সব দিনের মিষ্টি খাওয়ার গল্প করেছিলেন খুব আনন্দের সঙ্গে। মনে হচ্ছিল তীব্র শীতের ভিতর বসেও তিনি যেন ফিরে গেছেন এক কালবৈশাখীর বিকেলে। তার মাঝে তিনি আমাকে প্রশ্ন করেন, তোমরা ছোট বেলায় অমন মিষ্টি খাওনি। হেসে বলেছিলাম, খেয়েছি। কিন্তু আপনার মতো করে সে সব ঘটনা প্রকাশের ক্ষমতা তো নেই। যেমন সারাদিন মিষ্টি খেয়ে এক পর্যায়ে অপারগ হয়ে সমবয়সী দুই ভাই আর এক ভাগনে মিলে ফুলকো লুচির ভিতর মিষ্টি ভরে ভাসিয়েছি জোয়ারের জলে।

তিনি বলেন, বেশ মজার তো তোমার স্মৃতি। এখন কি এমন আর আছে তোমাদের ওখানে? বলেছিলাম, আছে, তবে সে পহেলা বৈশাখ মিষ্টি আর হালখাতায় বাধা নেই। বাধা নেই ফুলকো লুচি বা সান্ধ্য গানে। এখন আমাদের পহেলা বৈশাখ, আমাদের ভালবাসা, আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের দ্রোহ, আমাদের স্নিগ্ধতা। উনি হাসলেন, খুশির সে হাসি। বললেন, যেতে পারিনি তোমাদের বাংলাদেশে। ডাকেনি কেউ। তাই দেখিনি। তবে বুঝতে পারি। তীব্র শীতের জড়সড় সকালে শীত পোশাকে ঢাকা তাঁর মুখের ভিতর দিয়েও তাঁর চোখ দুটো চিক চিক করে ওঠে।

তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, কলকাতার আঁকাবাঁকা ছোট গলি পার হতে হতে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বার বার মনে করি, সৈয়দ মুস্তফা সিরাজের সেই চোখের ভাষা। শুধু বড় বাঙালী লেখক নন, আইপিটিআই-এর একজন কর্মী সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ। তাঁরা তো এমনই একটি আত্ম পরিচয়ের দিন চেয়েছিলেন। এ কথা মনে হতেই মনে হলো, আবার ফিরে যাই তাঁর কাছে। বলি, আপনার সহকর্মী কলিম শরাফীর ভরাট গলার রবীন্দ্রসঙ্গীত দিয়ে আমরা পহেলা বৈশাখের সূর্যকে আহ্বান করি। আবার পাশাপাশি মনে পড়ল, আমি আমার মাকে, পহেলা বৈশাখের সকালে স্নান সেরে নতুন গরদের শাড়িতে, ভিজে চুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে সূর্যকে আহ্বান করতে দেখেছি। হয়ত মুস্তফা সিরাজও দেখেছেন তাঁর মাকে। হয়ত একটু অন্যভাবে। কিন্তু এখন আমরা আমাদের এই বাংলাদেশে সবাই রবীন্দ্র-নজরুলের সুরে পহেলা বৈশাখের সূর্যকে আহ্বান করি।

ষাটের দশকের পহেলা বৈশাখের ঢাকার দ্রোহ আমরা বুঝতে পারি। সেখানে মানুষ কম ছিল। সেখানে বাধা বেশি ছিল। তবে বাধা ভেঙ্গে ফেলার তীব্রতা ছিল অনেক বেশি। পহেলা বৈশাখের লাখো মানুষের দ্রোহের আগুন প্রথম দেখি ৮৩ কি ৮৪ সালে। হয়ত পত্রপত্রিকার পাতায় খুঁজলে সাদা কালো ছবিতে এখনও সেদিনের রমনা বটমূলের ছায়ানটের অনুষ্ঠানটির ছবি পাওয়া যাবে। টাঙ্গাইল শাড়িতে, তরুণ নেত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বসে আছেন দর্শকের সারিতে। সামনে বেজে চলেছে রবীন্দ্র, নজরুল, দ্বিজেন্দ্র, লালন। সে অনুষ্ঠান শেষ হতেই আকাশের সূর্য তেতে উঠল, আর রাজপথে যেন মানুষের দ্রোহের আগুন উঠল জ্বলে। কণ্ঠে কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছে, ‘ ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে...’। বৈশাখের রোদের আগুন আর মানুষের দ্রোহের আগুন তখন একাকার হয়ে উঠেছে। সবাই যেন ওই আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে চায়, নিজের শরীরের ওপর যে সামরিক শাসনের আলখেল্লা চেপে বসেছে ওই আলখেল্লাকে। সেদিনের সামরিক শাসক এরশাদ তখন বাংলাদেশের শিশুকে বাধ্যতামূলক আরবী শেখাতে চাচ্ছে। শিক্ষানীতি সেইভাবে তৈরি হয়েছে। এই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ততদিনে ছাত্ররা রক্ত দিয়েছে। ওই দিনের বৈশাখের রোদকে তাই মনে হলো, রোদ যেন কেমন বুঝতে পেরেছে, তার এখন অনেক দায়। তাকে আগুন হয়ে পোড়াতে হবে বাঙালীর শরীরে চেপে বসা আলখেল্লা।

আর এই ছোটখাটো আকারের বাঙালীর ভিতর কোথায় যেন একটা বৈশাখের রোদের তেজ আছে। তাই মনে হয় পহেলা অঘ্রান নয়, পহেলা ফাল্গুন নয়, তীব্র রোদের পহেলা বৈশাখকেই বাঙালী তার আত্মপরিচয়ের দিন হিসেবে বেছে নিয়েছে। রমনা বটমূলের ছায়ানটের অনুষ্ঠানে যে সময়ে বোমা ফাটানো হয় তখন মূল অনুষ্ঠান থেকে বাইরে রাস্তায় ছিলাম। ছোট্ট সন্তানটি তখন কোলে, পাশে ওর মা। হঠাৎ বিকট শব্দ। কোন কিছু বুঝতে না পেরে ভয় পাওয়া মানুষের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভিতর দৌড়ে যাই। কিন্তু মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত। দেখি বদলে গেছে মানুষ। টিএসসি, বাংলা একাডেমি থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসছে রমনার দিকে। আবার তাদের সঙ্গে ফিরি। কিন্তু পা মেলাবো কিভাবে? কী দারুণ তাদের পদক্ষেপ! কী বিশাল তারা! তখনই মনে হলো, এজন্য মনে হয় শাহাবুদ্দিনের আঁকা ছবিতে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পদক্ষেপ অত দৃঢ়, অত বড় বড় পায়ে উঠে আসে। আসলে এখানেই মনে হয় পার্থক্য। দ্রোহে মানুষকে কতটা দীর্ঘদেহী, কতটা বড় করে তোলে তা না দেখলে বোঝা যায় না। কোন কল্পনা সেখানে পৌঁছায় না। শাহাবুদ্দিন বাঙ্কার থেকে বাঙ্কারে রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। তাই তিনি দেখেছেন ওই পদক্ষেপ। ছোটখাটো ওই বাঙালী শরীরগুলো যখন একের পর এক তীব্র গতিতে রমনা বটমূলের দিকে ছুটে চলে, তখন কী দীর্ঘ তাদের শরীর, কী তীব্র সে গতি। মর্গের সামনেও সেদিন হাজার হাজার মানুষ। না, কারো চোখে জল নয়। বৈশাখের তীব্র রোদ যেন ঝরে পড়ছে। সেদিন ওই মানুষের চোখ দেখে কিছুটা হলেও বুঝতে পারি, কেন বাঙালীর বিরোধীরা পহেলা বৈশাখকে ভয় পায়।

পহেলা বৈশাখের এ শক্তি বাঙালী নিজেই তৈরি করেছে। ষাটের দশকে এ কুড়িটি ফুটেছে। তবে কবে থেকে এর যাত্রা শুরু তা হয়ত কোনদিন জানা যাবে না। জানার দরকারও নেই। কারণ সকল গতির শক্তি চলার ভিতর দিয়েই সৃষ্টি হয়। আর শক্তি শুধু বল দিয়ে তো তৈরি হয়নি, আনন্দ দিয়ে, প্রাণ দিয়ে, প্রবহমান ধারার সুর দিয়ে, ছন্দ দিয়ে, মনের রং দিয়ে তৈরি হয়। তাই তো পহেলা বৈশাখে যারা রাস্তায় আলপনা আঁকে তাদের হাতের তুলিটির রঙের থেকেও রঙিন মনে হয় মুখের রংটি। আনন্দিত সে রং। ‘আনন্দিত’র শক্তির কাছে তস্করের শক্তি সব সময়ই কোন এক ছার।’ তাই তো যতই মেঘ করুক এ বাংলায়, সে মেঘ কেটে যায়। কারণ, এমনি করেই বার বার পহেলা বৈশাখ দুয়ারে এসে বাঙালীর প্রাণে আনন্দ জাগিয়ে দেয়। আর যখন কেউ বলে, আমি আনন্দিত, তখন তাকে রুখবে কে? তাই তো পহেলা বৈশাখের ঢাকগুলো ডিডিং ডিডিং করে বাজায় বিজয়ের জয়ডঙ্কা।

swadeshroy@gmail.com

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: