আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখ ও চারুশিল্পীরা

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫
  • হাশেম খান

১লা বৈশাখ।

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন।

এই দিনটি বাংলাদেশের গ্রাম, শহর সর্বত্র আনন্দ ও নানা রকম উৎসবের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পালিত হচ্ছে। শুধু বাংলাদেশে কেন? বাঙালিরা যেসব শহরে ও দেশে অভিবাসী হিসেবে রয়েছে, যেমন জাপান, ভারত, চীন, কোরিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশেও যথেষ্ট উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিচ্ছে। এই একটি দিন একটি উৎসব যা শতভাগ বাংলা ভাষাভাষী এক সঙ্গে উদযাপন করে। কে বৌদ্ধ, কে মুসলমান, হিন্দু বা খ্রিস্টান, কিংবা আদিবাসী- কোন ভেদাভেদ নেই এই নববর্ষ পালনে। বাঙালিদের অর্জনে এমনি আরও কয়েকটি দিন ও উৎসব রয়েছে। যেখানে বাংলা ভাষাভাষীরা জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই এক। একুশে ফেব্রুয়ারি তেমনি আরেকটি দিন। ঋতুভিত্তিক আরও কয়েকটি দিন বা উৎসব বাংলা ভাষাভাষীর অর্জনে ধীরে ধীরে স্থায়ীরূপে নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। যেমন নবান্ন, বর্ষা উৎসব, শীত উৎসব, বসন্ত উৎসব।

বাংলা ভাষার মর্যাদার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘকালের আন্দোলনের ফসল এই উৎসবগুলো। পাকিস্তান নামক দেশের জন্মের পরপরই ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ প্রচ- এক ধাক্কা খেয়েছিলÑ গবর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ঘোষণায়। পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ নাগরিক বাংলা ভাষায় কথা বললেও বাঙালিদের প্রতি চরম অবহেলা দেখাল পাক সরকার। প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল তরুণ ছাত্র সমাজ। দাবি জানালো উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। পাক সরকার কোন গুরুত্ব দিল না। বিস্ফোরণ ঘটল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানী শাসকবর্গ গুলি চালিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদাকে ধূলিসাত করে দিতে চাইল। ঢাকার রাজপথ বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হলো। মাতৃভাষার জন্য এতো বিশাল ও শক্তিশালী আন্দোলন পৃথিবীর আর কোন দেশে হয়নি। বাঙালির জয় হলেও পাকিস্তান সরকার তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর শাসন, শোষণের যাঁতাকল চালিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বঞ্চনা ও নির্যাতনের দিকে ঠেলে দিল। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে সেনাপতি ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে। সামরিক শাসকদের প্রচ- রাগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের ওপর। রাজনৈতিক নেতাসহ বহু বিশিষ্ট মানুষদের জেলে পুরে দেয়। পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতি চর্চা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়া হয়। সামরিক আইনের আওতায় এনে সংস্কৃতি চর্চা, লেখাপড়া এমনকি সামাজিক আচার অনুষ্ঠানের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সামরিক শাসকদের অনুমতি, হুকুম ও পছন্দ ছাড়া কিছু করা যাবে না।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ সেই শুরু থেকেই নিজের ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। আরোপিত কিছু, অন্যায়ভাবে কোন নির্দেশ, যা বাঙালির সমাজ-সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, কিংবা অপমান করছে; তা মেনে নেয়নি। ১৯৬০ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পালনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ কল্পে তোড়জোড় করে বাঙালিরা যখন আয়োজন শুরু করে, প্রচ- বাধা আসে সামরিক শাসকদের কাছ থেকে। রবীন্দ্র সাহিত্য ও সঙ্গীতকে অপবাদ দিতে থাকে, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু, তাঁর সাহিত্য-সঙ্গীত সবই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য। পাকিস্তান ইসলামী দেশ। মুসলমানদের মধ্যে রবীন্দ্র সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চা চলবে না। ইত্যাদি আরও কিছু ফতোয়া জারি করে।

কিন্তু স্বৈরশাসকরা বহুবিধ আইন করে, বাধার সৃষ্টি করে বাংলার মানুষদের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও বাংলা সংস্কৃতি চর্চার জয়যাত্রাকে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়।

পাকিস্তানের সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু ও বিধিনিষেধের বেড়াজালকে উপেক্ষা করে বাঙালীরা রবীন্দ্র শতবার্ষিকী অত্যন্ত সফলতার সঙ্গেই পালন করে। আর এই ধারাবাহিকতা রক্ষাকল্পে তথা বাংলা সংস্কৃতি চর্চাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া এবং শুদ্ধ সঙ্গীত চর্চার জন্য সে সময়ের বিদ্বজ্জন, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় ছায়ানট প্রতিষ্ঠানটি। ‘ছায়ানটের’ সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতারা নিছক সঙ্গীত চর্চার জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি গড়েননি। সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও চেতনা থেকে বাংলা সংস্কৃতি ও সঙ্গীত প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মান্তর ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত হোক, তরুণরা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হোক, লালন করুক ধারণ করুক। ছায়ানটের পরবর্তী কার্যক্রম বস্তুত সেই লক্ষ্যেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে।

‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠায় প্রধানত যাঁরা উদ্যোক্তা ছিলেন তাঁরা হলেনÑ মহীয়সী মানুষ সুফিয়া কামাল, সানজিদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক, মোখলেছুর রহমান তথা সিধু ভাই, শামসুন্নাহার, ফরিদা হাসান, কামাল লোহানী, আহমেদুর রহমান, সাইফুদ্দিন মানিকসহ অনেক প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গ।

বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক ও ষাটের দশকÑ এই বিশ বছর ছিল পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলার মানুষের জাগরণের কাল, আত্মোপলব্ধির সময়। আইয়ুব খানের কঠিন সামরিক আইন বাঙালিদের বেশিদিন দমিয়ে রাখতে পারল না। পাঁচ বছরের রাজনীতির নিষিদ্ধ কালকে মাত্র তিন বছরের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ ভেঙ্গে ফেলল। রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম একীভূত হয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহে পরিণত হলো। ১৯৬১ সালে ছায়ানট প্রতিষ্ঠা যেমন হয়েছেÑ প্রগতিবাদী লেখক, সাংবাদিক ও নাটকের মানুষরাও সংগঠিত হয়ে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে মননে ধারণ করে চর্চার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করে সাধারণ মানুষকে উজ্জীবিত করে তুলতে পেরেছে। অন্যদিকে চারু ও কারুশিল্পীরা চারুকলা ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে চারু ও কারুকলার চর্চার ক্ষেত্রকে দিনে দিনে বিস্তৃত করে জনগণের জীবন যাপনে রুচির বদল ঘটাতে শুরু করল। লোকচিত্র, লোক কারুশিল্পকে পুনরুদ্ধার করে মানুষের কাছে তুলে ধরা হলো। বাংলা শিল্পের মূল ও শিকড়কে আমাদের ‘লোকশিক্ষাÑ ’ মানুষ অনেককাল পর আবার বুঝতে শুরু করল। জনজীবনের শুদ্ধাচার ও আনন্দ-উৎসবে ‘আল্পনা’ যে সহজ একটি মাধ্যম তা নতুনরূপে সমাজ জীবনে প্রোথিত হতে লাগল।

সে সময় যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল জনকল্যাণে তথা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করে চলেছেÑ তাদের মধ্যে প্রধান ও শক্তিশালী দল ছিল আওয়ামী লীগ। কমিউনিস্ট পার্টি ও কিছু বাম দল ও আওয়ামী লীগের মতো জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলনে মানুষের সঙ্গে থেকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ কিছু দল ছিল যারা সামরিক সরকারের তল্পিবাহক ও দালালি করে বাংলার মানুষের অগ্রগতিকে সবসময় বাধাগ্রস্ত করে এসেছে। এরা হলোÑ মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলাম।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি আইয়ুব খান পাকিস্তানের সংস্কৃতি কী হবেÑ সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা, ব্যাখ্যা ও পটভূমিসহ এক বৃহৎ গ্রন্থ তৈরি করেন। পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সেই আরোপিত সংস্কৃতি পালনের নির্দেশও দেয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তা ভ্রƒক্ষেপও করেনি। হাস্যকর ও স্থূল সংজ্ঞার সেই ‘পাকিস্তানী সংস্কৃতি’ বাঙালিরা যেমন প্রত্যাখ্যান করেছে তেমনি পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবী, সিন্ধী, বেলুচ, পশতু ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কারও কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ‘সংস্কৃতি’ হঠাৎ করে কারো নির্দেশে তৈরি হয় না। দীর্ঘকালের ধারাবাহিক জীবনধারা, যা অর্থনীতি, উৎপাদন, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রভাবে ধীরে ধীরে কোন জাতি বা গোষ্ঠীর ‘সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠে।

১৯৬৬ সালে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান (পরবর্তীতকালে বঙ্গবন্ধু ও জাতির জনক) পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুললেন। একইভাবে পশ্চিম পাকিস্তানও স্বায়ত্তশাসনের আওতায় আসলে পাকিস্তানের দুই অংশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি আসবে এবং সবদিকেই সমৃদ্ধি লাভের দুয়ার খুলে যাবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা হিসেবে ছয়টি দফা তুলে ধরেন। মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে যায় ছয় দফার মর্ম। দীর্ঘকাল অপশাসন ও নিপীড়নের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা মুক্তি পাওয়ার আলোর সন্ধান পায় ছয় দফায়। আইয়ুবের সামরিক শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে আপামর জনতা ‘ছয় দফা’ বাস্তবায়নে আন্দোলন গড়ে তোলে শহরে বন্দরে, গ্রামে গঞ্জে সর্বত্র। সামরিক জান্তা শেখ মুজিবের ছয়দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবি জনগণ কর্তৃক গ্রহণযোগ্যতায় ভীত হয়ে পড়ে। ছয়দফা আন্দোলনকে অঙ্কুরেই শেষ করে দেয়ার জন্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘দেশদ্রোহী’ অপবাদ দিয়ে ‘আগরতলা কনসপ্রেসী’ নামে মামলায় জড়িয়ে বহু রাজনীতিবিদ ও উচ্চতর পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তাদের আটক করে জেল খানায় নিয়ে যায়। একই সঙ্গে আইয়ুব খান ১৯৬৮ সালে তার সামরিক শাসনের-উন্নয়নের ১০ বছর বহু অর্থ ব্যয়ে ঘটা করে পালন করে। তিনি মনে করেছিরেন তার সামরিক উন্নয়নের জৌলুসে মানুষ তার দিকে মুখ ফিরাবে। ফল হলো উল্টো। মানুষ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র পুনঃউদ্ধারে শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দীদের মুক্তির জন্যে সারা দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দিল। তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্র সমাজ তাদের ১১ দফা নিয়ে যে দুর্বার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল তা একত্রিত হলো ‘ছয়দফা’ ও শেখ মুজিবের মুক্তির আন্দোলনে। ছাত্র জনতার মিলিত আন্দোলনের তীব্রতা ও শক্তির কারণে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠল সারাদেশে। ভয়াবহ সেই বিপ্লবে (যা ইতিহাসে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন স্বীকৃত) আইয়ুবের সামরিক শাহী শুধু টলটলায়মান নয়Ñ ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। জনতার কাছে পরাজয় মেনে নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হলেন।

এরপরের ইতিহাস সবারই জানা। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ- পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সরকার গঠন করবে আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাদ সাধল পশ্চিম পাকিস্তানের কুচক্রী নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ও সেই সামরিক জান্তা। ফলে আবার বিক্ষোভ এবং এক দফা। আর তোমাদের (পাকিস্তান) সঙ্গে নয়। শুধু স্বাধীনতা। বাংলার মানুষ চায় স্বাধীনতা। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার মানুষ ভারতের সহায়তায় নয় মাস ধরে সশস্ত্র যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনল।

ঢাকা শহরে পহেলা বৈশাখ-এর উপক্রমনিকা হিসেবে এই দীর্ঘ পটভূমি উল্লেখ করতে হলো। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বই ছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১। সেই সময়ের সংস্কৃতির মানুষরাই রাজনৈতিক নেতাদের সাহস যুগিয়েছে, শক্তি যুগিয়েছে। রাজনীতিসমৃদ্ধ হয়েছে সংস্কৃতির মানুষদের কারণেই। সেই সময়ের পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষকে বাঙালি হিসেবে নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে ধারণ ও লালন করে পরিচিতি লাভের শক্তি ও প্রেরণা জুগিয়েছে এদেশের লেখক সাংবাদিক শিক্ষক সংগীত শিল্পী চিত্রশিল্পী নাট্যকার ও অন্যান্য সংস্কৃতির মানুষরা। এরাই গড়ে তুলেছেন ‘ছায়ানট’ চারুকলা ইনস্টিটিউট ও অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠান। শিল্পের ঐতিহ্য ও মূল খুঁজতে গিয়ে বাংলার লোক-সংস্কৃতির দিকে ফিরে তাকাতে হয়েছে বারবার। কৃষিনির্ভর বাঙালির গ্রামীণ জীবনই ছিল সমৃদ্ধ জীবন। ষড়ঋতুর দ্বারা আবর্তিত প্রকৃতিনির্ভর চাষবাস, জীবনযাপন, পোশাক, পরিচ্ছদ আচার অনুষ্ঠান ও উৎসব। দীর্ঘকাল ধরে গ্রামীণ সমাজ বাংলা মাস বৈশাখের প্রথম দিন বছরের যাত্রা শুরু হিসেবে উৎসবমুখর করে জীবন শুরু করে এসেছে। বঙ্গাব্দ হিসেবেই জীবন যাত্রার প্রচলন ছিল। খ্রিস্টাব্দ গ্রামে কখনই গুরুত্ব পায়নি। নানা কারণে বর্তমানে হয়তো কিছু ঢুকেছে। বছরের শেষদিন চৈত্রসংক্রান্তির উৎসবÑ হালখাতা বা বছরের হিসাব নিকাশ, দেনা পাওনার দিন ঐতিহ্যগত সমৃদ্ধ এক উৎসব।

‘ছায়ানট’ ও চারুকলা ইনস্টিটিউট বাংলা সংস্কৃতির মূল ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্যটি বাংলা নববর্ষকে নবরূপে ঢাকা শহরে নিয়ে এসেছে। ছায়ানট প্রতিষ্ঠার এক বছর পূর্তি অনুষ্ঠান-১৯৬২তে ১লা বৈশাখে শুরু করে। অনুষ্ঠানটি হয়েছিল বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার উদয়ন স্কুল চত্বরে। তখন নাম ছিল ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুল। এর পর প্রতিবছর এই ১লা বৈশাখেই ছায়ানটের নবীন সংগীত শিক্ষার্থীদের সনদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়মিতভাবে হয়ে এসেছে। ধীরে ধীরে ‘ছায়ানটে’র এই ১লা বৈশাখের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গেলে ‘প্রিপারেটরি স্কুলে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছিল না। তাই ১৯৬৭ সালে শিক্ষক গবেষক ও প্রকৃতি প্রেমী ড. নওজেশ আহমেদ-এর প্রস্তাব অনুযায়ী রমনার বটমূলে ১লা বৈশাখ প্রত্যুষে ‘ছায়ানট’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তারপর ঢাকাবাসীর জোয়ার নামে প্রতিটা বছর ১লা বৈশাখের ভোরবেলা। রমনার সবুজ চত্বর ছেয়ে যায় সংগীতপ্রিয় মানুষের ঢলে। ১লা বৈশাখকে প্রাণের উৎসবে ও বাংলার ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করার গর্বের অর্জনকে এনে দিতে পেরেছে ‘ছায়ানট’। প্রায় অর্ধশতকের বেশি কাল ধরে ‘ছায়ানট’ বাংলাগান, বাংলা সংগীতের চর্চা, সংগীতের সমৃদ্ধি, সাধারণ মানুষ ও তরুণ প্রজন্মকে রুচিশীল সংগীত প্রিয়তার দিকে নিয়ে যাওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে চলেছে। অন্যদিকে বাংলা নববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান, দেশের প্রতি ভালবাসার চর্চাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিচ্ছে।

চারুকলা ইনস্টিটিউটকে কেন্দ্র করে চারুশিল্পীরা, চারুকলার ছাত্র শিক্ষকরা দীর্ঘ কাল ধরে ‘ছায়ানটের’ মতোই ধারাবাহিকভাবে ১ লা বৈশাখে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও বৈশাখী মেলার জমজমাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় চারুশিল্পীদের তৈরি বাংলার ‘লোকশিল্পের’ ছোট ছোট বস্তু সামগ্রীর বিশাল আকৃতির রূপ মানুষকে দারুণভাবে উৎসাহিত করেÑ তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেÑ পরিচিত হয় বাংলার মূলধারার শিল্পের সঙ্গে। মঙ্গল শোভাযাত্রার দর্শন-মানুষকে ভাবায়।

পুরনো জীর্ণ ও অশুভ শক্তিকে রুখে দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে নতুন বছরের শুরু থেকেই মানুষের জন্য কল্যাণকামী হতে হবেÑ মানুষের ‘মঙ্গল’ করে যেতে হবে। বৈশাখী মেলায় নিয়ে আসা হয় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকশিল্পীদের, কারুশিল্পীদের। চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকদের কৃত শিল্পকর্মের পাশাপাশি থাকে তাদের শিল্পকর্ম-কারুশিল্প। আয়োজন থাকে যাত্রাপালার, লোকগানের, কবিগানের, জারি সারি গানের ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের।

ঢাকা শহরে স্বাধীনতার পর বহু প্রতিষ্ঠানই নিয়মিত ও অনিয়মিতভাবে বাংলা নববর্ষকে নানারকম বৈচিত্র্যময় মেলা ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে এসেছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলোÑবিসিক, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু ‘ছায়ানট’ ও চারুকলার শিল্পীরা স্বাধীনতা সংগ্রামকালে ও পূর্বে বৈরী পরিবেশেÑ নিষেধাজ্ঞার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সাহস ও মনোবল নিয়ে বাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় সাহসী ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজও নতুন নতুন রূপ নিয়ে এগিয়ে এসে মানুষকে ঐতিহ্য রক্ষা ও শুদ্ধ-সংস্কৃতির চর্চার প্রতি সম্মান জানাতে প্রেরণা যোগাচ্ছে।

তারিখ : ৮.৪.২০১৫

প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০১৫

১৪/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: